Home গল্প তোমাদের গল্প যমুনার তীরে -মেহেদী হাসান সানি

যমুনার তীরে -মেহেদী হাসান সানি

উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত এক গ্রাম রতনপুর। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বৃহত্তর যমুনা নদী এ গ্রামের প্রধান আকর্ষণ। যেমন চরোৎপাদী তেমন কুলগ্রাসী এ নদী রতনপুরের সাক্ষী হয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। ক’দিন যাবৎ গ্রামে প্রচণ্ড শীত। দিনের বেলা সূর্য দেখা দায়। কুয়াশার চাদরে মোড়ানো যেন সমস্ত প্রকৃতি।
কনকনে শীতের সকালে গোসল সেরে নিলো রশিদ। শহরে যাবে। জরুরি মিটিং আছে। উঠানের দিকে তাকিয়ে দেখল থরথর কাঁপুনি দিয়ে কে যেন বাড়ির দিকে আসছে। রশিদ খুব একটা গুরুত্ব দিলো না। চেয়ারম্যান মানুষ। সারাদিনই বাড়িতে লোকজনের আসা যাওয়া থাকে।
কে! আবুল চাচা না! এতদিন পর মনে পড়ল আমাগো কথা?
হ বাজান, অনেক দিন বাদে তোমাগো কথা মনে পড়ল। কেমন আছ, বাড়ির সবাই কেমন আছে?
আছে চাচা, আল্লাহর রহমতে ভালোই আছে।
তা এত সকালে কী মনে করে?
শুনলাম এলাকায় নাকি শীতের কম্বল বিতরণ হইবো, আমরা কবে পামু তা-ই জানতে আইলাম?
চাচা, কম্বলতো দিব এমপি সাহেব। গতকাল শুক্রবার দেওনের কথা ছিল, কিন্তু ঢাকায় উনার জরুরি মিটিং থাকায় এলাকায় আইতে পারে নাই। রাতে মোবাইলে কইলো আগামী শুক্রবার সব ব্যবস্থা করতে, উনি আসবেন। গ্রামে গ্রামেতো মাইকিংও হইছে, তুমি শুন নাই চাচা?
হ শুনছি! কিন্তু আমার যে একটা কম্বল খুব দরকার। শীতের কারণে একদম ঘুমাইতে পারি না, সারারাত বইয়া কাঁপন লাগে!
কিন্তু কী করার চাচা, উনারাতো গ্রামে আইসা সভা করবেন, সাংবাদিক ডেকে ছবি উঠাবেন, তারপরে তোমাদের কম্বল বিজয়ী করবেন। পারমিশন ছাড়া আমি এখন কেমনে কম্বল দেই! তই বও, দেখি ঘরে কিছু আছে কি না!
ফুলছড়ি ইউনিয়নের নবীন চেয়ারম্যান রশিদ উদ্দিন। তার বাবা ছিলেন আমির উদ্দিন। আশপাশের দশ গ্রামজুড়ে ছিল তার সুনাম। তারই একনিষ্ঠ কর্মচারী ছিলেন আবুল হোসেন। যমুনার ভাঙনে ঘরবাড়ি সব বিলীন হয়ে গেলে এ বাড়িতেই আবুলের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়। হালের গরু আর খেত খামার দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল আবুলের। মন দিয়ে কাজ করত সে, কোনো দিনও গাফিলতি করেনি। এ জন্য আমির উদ্দিনের আস্থাও পেয়েছিলো বেশ। আবুলের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তার একমাত্র কন্যার বিয়েও দিয়ে দেন আমির। কিন্তু বিয়ের বছরখানেক যেতে না যেতেই এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে মারা যায় তার মেয়ে। সেই শোকে আবুল অনেকটা পাথর হয়ে যায়। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে শান্ত রাখে আমির। কিন্তু বছর কুড়ি আগে আমির উদ্দিনের মৃত্যুর পর এ বাড়ি ছেড়ে চলে যায় সে। অবশ্য আমির উদ্দিনের স্ত্রী তাকে আরো কিছুদিন থেকে যেতে বলেছিলো, কিন্তু সে আর থাকেনি। সহায়-সম্পত্তি তখন কিছুটা লোপ পেয়েছিলো, বাড়তি লোক রাখা ও খাওয়ানো একরকম বোঝা হয়ে যাচ্ছিল। আবুল বিষয়টি বুঝতে পেরে অন্যত্র চলে যায়। এখন সে গজারিয়া ইউনিয়নের মাঝিঘাট পাহারা দেয়। একা মানুষ, কিই-বা আর করার আছে। কোন রকম দিনাতিপাত করা। বয়স আনুমানিক ৮০ হবে। জীবনের বহু রং সে প্রত্যক্ষ করেছে। বাল্যকালে স্কুলের বারান্দায়ও ঘুরেছে দু’য়েক বছর। দেখেছে ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল আর স্বাধীন বাংলাদেশের নানা চড়াই উতরাই কাহিনী।
রশিদ ঘর থেকে পুরাতন একটা স্যুয়েটার বের করে আনল। আবুলের হাতে তুলে দিয়ে বলল, চাচা আগামী শুক্রবার হাইস্কুল মাঠে চলে আইসেন। বেশি আগে যাওয়ার দরকার নাই। আপনারটা আমি আলাদা করে রাখমুনে। এহন আমার একটু শহরে যাওন লাগবো, দেরি হইয়্যা যাইতেছে। আপনি বসেন, ডাল-ভাত যা আছে একটু খেয়ে যায়েন।
আমির উদ্দিনের বড় ছেলে রশিদ। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরেছে। ছোট দুই বোনের বিয়ে দিয়েছে, আর এক ভাইকে শহরে পড়ালেখা করাচ্ছে। গত ইলেকশনে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে রশিদ। এরই মধ্যে এলাকায় বেশ নামডাক পড়ে গেছে। সব মানুষের খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করে। সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে সকলের পাশে থাকে সে। এলাকার এমপি, ওসি থেকে শুরু করে শিক্ষক, ব্যবসায়ী, দিনমজুর সবার সাথে তার সম্পর্ক ভালো।
শুক্রবার, দুপুর থেকেই স্কুল মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ। কম্বল বিতরণ হবে দুই হাজার কিন্তু মানুষের উপস্থিতি দশ হাজারেরও বেশি। উত্তরবঙ্গের শীত বলে কথা। তার ওপর এ বর্ষায় যমুনা নদীর ভাঙন ছিল মারাত্মক। সাতটি গ্রাম পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে, ভাঙনের কবলে পড়েছে আরো দশ বারটি গ্রাম। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ, উদ্বাস্তু হয়েছে শতাধিক পরিবার। আপাতত যে যেখানে পেরেছে কোন রকম আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে। কিন্তু শীত থেকেতো আর বাঁচার উপায় নেই।
মাঠের পরিস্থিতি দেখে রশিদ কিছুটা উদ্বিগ্ন। ক’দিন যাবৎ এই কম্বল বিতরণ নিয়েই ছিল তার খুব ব্যস্ততা। এতলোক এখন কী করে সামাল দেবে। স্থানীয় নেতারা এলাকার বাস্তব চিত্র ও চাহিদা বারবার ঊর্ধ্বতন জনপ্রতিনিধিদের জানানোর চেষ্টা করেছেন। তারপরও কেন এত কম কম্বল বরাদ্দ হলো তা কারো জানা নেই। যাই হোক পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিক আরো কিছু কম্বল ম্যানেজ করা হলো। রশিদ এক ফাঁকে তার ইউনিয়নের লোকজনদের দেখে নিলেন। আবুল চাচার কথাও তার মাথায় আছে। কিন্তু উনাকে এখন পর্যন্ত দেখা গেল না। এমপি সাহেবসহ অতিথিবৃন্দের আসতে আসতে প্রায় বিকাল সাড়ে তিনটা বাজল। কিছু কথা আর আনুষ্ঠানিকতা সেরে কম্বল বিতরণ শুরু হলো। প্রথম দিকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও শেষের দিকে হুলস্থূল বেধে গেল। বিতরণ শেষ হতে হতে সন্ধ্যা নেমে এলো।
কনকনে শীতের রাতে কিছুটা বিষণ্নতা নিয়েই বাড়ি ফিরল রশিদ। পর্যাপ্ত কম্বল না থাকায় বিতরণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে, অনেককে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। তার চেয়েও বড় কারণ আবুল চাচা কম্বল নিতে আসল না। বেচারা একটা কম্বলের আশায় গত সপ্তাহে সাঁঝসকালেই ভাঙা শরীর নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সাত কিলো পাড়ি দিয়েছিলো অথচ আজ বিতরণের দিন তার দেখা মিলল না, এটা কিছুতেই বুঝে আসছে না রশিদের। মনে মনে একটা আশঙ্কাও জাগ্রত হলো তার। ভাবল কাল সকালেই একবার গজারিয়ার মাঝিঘাট থেকে ঘুরে আসবে।
ফজর নামাজ পড়ে ভালো করে গায়ে চাদর মুড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল রশিদ। কম্বলটাও বেঁধে নিলো মোটর সাইকেলের পিছনে। কুয়াশার জাল আর কাঁচা-পাকা রাস্তা পেরিয়ে প্রায় ঘণ্টা খানেক পর পৌঁছল মাঝিঘাট। পরিচিত এক দোকানে বসে আগে এক কাপ চায়ের অর্ডার দিল সে।
তা, চেয়ারম্যান সাব, সাঁঝ-সকালেই মাঝিঘাট কী মনে করে?
আসছি আবুল চাচার সাথে একটু দেখা করতে।
আবুল!! ওরে আর কই পাইবা। ওতো ঐপারে চলে গেছে।
ঐপারে চলে গেছে মানে?
মানে আর কী, হায়াত তো আর কম পায় নায়। গত পরশু রাইতে আমার দোকানে বইসা শেষ চা খাইল, মাঝরাত পর্যন্ত হাঁকডাক দিয়া ঘাটও পাহারা দিল। শেষরাতে আর কোন সাড়া শব্দ নাই। ফজর ওয়াক্তে এত ডাকলাম আর উঠল না।
চা আর শেষ করা হলো না রশিদের। চোখের কোণায় দু’ফোঁটা জল ছলছল করে উঠল তার। গত রাতের আশঙ্কাটাই সত্যি হয়ে দেখা দিল। কিন্তু এর জন্য প্রস্তুত ছিল না সে। একজন জনম দুঃখী মানুষ, মৃত্যুর আগে যার কপালে জুটল না সামান্য একটা কম্বল, এই ভাবনাটাই তাকে বেশি পীড়া দিচ্ছে!
দোকানদার আরো কী যেন বলে যাচ্ছে, সে দিকে আর মনোযোগ নেই রশিদের। কিছুটা সময় উদাসীন থেকে কবরটা দেখার জন্য বের হয়ে আসল সে।
নতুন মাটি, মনে হয় কিছুক্ষণ আগে কবর দেওয়া হয়েছে। শিশিরভেজা নারিকেলের পাতাগুলো ছড়িয়ে আছে প্রাণহীনভাবে।
কুয়াশার ভিড় কেটে সূর্যের আলো ততক্ষণে কিছুটা ফুটে উঠেছে যমুনার তীরে। সে দিকেই অপলক দৃষ্টি রেখে নিঃসঙ্গভাবে দাঁড়িয়ে রইল শোকাহত এক ক্ষুদ্র জনপ্রতিনিধি।

SHARE

Leave a Reply