Home খেলার চমক বাবর আজম ব্যাটিংয়ের নতুন নক্ষত্র -আবু আবদুল্লাহ

বাবর আজম ব্যাটিংয়ের নতুন নক্ষত্র -আবু আবদুল্লাহ

ক্যারিয়ারের পাঁচ বছরও পূর্ণ হয়নি। ওয়ানডে খেলেছেন মাত্র ৭৪টি, টেস্ট ২৬টি (মার্চ ২০২০ পর্যন্ত) আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যেকোনো ব্যাটসম্যানের জন্য এটি সূচনা পর্ব হিসেবেই ধরা হয়; কিন্তু তারপরও বাবর আজমের নাম উচ্চারিত হচ্ছে বিরাট কোহলি, স্টিভ স্মিথ কিংবা শন উইলিয়ামসনের পাশাপাশি। অনেকেই তাকে বলেন ‘পাকিস্তানের বিরাট কোহলি’।
ক্রিকেট দুনিয়ায় পা রেখেই বাবর দৃষ্টি কাড়েন বিশেষজ্ঞদের। প্রথম দিন থেকেই তার মাঝে পরিণত ক্রিকেটারের ছোঁয়া দেখতে পান সবাই। নিখুঁত টেকনিক, ফুটওয়ার্ক, শট সিলেকশন সব কিছুতেই তিনি আলাদা ছিলেন যে কোন নবীন ক্রিকেটারের চেয়ে। যতই সময় গড়িয়েছে তার প্রমাণও দিয়েছেন বাবর। দুবাইয়ের মরুর বুকে যেমন রানের ফুলঝুরি ছুটিয়েছেন, তেমনি অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ইংল্যান্ডের মাটিতে রানের পর রান করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার দুইবারের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক রিকি পন্টিং যার মাঝে বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান হওয়ার সম্ভাবনা দেখেন। পাকিস্তানের নতুন ব্যাটিং স্তম্ভ বাবর আজম। মিসবাহ উল হক, ইউনুস খানদের বিদায়ের পর পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা বেশ ভালোভাবেই কাটিয়ে উঠেছে দলটি। আর এই জায়গাটি পূরণ করেছেন ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। ২৫ বছর বয়সেই বাবর পাকিস্তান ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছেন। সব ফরম্যাটের ক্রিকেটে সমান কার্যকর তার ব্যাট। যে কারণে এখইন তার তুলনা চলছে বিরাট কোহলি, স্টিভ স্মিথদের সাথে। অনেকদিন ধরেই আইসিসির টি-টোয়েন্টি র‌্যাঙ্কিংয়ে সেরা ব্যাটসম্যান তিনি, আছেন টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের সেরা পাঁচে। তার চেয়েও বড় কথা অভিষেকের পর থেকেই ধারাবাহিক পারফর্ম করে চলছেন এই ব্যাটসম্যান।

অভিষেক ও উত্থানপর্ব
পাকিস্তান ক্রিকেটের সঙ্কটময় সময়টাতে বেড়ে উঠেছেন বাবর আজম। ২০০৯ সালে লাহোরে শ্রীলঙ্কার টিম বাসে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকেই দেশটিতে অনেক বছর বন্ধ ছিলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। সেই সময়টাতে এই লাহোরেই বেড়ে উঠেছেন বাবর। যখন পাকিস্তানকে হোম ম্যাচও খেলতে হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা অন্য কোন দেশে। এরপর পাকিস্তানে ক্রিকেট ফেরাতে যখন মরিয়া দেশটির ক্রিকেট বোর্ড সেই সময় জাতীয় দলে আসেন বাবর। অনেক আলোচনার পর ২০১৫ সালে জিম্বাবুয়ে দল পাকিস্তান সফর করে। সেই সিরিজে নিজ শহর লাহোরে আন্তর্জাতিক অভিষেক বাবরের।
ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ক্রিকেটের মধ্যে। বাড়িতেই ছিলো ক্রিকেটের চর্চা। চাচাতো ভাইদের সাথে বাড়ির উঠানে খেলতেন। তোমরা কি জানো বাবরের চাচাতো ভাই কারা? আকমল ব্রাদার্স- অর্থাৎ কামরান আকমল, আদনান আকমল ও ওমর আকমল। আকমলরা তিন ভাই-ই খেলেছেন পাকিস্তান জাতীয় দলে। তাদের সাথেই বেড়ে উঠেছেন বাবর। ছোট বেলায় বাড়ির উঠানে একসাথে খেলতেন এই চারজন। চারজনই খেলেছেন পাকিস্তান দলে; বিষয়টা বিস্ময়কর তাই না! বাবর আজম পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৫ দলে খেলার পর সুযোগ পেয়েছেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। ২০১০ ও ২০১২ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলেছেন। শেষবার পাকিস্তানকে নেতৃত্বও দিয়েছেন। দুইবারই ছিলেন দলের পক্ষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক।
ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব মেধাবী ক্রিকেটার বাবর। কামরান আকমল একবার বলেছেন, ছোটবেলা থেকে তাকে কিছু শিখিয়ে দিতে হতো না আমাদের। ভালো ক্রিকেটারের সব কিছুই আছে তার মধ্যে, আমরা শুধু সমর্থন দিয়েছি।
আদর্শ ব্যাটসম্যানের সব যোগ্যতাই আছে তার। উকেটের চারদিকে শট খেলতে পারেন সমান তালে। আর যার প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে প্রতি ম্যাচে। প্রথম ওয়ানডেতে হাফ সেঞ্চুরির পর ধারবাহিকভাবে রান পেয়েছেন। তবে পুরোপুরি জাত চিনিয়েছেন পরের বছর আরব আমিরাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজে। পরপর তিন ম্যাচে খেলেছেন ১২০, ১২৩ ও ১১৭ রানের ইনিংস। সে বছরই ডাক পান টেস্ট দলে। ২০১৭তে অস্ট্রেলিয়া সফরে অ্যাডিলেডে স্টার্ক-হ্যাজেলউল-কামিন্সদের বিরুদ্ধে খেলেছেন ১০০ রানের অনবদ্য ইনিংস। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়ে প্রভিডেন্সে খেলেন অপরাজিত ১২৫ রানের ইনিংস। এরপর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি পাকিস্তানে হয়। সেখানে বড় কোন ইনিংস না খেললেও মাঝারি কিন্তু কার্যকর কয়েকটি ইনিংস খেলেন।
ওই বছরই অক্টোবরে দুবাই ও আবুধাবিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পরপর দুই ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি করেন। মোট কথা এই সময়টাতেই বিশ্ব ক্রিকেটে দাপুটে আবির্ভাব বাবর আজমের। তাকে ভবিষ্যতে গ্রেট হিসেবে বিবেচনা শুরু হয়ে গেছে ততদিনে। অফ ফর্ম এখন পর্যন্ত তাকে ছুঁতে পারেনি। ৭১ ইনিংসে এসে পেয়েছেন ১১তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি, যেটি করতে বিরাট কোহলির লেগেছিল ৮২ ইনিংস।
আগেই বলেছি বাবর আজম রান করেছেন বিশ্বের সব প্রান্তে। গত ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অসাধারণ এক সেঞ্চরি করে ম্যাচ জিতিয়েছেন। গত বছর নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে পরপর দুই টেস্টে ব্রিসবেন ও অ্যাডিলেডে খেলেছেন ১০৪ ও ৯৭ রানের ইনিংস। সাধারণত ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট এক্সপার্টরা তাদের মাটিতে রান করতে না পারলে কোন ব্যাটসম্যানকে সেরা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চান না- বিশেষ করে উপমহাদেশের ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে। কারণ উপমহাদেশের টার্নিং উইকেটে খেলে অভ্যস্ত ব্যাটসম্যানদের জন্য ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজে রান করা কঠিন। সেখানকার পিচ বানানো হয় এমনভাবে যাতে বলে প্রচুর সুইং ও বাউন্স পায় পেস বোলাররা। পিচে এত ঘাস থাকে অনেক সময় আউটফিল্ড থেকে পিচ আলাদা করা কঠিন হয়ে যায়। ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতি নিয়ে একটি বল যখন হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে মাথার কাছে কিংবা মিডল স্টাম্পে পড়েও সুইং করে অফ স্টাম্পের বাইরে দিয়ে চলে যায়- তখনই আসলে ব্যাটসম্যানের আসল পরীক্ষাটা হয়ে যায়।
বাবর আজম ক্যারিয়ারের শুরুতেই এই পরীক্ষায় পাস করেছেন। কিšুÍ এত কিছুর পরও একটি জিনিস বাকি ছিলো তার- দেশের মাটিতে রান করা। বাবরের অভিষেকের সময় থেকে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফেরার প্রক্রিয়া শুরু হলেও সেই অর্থে বড় কোন সিরিজ হয়নি। আসল শুরুটা হয়েছে গত বছরের শেষ দিকে। শ্রীলঙ্কার পর বাংলাদেশের সাথে পূর্ণাঙ্গ হোম সিরিজ খেলেছে পাকিস্তান। আর সেই সিরিজে দেশের দর্শকদের সামনে বাবর দেখিয়েছেন তার ব্যাটিং ঝলক। দেশের মাটিতে এই দুটি সিরিজে তার সর্বশেষ ইনিংসগুলো ছিলো – ১০২*, ৬০, ১০০*, ৬৬*, ১৪৩। ওয়ানডেতে তার ব্যাটিং গড় ৫৪, টেস্টে ৪৫। ওয়ানডেতে ১১ সেঞ্চুরির পাশাপাশি ২৬ টেস্টে সেঞ্চুরি আছে ৫টি। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে কেন তাকে এখনই বিশ্ব ক্রিকেটের সেরাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। টি- টোয়েন্টির কথা কী আর বলতে হবে! সেখানে কিন্তু তিনি আইসিসি র‌্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর ব্যাটসম্যান। ৩৮ ম্যাচ খেলে গড় ৫১ (প্রায়)। সবচেয়ে কম ইনিংসে এক হাজার রান করার বিরাট কোহলির রেকর্ড নিয়েছেন নিজের দখলে (২৬)।
পাকিস্তানের টি-টোয়েন্টি অধিনায়কও তিনি। আগামীতে যে সব ধরনের ক্রিকেটের নেতৃত্বই তার কাঁধে আসবে সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি- সব ফরম্যাটে সমান তালে খেলতে পারা ব্যাটসম্যান বিশ্বে খুব কমই আছেন। যে কারণেই বাবর আজম তার সমসাময়িক অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম। বরং তার তুলনাটা হচ্ছে এই সময়ের সেরাদের সাথে। হ

SHARE

Leave a Reply