Home চিত্র-বিচিত্র সাদা-কালোয় অপরূপ পাখি দুধরাজ -জাহিদ ইকবাল

সাদা-কালোয় অপরূপ পাখি দুধরাজ -জাহিদ ইকবাল

পাখি বলতেই তার সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে। দুধরাজ তেমনই একটি পাখি। রং শুধু সাদা আর কালো হলেও তাতেই স্বর্গীয় সুষমা এর রূপে। চোখে পড়লে নজর ফেরানো দায়। আর যখন পাখিটি ওড়ে, সে দৃশ্য যে কত অপরূপ! তবে এই পাখিটির দেখা পাওয়া দুর্লভ। পাখিটির ঠোঁট, মাথা, চোখ, পাখা, বুক, পা ও লেজ দেখতে এককথায় অপূর্ব। অনেকে একে স্বর্গীয় পাখি বলে। এদের মাথায় রাজকীয় কালো রংয়ের ঝুঁটি। বিশেষ করে আকর্ষণীয় এদের লেজ। চোখ ফেরানো যায় না, শুধু দেখতেই ইচ্ছা করে। দুধরাজের ইংরেজি নাম এশিয়ান প্যারাডাইস ফ্লাইক্যাচার। বৈজ্ঞানিক নাম টেপসিফোন প্যারাডিসি। অঞ্চলভেদে এরা সুলতান বুলবুল, হোসনি বুলবুল, নন্দনপাখি ইত্যাদি নামে পরিচিত। সুদীর্ঘ লেজ পাখিটির শারীরিক সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। লেজের জন্যই ছোট আকারের ঝুঁটিওয়ালা পাখিটি অন্য পাখি থেকে সহজেই আলাদা করে চেনা যায়।
চুলের ফিতার মতো লেজের দুই দীর্ঘ পালক দুই দিক দিয়ে ঝুলে থাকে। মনে হয় যেন লতাগুল্মের কোনো অংশবিশেষ। লম্বা লেজ দেখলে মনে হতে পারে এ পাখি উড়ে কেমন করে। অবশ্য উড়তে তার কোন সমস্যা নেই।
পাখিটির চিকন গড়নের শরীর। এদের ঠোঁট থেকে লেজ পর্যন্ত মাপ প্রায় ২০ থেকে ২১ সেন্টিমিটার। আর লেজের শেষপ্রান্ত থেকে লম্বা পালক দুটির দৈর্ঘ্য ২২ থকে ২৪ সেন্টিমিটার। দুধরাজের মাথায় কালো রঙের ঝুঁটি আছে। ঝুঁটির চুলগুলো পলিশ করা কালো। ঠোঁট নীলচে, সামান্য বাঁকানো। বুক থেকে শুরু করে গলা, মাথা তেল চকচকে কালো। মাথায় এক দর্শনীয় চূড়া। একটু বাঁকানো নীলচে রঙের তীক্ষè ঠোঁট। চোখের মণিও নীলচে, কেন্দ্রে সূক্ষ্ম সাদা বিন্দু। পা হালকা লালচে। পিঠের অধিকাংশই ধবধবে সাদা। ডানা ও লেজের পালকও সাদা। কয়েকটা পালকে সাদার মাঝখানে কালো রঙের লম্বা লাইন। লেজের লম্বা দুটি পালক, যা তাকে দিয়েছে অপরিসীম সৌন্দর্য। উড়ার সময় লেজের লম্বা দুধ সাদা পালক দুটি বাতাসে চমৎকার ভঙ্গিমায় আন্দোলিত হয় যা দ্যুতি ছড়ায়। স্ত্রী পাখির লম্বা লেজ হয় না। দেখতে অনেকটা বুলবুলির মতো। এদের পিঠের রঙ হালকা বাদামি, পেটে ধূসরের সঙ্গে সাদার মিশ্রণ। এদের কণ্ঠস্বর তেমন সুন্দর নয়। তবে বিভিন্নভাবে ডাকতে পারে। প্রজনন মৌসুমে মোলায়েম সুরে ডাকাডাকি করে। দুধরাজের স্বভাব বড্ড চঞ্চল। কোথাও দুই মুহূর্ত স্থির থাকার ধৈর্য নেই। এই এসে বসল তো এই আবার উধাও। ছায়াশীতল ঘন-জঙ্গল এদের পছন্দ। দুধরাজ শিকারের আশায় গাছের ডালে চুপচাপ বসে থাকে। গরু, ছাগল, মহিষ, হরিণ ও শূকর ঝোপঝাড়ে লতাপাতা খাওয়ার সময় কীটপতঙ্গ উড়ে বের হলে এরা সঙ্গে সঙ্গে শিকার ধরে ফেলে। সাধারণত এরা নিচুতে বাসা বানায়। গ্রীষ্ম বসন্তকালে গাছের ডালে ছিমছাম ভাবে ঘাস, লতা, মাকড়সার জাল দিয়ে বাসা তৈরি করে এরা। মাটি থেকে আনুমানিক ১০ ফুট উঁচুতে বাসা বানায়। জনপথের পাশে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা বা অশোক গাছের ডালে বাসা বাঁধে। লোকজনের চলাচলের পথের ধারে বাসা বাঁধার কারণ অন্যান্য শত্রু পাখি বা প্রাণী যেন তাদের আক্রমণ করতে না পারে। তাদের বাসার ধারে জলাশয় থাকতে হবে। দেশজুড়ে এদের দেখতে পাওয়া যায়। তবে চালচলনে লুকোচুপি থাকার কারণে মানুষের নজরে পড়ে না সহজে। মেয়ে পাখিটির নাম দুধরানী। দুধরানীর যেকোনো বিপদে দুধরাজ অন্যরকম আহাজারি করে ক্রন্দন করে। তাদের প্রজনন মৌসুম শুরু হয় বৈশাখে। ডিম দেয় তিন থেকে পাঁচটি। ডিম ফুটতে ১৮ থেকে ২০ দিন লাগে। তবে সবগুলো ডিম ফোটে না। যেগুলো ফোটে তার সব বাচ্চাও বাঁচে না। এদের ছানার মৃত্যুর হার অন্য পাখির চেয়ে বেশি। সে কারণে দুধরাজের সংখ্যা বরাবরই কম। বাবা মা উভয়েই ডিমে তা দেয়। তা থেকে দুই তিনটি ছানা বড় হয়। ডিম থেকে ফোটার পর হালকা গোলাপিই থাকে এদের রং। যৌবনে সে লাল আর মরিচায় আবৃত। শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে যখন সে যুবক, তখন বদলে যায় রঙ। সাদা-কালোয় হয়ে ওঠে স্বর্গীয় পাখি। এমন রঙ বৈচিত্র্য খুব কম পাখিরই আছে। বড় হতে সময় লেগে যায় আড়াই থেকে তিন বছর। গড়ে ১০-১২ বছরের জীবন দুধরাজের। অনিন্দ্য সুন্দর পাখি দুধরাজ। কিন্তু শুধু সুন্দর হলেই তো চলে না, কঠিন দুনিয়ায় বাঁচতে হলে বুদ্ধি আর সাহসও থাকা চাই। তা পর্যাপ্ত আছে দুধরাজের। শত্রুভাবাপন্ন কেউ বাসার আশপাশে এলে যেন বাজ, ফিঙে বা অনেক বড় পাখিকেও এরা তাড়িয়ে বেড়ায়। সে কারণে অনেক নিরীহ পাখি এদের বাসার কাছে বাসা তৈরি করে। প্রতিদিনিই পুরুষ ও মেয়ে পাখি পানিতে গোসল করে। তাই জলাশয় বা পানির আধারের আশপাশে তাদের বাসা বাঁধার আরেকটি কারণ। এদের শত্রু ঝড়, বৃষ্টি, বাদল, গুইসাপ, সাপ ও হাঁড়িচাচা পাখি। ঝড়ে গাছ ভেঙে কিছু ডিম নষ্ট হয়। কিছু সাপ জাতীয় প্রাণী খেয়ে ফেলে। আর কাক, হাঁড়িচাচা পাখি বাচ্চা খেয়ে ফেলে। পাখিকুলের মাঝে সবচেয়ে প্রতিকূল অবস্থায় প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে এই দুধরাজ বা প্যারাডাইজ ফ্লাইক্যাচার পাখি বেঁচে আছে। দুধরাজ এক এলাকায় বেশি দিন থাকে না। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশ থেকে এই পাখি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে পাওয়া গেলেও পঞ্চগড় ও উত্তরাঞ্চলে তাদের বেশি দেখা যায়। দেখা যায় সুন্দরবনেও। ঘন ঝোপঝাড় তাদের পছন্দের জায়গা। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ ও শত্রুদের মোকাবিলা করে এরা বংশ বিস্তার করে আজও বেঁচে আছে। কিন্তু প্রকৃতিতে কমে যাচ্ছে দুধরাজের সংখ্যা।

SHARE

Leave a Reply