Home বিজ্ঞান ও বিশ্ব রঞ্জন রশ্মি -আল জাবির

রঞ্জন রশ্মি -আল জাবির

বিজ্ঞানীরা যেমন অজানাকে জানার জন্য, বিভিন্ন রহস্য উদঘাটন করার জন্য নানান জিনিস আবিষ্কার করেন তেমনি ভুলবশতও আবিষ্কার হয়েছে অনেক কিছু। বিজ্ঞানের অনেক মহান আবিষ্কারগুলোর মতো এক্সরেও আবিষ্কার হয়েছিলো ভুলবশত। এক্সরে এবং দৃশ্যমান লাইট অনেকটাই এক জিনিস। উভয়ই ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ফর্মে চলে এবং এই এনার্জিকে ফোটন বহন করে দৃশ্যমান আলো এবং এক্সরে উভয়ই অ্যাটমের মধ্যের ইলেকট্রনের নড়াচড়া থেকে উৎপন্ন হয়। যখন ইলেকট্রন তার কক্ষপথ থেকে নিম্নস্তরে নেমে আসে, ইলেকট্রন কিছু এনার্জি ত্যাগ করে, আর এই এনার্জি ফোটন আকারে ত্যাগ করে। এক কথায় এক্সরে হলো সাধারণ লাইটের সুপার পাওয়ার ফুল ভার্সন। সাধারণ আলোর মতো এটিও একই পিডে ভ্রমণ করতে পারে। যদি কোন কাগজের টুকরাকে নির্দেশ করে এক্সরে লাইট ছুড়ে মারা হয় তাহলে দেখা যাবে সাধারণ আলোর চেয়ে এর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য হাজার গুণ ছোট। এর এনার্জি অনেক বেশি, তরঙ্গ দৈর্ঘ্য খাটো এবং ফ্রিকুয়েন্সি অনেক বেশি হওয়াতে এটি এমন সকল বস্তুকে ভেদ করতে পারে, যেটা সাধারণ আলো ভেদ করতে পারে না।
এবার আসি এক্স-রের আবিষ্কারকের কথায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে একজন পদার্থবিদ পরীক্ষাগারে সামান্য ভুল থেকে আবিষ্কার করেন এক বিস্ময়কর রশ্মির। কিন্তু সেই বিজ্ঞানী কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে, তিনি নতুন কিছু আবিষ্কার করেছেন। তিনি বারবার একই পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন যেন নিজের ভুল সংশোধন হয়ে যায় এবং বারবার একই ফলাফল পেতে থাকেন। এক সময় তিনি ভাবলেন, হয়তো তার মানসিক ভারসাম্য ঠিক নেই। তিনি পাগল হয়ে গেছেন। অবশ্য তার এরকম ভাবনা অমূলক নয়। কারণ, তিনি যে রশ্মি আবিষ্কার করেছেন, সেটা অনেকটা অদ্ভুত। যেমন, তা অনেক দেহের মাংস ভেদ করে প্রবাহিত হলেও, ঠিকই হাড় দ্বারা প্রতিহত হচ্ছিলো। এই অদ্ভুত রশ্মিকে তিনি তার মনের অলীক কল্পনা ভেবে ভুল করছিলেন। কিন্তু তার ভুল ভাঙলো যখন বুঝতে পারলেন, তিনি একা নন, তার স্ত্রীও একই দৃশ্য অবলোকন করছেন।
আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে থাকা সেই পদার্থবিদ হচ্ছেন উইলহেম রন্টজেন। আর সেই অদ্ভুত রশ্মির নাম রঞ্জন রশ্মি বা এক্স-রে। ক্লাসের দুষ্টু ছেলে উইলহেমের জন্ম হয়েছিলো ১৮৪৫ সালের ২৭ মার্চ জার্মানির নিম্ন রাইন প্রদেশের লেনেপ অঞ্চলে। তার পূর্ণনাম উইলহেম কনরাড রন্টজেন। তিনি ছিলেন কাপড় বিক্রেতা পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। জন্ম জার্মান মুলুকে হলেও তার শৈশব কেটেছিলো বর্তমান নেদারল্যান্ডসের আপ্লেডুর্ন শহরে। সেখানে তাকে ভর্তি করানো হয় মার্টিনাস হার্মান ফন ডুর্নের বোর্ডিং স্কুলে। এদিকে স্কুলের পাঠে মনোযোগী ছিলেন না কিশোর উইলহেম। তার শুধু গ্রাম, অরণ্যে প্রকৃতির মাঝে মিশে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগতো। তবে পড়াশোনায় দুর্বল হলেও তিনি যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসতেন। যন্ত্রপাতির প্রতি এই ভালোবাসার কারণে তাকে ১৮৬২ সালে ভর্তি করানো হয় ইউত্রেক্তের এক কারিগরি স্কুলে। এখানে অধ্যয়নরত অবস্থায় তার বিরুদ্ধে সেই শিক্ষক অবমাননার অভিযোগ উঠেছিলো। স্কুল বহিষ্কারের মতো গুরুতর শাস্তি যেকোনো ছাত্রের শিক্ষাজীবনে ধাক্কা দিতে পারে। কিন্তু উইলহেম এসব ভুলে তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন।
১৮৬৯ সালে তিনি গবেষণা জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিলো ওয়ারজবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৮৮৮ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে এখানে যোগদান করেন। এখানে কর্মরত অবস্থায় তিনি তার বিশ্ব কাঁপানো রঞ্জন রশ্মি আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। সাধারণ উইলহেমের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প এখানেই রচিত হয়েছে। টানা সাত সপ্তাহ ধরে নিজের গবেষণাগারের দরজা বন্ধ করে রেখেছেন উইলহেম রন্টজেন। ঠিক কী কারণে তিনি হঠাৎ এরকম আচরণ করছেন, তা বন্ধু-বান্ধব, পরিবারের কারো ¯পষ্ট নয়। সেখানে রাত দিন গবেষণা করে যাচ্ছেন বিজ্ঞানী উইলহেম। ১৮৯৫ সালের দিকে তিনি ক্যাথোড রশ্মি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। তার কাজ ছিল অতিরিক্ত নিম্নচাপে থাকা গ্যাসের ভেতর দিয়ে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ প্রবাহিত করা। সেই বছর ৮ নভেম্বর তিনি কাজ করার সময় লক্ষ করলেন, গ্যাসের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার সময় কিছু রশ্মি উদ্ভূত হচ্ছে। এখানে বলে রাখা দরকার, উইলহেম রন্টজেন যে কক্ষে তার গবেষণা কাজ করতেন, সেটি ছিল আলোকচিত্রীদের ‘ডার্ক রুম’-এর মতো অন্ধকারাচ্ছন্ন। তাছাড়া যে টিউবের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করা হচ্ছিলো, তা ছিল বিভিন্ন অস্বচ্ছ পদার্থ দিয়ে আবৃত। তাই আলোকতরঙ্গ সেই অস্বচ্ছ আবরণ ভেদ করে প্রবাহিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।


কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো, বিদ্যুৎ প্রবাহে সৃষ্টি হওয়া রশ্মি সেই পুরো আবরণ ভেদ করে দুই মিটার দূরত্বে টিউবের বিপরীত দেয়ালে রাখা বেরিয়াম প্লাটিনোসায়ানাইড পর্দার ওপর উজ্জ্বল প্রতিপ্রভাব সৃষ্টি করেছে। উইলহেম ভাবলেন, তিনি বোধ হয় চোখের ভুল দেখছেন অথবা তার কাজে কোথাও কোনো ভুল হয়েছে। সেই ভুল ভাঙার অধ্যবসায়ে তিনি টানা সাত সপ্তাহ একই পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি ঘটান। কিন্তু প্রতিবার একই ঘটনা ঘটতে থাকে। তিনি বিভিন্ন ধাতব বস্তুর মাধ্যমে সেই রশ্মিকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন এবং ব্যর্থ হন। তাছাড়া তিনি নিজেও এই অদ্ভুত রশ্মির ধর্ম স¤পর্কে দ্বিধায় ছিলেন। শেষে তিনি তার স্ত্রী আনাকে তলব করলেন। উ™£ান্ত বিজ্ঞানী তার স্ত্রীর হাত সেই রশ্মির যাত্রাপথে মেলে ধরলেন। তখন আনার হাতের আঙুলে বিয়ের আংটি পরিহিত ছিল। অবাক চোখে উইলহেম দেখলেন, দেয়ালে একটি ভৌতিক হাতের দৃশ্য ভেসে উঠেছে। সেই হাতের মাংসগুলো স্বচ্ছ হয়ে গেছে। কিন্তু হাতের অস্থিগুলো ¯পষ্ট চিত্রিত হয়ে আছে। আর বিয়ের আংটির স্থলে গাঢ় কালো রঙের ছায়া দেখা যাচ্ছে। আর এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম রন্টজেনোগ্রাম। এই দৃশ্য দেখে তার স্ত্রী আনাও ভয়ে শিউরে উঠলেন। আর এখানেই বন্ধ ঘরের সকল রহস্য এবং অলৌকিকতার ইতি ঘটলো। উইলহেম বুঝতে পারলেন, তিনি পাগল হয়ে যাননি। তার স্ত্রীও একই দৃশ্য অবলোকন করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ রশ্মি আবিষ্কার করে ফেলেছেন। আর এভাবে তিনি দেখিয়ে দিলেন, ভৌত পদার্থের ওপর ক্যাথোড রশ্মির প্রভাবে সৃষ্টি হয় এক অদ্ভুত রশ্মির।
যেহেতু সেই রশ্মির বৈশিষ্ট্য সবার অজানা ছিল, তাই তিনি একে নাম দিলেন এক্স-রে। অনেকে একে রন্টজেন রশ্মি হিসেবে ডাকা শুরু করে। আজ ১০০ বছর পরে রঞ্জনরশ্মির বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের অজানা নয়। কিন্তু তারপরেও সেই এক্স নামটুকুর কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। রঞ্জনরশ্মির আগমন বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক নতুন বিপ্লবের ডাক দিলো। সবচেয়ে বেশি উপকৃত হলো চিকিৎসাক্ষেত্র। যেহেতু এই রশ্মি মাংস ভেদ করতে পারলেও অস্থি দিয়ে প্রতিহত হয়, তাই এটি ব্যবহারের মাধ্যমে রোগীর ভাঙা হাড়ের চিকিৎসা করা সহজ হয়ে যায়। রঞ্জনরশ্মি রীতিমতো যশস্বী ব্যক্তিত্বে পরিণত করলো উইলহেম রন্টজেনকে। তার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৮৯৬ সালে রামফোর্ড এবং মাতেউচি পদকে ভূষিত করা হয়।
পরবর্তী বছর তিনি এলিয়ট ক্রেসন পদকে ভূষিত হন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানজনক বার্নার্ড পদকে পুরস্কৃত করা হয় উইলহেম রন্টজেনকে। কিন্তু এরকম এক ডজন পদকে ভূষিত হলেও উইলহেম রন্টজেনকে অন্যান্য পদকপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীদের থেকে আলাদা করেছে এক নতুন পদক। সেটি হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে সম্মানজনক নোবেল পুরস্কার।
১৯০১ সাল থেকে শুরু হয় এই সম্মানজনক পদক প্রদান যা শতবর্ষ পরেও সমান গুরুত্বের সাথে প্রতি বছর বিভিন্ন খাতের সেরা কীর্তিমানদের সম্মানিত করে আসছে। এই পদকের প্রথম আসরে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পুরস্কৃত করা হয় রঞ্জনরশ্মির আবিষ্কারক উইলহেম রন্টজেনকে। আর এর মাধ্যমে নোবেলের ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখে ফেললেন এই বিজ্ঞানী। জার্মানিতে জন্ম নেয়া উইলহেম শেষ পর্যন্ত ফিরে যান তার জন্মভূমিতে। কর্মজীবনের শেষটুকু এখানে কাটিয়ে ১৯২০ সালে অবসর গ্রহণ করেন এই গুণী পদার্থবিদ। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর থেকে বিজ্ঞানীর উইলহেমের দিনকাল ভালো যাচ্ছিল না। তিনি নিজে অন্ত্রের ক্যান্সারে ভুগছিলেন। তার ওপর তার স্ত্রী আনা রন্টজেন আকস্মিক মৃত্যুবরণ করায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
অসুস্থ উইলহেম ক্যান্সারের ধাক্কা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলেন না। ১৯২৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ৭৭ বছর বয়সে এই মহান বিজ্ঞানী মারা যান। পরবর্তীতে তার শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী, তার যাবতীয় ব্যক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক নথিপত্র ধ্বংস করে দেয়া হয়। রঞ্জনরশ্মির কারণে এখনো কোটি কোটি মানুষ উপকৃত হচ্ছে। সেই সাথে অমর হয়ে আছে উইলহেম রন্টজেনের নাম। অবশ্য বিজ্ঞানীদের আসর ছাড়াও তার নাম আরেক স্থানে চিরদিনের জন্য অমর হয়ে আছে। সেটা হচ্ছে পর্যায় সারণি।
২০০৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী উইলহেম রন্টজেনকে সম্মানিত করে ওটচঅঈ কর্তৃক ১১১ নং মৌলিক পদার্থের নাম রাখা হয় রন্টজেনিয়াম (জম)। এই নাম শুধু একজন বিজ্ঞানীর নাম নয় বরং পৃথিবীর প্রতিটি স্বপ্ন দেখা তরুণের জন্য অনুপ্রেরণার নাম। তার অনুপ্রেরণায় পৃথিবীতে নতুন নতুন আবিষ্কার আর বিপ্লবের জন্ম হবে, এটাই প্রত্যাশা।

SHARE

Leave a Reply