Home স্বপ্নমুখর জীবন শিকড় থেকে শিখরে -আমিনুল ইসলাম ফারুক

শিকড় থেকে শিখরে -আমিনুল ইসলাম ফারুক

‘সফলতা’ শব্দের মানে কী? কখন একজন মানুষকে সফল বলা যায়? সফল হওয়ার জন্য আবশ্যকীয় উপাদানগুলো কী কী? যার অনেক টাকা-পয়সা ও গাড়ি-বাড়ি আছে তিনিই কি সফল? যিনি অনেক অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট অর্জন করেছেন তাকেই সফল বলব? কিংবা সরকারের বড় কোনো চেয়ারে যিনি বসে আছেন তাকেই সফল বলব? সাফল্যের আর কোন সীমা-পরিসীমা আছে কি? আসলে সফলতার নির্দিষ্ট কোনো ডেফিনেশন নেই। একজন মানুষ নিজেকে তখনই সফল ভাবেন যখন তার কাছে মনে হবে জীবনের কাছে যা তিনি চেয়েছেন, তা সবই পেয়েছেন। একজন মানুষের এই বোধ তৈরি হওয়া মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। জীবনে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তবেই সাফল্য আসে। তার জন্য দরকার হয় সময় এবং সুযোগ। কিন্তু এই দুটো কখনো একসাথে আসে না বলেই বেশির ভাগ মানুষ জীবনে সফল হতে পারে না। সাহিত্যে নোবেল লরিয়েট বব ডিলান পেশাদার সফল মানুষ চিহ্নিত করতে গিয়ে বলেছেন- A man is a success if he gets up in the mourning and gets to bed at night and in Between he does what he wants to do.’ .’ ‘অর্থাৎ সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে যিনি প্রত্যাশিত কাজগুলো ঠিকঠাক করতে পারেন তিনিই সফল মানুষ।’
সফলতার গোড়ার কথাই হলো কাজে লেগে যাও এবং এখনই লেগে যাও। জীবন ক্ষুদ্র এবং তা উপভোগের সময় আরো ক্ষুদ্র। মানুষের জন্ম নিয়তি নির্ধারিত আয়ু নিয়ে। জন্মের পর থেকে তাই তার বেঁচে থাকার বিয়োজন ঘটতে থাকে। এই অর্থে মানুষের আয়ু বাড়ে না বরং কমতে থাকে। তাই জীবনের চেয়েও সময়ের দাম বেশি। সবার আগে সময়ের সদ্ব্যবহার জরুরি। তোমার সমস্যা একান্তই তোমার। তার সমাধান তোমাকেই বের করতে জানতে হবে। কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এতে কারো কিছুই যায় আসে না। ক্ষতিটা তোমারই। যে কোন খেলা খেলতে হলে আগে সে খেলার আইন-কানুন ভালোভাবে জেনে নিতে হয়। তবেই ভালোভাবে খেলা যাবে, আর তখন খেলা হবে উপভোগের এবং জেতার। বোকারাই শুধুমাত্র বসে থাকে এবং কারো মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হতে চায়। আর সাহসীরা উঠে দাঁড়ায় এবং কাজে লেগে যায়। নিজেকে শুধু চিনলেই হবে না, আবিষ্কার করতেও জানতে হবে। মনে রাখবে, নিজেকে আবিষ্কার করার মতো এত বড় আবিষ্কারক পৃথিবীতে আর নেই।
সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করলে জীবন হচ্ছে মাত্র দশ ভাগ। আর নব্বই ভাগই হচ্ছে জীবনকে আমরা কিভাবে দেখছি তার ওপর নির্ভরশীল। জীবন সহজ নয়, কঠিনও নয়, জীবন জীবনের মতো। আমরাই একে সহজ করি, জটিল করি। মানুষের জীবনকে ঢেউয়ের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। প্রতিদিন একইভাবে জীবন চলবে না। একেক দিন একেক ধরনের ঢেউ আসবে। প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো বাধা তোমাকে কষ্ট দিবে, তোমার পথ থেকে সরে আসতে বলবে। তবে জীবন চলার পথে যা তোমাকে কষ্ট দেয় তা ভুলে যাওয়াই উত্তম। অথচ এ কষ্ট থেকে কী শিক্ষাগ্রহণ করেছো তা মনে রাখা চাই। তবেই জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্র উপভোগগুলো স্মৃতিময় ও সুখকর মনে হবে। জীবনের কোনো ঘটনাই ক্ষুদ্র নয়, ভুলবার নয়, তুচ্ছ নয়। আলবার্ট আইনস্টাইন প্রায়শই বলতেন- ‘জীবনটা সাইকেলের মতো। এ জীবনে ব্যালান্সের জন্য চাই তীব্র গতি। সাইকেলের প্যাডেল মারা বন্ধ করলেই যেমন আমরা পড়ে যাই তেমনি পরিশ্রম বাদ দিলেই জীবন ভেস্তে যায়।’
জীবনকে এক পেয়ালা চায়ের সাথে তুলনা করেছেন আল্লামা শেখ সা’দী। তিনি বলেন, ‘জীবন হচ্ছে এক পেয়ালা চা। যতই তৃপ্তিসহকারে আমরা তা পান করি ততই দ্রুত তলার দিকে অগ্রসর হতে থাকি।’
থমাস জেফারসন বলেছেন- Three important parts of life are- Choice, Chances and Changes. You must make a choice to make a chance of your life untill never chnage.’
একজন মানুষ তখনই শক্তিশালী হয় যখন সে তার দুর্বলতা বুঝতে পারে। একজন মানুষ তখনই সাহসী হয় যখন সে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা অর্জন করতে পারে। একটা স্বপ্ন কখনই বাস্তবে রূপ নেবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি জেগে উঠবে। তোমাদের অনেকেই জেগে উঠতে ভয় পায়। যার ফলে তোমাদের স্বপ্নগুলোও অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।
তোমরা যারা ব্যর্থতাকে পাত্তা দাও না এবং নিজেদের ওপর প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী তারা আজ হোক কাল হোক সফল হবেই। সফল মানুষগুলো যে কোনো বিষয়কে খুব সহজভাবে নিয়ে থাকেন এবং সুযোগগুলোকে কাজে লাগান। ঠিক তোমাদেরও সুযোগ খুঁজতে হবে এবং সুযোগ পেয়েই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। একবার সুযোগ পেয়ে গেলে আর কালক্ষেপণ করা যাবে না, কারণ সুযোগ বেশিক্ষণ থাকে না। আবার এটাও ঠিক শুধু সুযোগের জন্য বোকারাই বসে থাকে। তোমার সারাজীবনে হয়তো কোনো সুযোগ নাও আসতে পারে তাই বলে তোমার কাজ বন্ধ করে রাখবে? সুযোগ মূলত আমাদের কাজের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়। সফলতার জন্য দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করা এতটাই জরুরি যে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে সফল হতে পারে না। কেননা তার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ ভুল ছিল। কলিন পাওয়েল বলেছেন- ‘সাফল্যের পেছনে গোপন কোনো রহস্য নেই। এটা কেবল প্রস্তুতি, পরিশ্রম এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা গ্রহণের সম্মিলিত ফলাফল।’
আফ্রিকান বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন- ‘সফলতার ভিত্তিতে আমাকে বিচার করো না। আমাকে বিচার করো, ব্যর্থতার পর জীবনে কতবার ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছি তার ভিত্তিতে।’ সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল বলেছেন- ‘Success is not final, failure is not fatal. It is the courage to continue thats counts.’
আমি যত মোটিভেশনাল লেখকদের বই পড়েছি চিন্তা-চেতনায় মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির (১২০৭-১২৭৩) সমপর্যায় কিংবা তার কাছাকাছি জায়গায় অবস্থান করতে পারেন এমন একজন ব্যক্তি আজো পাইনি। রুমিকে অনেকেই একজন ইসলামী পণ্ডিত মনে করেন। কিন্তু রুমির তারচেয়েও বড় পরিচয় তিনি একজন বিশ্ববরেণ্য দার্শনিক, বড় মাপের একজন কবি ও মোটিভেশনাল লেখক ছিলেন।
তিনি শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের কবিই নন খোদ অ্যামেরিকাতেও তিনি ‘বেস্ট সেলিং পয়েট’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর অসংখ্য গ্রন্থাবলির মধ্যে মসনবী ও দিওয়ান তাঁকে অমর করে রেখেছে। মসনবীতে আছে সাহিত্যের এমন এক প্রবাহ যদি তুমি এটা পড়তে শুরু করো তাহলে এর আনন্দ থেকে নিজেকে বিরত রাখা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়বে। বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে মসনবীর কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।
পারস্যে আজো পবিত্র কুরআন ও হাদিসের পরই মসনবীকে যথার্থ পথপ্রদর্শক বলে মনে করা হয়। পারস্যবাসী এটাও মনে করেন, মসনবীকে যদি কুরআন বলে চালিয়ে দেয়া হতো তাহলে অনেকে হয়তো বুঝতেও পারতো না তিনি কুরআন পাঠ করছেন নাকি মসনবী পড়ছেন। মসনবী লেখার মাধ্যমে রুমি নিজের সীমার মধ্যেই অসীমের সন্ধান লাভ করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
রুমির মাত্র দুটো কথার দিকে চোখ রাখো। আজকের পৃথিবীর সব মোটিভেশন পিকার ও লেখকদের গা শিউরে উঠবে। কী দারুণ কথামালা- এক. ‘আগামীকাল করব এটা বলো না। আজ তো গতকালেরই আগামীকাল ছিল, কী করতে পেরেছ?’ দুই. ‘সৌন্দর্যকে বিশ্বাস করো না, একটি ব্রণই যথেষ্ট। স¤পদকে বিশ্বাস করো না, একটি স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট। রবকে বিশ্বাস করো, তিনি সব কিছুর জন্য যথেষ্ট।’
তুমি নিজেকে ব্যর্থ ভাবছো অথচ মহান আল্লাহ তোমাকে উদ্দেশ করেই বলেছেন ‘নিশ্চয়ই বিশ্বাসীরা সফল হয়। বিশ্বাসের সাথে যদি তারা নিজেদের নামাযে বিনয়াবনত হয়, অনর্থক কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখে, অসহায়দের সাহায্য করে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে তাহলে তারা উভয় জগতেই সফলকাম।’ (কুরআন, ২৩:১-৪)
তুমি বলছো তোমার জীবনে অনেক কষ্ট অথচ আল্লাহ বলছেন-‘নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে আছে স্বস্তি।’ (কুরআন, ৯৪:৬) তুমি হয়তো ভাবছো তোমাকে সাহায্য করবার কেউ নেই অথচ আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করার জন্যই বলছেন- ‘মুমিনদের সাহায্য করা আমি আল্লাহর জন্য আবশ্যক।’ (কুরআন, ৩০:৪৭) তুমি দেখতে খুবই কুৎসিত তাই হীনমন্যতায় ভুগবে অথচ তোমাকে উদ্দেশ করেই আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম আকৃতিতে।’ (কুরআন, ৯৫:৪) তুমি বলবে তোমার কোনো সঙ্গী নেই অথচ আল্লাহ বলছেন- ‘ভয় করো না, আমি সবসময় তোমার সাথেই রয়েছি।’ (কুরআন, ২০:৪৬)
সুতরাং মানুষকে নয় তোমার প্রয়োজনগুলো শুধু আল্লাহকে বলো। আল্লাহ হয়তো তোমার চাহিদা পূরণ করে দেবেন অথবা চাহিদার চেয়েও বেশি দেবেন। কিন্তু এই বিশ্বাস রাখো আল্লাহ তোমাকে কম দেবেন না। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার পাশাপাশি নিজের ওপর আস্থা রাখো, ধৈর্য ধরো, দেখবে আল্লাহ সব সহজ করে দিয়েছেন।
তোমাকে বুঝতে হবে পৃথিবীর কোনো কিছুই খারাপ না। আল্লাহ সব কিছুই মানুষের কল্যাণে সৃষ্টি করেছেন। সমস্যাটা হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। আমরা কিভাবে সেগুলো দেখি। নিজের ভেতরের আনন্দকে খুঁজে বের করো এবং সেটাকে অনুসরণ করো। সাফল্য একটা দক্ষতা মাত্র। এক অর্থে সাফল্য খুব বড় জিনিস নয়, বড় জিনিস হলো সার্থকতা। ফুলের অনেক বৈচিত্র্য বা রঙের জৌলুশ আছে। এগুলো তার সাফল্য। কিন্তু যে গন্ধ দিয়ে আমাদের মুগ্ধ করে তা হলো তার সার্থকতা।
তোমাদের প্রতিটি কাজ হতে হবে অন্যের কল্যাণের জন্য এবং সেই কাজ আনন্দের সাথে করতে হবে। শুধু পুরস্কারের জন্য কাজ করে বোকারা। কেননা পুরস্কার অর্জন ব্যর্থ হলেই আসে হতাশা। তোমাদের উচিত মানুষের কাজের প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া। অন্যকে সাহায্য করা, উৎসাহ দেওয়া। অন্তত কাউকে সাহায্য করতে না পারলেও মনের দিক থেকে উপকারী হওয়া। কারো সাফল্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করা। সবাই ভালো থাকবে, সুস্থ থাকবে।

SHARE

Leave a Reply