Home নিবন্ধ আগামীর সুন্দর পৃথিবী গড়তে শিশুদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা – মাহবুবুর রহমান

আগামীর সুন্দর পৃথিবী গড়তে শিশুদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা – মাহবুবুর রহমান

আজকে যারা শিশু কালকে তারা বাবা অথবা সমাজের অভিভাবক। এই শিশুদের ভালোভাবে গড়ে তুলতে পারলেই আগামীর পৃথিবী সুন্দরভাবে গড়ে উঠবে। কোনো শিশুই চোর হিংস্র অসামাজিক হিসেবে জন্ম লাভ করে না। বরং তার পারিবারিক শিক্ষা তাকে খারাপ অথবা ভালো করে তোলে। এ জন্য অভিভাবকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিছু কথা বলতে চাই। অতিরিক্ত ভালোবাসা আজকের শিশুদের নষ্টের মূল কারণ। সে যখন যা চাইছে আপনি তাকে তার চাহিদা মিটাচ্ছেন। তা হয়তো ঠিক নয়। ওকে জিজ্ঞাসা করুন- ও কেন চাইছে? প্রয়োজন আর অপ্রয়োজনের তফাতটা ওকে বুঝতে শেখান। এতে ওর মূল্যবোধ বাড়বে। আপনার আছে তাই তার ইচ্ছে মতো চাহিদা মিটাচ্ছেন- না এটা একেবারেই ঠিক হচ্ছে না। তার প্রয়োজনের তুলনায় কম দিন। তাহলে সে তার অসৎ ইচ্ছা পূরণ করতে পারবে না।
প্রথমত: ছোটরা সব কিছু ভালোভাবে কপি করতে পারে, তাই ওর সামনে কখনো কটু কথা, গালাগালি জাতীয় ভাষা, মিথ্যা কথা, মিথ্যে আশ্বাস, ধোঁকাবাজি, পরনিন্দা, অন্যের ক্ষতি হয় এমন কাজ না করা। হয়তো সেটাই শিখে ও স্কুলে বা অন্য কারো সামনে বলতে বা করতে শুরু করবে। এমনকি আপনার যদি ধূমপানের অভ্যাস থাকে তা যাতে শিশুর সামনে না হয়। কারণ আপনার শিশুটি আপনাকে সব সময় ফলো করে। আপনি যা করবেন বলবেন সে তাই করবে বা বলবে। তাই আপনার উচিত বাবা হওয়ার পর সকল বদ অভ্যাস পরিহার করা, তাহলেই আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভালো হবে।
দ্বিতীয়ত: আপনার শিশুকে ছোটখাটো কাজ দিন। ঐ কাজ ভুল হলেও, তার কাজের প্রশংসা করুন যত কম বা ছোট কাজই হোক না কেন, এতে ওর উৎসাহ বাড়বে, তার মাঝে দায়িত্ব অনুভূতি জাগ্রত হবে। তার মেধা বিকাশে সহায়তা হবে। তাকে এমন কিছু শিক্ষা দেন যাতে সে শিখতে পারে বড়দের সাথে তার আচরণ কেমন হবে, ছোটদের সাথে কেমন হবে। পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ব কেমন হবে, সমাজের প্রতি তার দায়িত্ব কেমন হবে, দেশের প্রতি দায়িত্ব কেমন হবে। এ জন্য তাকে অ্যাকাডেমিক পড়ালেখার পাশাপাশি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর শৈশবের জীবনী পড়ান।
এ ছাড়াও যুগে যুগে অনেক মনীষী পৃথিবীর বুকে মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করেছেন, তাদের জীবনী পড়ান। অন্যথায় দেশের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তার থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না, যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আজকে বাংলাদেশের অবস্থা।
তৃতীয়ত: আপনার শিশুকে সময় দিন, তার বিশ্বস্ত বন্ধুতে পরিণত হোন, ওর সাথে জানা অজানা জ্ঞানের বিষয় নিয়ে আলোচনা করুন। সব সময় শুধু তাকে জ্ঞান বিজ্ঞান, অঙ্ক, ইংরেজি বিষয়ের ওপর নজর না দিয়ে মাঝে মাঝে নবী করিম (সা)-এর শৈশবের সময়, সাহাবায়ে কেরামের জীবনী, সাহসী মানুষের জীবনী, মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে। তাহলে দেখবেন তার মাঝে প্রকৃত মুসলমানের চেতনা জাগ্রত হবে। আজকে কিন্তু আমাদের শিশুদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধের বিস্তর ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এর মূল কারণ হলো তাকে ছোট থেকেই নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষা দিচ্ছি না, তাকে তার ইচ্ছের আলোকে চলতে দিচ্ছি, তাকে দুনিয়া ও আখেরাতের জবাবদিহির বিষয়ে শিক্ষা দিচ্ছি না। আমি আপনার উচিত আমার শিশুর দুনিয়ার কারণে যাতে আখেরাত তথা পরকাল নষ্ট হয়ে না যায়।
চতুর্থত: সামনেই হয়তো আপনার সন্তানের পরীক্ষা। এ জন্য তাকে আপনি কোরআন হাদিস, বিভিন্ন বই থেকে বিরত রাখলেন, খেলা বারণ, টিভি দেখা বারণ, কোথাও যাওয়া তো চলবেই না। রীতিমত যেন কারফিউ জারি করা হলো। তারপর আপনি হয়তো রোজ বলে চলেছেন ‘ক্লাসে ফার্স্ট হতে হবে’, ‘আশি, নব্বই নম্বর পেতেই হবে’ নইলে ওর মূল্য থাকবে না ইত্যাদি কথা। আপনি মনে করেন এখানকার সফলতাই জীবনের সফলতা। আসলে কি তাই! অবশ্যই না। একবারও কি এ কথা বলছেন ভালো মানুষ হতে হবে, কোরআন হাদিস পড়তে হবে। ভালো মানুষের সংজ্ঞা হয়তো আপনি বলবেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার হওয়া। না শুধুমাত্র এটা নয়, কারণ আমরা আজ সবচেয়ে বেশি যে অভাব অনুভব করছি সেটা হলো নীতি-নৈতিকতা। আমাদের যে শিক্ষাব্যবস্থা আছে তাতে এটা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তাই আপনার আমার উচিত তার অ্যাকাডেমিক পড়ালেখার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা। তাতে সে যেমন একজন ডাক্তার হবে, পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হবে। ভালো মুসলমান হবে, একজন সুনাগরিক হবে, দেশপ্রেমিক হবে।
পঞ্চমত: আপনার বাচ্চা যখন আপনাকে কিছু বলে তা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং সেটার উচিত অনুচিত তাকে বুঝিয়ে দিন। ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে তার কথা গুরুত্ব দিচ্ছেন না, তাহলে দেখবেন সে অনেক বিষয়ে আপনার সাথে শেয়ার করবে না, ওকে গুরুত্ব দিন। দেখবেন ও আপনাকে তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু মনে করবে। তাকে নিকট-আত্মীয়দের সাথে মিশতে দিন তাহলে সে তার আত্মীয়তার সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবে, আত্মীয়তার হক কী তা সে জানতে পারবে, তাদের প্রতি তার প্রেম, ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।
ষষ্ঠত: আপনার শিশুর নিজেকে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে দিন, সহজ কিছু ব্যাপারে। যেমন- কোথাও বেরনোর আগে কী পরা দরকার, ছেলেদের পোশাক কেমন হবে, মেয়ে শিশুর পোশাক কেমন হবে, তা অবশ্যই মুসলিম রীতি মোতাবেক হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে প্রত্যেক ধর্মেই শালীনতার ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়। আমাদের দেশে বিভিন্ন উৎসবে বিভিন্ন ধরনের রান্না হয়ে থাকে। ‘বাড়িতে অতিথি এলে প্রথমে সে তাকে কিভাবে রিসিভ করবে। তারপর তাকে কী খেতে দেয়া উচিত’ ইত্যাদি ধরনের। কার সাথে কেমন আচরণ হবে, বড়দের সাথে কেমন, ছোটদের সাথে কেমন, পুরো বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করুন, ভুল-ত্রুটিগুলো শুধরিয়ে দিন, দেখবেন এতে সামাজিক হতে শিখবে। একটা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে।
সপ্তমত: ছোটদের সামনে বিতর্ক না হাওয়াই ভালো, তবুও যদি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে হয়েও যায় তাহলে ওকে বলুন একসঙ্গে থাকলে এরকম আলোচনা হয়, আর তার মানেই সম্পর্ক খারাপ হওয়া নয়। দরকার হলে ওই বিতর্কের সমাধানও ওর সামনেই করুন যাতে ওর মনে হয় সব সমস্যারই সমাধান পাওয়া যায়। এতে করে ওর মনে কোনো কুপ্রভাব কিংবা চাপ পড়বে না।
অষ্টমত: আপনার শিশুকে শাসন নিশ্চয়ই করবেন, কিন্তু অতিরিক্ত নয় যা থেকে ওর ভয় তৈরি হয়। আপনাকে যদি ও ভয় পেতে থাকে তাহলে ও হয়তো ওর মনের অনেক কথা লুকিয়ে রাখবে। কোনো দিন কোনো সমস্যায় পড়লেও ওই ভয়ের কারণেই হয়তো সে সব কথা শেয়ার করলই না, আর এ থেকে কোনো অজানা বিপদও আসতে পারে, যা আপনি জানতে পারছেন না। ছোটদের মত করে ওদের একজন হয়ে মেশা দরকার। যাতে ওরা আপনাকে বন্ধু ভেবে মনের কথা বলতে পারে। এবং আপনি তাকে আপনার আদর্শের আলোকে গড়তে পারেন।
মূল কথা হলো আমি আপনি বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সব সময় পেরেশানিতে থাকি। তাকে কিভাবে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করানো যায়। কিন্তু আপনি দেখেন আমাদের দেশে উচ্চতর ডিগ্রিধারীর অভাব নেই। অভাব শুধু উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষের। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে আল্লাহর দেওয়া নির্দেশনাটি ফলো করি, আল্লাহ তায়ালা বলেন, পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না (সূরা আল আলাক : ১-৫)
এ নির্দেশনা এটাই বুঝাতে চাচ্ছে যে সব কিছু থেকে জ্ঞান অর্জন করা যায় না। যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর দেখানো পথেই জ্ঞান অর্জন করতে হবে, আর এটাতেই কল্যাণ নিহিত।

SHARE

Leave a Reply