Home ভ্রমণ দেখে এলাম বরেন্দ্র অঞ্চল – নাহিদ নূর

দেখে এলাম বরেন্দ্র অঞ্চল – নাহিদ নূর

আমার মামাত ভাই ফাহিম ভাইয়ার কাছে আমি কাঁকনহাটের অনেক মজার মজার গল্প শুনতাম। মাঠে মাঠে ঘুঘু শিকার, সেই ঘুঘুর মাংস দিয়ে পিকনিক, মাছ ধরা, পাখির বাসা থেকে পাখির ছানা ধরে নিয়ে আসা, আবার নাক-কাটা বিশুর গল্প যার নাম নিলে জিন-ভূতও ভয় পায়। প্রতিবার শীত এলেই ভাইয়ারা নানার বাড়ি বেড়াতে যায়; তখন আমিও বায়না ধরি মামাদের সাথে আমি যাব। কিন্তু আম্মু আমাকে যেতে দেয়নি; কারণ আমি একা থাকতে পারবো না বলে। এবার সবেমাত্র আমার ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট হয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে উঠলাম। তাই আমার নানাবাড়ি গিয়েছি আর তখনই শুনতে পেলাম মামারা কাঁকনহাট বেড়াতে যাওয়ার শোরগোল। বড়মামা আমাকে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলতেই আমি আম্মুর কাছে বায়না ধরলাম। আম্মু পারমিশন দিলেন এবং তিনিও আমাদের সাথে যাবেন। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি নামার মত। তবে আম্মু একটা শর্ত জুড়ে দিলেন- যা বলবে তাই শুনতে হবে এবং অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। আমি তাতেই রাজি।
মামার সাথে আম্মুর কথা হলো পনেরোই নভেম্বর শনিবার বেলা তিনটায় রাজশাহী রেলস্টেশন হতে ট্রেনে আমরা যাত্রা করবো। সেই মোতাবেক আমরা আমাদের বাড়ি থেকে এবং মামারা মামাদের বাড়ি থেকে কাঁকনহাটের উদ্দেশে পৌনে তিনটায় স্টেশনে চলে এলাম। সেখানে বড়মামা, মামী, ফাহিম ভাইয়া, আরো দুই খালামনি, ছোট দুই মামাতো ভাই বোন ফারজিন এসেছে। ট্রেন আসলো প্রায় পঞ্চাশ মিনিট লেটে। ট্রেনের নাম কমিউটার। ট্রেনের যাত্রা শুরু হলো। ট্রেনে বিভিন্ন রকমারি জিনিস ও খাবার নিয়ে হকাররা ঘুরছে। আমরা প্রথমে বাদাম কিনলাম, কমলা ও বারো ভাজা খেলাম। এরই মধ্যে মাত্র ২৫ মিনিট জার্নি শেষে গন্তব্য স্টেশন কাঁকনহাটে পৌঁছে গেলাম। মামা বলল- আমরা এসে গিয়েছি, এখন নামতে হবে। সকল ব্যাগ ব্যাগেজ নিয়ে আমরা স্টেশন থেকে নেমে একটা ভ্যানে আম্মা ও মামিরা চলে গেলেন নানার বাড়ি। আর মামা, আমি ও ফাহিম ভাইয়া স্টেশনটা কিছুক্ষণ ঘুরে দেখতে লাগলাম। স্টেশনের সামনে রেললাইনগুলোর পরেই অনেক বড় বড় দু’টি বটগাছ, দু’টি কড়ইগাছ ও একটি পাইকড় গাছ যেন ছায়া দেয়ার জন্যই দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই একটি খোলিনে নতুন ধান মাড়াই করা হচ্ছে এবং বেশ কয়েক জন লোক ধানের ওপর পড়ে থাকা ময়লা ও খড়গুলি কুলার মত বাঁশের এক ধরনের জিনিস দিয়ে উড়িয়ে পরিষ্কার করছে।
কিছুক্ষণ বেড়ানোর পর মামা আমাদের নিয়ে ভ্যানে উঠলেন। আমরা দেখতে থাকলাম সেখানকার জমিগুলি স্তরে স্তরে সাজানো। একটি জমি অন্য জমি থেকে উঁচু হতে হতে আবার একটু নিচু এবং মাটিগুলো লালচে, অনেক তালগাছ, মাঠের পর মাঠ এভাবেই দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম মামির নানাবাড়ি। গ্রামটির নাম শেরপাড়া। এখানে নাকি কোন এক সময় একজন বাঘ শিকার করেছিলেন। তাই নাম শেরপাড়া। নানাবাড়িটি একপাশে ইটের তৈরি ছাদ দেয়া পাকা বাড়ির সাথে লাগোয়া মাটির তৈরি দোতালা বাড়ি। সামনে বড় উঠান তার চারিদিকে লামিয়া খালামণি ও একা খালামণির ফুলের গাছ, বাম পাশে মুরগির চালা ঘর এবং পাশেই রান্নাঘর। আর বাড়ির সামনেই বিরাট খোলান যেখানে ধানমাড়াই করছে এবং গোলাকৃতির বিরাট উঁচু খড়ের পালা, দু’একটি পালা চারকোণা ঘর আকৃতির যা অনেক সুন্দর। গিয়ে দেখি নানি ও মামিরা শীতের পিঠা বানাচ্ছে। আমি খড়ের পালাগুলিকে মনে করেছিলাম শীত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এক ধরনের খড়ের তৈরি ঘর। তাইতো মামাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম এই ঘরের দরজা কোথায়? সবাইতো হেসে অস্থির। তখন মামা আমাকে বুঝিয়ে বললো-এটা গাঁদা করে রাখা খড়ের পালা যা সারা বছর গরুকে খাওয়ানো হয়। এভাবে দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হলো, গোয়াল ঘরে গরু গুলি তোলা হলো। হাত মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকে পিঠা ও অন্যান্য নাস্তা খেয়ে চা খেলাম। রাতে মুরগির গোশত, ডাল ও সবজি দিয়ে ভাত খেলাম। এরপর সবাই মিলে গল্পের আসর বসলো। গল্পের শেষে সবাই ঘুমাতে গেল। আমাদের যে ঘরে থাকার ব্যবস্থা করা হলো সে ঘরে বড় একটি খাট রয়েছে। কিন্তু আমি খাটে না ঘুমিয়ে পাশেই নতুন জিনিস দড়ির খাট পেতে ঘুমালাম। আম্মু ও টুম্পা খালা খাটে ঘুমালো।
ঘুম থেকে উঠে ভাপা পিঠা ও আখিয়া পিঠা খেয়ে বেড়াতে বের হলাম। বের হয়ে প্রথমেই দেখলাম ঢেঁকিতে নতুন চালের গুঁড়ি তৈরি করছে। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম দু’পাশে বড় বড় দোতালা তিনতলা মাটির বাড়ি, খাড়া টিনের চালা। প্রায় প্রতিটি বাড়ি টিনের চালের সাথে হাঁড়ি ও বাঁশে ঝুড়ি/ডালি ঝুলানো রয়েছে। তাতে কবুতর বাসা বেঁধেছে। মাঝে মাঝে ঘুঘুর বাসাও দেখা যাচ্ছে। রাস্তা ও পুকুরের পাড়ে বড় বড় রাজহাঁস ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। আমার মনে হচ্ছে-এখানে যদি আমাদের নিজের একটা বাড়ি থাকতো তবে প্রতিবছর আমাদের আসা হতো। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে আমরা সাঁওতাল পাড়াতে এসে গেলাম। তাদের প্রতিটি বাড়ির দেয়ালে সাদা, লাল ও সবুজ রং দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফুল ও লতাপাতার আলপনা আঁকা হয়েছে। সে এক অদ্ভুত শিল্পকর্ম। এখানে যে দিকে তাকাই শুধু ধানের ক্ষেত, পেয়ারার ক্ষেত, টমেটো, মশুর ও সরিষার ক্ষেত এবং তালগাছের সারি। সরিষা ক্ষেতে হলুদ সরিষা ফুল ফুটে আছে- সে এক অপূর্ব সৌন্দর্য প্রাণ জুড়িয়ে যায়। এখানকার জমির মাটি এত শক্ত যে ইটের বাড়িগুলি ফেটে ফেটে গেছে। রাস্তা দিয়ে ফেরার পথে দেখলাম গরুর গাড়ি। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা গুরুর গাড়ির দুই দিকে দু’জন করে বসে সুখ খাচ্ছে। আমিও তাদের সাথে সুখ খেলাম। অনেক মজা হলো। বাড়ি এসে দুপুরের খাবার খেয়ে ফাহিম ভাইয়ার সাথে ঘুঘু শিকারে বের হলাম। কিন্তু দলবলসহ ব্যর্থ হয়ে বাড়ি ফিরলাম। পরের দিন সকালে পোয়ালের গাঁদার পাশে তালপাতার ঘর বানিয়ে অনেকের সাথে খেললাম, লুকোচুরি খেললাম। দুপুরে হাঁসের গোস্ত, গরুর মাংস ও বেগুন ভাজি দিয়ে পোলাও ভাত খেয়ে আমাদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। কাঁকনহাট স্টেশনে বেলা তিনটার ট্রেনে চেপে রাজশাহী চলে এলাম। বাড়ি আসতে মন চাইছিল না কিন্তু আম্মুকে দেয়া শর্তের বাইরে একদিন বেশিই থাকা হয়েছে। আব্বু রাজশাহী স্টেশনে এসে আমাদের বাড়ি নিয়ে গেলেন। আসার সময় আমার পছন্দের দড়ির খাট নিয়ে এসেছিলাম সেটায় বসেই এই ভ্রমণ কাহিনীটি লিখলাম। কাঁকনহাটে কখনও বেড়াতে গেলে দেখবেন লাল এঁটেল মাটি, বড় বড় মাটির বাড়ি এবং বরেন্দ্র অঞ্চল।

SHARE

Leave a Reply