Home খেলার চমক মতিন মিয়া রঙমিস্ত্রি থেকে ফুটবল তারকা – আবু আবদুল্লাহ

মতিন মিয়া রঙমিস্ত্রি থেকে ফুটবল তারকা – আবু আবদুল্লাহ

ছোটবেলা থেকেই ফুটবল পাগল ছিলো ছেলেটি। ফুটবলের কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ তার ছিলো না; আল্লাহ প্রদত্ত মেধা আর মহল্লায় বন্ধুদের সাথে বিকেলে খেলা- এই দুটিই মূলধন। তার জোরেই সে আজ জাতীয় ফুটবলের এক তারকা। নাম তার মতিন মিয়া। বাংলাদেশের ফুটবলের ‘নাম্বার নাইন’। জাতীয় দলে অনেকটা নতুন হলেও তাকেই ভাবা হচ্ছে এদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ফুটবলের সেরা প্রতিভা মনে করা হয় তাকে। আলফাজ, কাঞ্চনদের অবসরের পর জাতীয় দলে যোগ্য স্ট্রাইকারের অভাব অনেক দিনের। প্রতিপক্ষের রক্ষণ বাধা চূর্ণ করে যিনি গোল আদায় করতে পারবেন এমন স্ট্রাইকারের সঙ্কটে অনেক ম্যাচেই ভালো খেলেও জয় পায়নি বাংলাদেশ। এবার মতিন যেন হয়ে এসেছেন আশার আলো। তার মাঝেই যোগ্য স্ট্রাইকারের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন ফুটবল সংশ্লিষ্টতা।
অথচ এই ফুটবলে আসার জন্য মতিন মিয়াকে পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক কঠিন পথ। সিলেট শহরের পাশে তাজপুরে বাড়ি তার। সিএনজি অটোরিকশা চালক বাবার আয়ে নয় সদস্যের পরিবারের খরচ চালানো কঠিন ছিল। বাধ্য হয়ে পড়াশোনা বন্ধ করে মতিনকে নামতে হয়েছিল রংমিস্ত্রির কাজে। হাড়ভাঙা খাটুনির পর দিন শেষে যে টাকা পেতেন, মতিন সেটিই তুলে দিতেন মায়ের হাতে। বছর চারেক আগে বাবা মারা গেলে দায়িত্ব আরো বড় হয়ে ওঠে মতিনের জন্য। দায়িত্বের কারণে কাজের চাপও বেড়ে যায়; কিন্তু মতিনের মন পড়ে থাকত মাঠে। কারণ ফুটবলই যে তার ধ্যান-জ্ঞান। কাজ শেষে বিকেলে চলে যেতেন মাঠে। খেলতেনও দারুণ। প্রথম দিকে খেলতেন খালি পায়ে। পরে এলাকার এক বড় ভাইয়ের পুরনো এক জোড়া বুট দিয়ে শুরু করেন। ধীরে ধীরে এলাকায় ফুটবলার হিসেবে তার খ্যাতি তৈরি হয়। বিভিন্ন জায়গা থেকে খ্যাপ খেলার প্রস্তাব আসতে শুরু করে। টাকার প্রয়োজন আর ফুটবলের নেশা- দুটোই পূরণ হতে থাকে খ্যাপ খেলায়। নিজ জেলার বাইরে থেকেও ডাক আসে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে। এর মধ্যে বড় ভাই দুবাই চলে গেলে সংসারের চাপ কমতে থাকে কিছুটা। ফুটবলে আরো মনোযোগী হয়ে ওঠেন মতিন।
২০১৪ সালে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন তারই এলাকার ‘বড় ভাই’ জাতীয় দলের ডিফেন্ডার ফুটবলার ইয়ামিন মুন্না। টিঅ্যান্ডটি ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবলে শুরু তার। প্রথম মৌসুমে ভালোই খেলেছেন; কিন্তু খ্যাপ খেলার নেশায় পরের বছর আর ঢাকায় আসেননি। ২০১৬ সালে মুন্না অনেকটা জোর করেই তাকে ঢাকা নিয়ে আসেন। সেবার হাতেখড়ি পেশাদার ফুটবলে। সুযোগ হয় সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবে। প্রথম মৌসুমেই সাইফ স্পোর্টিংকে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ (ঘরোয়া ফুটবলের দ্বিতীয় স্তর) শিরোপা এনে দিয়ে তোলেন প্রিমিয়ার লিগে। সাইফকে প্রিমিয়ারে উঠাতে মতিনের ভূমিকা দুর্দান্ত। আসরে গোল করেছিলেন ৬টি। হয়েছিলেন লিগের সেরা খেলোয়াড়। দুর্দান্ত একটি গোল করেন মুক্তিযোদ্ধার বিপক্ষে। পাঁচ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে তার করা সেই গোলটি ছিল দেশের ফুটবলে অন্যতম সেরা। সেবার সাইফ স্পোর্টিং তাকে দিয়েছিল ৫ লাখ টাকা। দল প্রিমিয়ার লিগে ওঠার পর পরের মৌসুমে পারিশ্রমিক বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ লাখ টাকায়। বাড়তি পুরস্কার হিসেবে ডাক পেয়েছিলেন জাতীয় দলের কন্ডিশনিং ক্যাম্পে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মতিনকে।
সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবের কন্ডিশনিং ক্যাম্প করতে কলকাতায় যাওয়ার পর তার দুই পায়ের কাজ সেখানকার বিখ্যাত ক্লাব ইস্টবেঙ্গলের কর্মকর্তাদের নজর কেড়েছিল। সেখানে ইস্টবেঙ্গলের জুনিয়র দলের বিপক্ষে দু’টি প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল সাইফ। দুটিতেই মতিনের নৈপুণ্য ছিল অনন্য। ইস্টবেঙ্গল তাকে দলে নিতেও চেয়েছিল; কিন্তু সাইফ স্পোর্টিংয়ের কর্মকর্তারা মতিনকে যেতে দেননি কলকাতায়। কারণ শিক্ষা-দীক্ষা কম থাকায় বিদেশের ফুটবলে মানিয়ে নিতে কষ্ট হবে তার। হতে পারেন প্রতারণার শিকার। সে বছর তিনি প্রিমিয়ারে খেলেন সাইফের হয়েই।
পরের মৌসুমে (২০১৮-১৯) প্রায় ৪০ লাখ টাকায় বিগ বাজেটের দল বসুন্ধরা কিংসে যোগ দেন মতিন মিয়া। বিদেশী ফরোয়ার্ডদের ভিড়েও উজ্জ্বল ছিলেন তিনি। ১২ গোল করে স্থানীয় ফুটবলারদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। সেই সূত্র ধরেই তার ওপর আস্থা তৈরি বাংলাদেশ জাতীয় দলের হেড কোচ জেমি ডের। সুযোগ হয় জাতীয় দলে। যদিও প্রথম দিকে জাতীয় দলের সেরা একাদশে সুযোগ কমই পেতেন, কখনো নামতেন বদলি হিসেবে। ২০১৯ সালের মার্চে কম্বোডিয়ার বিপক্ষে ফিফা প্রীতি ম্যাচে শুরুর একাদশে খেলেন তিনি। গত বছর জুনে লাওসের বিপক্ষে বিশ্বকাপ প্রাক-বাছাই ম্যাচেও ছিলেন প্রথম একাদশে। অনূর্ধ্ব-২৩ এএফসি ফুটবলে তিনি নিয়মিতই ছিলেন।
এবারের বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে স্ট্রাইকার জীবন অসুস্থ থাকায় সুযোগটা পেয়ে যান মতিন। প্রথম ম্যাচে ফিলিস্তিনের বিপক্ষে তিনি অল্পের জন্য গোল পাননি। তবে দারুণ খেলেছেন, বেশ কয়েকটি জোরালো আক্রমণ করেছিলেন। পরের ম্যাচ ছিলো শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। যেটি ছিলো বাংলাদেশের বাঁচা-মরার ম্যাচ। সেমিফাইনালে উঠতে হলে জিততেই হবে, হারলে বাদ টুর্নামেন্ট থেকে। আসল সময়টাতইে জ্বলে ওঠেন মতিন। জোড়া গোল করে বাংলাদেশকে তোলেন সেমিফাইনালে। প্রথমবার তার বুলেটগতির শট শ্রীলঙ্কান গোলরক্ষকের হাতে লেগেও জালে জড়ায়। আর পরের গোলটি করেছেন কাউন্টার অ্যাটাকে মাঝমাঠ থেকে দৌড়ে বল নিয়ে প্রতিপক্ষের গোলরক্ষককে কাটিয়ে।
টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে বাংলাদেশ হেরে যায় বুরুন্ডির কাছে। সেই ম্যাচেও মতিন মিয়ার খেলা প্রশংসা কুড়িয়েছে। দুরন্ত গতি আর সেই সাথে গোলের ক্ষুধা তো আছেই, ফিনিশিংয়েও ভালো। দারুণ দক্ষতায় প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের মার্কিং ফাঁকি দিয়ে ঢুকে পড়তে পারেন ডি-বক্সে। সবকিছু মিলিয়ে মতিন যেন একজন দক্ষ স্ট্রাইকারের প্যাকেজ। তাই তার মাঝেই আশার আলো দেখছে বাংলাদেশের ফুটবল। আর যে মতিন এক সময় অন্যের বাড়ির দেয়াল রাঙানোর কাজ করতেন, তিনিই আজ দু’পায়ের জাদুতে রাঙিয়ে চলছেন বাংলাদেশের ফুটবল। তার পায়ের কারুকাজে আরো রঙিন হোক এদেশের ফুটবল সেই প্রত্যাশা এখন সবার।

SHARE

Leave a Reply