Home গল্প তোমাদের গল্প গুহাবাসী – নাজমুন হাছান (ইপ্তি)

গুহাবাসী – নাজমুন হাছান (ইপ্তি)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির শিক্ষা লাভের জন্য নানা ঘটনা উল্লেখ করেছেন। আসহাবে কাহাফ হচ্ছে ঐ ঘটনাগুলোর একটি। আসহাবে কাহাফ অর্থ হলো গুহাবাসী। কোরআনে এর ঘটনা উল্লেখ করলেও এর স্থান উল্লেখ করা হয়নি। কারো কারো মতে এটি প্রাচীন গ্রিক শহরের আনাতলিয়া বা এফিসাসে অবস্থিত। বর্তমানে ভৌগোলিকভাবে শহরটি তুরস্কে পড়েছে। এবার মূল ঘটনায় আসা যাক। সেই যুগে এক ঈদের দিন লোকেরা মূর্তিপূজার উদ্দেশ্যে বাহির হলো। এতে তারা তাদের মূর্তির নৈকট্য লাভের জন্য পশু জবাই বা অন্যান্য যা যা লাগে তা করতো। কিন্তু তাদের এক সম্ভ্রান্ত বংশের এক যুবক মূর্তিপূজার এই মহড়া কোন ক্রমেই মেনে নিতে পারেনি। তারা যে সমস্ত কল্পিত মাবুদের উপাসনা করছে তা দেখে তিনি নিজের বিবেকের কাছে থমকে দাঁড়ালেন। প্রশ্নগুলো তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। তার চিন্তার এবং চেতনার এক নতুন সঞ্চালন হলো। তিনি লোকসমাজ হতে দূরে একটি গাছের নিচে বসে বসে চিন্তা করতে লাগলেন। হযরত ঈসা (আ) যে একত্ববাদের কথা বলেছিলেন তাই সত্য ধর্ম। তিনি এই বিশ্বজগৎ নিয়ে ভাবতে লাগলেন। এবং ঔ মানুষদের নিয়ে ভাবলেন যারা মূর্তিপূজায় ক্রমশ অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর তার মতো আরেকজন এসে তার পাশে বসলো। তার মনেও একই প্রশ্ন। একে একে সাতজন এসে একত্রিত হলো। তাদের সবার মনে একই প্রশ্ন- হযরত ঈসা (আ) এর আনীত ধর্মই সত্য ধর্ম। আর এদের নিজেদের হাতে বানানো মূর্তি মিথ্যা। সাতজনের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিলো না তবুও তারা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই একে অন্যের সাথে ঈমানের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেলো। তারা একে একে তাদের মনের সন্দেহ শহরবাসীর কাছে প্রকাশ করলো। এরপর তারা তাদের প্রখর দৃষ্টি এই মহা বিশ্বের দিকে ঘুরালো এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, এই মহান আকাশ যিনি সৃষ্টি করেছেন তারই ইবাদত করা আমাদের বিশেষ আবশ্যক। তিনিই আমাদের প্রভু। আর আল্লাহ এবং ঈসা (আ)-এর ওপর ঈমান আনলেন এবং গোপনে একত্ববাদের দাওয়াত দিতে লাগলেন। এ কথা কোনোক্রমে ঐ দেশের বাদশাহ জানতে পারলো। সে ছিলো অত্যন্ত অত্যাচারী মূর্তিপূজক। কেউ যদি সত্য ধর্মের অনুসরণ করে তবে তাকে ডেকে এনে দুটি বিকল্প প্রস্তাব তার সামনে পেশ করতো। তাকে দুটি হতে যে কোন একটি বাছাই কবার নির্দেশ দিতো এবং চিন্তা ভাবনার কোন সময় দেয়া হতো না। বিকল্প দুটি-
১. তার মতো মূর্তিপূজারি হতে হবে।
২. তার জল্লাদের কাছে প্রাণ দিতে হবে।
পরে যুবকদের রাজ সভায় ডেকে এই দুটি বিকল্পের একটি বেছে নিতে বলল অত্যাচারী বাদশাহ। বাদশাহ তাদের বংশ ও বয়সের দিকে চিন্তা করে তাদের কিছু সময় দিলো চিন্তা করার জন্য, যা অন্যদের দেওয়া হয় না। যুবকরা এই দুটি বিকল্পের একটাও গ্রহণ করতে রাজি নয়। পরক্ষণে তারা স্থির করলো তারা দেশ ত্যাগ করে অন্য কোথাও বরং সত্যের দাওয়াত দিবে। তারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। পথ চলতে চলতে একটি কুকুর তাদের সাথী হয়ে গেলো। কুকুরটি নিজেকে নিজে মনোনীত করলো পাহারাদার হিসেবে। সে বোধ হয় বুঝতে পেরেছিলো ভালোকে ভালোবাসলে সৎলোকের সঙ্গ দিলে আল্লাহর প্রিয় হওয়া যায়। কিছু দূর যাওয়ার পর তারা ক্লান্ত হয়ে একটু বিশ্রামের উদ্দেশ্যে একটি গুহায় অবস্থান করলো। তারা ঐখানে আল্লাহর দেয়া ফল খেলো। আর কুকুরটি বীরের মতো দু’ পা সামনে রেখে পাহারা দিচ্ছে। আর একটু বিশ্রামের নিয়তে শুয়ে পড়লো, তারপর চলে এলো ঘুম। ঐ ঘুম হতে চলে এলো গভীর নিদ্রা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কেটে গলো। গুহার ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে সামান্য সূর্যের আলো ভিতরে ঢুকতো। আল্লাহর হুকুমে সূর্যের প্রখর তাপ তাদের স্পর্শ করতো না। ঝড় বৃষ্টি প্রচণ্ড বজ্রপাত তাদের ঘুম ভাঙাতে পারেনি। আর ঐ দিকে পরদিন রাজ সভায় উপস্থিত না হওয়ায় রাজা তাদের খোঁজার জন্য প্রহরী পাঠায়। তারা তন্য তন্য করে খুঁজে এমনকি গুহার সামনে পর্যন্তও চলে আসে কিন্তু আল্লাহর রহমতে তাদের কোথাও খুঁজে পেলো না।
আর যুবকদের ঘুমাতে ঘুমাতে কেটে গেলো ৩০৯ বছর। প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত অবস্থায় ৩০৯ বছর পর তাদের ঘুম ভাঙলো। ঘুম থেকে উঠে তাদের মধ্য হতে একজন বলে উঠলো আমরা আজ অনেকদিন ঘুমিয়ে পার করেছি। আরেকজন বলল, তাইতো মনে হয় কেননা যে পরিমাণে ক্ষুধা লেগেছে তা এটাই ইঙ্গিত করে। ৩য় জন বলল, না আমরা সকালে ঘুমিয়েছি দেখ সূর্য এখনো অস্ত যায়নি। ৪র্থ জন বলল, এই সব বাদ দাও আল্লাহ জানেন আমরা কত কাল ঘুমিয়েছিলাম। এখন আমাদের একজনের উচিত শহরে গিয়ে কিছু খাদ্য ক্রয় করে আনা। এবং তাকে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। একজন কিছু রূপার দিরহাম নিয়ে শহরে গেলো। গিয়ে শহরের অবস্থা দেখে তার চোখ ঝলসে পড়লো এবং এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো কিছুই আর আগের মতো নেই। আগের ঘরবাড়িগুলো পাল্টে গেছে, রাজপ্রাসাদগুলো পরিত্যক্ত অবস্থার পড়ে আছে। চারদিকে কোনো চেনা মুখ দেখা যাচ্ছে না। লোকেরা তার চলার ভঙ্গি ও এদিক ওদিক তাকানোর কারণে সন্দেহ করলো। এবং তাকে ঘিরে ধরে জিজ্ঞেস করলো ‘আপনি কি অন্যদেশ থেকে এসেছেন?’
যুবকটি বললেন, ‘আমি এখানে অপরিচিত কেউ নই। আমিতো কিছু খাদ্য ক্রয় করার জন্য এসেছি কিন্তু দোকান খুঁজে পাচ্ছি না।’
একজন লোক তার হাত ধরে একটি দোকানে নিয়ে যায়। যুবকটি রূপার দিরহামগুলো দোকানদারকে দিলো। দোকানদার অনেক যাচাই বাছাই করে দেখলো দিরহামগুলো ৩০০ বছর আগের। দোকানদার মনে মনে ভাবলো এই লোকটি নিশ্চয়ই গুপ্তধন পেয়েছে। এ দিরহামগুলো ছাড়াও ওর কাছে আরো অনেক দিরহাম আছে। দোকানদার লোকজন ডেকে বিষয়টি জানালো। যুবকটি বলল, আমার ওপর কেনো গুপ্তধন পাওয়ার গুজব লাগানো হচ্ছে? এই দিরহামগুলোত গতকাল এক ব্যক্তির সাথে লেন-দেনের সময় আমার হস্তগত হয়। এখন আমি এগুলো দিয়ে খাদ্য ক্রয় করছি এতে সন্দেহের কী আছে। ভিড় জমে যাওয়ায় যুবকটি তার ও তার সাথীদের প্রাণনাশের আশঙ্কায় স্থান পরিবর্তন করতে চাইলো কিন্তু লোকেরা তাকে যেতে দিল না। এখানকার কিছু লোক ভিড় ভাঙিয়ে নম্রভাষায় কথা বলে জানতে পারলো তারা ৩০৯ বছর আগের অত্যাচারী বাদশার সময়ের সেই ৭ জন যুবক। যাদের খোঁজার জন্য বাদশার সকল প্রচেষ্টা সফল হয়নি। যুবকটি লোক জানাজানির ভয়ে অবস্থান ত্যাগ করতে চাইলে একজন লোক তাকে বলে, ভয় পেয়ো না ঐ জালিম বাদশা আর বেঁচে নেই। আল্লাহ তাকে অনেক আগেই ধ্বংস করে দিয়েছেন। যুবকটি বলল, আমার সাথীরা হয়তো আমার জন্য চিন্তা করছে এবং আমি তাদের এখানের বিষয়টি সম্পর্কে জানাই। যুবকটি ঐ গুহায় চলে গেলো। এ সংবাদটি ঐ সময়ের বাদশা জানতে পেরে তাড়াতাড়ি ছুটে গেলেন তাদের কাছে। তাদেরকে সালাম দিলেন মোসাফাহ করলেন এবং আলিঙ্গন করলেন। অতঃপর তাদের রাজ মহলে আহ্বান জানালেন এবং তাদের এইখানে বাকি জীবন কাটানোর জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু তারা সবাই জবাব দিলো, ‘আমাদের বাবা-মা ছেলে-সন্তান কেউ বেঁচে নেই তাই আমরা বাকি জীবনটা আল্লাহর ইবাদত করে কাটাতে চাই।’ আর কিছুক্ষণ পর তারা সবাই ইন্তেকাল করলেন।
তো বন্ধুবা! আমরা এই ঘটনা থেকে কী জানতে পারি? আল্লাহ কেনই এই ঘটনা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন?
এ ঘটনা থেকে আমরা জানতে পারি- একত্ববাদ আল্লাহর ইবাদত করা এবং তার সাথে কাউকে শরিক করা যাবে না। সকল বিপদে আপদে আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং তার নিকট দোয়া প্রার্থনা করা জরুরি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সত্যের ওপর অটুট থাকতে হবে। আর ৩০৯ বছর পর তাদের আবার জীবিত করাকে ঐ দিকে ইঙ্গিত করে যে মৃত্যুর পরে পুনরুত্থান সত্য, কিয়ামত দিবস সত্য। আসহাবে কাহাফ পরকাল বিশ্বাসের এক অকাট্য প্রমাণ বিশেষ। আর হেদায়াত হচ্ছে আল্লাহর কাছ থেকে এক বিশেষ নিয়ামত। আমাদের সকলের উচিত সর্বদা আল্লাহর কাছে হেদায়াত কামনা করা।

SHARE

Leave a Reply