Home গল্প এক টুকরো মুক্তির গান – আহসান হাবিব বুলবুল

এক টুকরো মুক্তির গান – আহসান হাবিব বুলবুল

খাঁচায় বন্দি পাখির প্রতি তাসনিমের তেমন একটা আগ্রহ নেই। ওকে নিয়ে যত মাতামাতি নিশাতের। বাবা সেদিন নীল-সবুজের এই টিয়া পাখিটি নিয়ে আসেন। নিশাতকে সারপ্রাইজ দেন ওর জন্মদিনে।
নিশাত আনন্দে নাচতে থাকে, ছোট বোনের আনন্দে তাসনিম পুলকিত হয়। নিশাতের যেন ঘুম নেই। খাঁচার পাখিকে নিয়ে যত কোলাহল। ওর বন্ধুরা এসেছে নতুন এই অতিথিকে দেখতে। নিশাত তার টিয়া পাখিকে কলা, বুট, বাদাম কত কী খেতে দেয়। ও তেমন একটা খায় না। শুধু এপাশ-ওপাশ করে। লোহার খাঁচায় শিক জাপটে ধরে। নিশাত পাখিকে কথা শেখাবে। প্রথম কি কথা শেখানো যায় ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করে।
: তোর পাখিকে প্রথম কি শিখাবি জানিস ‘মুক্তি চাই মুক্তি চাই’!-
– তাসনিম মুষ্টিবদ্ধ দু’হাত ওপরে তুলে ধরে।
: এটা একটা ভাষা হলো। এই বুলি শেখালে তো ওকে সত্যি সত্যি মুক্ত করে দিতে হবে। নইলে খারাপ লাগবে তো!
– নিশাতের বন্ধুরা হেসে কুটি কুটি হয়। পাখির প্রতি নিশাতের অনাবিল আগ্রহ তাসনিমকে আরও ভাবায়। নিশাত যখন থাকে না তখন তাসনিম খাঁচার পাশে এসে দাঁড়ায়। ভাবে মুক্ত করে দেই। না, নিশাত কাঁদবে। বাড়িশুদ্ধ তোলপাড় করে ছাড়বে। থাক। আচ্ছা, ওর সাথীটি এখন কোথায়? প্রকৃতিতে ওরা জোট বেঁধে থাকে। বাসা বানায়। ওর সাথীটি মুক্ত হলেও হয়তো এখন আশাহত। প্রিয়জনের বিরহ বেদনায় কাতর।
– তাসনিম টিয়ার গাঢ় সবুজ রঙ একটু ছুঁয়ে দেখে। প্রকৃতির দিকে তাকায়। আনমনে ছড়া কাটে, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’
দেখতে দেখতে ছুটির দিনগুলো ফুরিয়ে আসে। তাসনিম যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। ও অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। সিরাজগঞ্জ জেলা স্কুলে ভর্তি হয়েছে। হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করে। উল্লাপাড়া উপজেলা শহরে ওদের পৈতৃক নিবাস। বাবা আরিফুল ইসলাম একটি এনজিওতে চাকরি করেন। মা তাহমিনা বেগম গৃহিণী ছেলে-মেয়েদের নিয়ে তাদের অনেক স্বপ্ন।
– ওরা বড় হবে, মানুষ হবে। দেশের জন্য কাজ করবে।’
তাসনিম ছোটবেলা থেকেই একটু অন্যরকম। খুব ধীরস্থির প্রতিভাদীপ্ত। অন্যের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। আবেগপ্রবণ তাসনিম অল্প বয়সেই নিজ চরিত্র মাধুর্যের জন্য সবার কাছে প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠে। সবাই ওর মাঝে একটা আলো দেখতে পায়। বাবা-মার ইচ্ছা ওকে ভালো একটা স্কুলে পড়ানোর। কিন্তু মধ্যবিত্তের টানাপড়েনের সংসারে এত দিন হয়ে ওঠেনি। এবার কষ্ট করে হলেও তারা ছেলেকে জিলা স্কুলে ভর্তির সুযোগটা হাতছাড়া করেনি।
বাবা-মা, নিশাত, দাদা-দাদু সবাইকে ছেড়ে যেতে হবে ভেবে তাসনিমের খুব খারাপ লাগে। পরক্ষণেই ও নিজেকে সান্ত¡না দেয় জীবনে বড় হতে হলে একটু ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। নিশাতের মনটাও ভার হয়ে ওঠে। ভাইয়া চলে যাবে। ভাইয়া চলে গেলে বাড়িটা খালি খালি লাগবে। নিশাত তাই ভাইয়ার পিছু ছাড়ছে না। এটা ওটা গুছিয়ে দিচ্ছে। গল্প করছে।
– ভাইয়া! পাখিটা কী করব? তুমি তো আটকিয়ে রাখা পছন্দ করো না। আব্বু এত টাকা দিয়ে কিনে আনলেন!
: তোর যেটা ভালো লাগে তাই করবি। শুধু পাখিকে আদর দিলে চলবে না; ভালো করে লেখাপড়াও করতে হবে। নইলে আব্বু কিন্তু আর কোনো সারপ্রাইজ দেবে না।
: ঠিক ঠিক পড়াশোনা করব দেখো। তুমি কিন্তু ছুটি পেলেই চলে আসবে।
– ভাই-বোনের আলাপচারিতায় বিকেলটা গড়িয়ে যায়। কাল ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস। যথাযোগ্য মর্যাদায় ভাবগম্ভীর পরিবেশে পালিত হবে। সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। স্টেডিয়াম মাঠে কুচকাওয়াজে জেলা স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের মহড়া শেষে বিকেলে হোস্টেলে ফিরে তাসনিম। একটি রঙিন খাম। হয়তো কারো চিঠি। হ্যাঁ তাই তো। খুব পরিচিত হাতের লেখা। শিল্পীর কারুকাজ। খামের ওপরে বিজয় দিবসের স্মারক ডাকটিকিট। ও একটা রোমাঞ্চ অনুভব করে। কে লিখতে পারে! আর বুঝতে বাকি থাকে না। নিশাত লিখেছে-
ভাইয়া! বিজয় দিবসের প্রাক্কালে তোমাকে সবচেয়ে খুশির খবরটা দিতে চাই। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি কাল ভোরে একুশবার তোপধ্বনির পরপরই টিয়া পাখিটি মুক্ত করে দেবো। ও পেখম মেলবে আকাশে। ও প্রাণভরে আমাদের মতোই স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করবে। ভাইয়া! আমরা বন্ধুরা মিলে অনেকগুলো পতাকা বানিয়েছি। লাল-সবুজের পতাকা। আমাদের স্কুল থেকে পতাকা মিছিল বের হবে। তোমরাও বুঝি খুব মজা করবে। প্রাণোচ্ছ্বাসে অতীতের সব গ্লানি ধুয়ে মুছে যাবে। নতুন দিনের আবাহনে….।
– রুমমেট জাহিদ ঘরে ঢোকে জিজ্ঞেস করে কার চিঠি দোস্ত!
: ছোট বোন নিশাত লিখেছে।
: কী লিখেছে?
এক টুকরো মুক্তির গান।

SHARE

Leave a Reply