Home গল্প সোনার বিস্কুট – মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

সোনার বিস্কুট – মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

মামুন স্যার সকলের প্রিয় স্যার। তিনি ক্লাসে সারাক্ষণ ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে গল্প করেন। গল্পের মাধ্যমে অনেক কিছু শিখান। ছাত্র-ছাত্রীরা খুব মজা পায়।
– আচ্ছা, তোমরা বাড়িতে কী কর?
– পড়ি, টিভি দেখি, ছোট বোনকে আদর করি, খেলা করি।
– খুব ভালো, তবে বেশিক্ষণ টিভি দেখবে না, তাতে অনেক ক্ষতি, মনে থাকবে?
– জি স্যার।
– তোমরা কি কেউ বাজারে যাও?
– হ্যাঁ স্যার, বাড়ির কাছেই বাজার। কতো কিছু কিনি।
– বলতো, বাজারে কোন জিনিস খুব সস্তা?
– আলু, কচু, ডাঁটা ও পুঁইশাক।
– অনেক হয়েছে। তোমরা মাছ খাও? কোন মাছ তোমাদের পছন্দ?
– ইলিশ মাছ স্যার।
– এই ইলিশ কোথায় পাওয়া যায়?
– বাজারেই পাওয়া যায় স্যার। ভ্যান গাড়িতেও পাওয়া যায়।
– বাজারে আসে কোথা থেকে?
– নদী থেকে স্যার।
– পুকুরে পাওয়া যায় না?
– না স্যার, ইলিশ পুকুরে হয় না। তাই অনেক দাম।
– এবার বলতো, কোন জিনিসের দাম খুব বেশি?
– স্যার, এখন পেঁয়াজের খুব দাম।
– পেঁয়াজের আর কতো দাম? লাখ লাখ টাকা দামেরও জিনিস আছে। সে রকম কোন জিনিসের নাম বলতে পারো?
– হ্যাঁ স্যার। সোনা, রুপা, হীরা চুনি-পান্না।
– বাস, বাস, এসব নাম টিভি দেখে শিখেছো। এসব কি কখনো দেখেছো?
– আমার আম্মার সোনার গয়না আছে।
– বলো দেখি, এই সোনা কোথায় পাওয়া যায়?
– গুলশানে স্যার। আপন জুয়েলার্সে অনেক সোনার জিনিস আছে স্যার।
– দোকানে এতো এতো সোনা আসে কোথা থেকে?
– আমি জানি স্যার, সোনা পাওয়া যায় খনিতে।
– সোনার খনি কোথায় আছে, বলতে পারো?
– এয়ার পোর্টে স্যার। টিভিতে দেখেছি, হাজার হাজার সোনার বিস্কুট।
– খবরদার, ফারদার কেউ টিভির কথা বলবে না। আফ্রিকা মহাদেশের নাম শুনেছো? পৃথিবীর সবচেয়ে বড় খনি আছে আফ্রিকার জোহান্সে বার্গে। মনে থাকবে?
– জি স্যার।
– বলতো, হীরার খনি আছে কোন দেশে?
– হীরক রাজার দেশে স্যার।
– আবার সেই টিভির কথা? টিভি তোমাদের মাথা চিবিয়ে খেয়েছে। পৃথিবীতে এরকম কোন দেশ নেই, রাজাও নেই। এবার আমি তোমাদের একটা গল্প শোনাব। মনোযোগ দিয়ে শুধু শুনবে। কোন প্রশ্ন করবে না।
– গল্পের নাম কী স্যার?
– গল্প শুরুর আগেই প্রশ্ন? তুমিতো খুব বেয়াদব হয়েছো।
– স্যার, ক্ষমা চাইছি স্যার। গল্পের মাঝখানে কোন কথা বলবো না স্যার। নাম জানলে বুঝতে সুবিধা স্যার।
– গল্পের নাম সোনার বিস্কুট। চোরাকারবারি দলের এক লোক এক ব্যাগ সোনার বিস্কুট নিয়ে এক জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পালাচ্ছিল। পুলিশ টের পেয়ে তার পিছু ধাওয়া করলো। লোকটা ব্যাগ ফেলে দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলো। পুলিশ তাকে ধরতে পারলো না।
– সোনার বিস্কুটগুলোর কী হলো স্যার?
– প্রশ্ন করতে নিষেধ করেছিলাম।
– গল্প শুনতে গেলে একটু আধটু প্রশ্ন এসে যায় স্যার। মাফ করবেন স্যার।
– শেষবারের মত মাফ করে দিলাম।
সোনার বিস্কুটগুলো জঙ্গলেই পড়ে রইলো। তিন বন্ধু একদিন সেই জঙ্গলে ঘুরতে গেল। একজনের চোখে পড়লো ব্যাগটা। ব্যাগ খুলে সোনার বিস্কুট দেখে আনন্দে আত্মহারা। এতো এতো সোনা। লোকগুলো ছিল খুবই দুষ্ট, খুবই লোভী। সেখানেই বসে পরামর্শ করতে লাগলো, কী করবে এখন।
এতো সোনা নিয়ে জঙ্গল থেকে বের হলে মানুষ টের পেয়ে যাবে। তাই সারাদিন অপেক্ষা করতে হবে জঙ্গলে। রাতের আঁধারে বাড়ি নিয়ে যাবে লাখ লাখ টাকার সোনা।
সারা দিনতো না খেয়ে থাকা যায় না। বিকেলের দিকে খুব ক্ষুধা পেল। একজনকে খাবার আনার জন্য বাইরে পাঠিয়ে বাকি দু’জন পাহারা দিতে লাগলো। জঙ্গলের পাশেই ছিল বাজার। লোকটা কিছু খাবার কিনলো। হঠাৎ তার মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি চাপলো। সোনার বিস্কুটগুলো তিনজন ভাগ করে নিলেতো কম হয়ে যাবে। সব সোনা একাই দখল করার ফন্দি আঁটলো। কিটনাশকের দোকান থেকে কিছু এনড্রিন কিনে খাবারে মিশালো। নিজের জন্য কিছু খাবার আগেই আলাদা করে রাখলো।
জঙ্গলে পাহারায় থাকা লোক দুটো আটলো আর এক ফন্দি। তারা পরামর্শ করলো, সোনাগুলো তিন ভাগ না করে দু’ভাগ করলে লাভ বেশি। জঙ্গলে লাঠির অভাব নেই। দুইটা মজবুত গাছের ডাল রেডি করে রাখলো। খাবার নিয়ে আসার সাথে সাথেই দু’জন মিলে মাথায় আঘাত করলো, পিটিয়ে মেরে ফেললো তাকে। তারপর বিষ মেশানো খাবার খেয়ে তারাও সেখানে মরে পড়ে রইলো। সোনার বিস্কুটের ব্যাগও পড়ে থাকলো জঙ্গলে।
– কেমন লাগলো গল্পটা?
– এরকম সিনেমা রোজই টিভিতে দেখায় স্যার।
– তুমি কান ধরে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাক।
– গল্পতো শেষ স্যার। গল্পের মাঝখানেতো কিছু বলিনি স্যার।
– রোজ রোজ টিভি দেখার শাস্তি এটা। ধরো কান।
– এবার বলো, এ থেকে তোমরা কী শিখলে?
– অনেক কিছু শিখলাম স্যার।
– এরকম জবাব দিলে হবে না। সরাসরি জবাব দিতে হবে।
– বেশি লোভ ভালো না স্যার।
– বেশি লোভ কেন? কোন প্রকার লোভই ভালো নয়। আরও ভালো জবাব কে দিতে পারবে?
– লোভ করা বড় পাপ স্যার।
– এ ব্যাপারে একটা প্রবাদ বাক্য আছে। কে বলতে পারো?
– অতি লোভে তাঁতী নষ্ট।
– তাঁতী মানে কী?
– যারা তাঁত দিয়ে কাপড় বানায় স্যার।
– তোমরা কেউ তাঁত দেখেছো?
– জি স্যার, মিরপুর বেনারসি পল্লীতে অনেক তাঁত ও তাঁতী আছে স্যার।
– ঠিক আছে। তোমরা ভালোই বলেছো। এবার আমি এ গল্পের মূল শিক্ষা বলছি। সব সময় মনে রাখবে। পরের অর্থ সম্পদ মানুষকে লোভ দেখায়। লোভ মানুষকে পাপ শেখায়। পাপের পরিণতি মৃত্যু।

SHARE

Leave a Reply