Home খেলার চমক প্রতিবাদী মেসুত ওজিল – আবু আবদুল্লাহ

প্রতিবাদী মেসুত ওজিল – আবু আবদুল্লাহ

২০১৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ী জার্মানি দলের প্রাণভোমরা ছিলেন মেসুত ওজিল। জার্মানি ও রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক এই মিডফিল্ডার বর্তমানে খেলছেন ইংল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় ক্লাব আর্সেনালের হয়ে; কিন্তু ফর্মের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলেছেন মেসুত ওজিল। সর্বশেষ রাশিয়া বিশ্বকাপে তার গায়েই ছিল জার্মানির ১০ নম্বর জার্সি।
দৃঢ়চেতা মেসুত ওজিল নিজের ধর্ম আর সংস্কৃতির সাথে আপস করেননি। মুসলিম হওয়ার কারণে জার্মান ফুটবলে তার সাথে যে বিরূপ আচরণ করা হয়েছে তার প্রতিবাদেই ২০১৮ সালের মে মাসে জানিয়ে দেন জার্মানির জার্সি গায়ে আর তিনি মাঠে নামবেন না। বর্ণবাদী আচরণের প্রতিবাদে ছেড়েছেন উজ্জ্বল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
গত বছরের শেষ দিকে চীনের উইঘুর মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করে বিশ্বে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন এই ফুটবলার। পেশাদার খেলোয়াড়দের সাধারণত রাজনৈতিক বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকলেও ধর্মপ্রাণ ওজিল তার ধার ধারেননি। সেই দৃঢ়চেতা মেসুত ওজিলকে নিয়েই আমাদের এবারের লেখা।
জার্মানিতে অভিবাসী হওয়া একটি তুর্কি মুসলিম পরিবারে জন্ম মেসুত ওজিলের। জার্মানির পরিবেশে বড় হলেও ওজিল পূর্বপুরুষের দেশ তুরস্কের রীতি-সংস্কৃতিও হৃদয়ে ধারণ করেন প্রবলভাবে। সেই সাথে পারিবারিক পরিবেশেই শিক্ষা পেয়েছেন ইসলাম ধর্মচর্চার; কিন্তু এই বিষয়গুলোই শেষ পর্যন্ত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ফুটবল ক্যারিয়ারের পথে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানবো। তার আগে চলো জেনে নেই ওজিলের ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোর কথা।
জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলীয় গেলসেঙ্কিরিশেন শহরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা ওজিলের। ওই শহরের কয়েকটি ক্লাবে অপেশাদার ফুটবল খেলেছেন কৈশোরে। এরপর ২০০৫ সালে সুযোগ হয়ে যায় সেখানকার নামকরা ক্লাব শালকে জিরো ফোরে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি দারুণ প্রতিভাবান এই ফুটবলারকে। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে ক্লাবের যুবদলে খেলে দ্রুতই জায়গা করে নেন মূল দলে। এই ক্লাবের পারফরম্যান্স দিয়ে জায়গা করে নেন জার্মানির অনূর্ধ-১৭ ,১৯ ও ২১ দলে।
দুই দেশের নাগরিকত্বের কারণে তুরস্ক কিংবা জার্মানি- যে কোন দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলার সুযোগ ছিলো ওজিলের। যে পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন, যেখানে ফুটবল শিখেছেন- সেই জার্মানিকেই বেছে নিয়েছেন তিনি। ওজিল প্রায়ই বলেন, আমার ভেতর দুটি সত্তা। ফুটবলের প্রতি যে টান, আর খেলার টেকনিক এটি তুর্কি অংশ থেকে পাওয়া। আর শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, পরিশ্রম এগুলো জার্মান থেকে পাওয়া।
তিন বছর শালকে জিরো ফোর ক্লাবে খেলার পর ৫০ লাখ ইউরো ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে তাকে কিনে নেয় জার্মানির আরেক ক্লাব ওয়েরডার বারমেন। ২০০৯ সালের জুনে অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে জার্মানি। ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ৪-০ ব্যবধানে হারানোর দিন ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কারটি ওজিলের হাতেই উঠেছিল। ততদিনে অবশ্য জাতীয় দলেও অভিষেক হয়ে গেছে তার। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে নরওয়ের বিপক্ষে এক প্রীতিম্যাচে অভিষেক তার সাদা-কালো জার্সিতে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের তৃতীয় ম্যাচেই পান গোলের দেখা।
২০১০ বিশ্বকাপে জার্মানির হয়ে নজর কাড়েন তরুণ প্লেমেকার ওজিল। সেমিফাইনাল পর্যন্ত জার্মানির সবগুলো ম্যাচে শুরু থেকে ছিলেন একাদশে। টুর্নামেন্টের গোল্ডেন বল পুরস্কারের ১০ জনের তালিকায়ও নাম ছিলো তার। বিশ্বকাপের পর ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যায় তাকে নিয়ে। শেষ পর্যন্ত সবাইকে টেক্কা দিয়ে তাকে দলে ভেড়ায় স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ। ট্রান্সফার ফি ছিলো দেড় কোটি ইউরো।
২০১০ সালের মাঝামাঝিতে রিয়াল মাদ্রিদে যান ওজিল। প্রথম মৌসুমেই এই প্লেমেকার রেকর্ড ২৫ গোল করান (অ্যাসিস্ট) দলের স্ট্রাইকারদের দিয়ে। পাশাপাশি নিজেও কয়েকটি গোল করেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, কোপা ডেল রে’র মতো আসরে। পরের মৌসুমে কোচ হোসে মরিনহো তার গায়ে তুলে দেন ১০ নম্বর জার্সি। এবার আরো দুর্দান্ত রূপে দেখা দেন ওজিল। ব্রাজিলিয়ান তারকা কাকাকে সরিয়ে তিনিই হয়ে ওঠেন দলের মূল ভরসা। রিয়াল মাদ্রিদকে জেতান ৩২তম লা লিগার শিরোপা। এবার তার নাম ওঠে ফিফা ব্যালন ডি অরের শর্টলিস্টে।
টানা তিন মৌসুম দুর্দান্ত খেলেছেন রিয়ালের মাঝমাঠে। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে যোগ দেন আর্সেনালে। এবার ট্রান্সফার ফি গোপন রাখা হয়। তবে সোয়া চার কোটি ইউরো বলে গুজব শোনা যায়। সেই থেকে এখনো ইংল্যান্ডের ক্লাবটিতেই আছেন মেসুত ওজিল। প্রতিটি মৌসুমেই খেলছেন দুর্দান্ত।
এর মধ্যে ২০১৪ সালে জার্মানিকে জিতিয়েছেন বিশ্বকাপ। ২০১২ ও ২০১৬ ইউরোর সেমিফাইনালে তুলেছেন। ২০১৪ বিশ্বকাপের পর ফুটবল কিংবদন্তি মিশেল প্লাতিনি ওজিলের খেলায় মুগ্ধ হয়ে তার জার্সি চেয়ে নিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, সেবার বিশ্বকাপে পাওয়া সব অর্থ ব্রাজিলের ২৩ গরিব শিশুকে দান করে আসেন ওজিল- যারা টাকার অভাবে জটিল অপারেশন করাতে পারছিল না।
তবে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে জার্মানি প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয়। যেটি ছিল এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটন। মিডফিল্ডার হয়েও পুরো ক্যারিয়ারে জার্মানির জার্সিতে ২৩টি গোল করেছেন, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন শতাধিক। ক্লাবের হয়েও ২০১৯ সাল পর্যন্ত তার গোল ৬০টির বেশি।

প্রতিবাদী অবসর
জাতীয় দলে তার সাথে বর্ণবাদী আচরণের প্রতিবাদে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকেই থামিয়ে দিয়েছেন প্রজন্মের সেরা এই মিডফিল্ডার।
২০১৮ সালের মে মাসে অবসরের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘দেশটির রাজনীতিক ও কর্মকর্তারা আমার সাথে যে আচরণ করেছেন, তাতে সাদা-কালো জার্সি গায়ে তোলার ইচ্ছে নষ্ট হয়ে গেছে। দলের হয়ে ভালো খেললেই আমি জার্মান, খারাপ করলে হয়ে যাই অভিবাসী’।
ওজিল জার্মান দর্শকদের ভোটে রেকর্ড পাঁচবার দেশটির সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু সেই ওজিলকে খোদ ফুটবল ফেডারেশন, জাতীয় পর্যায়ের অনেক রাজনীতিক তার তুর্কি শেকড় নিয়ে অনেক বিদ্রƒপাত্মক মন্তব্য করেছেন।
ওজিল বলেছেন, এবারের (২০১৮) বিশ্বকাপে দল বাদ পড়ার পর থেকেই জার্মানির সংবাদমাধ্যম আমার তুর্কি শেকড় নিয়ে এমন সমালোচনা করেছে, যেন আমার ওই পরিচয়ের কারণেই দল প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নিয়েছে।
বিশ্বকাপের আগে লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের সাথে দেখা করার পর থেকেই শুরু হয় সমালোচনা। বিশ্বকাপে জার্মাানি খারাপ করার পর সেটি চলে যায় নোংরামির পর্যায়ে। এর মূল কারণ যে ওজিলের ধর্ম ও তুর্কি শেকড় সেটি সহজেই বোঝা যায়। তাই এই আচরণের প্রতিবাদে জার্মানির হয়ে আর না খেলার সিদ্ধান্ত নেন ওজিল।
ইউরোপের ফুটবলে বর্ণবাদের শিকার যে ওজিলই প্রথম তা নয়। বেলজিয়ামের তারকা স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু গত রাশিয়া বিশ্বকাপের সময় প্লেয়ার্স ট্রিবিউনে লেখা এক নিবন্ধে বলেছেন, ‘যখন সবকিছু ভালোভাবে হয়, পত্রিকার পাতায় আমার সম্পর্কে লেখা হয় বেলজিয়ান স্ট্রাইকার লুকাকু। আর যখন দল খারাপ করে আমি হয়ে যাই কঙ্গোর বংশোদ্ভূত লুকাকু’।
ফ্রান্স ও রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক স্ট্রাইকার করিম বেনজেমা ২০১১ সালে বলেছিলেন, ‘জাতীয় দলের হয়ে গোল করলে বলা হয় আমি একজন ফরাসি, আর না পারলে তাদের কাছে আমি হয়ে যাই একজন আরব’।
ওজিলের প্রতিবাদী চরিত্রের আরেক উদাহরণ পাওয়া গেছে গত ডিসেম্বরে। চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলমানদের ওপর দেশটির কমিউনিস্ট সরকারের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন তিনি। টুইটারে একটি বড় পোস্ট দিয়ে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। যেখানে তিনি উইঘুরদের ‘অত্যাচার প্রতিহতকারী যোদ্ধা’ হিসেবে আখ্যায়িত করার পাশাপাশি বলেছেন, ‘(এই) গৌরবময় বিশ্বাসীরা একসাথে লড়াই করে তাদের বিরুদ্ধে- যারা মানুষকে জোরপূর্বক ইসলাম থেকে সরিয়ে দিতে চায়।’
ওজিল ওই স্ট্যাটাসে আরো লিখেছেন, ‘সেখানে কোরআন পোড়ানো হচ্ছে….. মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে… ইসলামিক স্কুল, মাদরাসা বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে….ধর্মীয় নেতাদের একের পর এক হত্যা করা হচ্ছে…. এত কিছুর পরও মুসলিমরা নীরব হয়ে আছে।’

SHARE

Leave a Reply