Home খেলার চমক ইউরোপের ফুটবলে আমাদের হামজা – আবু আবদুল্লাহ

ইউরোপের ফুটবলে আমাদের হামজা – আবু আবদুল্লাহ

ফুটবল বাংলাদেশে এক হতাশার নাম। এক সময়ের বিপুল জনপ্রিয় আর জৌলুশময় এই খেলাটি এ দেশে এখন ক্রমশই নিচের দিকে নামছে। সেই গ্যালারি ভর্তি দর্শক, মাঠের টানটান উত্তেজনা কিংবা দলবদলের সময় খেলোয়াড় নিয়ে ক্লাবগুলোর কাড়াকাড়ি- কোনটিই নেই। অথচ এক সময় আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ হলে পুরো ঢাকার শহরই যেন ছুটতো স্টেডিয়ামের দিকে। সারা দেশে রেডিও কিংবা টিভিতে খেলার নেশায় পাগল ছিলো কোটি কোটি দর্শক।
এখন ঘরোয়া ফুটবল টুর্নামেন্টগুলো কবে হয় সেই খবরও অনেকে রাখেন না। জাতীয় দল কবে কোথায় কার সাথে খেলে সেটিও জানে না অনেকে। সারা বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে পারছে না বাংলাদেশ। তাই ফুটবল নিয়ে আমাদের গর্ব করার দিন অতীত হয়েছে অনেক বছর আগেই।
তবে এত হতাশার মাঝেও ইউরোপের ফুটবলে আলো ছড়াতে শুরু করেছেন এক বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তরুণ। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র ইউরোপে এ দেশের কারো খেলা এই প্রথম। যেখানে মেসি, রোনালদো, সালাহরা খেলেন সেই ইউরোপের পেশাদার ফুটবলে কারো পরিচয় বাংলাদেশী হিসেবে পাওয়া গেলে সেটি আমাদের জন্য গর্বেরই। সেই তরুণ ফুটবলারের নাম হামজা দেওয়ান চৌধুরী। মাথা ভর্তি ঝাকড়া চুলের এক মিডফিল্ডার যখন বিশ্বের বাঘা বাঘা ফুটবলারদের সাথে বল দখলের লড়াইয়ে নামে তখন তাকে দেখে নিশ্চয়ই বাড়তি একটা ভালো লাগা কাজ করে বাংলাদেশী দর্শকদের মাঝে।
তিনিই প্রথম বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত, যিনি সুযোগ করে নিয়েছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা কোনও ক্লাবে। পেশাদার ফুটবলের সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ আসরগুলোর একটি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ। সেখানে লেস্টার সিটির হয়ে খেলছেন মিডফিল্ডার হামজা দেওয়ান চৌধুরী।
তার আগে বলে নেই এই তরুণের পরিচয় সম্পর্কে। ১৯৯৭ সালে পহেলা অক্টোবর ইংল্যান্ডের লাফবারা শহরে জন্ম হামজার। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সূত্রে জানা যায়, তার মা বাংলাদেশী ও বাবা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দ্বীপ দেশ গ্রানাডার। এই দম্পতির বসবাস ছিল ইংল্যান্ডে। তবে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর হামজার মা রাফিয়া চৌধুরী আবার বিয়ে করেন বাংলাদেশী ব্রিটিশ নাগরিক দেওয়ান গোলাম মোর্শেদ চৌধুরীকে। এই পরিবারেই বেড়ে ওঠা হামজার। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে সবার বড় হামজা। সৎ বাবা ও মা দু’জনের বাড়িই হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলায়। ইংল্যান্ডে জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও বাংলাদেশী সংস্কৃতির সাথে পুরোপুরি পরিচিত হামজা। বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারেন। অবশ্য প্রমিত বাংলার চেয়ে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেই হামজা বেশি অভ্যস্ত। কারণ পরিবারে সেই ভাষাটির চর্চাই বেশি। ঢাকার একটি পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘২০ বারের বেশি বাংলাদেশে গেছি। গ্রামে কাদার মধ্যে ফুটবল খেলেছি। ইংল্যান্ডে নিজের বাড়িতে সব সময় বাংলাতেই কথা বলি।’
গত কয়েক বছর ধরে শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে ব্যস্ততার কারণে দেশে আসার সুযোগ এখন কমই পান হামজা। তবে এক সময় প্রতি বছরই বেড়াতে আসতেন মাতৃভূমি বাংলাদেশে।
ব্রিটিশ মুল্লুকে বাংলাদেশীদের অগ্রযাত্রার পথে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করা হাজমা নিজের বাংলাদেশী শেকড় নিয়ে গর্ববোধ করেন। সব সময়ই বলেন- আমার বাবা-মা দু’জনেই বাংলাদেশী। যে কারণে পাশ্চাত্য ফুটবলের রঙিন দুনিয়ায় বাংলাদেশের নামটিও বারবার উচ্চারিত হচ্ছে।
ছোটবেলা থেকেই বেশ দুরন্ত স্বভাবের হামজার ঝোঁক ছিল ফুটবলের প্রতি। যে কারণে চার বছর বয়স থেকেই ফুটবল খেলতে নিয়ে যেতেন মা। পাঁচ বছর বয়সে তাকে লাফবারা ফুটবল ক্লাবে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলে শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক ফুটবল চর্চা। ছয় বছর বয়সে এক ম্যাচ খেলতে গিয়ে নটিংহাম ফরেস্টে ক্লাবের কর্মকর্তাদের চোখে পড়েন হামজা। কয়েক দিন পর বিখ্যাত ক্লাব লেস্টার সিটির কর্মকর্তারাও আগ্রহ দেখান তার ব্যাপারে। উভয় দলের আগ্রহ থাকলেও লেস্টার সিটির অ্যাকাডেমিতে হামজাকে ভর্তি করায় পরিবার। তার জন্যই পুরো পরিবার চলে যায় লেস্টার শহরে। স্কুল ছুটির পর সপ্তাহে দুইদিন প্রশিক্ষণ আর শনি ও রোববার খেলতেন ম্যাচ। শুরু হয় এক শিশু ফুটবলারের বেড়ে ওঠা।
২০১৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ইএফএল কাপের ম্যাচ দিয়ে লেস্টার সিটির হয়ে লিভারপুলের বিপক্ষে অভিষেক হয় তার পেশাদার ফুটবলে। একই বছর ২৮ নভেম্বর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে টটেনহাম হটস্পারের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে অভিষেক। এরপর লেস্টার সিটির অনূর্ধ্ব-২৩ দলের অধিনায়কও হয়েছেন।
ক্লাবের হয়ে কয়েকটি ম্যাচ খেলেই ইংল্যান্ড ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নজর কাড়েন। যার ফলস্বরূপ ডাক আসে ইংল্যান্ডের জার্সিতে খেলার। ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে প্রথমবারের মতো মাঠে নামেন। চীনের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ২-১ গোলে জয় পেয়েছিল তার দল। এরপর থেকে এই দলের নিয়মিত সদস্য হামজা। গত জুনে ইতালিতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে একাদশে ছিলেন নিয়মিত। বয়সভিত্তিক দলে মিডফিল্ডার হিসেবে আস্থা অর্জন করায় হয়তো ইংল্যান্ড জাতীয় দলের ডাক আসবে যে কোন দিন।
২০১৬ সালে হামজাকে বারটন এলবিওন নামের একটি ক্লাবে ধারে খেলতে পাঠিয়েছিল তার ক্লাব। সেখানেও দারুণ করেছেন। দুই মৌসুম খেলে আবার ফিরেছেন নিজের ক্লাবে। এখন তার একটাই লক্ষ্য ক্লাবে ভালো করে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলা। ইংল্যান্ডের হয়ে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নটা পুষে রেখেছেন মনের কোণে। বয়স মাত্র ২২, সামনে রয়েছে লম্বা ক্যারিয়ার। তাই হামজা অনেক দূর যাবেন বলেই বিশ্বাস সবার।
ব্রিটিশ মুল্লুকে বড় হলেও হামজা যে বাংলাদেশকে মনে প্রাণে ধারণ করেন সে কথা ওপরেই বলেছি। এবার আরেকটু প্রমাণ দেই। গত বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল যখন ইংল্যান্ডে খেলতে গেল, হামজা তখন ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে ইতালিতে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে ব্যস্ত; কিন্তু সেখান থেকেই হামজা তার বাবার জন্য অনলাইনে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের টিকিট পাঠান বাবা দিবসের উপহার হিসেবে। নিজেও খোঁজ খবর রাখেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের। সাকিব আল হাসান আর মুশফিকুর রহীমের ভক্ত হামজা। সুযোগ পেলেই ইউটিউবে খুঁজে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ফুটবল ম্যাচও দেখেন।
ব্যক্তিগত জীবনে এক কন্যা সন্তানের জনক হামজা। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা পেয়েছেন ধর্ম চর্চার। শিখেছেন কোরআন পড়া। এক সাক্ষাৎকারে বিবিসিকে হামজা বলেছেন, ‘আমি ড্রেসিং রুম থেকে বের হওয়ার সময় আয়াতুল কুরসি পড়ি, আরো ছোট ছোট কিছু দোয়া পড়ি যেগুলো আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন।’
এ দেশে জন্ম না নিলেও বাংলাদেশকে নিজের দেশ বলে মনে করা হামজা ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্ব ফুটবলে খেললে বাংলাদেশী হিসেবে আমাদের জন্য অবশ্যই সেটি হবে গর্বের বিষয়।

SHARE

Leave a Reply