Home দেশ-মহাদেশ মেগা বৈচিত্র্যের দেশ ফিলিপাইন – মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

মেগা বৈচিত্র্যের দেশ ফিলিপাইন – মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

ফিলিপাইনকে সরকারিভাবে ফিলিপাইন প্রজাতন্ত্র এবং তাগালোগ ভাষায় পিলিপিনাস্ বলা হয়। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপপুঞ্জ রাষ্ট্র। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে এটি অবস্থিত। ফিলিপাইন ৭,৬৪১টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। এগুলোর মধ্যে ১১টি বড় দ্বীপ দেশটির মোট আয়তনের ৯৪ শতাংশ। মোট আয়তন ৩ লাখ বর্গকিলোমিটার (১ লাখ ২০ হাজার বর্গমাইল)। ফিলিপাইনের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটি ৫৮ লাখ ৯৩ হাজার ৩৮১ জন।
এ দেশের দ্বীপগুলোতে নানা জাতিগত গ্রুপের লোকজন ও সংস্কৃতি দেখতে পাওয়া যায়। জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ভিসায়ান ৩২.৯ শতাংশ, তাগালগ ২৯.৫ শতাংশ, মরো ১০.১ শতাংশ, ইলোকানো ১০ শতাংশ, বিকোলানো ৫.৮ শতাংশ, কাপামপাংগান ২.৮ শতাংশ, ইগোরত ১.৬ শতাংশ, পাঙ্গাসিনিজ ১.৫ শতাংশ, চীনা ১.৫ শতাংশ এবং অন্যান্য ৩.৩ শতাংশ। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে খ্রিষ্টান ৯১.৩ শতাংশ, মুসলিম ৫.৫ শতাংশ এবং অন্যান্য ৩.২ শতাংশ। ফিলিপাইনের নাগরিকদের ফিলিপিনো বলা হয়।
তাগালগ ভাষা ও ইংরেজি ভাষা ফিলিপাইনের সরকারি ভাষা। তাগালগ ভাষা ফিলিপাইনের প্রায় ৪০ শতাংশ লোকের মাতৃভাষা। প্রায় ৫০ শতাংশ লোক দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে পারে। এ ছাড়া ফিলিপাইনে প্রায় ১০০টি স্থানীয় ভাষা প্রচলিত; এগুলোর অনেকগুলোর একাধিক আঞ্চলিক উপভাষা আছে। এদের মধ্যে সেবুয়ানো ভাষা (প্রায় ২৫%), ইলোকানো ভাষা (প্রায় ১১%), হিলিগেনন ভাষা (প্রায় ১০%), এবং বিকোলানো ভাষা (প্রায় ৭%) উল্লেখযোগ্য। ফিলিপাইনের প্রায় আড়াই লাখ লোক যেকোনো একটি স্পেনীয় ভাষাভিত্তিক ক্রেওল ভাষায় কথা বলে; এদের মধ্যে চাভাকানো ক্রেওল ভাষাটি উল্লেখযোগ্য। ৫ লক্ষেরও বেশি লোক চীনা ভাষায় কথা বলে। তাগালগ ভাষা ও ইংরেজি ভাষা ফিলিপাইনের সার্বজনীন ভাষা বা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা। আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়।
স্পেনের এককালের রাজা ফিলিপ দ্বিতীয় এর নাম অনুসারে ফিলিপাইনের নামকরণ করা হয়। স্পেনিশ অভিযাত্রী রুই লোপেজ ডিভিলালোবস তার ১৫৪২ সালের অভিযানে তদানীন্তন প্রিন্স অব অস্ট্রিয়াসের নামানুসারে লেইতে ও সামার দ্বীপের নামকরণ করেন ফিলিপিনাস। পরবর্তীতে এই দ্বীপপুঞ্জের সকল দ্বীপের সম্মিলিত নাম দাঁড়ায় ফিলিপাইন প্রজাতন্ত্র।
ফিলিপাইনকে উত্তর থেকে দক্ষিণে তিনটি প্রধান ভৌগোলিক ভাগে বিভক্ত করা হয়ে থাকে। সেগুলো হলো লুজন, ভিসায়াস ও মিন্দানাও। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা এবং সবচেয়ে জনবহুল নগরী কুয়েজন সিটি। উভয়ই মেট্রো ম্যানিলার অংশ। পশ্চিমে দক্ষিণ চীন সাগর, পূর্বে ফিলিপাইন সাগর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে সেলেবেস সাগর পরিবেষ্টিত ফিলিপাইনের উত্তরে তাইওয়ান, উত্তর-পূর্বে জাপান, পশ্চিমে ভিয়েতনাম, পূর্বে পালাউ এবং দক্ষিণে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সাথে সমুদ্রসীমা রয়েছে।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মুসলিম অধ্যুষিত মিন্দানাও বর্তমানে বাংসামোরো স্বশাসিত অঞ্চল নামে পরিচিত। বাংসামোরোর অবস্থান দক্ষিণ ফিলিপাইনের দক্ষিণ অংশে। ২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারি ভোটের মাধ্যমে আইন পাস করে মুসলিম মিন্দানাও স্বশাসিত অঞ্চল নামটি পরিবর্তন করে মুসলিম মিন্দানাও বাংসামোরো স্বশাসিত অঞ্চল করা হয়। বাংসামরোর এই মর্যাদা অর্জনের একমাত্র কারণ এ অঞ্চল পুরো ফিলিপাইনে মুসলিম সমৃদ্ধ অঞ্চল। বাংসামরোর বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ ইবরাহিম।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয়ে এবং নিরক্ষরেখার কাছাকাছি ফিলিপাইনের অবস্থান হওয়ায় দেশটিতে ভূমিকম্প ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা রয়েছে। তবে দেশটিতে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বিশ্বের কিছু প্রধান জীববৈচিত্র্য রয়েছে। ফিলিপাইন বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দ্বীপরাষ্ট্র। ২০১৮ সালে দেশটি এশিয়ার অষ্টম জনবহুল দেশ এবং বিশ্বের দ্বাদশ জনবহুল দেশ হিসেবে সাব্যস্ত হয়।
ফিলিপাইনের আদি অধিবাসী নেগ্রিতো জাতির লোকেরা প্রায় ৩০ হাজার বছর আগে বোর্নিও ও সুমাত্রা দ্বীপ থেকে এখানে এসেছিল। এরপর দক্ষিণ থেকে মালয় জাতির লোকেরাও এখানে আসা শুরু করে। মালয়রা এখানে বারাংগে নামে পরিচিত। ৯ম শতকে চীনা ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন ও বসতি স্থাপন করেন। কখনও কখনও আরবদের জাহাজও এখানে ভিড়তো এবং ফিলিপাইনের দক্ষিণে এরাই ইসলামের প্রচলন করে। তবে ১৬শ শতকে স্পেনীয়দের আগমনের আগে মালয়রাই ছিল ফিলিপাইনের প্রধান জাতি।
পর্তুগিজ অভিযাত্রী ফের্দিনান্দ মাগেলান ১৫২১ সালে ফিলিপাইনে পৌঁছান এবং স্পেনের হয়ে দ্বীপটি দাবি করেন। কিন্তু তিনি এখানে বেশিদিন ছিলেন না। পরবর্তীতে স্পেনীয় শক্তি এখানে ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে এবং খ্রিষ্টধর্মের পত্তন ঘটায়।
১৮১০ সালে মেক্সিকো স্পেন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণার আগ পর্যন্ত ফিলিপাইনের দ্বীপগুলো স্পেনীয় উত্তর আমেরিকার অধীনে ছিল এবং ফিলিপাইন ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে যাতায়াত বিদ্যমান ছিল। লুসন দ্বীপের ম্যানিলা শহরকে কেন্দ্র করে স্পেনীয় ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং লোকজন গণহারে রোমান ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে শুরু করে। তবে কেন্দ্রীয় ফিলিপাইন ও লুসনের বাইরে, যেমন মিন্দানাও দ্বীপে স্পেনীয় প্রভাব ছিল কম।
দীর্ঘ স্পেনীয় শাসনের সময় বহু বিপ্লব ঘটে। ১৯ শ’ শতকের শেষের দিকে ইউরোপে শিক্ষিত ফিলিপিনোরা স্পেনীয় শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে থাকে এবং ফিলিপিনোদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। ১৮৯৮ সালে স্পেনীয়-মার্কিন যুদ্ধে মার্কিনিরা ম্যানিলা উপসাগরে স্পেনীয় নৌবহরকে পরাজিত করে। চীনা-বংশোদ্ভূত ফিলিপিনো নেতা এমিলিও আগিনালদো ঐ বছরের ১২ জুন ফিলিপাইনকে স্পেন থেকে স্বাধীন ঘোষণা করেন।
স্পেনীয়দের পরাজিত করার পর মার্কিনিরা ফিলিপাইনের দখল নেয়। স্পেন প্যারিস শান্তি চুক্তিতে দ্বীপগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে দেয়। কিন্তু ১৮৯৯ সালেই মার্কিন শাসনের বিরুদ্ধে ফিলিপিনোরা বিদ্রোহ শুরু করে দেয়। তিন বছর বিক্ষিপ্ত মার্কিন-ফিলিপিনো যুদ্ধে বহু হাজার ফিলিপিনো ও মার্কিন সেনা নিহত হয়। ১৯০২ সাল নাগাদ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
ফিলিপাইনের রাজনীতি একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত বহুদলীয় প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংগঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি একাধারে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রধান। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের ওপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং দ্বিকাক্ষিক আইনসভা উভয়ের ওপর ন্যস্ত। ফিলিপাইনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তে। ফিলিপাইনের দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট বা আইনসভার নাম কংগ্রেস: উচ্চকক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদ ও সিনেটের মেয়াদ ছয় বছর এবং প্রতিনিধি পরিষদের মেয়াদ তিন বছর।
ফিলিপাইনের প্রশাসনিক এলাকা তিনটি দ্বীপ গ্রুপে বিভক্ত। সেগুলো হলো লুজন, ভিসায়াস ও মিন্দানাও। এগুলো আবার ১৭টি অঞ্চল, ৮১টি প্রদেশ, ১৪৫টি নগরী, ১ হাজার ৪৮৯টি পৌরসভা এবং ৪২ হাজার ৩৬টি বাঙ্গায়ে বিভক্ত। এ দেশের ১০টি প্রধান জনবহুল অঞ্চল হলো কালাবারজন, জাতীয় রাজধানী অঞ্চল, সেন্ট্রাল লুজন, সেন্ট্রাল ভিসায়াস, বিকোল অঞ্চল, ইলোকস অঞ্চল, ডাভাও অঞ্চল, উত্তর মিন্দানাও, সকসসারজেন ও পশ্চিম ভিসায়াস।
ফিলিপাইনের পার্বত্য দ্বীপগুলোর বেশির ভাগ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বৃষ্টিবিধৌত জঙ্গলে আবৃত এবং আদিতে আগ্নেয়গিরি। সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট আপো। সমুদ্র স্তর থেকে এর উচ্চতা ২,৯৫৪ মিটার (৯,৬৯২ ফুট) এবং পর্বতটি মিন্দানাও দ্বীপে অবস্থিত। ফিলিপাইন ট্রেঞ্চের গালাথিয়া ডেপথ হচ্ছে দেশটির সবচেয়ে গভীরতম স্থান এবং বিশ্বের তৃতীয় গভীরতম স্থান। ট্রেঞ্চটি ফিলিপাইন সাগরে অবস্থিত।
ফিলিপাইনের দীর্ঘতম নদী হলো উত্তর লুজনের কাগাইয়ান নদী। ম্যানিলা উপসাগর (যার উপকূলে রাজধানী ম্যানিলা নগরী অবস্থিত) পাসিগ নদীর মাধ্যমে ফিলিপাইনের বৃহত্তম হ্রদ লেগুনা ডি বে’র সাথে যুক্ত। সুবিক বে, ডাভাও গালফ ও মরো গালফ হলো ফিলিপাইনের অপর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপসাগর।
ফিলিপাইনে অনেক সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে, যেমন মেয়ন ভলকানো, মাউন্ট পিনাটুবো ও তায়াল ভলকানো। আগ্নেয়গিরি প্রকৃতির দ্বীপগুলোর দরুন এ দেশে খনিজদ্রব্যের মজুদ অঢেল। দক্ষিণ আফ্রিকার পর এ দেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বর্ণের মজুদ আছে বলে নির্ণয় করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বের মধ্যে এ দেশে অন্যতম বৃহত্তম তামার মজুদ রয়েছে। তাছাড়া ফিলিপাইনে প্লাটিনামের বৃহত্তম মজুদ পাওয়া গেছে। এ দেশের রমব্লোন দ্বীপে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়, উচ্চ মান এবং সবচেয়ে কঠিন ও সাত রঙের মার্বেল পাথর পাওয়া গেছে। যেমন বাদামি, ধূসর, মরিচা রঙ, সাদা, সবুজ, কালো ও কমলা। এ দেশের মুদ্রার নাম পেসো।
ফিলিপাইনের বৃষ্টিবিধৌত জঙ্গলগুলো এবং এর বিস্তীর্ণ উপকূল রেখা বিচিত্র সব উদ্ভিদ, পাখি, জীবজন্তু ও সামুদ্রিক প্রাণীর আদর্শ আবাসস্থল। ফিলিপাইন জীববিদ্যাগতভাবে বিশ্বের দশটি মেগাবৈচিত্র্যের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ফিলিপাইনে ১১শ’ প্রজাতির স্থল মেরুদণ্ডী প্রাণী পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে শতাধিক স্তন্যপায়ী প্রজাতি এবং ১৭০ পাখি প্রজাতি শুধুমাত্র এ দেশেই পাওয়া যায়। স্থানীয় স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলোর মধ্যে রয়েছে পাম সিভেট ক্যাট, ডুগং, ক্লাউড ব্যাট ও ফিলিপাইন টারসিয়ার (ক্ষুদ্র বানর) শুধুমাত্র বোহল দ্বীপেই পাওয়া যায়।
ফিলিপাইনে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সামুদ্রিক আবহাওয়া বিরাজ করে। অর্থাৎ এখানকার আবহাওয়া গরম ও আর্দ্র। এ দেশে ঋতু তিনটি : মার্চ থেকে মে পর্যন্ত গরম শুষ্ক গ্রীষ্মকাল, জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বর্ষাকাল এবং ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঠাণ্ডা শুষ্ক শীতকাল। তাপমাত্রা সাধারণত ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে।
ভ্রমণ ও পর্যটন খাত এ দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখে থাকে। সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য পর্যটনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সৈকত, পর্বত, বৃষ্টিবিধৌত জঙ্গল, দ্বীপ ও ডাইভিং স্পট হলো সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটক গন্তব্য। ঝলমলে সাদা বালির সৈকত সমৃদ্ধ বোরাকে দ্বীপ বিশ্বের সেরা দ্বীপ হিসেবে গণ্য।

SHARE

Leave a Reply