Home ভ্রমণ অপরূপ লোভাছড়া – রুমান হাফিজ

অপরূপ লোভাছড়া – রুমান হাফিজ

বিদেশের কোনো স্থান নয়, এটি সিলেটের লোভাছড়া। নীলাকাশে সাদা বকের ওড়াড়ড়ি। ঢেউয়ের দোলায় ছন্দময় দুলুনি। চোখ জুড়ানো সবুজের আস্ফালন। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা বিশুদ্ধ হাওয়া। সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লক্ষ্মীপ্রসাদ ইউনিয়নে অবস্থিত এক মনোহরিণী স্থান লোভাছড়া।
মূলত লোভাছড়া চা বাগানই নাম এটির। আর এই চা বাগানের সূত্র ধরেই পুরো একটা বিশাল এলাকার নাম হয়েছে লোভাছড়া। দেখলে মনে হবে বিদেশের কোনো স্থানেই ভ্রমণে বেরিয়েছেন। কিন্তু না, সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটের লোভাছড়া। যেখানে মিশে আছে পাহাড়, মেঘ আর আকাশ! নদীর স্রোতে ইঞ্জিনহীন ডিঙ্গি নৌকার ভেসে চলা কিংবা পাথর নিয়ে গন্তব্যে ছুটে চলা বিশালাকারের স্টিমার, সেই সঙ্গে স্টিমারকে ঘর-বাড়ি বানিয়ে ফেলা শ্রমিকদের জীবনচিত্র সবকিছু দেখে মুগ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো পথই থাকে না! বড় বড় স্টিমারের ছুটে চলার পথ বেয়ে নদীজলের আস্ফালন, বিশাল সব ঢেউ বুকে অদ্ভুত শিহরণ বইয়ে দেয়।
সিলেট থেকে বাসে বা সিএনজিতে কানাইঘাট পৌঁছে সেখান থেকে সুরমা নদীর বুক চিরে নৌকাযোগে যেতে হয় লোভাছড়ায়। আর নৌকায় ওঠার পর থেকেই শুরু হয় নাগরিক কোলাহলমুক্ত, বিষের বাতাসমুক্ত ও যান্ত্রিকতার দাবানল ছাড়া স্নিগ্ধ সুশোভিত এক নতুন পথচলা।
নৌকা চলার কয়েক মিনিট পরেই যে কেউ হারিয়ে যাবে নিজস্বতা থেকে। নৌকার ঝাঁকুনি, ঢেউয়ের সঙ্গে অবাক ছন্দে ওপর-নিচ দোল খাওয়া, সীমাহীন আকাশের ক্ষণে ক্ষণে রূপ পাল্টানো রং, ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা বকের দলের হাওয়ার সঙ্গে ওড়াউড়ি এ সবকিছুই যে কাউকে নিজের অজান্তেই টেনে নিয়ে যাবে ভাবনার অন্য এক জগতে। নদীপাড়ের মানুষের জীবনচিত্র দেখতে দেখতে আপনি কখন পৌঁছে যাবেন কাক্সিক্ষত লোভাছড়ায়, সেটা টেরই পাবেন না। ভাবছেন, এত চমৎকার সব দৃশ্য অবলোকনের পর লোভাছড়ার আর কিইবা দেখবা? হুম, দেখার অনেক কিছুই আছে!
লোভাছড়ার যেখানে গিয়ে আপনার নৌকা থামবে, সে জায়গাতেই নদীর পাথুরে পাড় দেখে আপনি বিস্ময়ে হতবাক হবেন নিশ্চয়। আর পাশেই চারদিকে বিশালাকারের ডালপালা নিয়ে স্বগর্বে দণ্ডায়মান বটবৃক্ষকে ঘিরে চা শ্রমিকদের চা-পাতা নিয়ে কাজকর্ম দেখতে গিয়ে আপনি থমকে যাবেন নিশ্চিত বলা চলে! এরপর দু-তিন মিনিট হাঁটলেই হারিয়ে যাবেন সবুজ নিসর্গের মধ্যে।
হাঁটতে হাঁটতেই চোখে পড়বে লোভাছড়ার বাসিন্দাদের অদ্ভুত নির্মাণশৈলীর ছোট ছোট কুটির। কুটির থেকেই চেয়ে থাকা ছোট্ট শিশু-কিশোরদের মায়াবী চাহনি দেখে আপনার মনে হবে এমন চাহনি কতদিন যে দেখিনি!
চারপাশের মনমাতানো সবুজের শ্যামলীমায় মুগ্ধ হয়ে আপনি হাঁটছেন ক্লান্তিহীনভাবে। হঠাৎ করেই থমকে যাবেন, এ কি! রাঙ্গামাটিতে চলে এলাম নাকি! আপনার এই বিস্ময়ের কারণ, রাঙ্গামাটির মতোই একটি ঝুলন্ত ব্রিজ রয়েছে এই লোভাছড়ায়! আপনি আরও বিস্মিত হবেন, যখন দেখবেন ব্রিজটির গায়ে খোদাই করে লেখা রয়েছে ‘ব্রিজটি নির্মিত হয় ১৯২৫ সালের এপ্রিল মাসে!’
তিন টন ধারণ ক্ষমতাস¤পন্ন এই ঝুলন্ত ব্রিজ আপনাকে ঘোরের মধ্যে ফেলবে যে, সেই আমলে এই বনভূমিতে তিন টন ধারণক্ষমতার কোনো যানবাহন চলত? কারা বসবাস করত এখানে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আপনাকে ইতিহাসের আশ্রয় নেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।

যেভাবে যাবেন

দেশের যেকোনো জায়গা থেকেই সিলেট এসে বাসে করে যাওয়া যাবে কানাইঘাট। ভাড়া ৬০ টাকা অথবা সিলেট থেকে সিএনজি রিজার্ভ করেও যাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে ভাড়া নেবে ৬০০ টাকার মতো।
কানাইঘাট থেকে নৌকায় লোভাছড়ায় যেতে জনপ্রতি ভাড়া নেবে ৩০-৪০ টাকা। চাইলে রিজার্ভ নৌকাও নিতে পারেন।

SHARE

Leave a Reply