Home উপন্যাস ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস জীবনযুদ্ধের গল্প – দেলোয়ার হোসেন

জীবনযুদ্ধের গল্প – দেলোয়ার হোসেন

আর কোনো উপায় না দেখে মায়ের ঘরে তালাবিহীন টিনের বাক্সটার ওপর চোখ পড়লো আমার। সেখানে যে কিছু পাওয়া যাবে না, তা বুঝেও দ্রুত পুরনো কাপড়-চোপড় উল্টাতে লাগলাম। আর মনের মধ্যে এই বিশ্বাস প্রবল করে তুললাম যে, ‘যেখানেই দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই-পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন’।
আমার অবশ্য অমূল্য রতন চাই না। যদি পঞ্চাশ অথবা পঁচিশটা টাকাও মিলে যায়, তাহলেই আমার দেশান্তরি হতে আর বাধা থাকবে না।
জানি না আল্লাহর কী শান, পঞ্চাশ নয় পঁচিশ নয়, পেয়ে গেলাম তিনটা দশ টাকার নোট। তাই সম্বল করে এমনভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম যেনো কেউ বুঝতে না পারে যে, আমি দেশান্তরি হতে চলেছি।
বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি গিয়ে দৌড়ে চলন্ত বাসে উঠে পড়লাম। লক্কড়-ঝক্কড় বাস। হাঁপানি রোগীর মতো দম টেনে টেনে চলে। এর মধ্যেই এক বন্ধু কিভাবে আমাকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে বললো, এই সালু, কই যাস? আমিও বললাম, আইতাছি।
আমার কথাটা বন্ধুর কান পর্যন্ত গেলো কি-না জানি না। তবে, বাসের হেলপার শুনলেও শুনতে পারে। তারপর বড় রাস্তায় গিয়ে আবার বাস বদল। শেষে গোয়ালন্দ ঘাটে পৌঁছে ভাবতে লাগলাম, এই টাকায় ঢাকা পৌঁছাতে পারবো তো! মনের মধ্যে তখন আর কোনো ভাবনা নেই। শুধু ঢাকা পৌঁছাবার ভাবনা। তার ওপর এই আমার প্রথম ঢাকা যাত্রা। মনের মধ্যে সাহস এনে ভাবছি, পথে যখন বেরিয়েছি, তখন যা হয় হবে।
হঠাৎ কানে এলো, আরে সালু নানা, কই যাবা?
আমি চমকে উঠে ঘাড় ফিরিয়ে দেখি কুদ্দুস। এই কুদ্দুস ছোটবেলা থেকেই ঢাকা খুলনা যশোর চষে বেড়ায়। দিলখোলা ছেলে। আমার চেয়ে দু-এক বছরের বড়। গ্রামের সব মানুষই লতা-পাতার মতো একে অপরের আত্মীয়। কখনো আবার সম্পর্ক পাল্টে যায় নতুন নতুন আত্মীয়তার সুবাদে। আমি সম্পর্কের অ্যালজাবরা বুঝি না। তবে, কুদ্দুস আর আমি একে অপরকে নানা বলে ডাকি।
যাহোক, কুদ্দুস নানাকে পেয়ে আমার শুকিয়ে যাওয়া বুকটা যেনো আবার রসালো হয়ে উঠলো।
সে বললো, নানা কি ঢাকা যাবা?
হ্যাঁ- তুমি?
আমি তো এখন ঢাকাতেই থাকি।
তোমার সাথে দেখা হয়ে কি যে ভালো লাগছে আমার। একা না বোকা, তার ওপর এই আমার প্রথম ঢাকা যাত্রা।
বাদ দাও ওসব। দেখা যখন হয়েই গেলো তখন আর চিন্তা কি। তা-তুমি যে ঢাকা যাচ্ছো বাড়ির মানুষ জানে?
আমি সহসা নানার কথার উত্তর দিতে পারলাম না। সে বললো, বুঝেছি, চিন্তা করো না। চলো চা খাই।
চরের ওপর সারি সারি ভাতের হোটেল, চায়ের দোকান। প্রত্যেকটা দোকানের সামনে একটা করে ছেলে টিয়া পাখির মতো মাথা ঠুকে বলছে, স্যার আসুন এই হোটেলে আসুন। টাটকা গরম ভাত খান। কুদ্দুস নানা কাউকে পাত্তা না দিয়ে ঢুকে পড়লো এক হোটেলে। চা খেতে খেতে ভাবতে লাগলাম, কথাটা তো ঠিকই। আল্লাহ্ বলেছেন, তুমি যদি এক পা আগাও, আমি তোমাকে দু’পা এগিয়ে দেবো। তা ছাড়া কিসে যে কী হয়, অতো কি আর আমরা বুঝি।
হঠাৎ স্টিমারের শব্দ শুনে দৌড়ে গেলাম ঘাটে। একে একে গাড়ি নামলো গাড়ি উঠলো। আমরাও এ সিঁড়ি সে সিঁড়ি করে একেবারে স্টিমারের ডেক-এ গিয়ে বসলাম। কথায় কথায় নানা বললো, নানা তোমার ঘটনাটা একবার কও দেখি।
আমি বললাম, ঘটনা কি সত্যি শুনতে চাও?
বলো- শুনতে শুনতে যাই।
জানোই তো এইচএসসি ফেল করা গ্রুপের মধ্যে আমিও একজন। যাদের ডাহা ফেল করার কথা, তারা দিব্বি পাস করে গেলো। তাদের শত দোষের একটির কথাও এখন আর কেউ বলছে না। আমি ভালোভাবে পাস করবো এটাই ছিলো সবার ধারণা। অথচ আমি ফেল করলাম, আর সবার চোখে খারাপ হয়ে গেলাম। এখন টাকা পয়সাও নেই যে, আবার পরীক্ষা দেবো। তবুও চেষ্টা চলছিলো।
এর মধ্যেই ঘটলো এক ঘটনা। হঠাৎ রাত দুপুরে আমার জানালায় টোকার শব্দ শুনে কান খাড়া করলাম। আমি চুপ করেই আছি। আবার টোকার শব্দ! এবার বললাম- কে?
বাইরে থেকে খুব চাপা স্বরে কেউ বললো, কাকা দরজা খোলো।
তুই- কে?
আমি কওসার।
কী ব্যাপার?
আগে দরজা খোলো।
কওসার ভিতরে এসে কোনো কথা না বাড়ায়ে বললো, কাকা চলো কারিগর পাড়া যাই। আমি অবাক হয়ে বললাম, এতো রাতে কারিগর পাড়া কেনো?
চলো মুরগি নিয়ে আসি।
আমি বললাম, কওসার, এমনিতেই মন ভালো নেই। এখন আর চুরি-ফুরি করতে যাবো নারে। তুই বাড়ি যা। কওসার বললো, ফেল করেছো তাতে কী হয়েছে? ভালো ছাত্ররা কি কখনো ফেল করে না! তুমি চলো। ভাবনা-চিন্তা বাদ দাও। সামনে আবার পরীক্ষা দাও।
কওসার আমাকে এক রকম জোর করে নিয়ে যেতে যেতে বললো, যা করার আমিই করবো। তুমি শুধু আমার সঙ্গে থাকবা। একা কি মুরগি জবাই করা যায়? হারাম হয়ে যাবে না!
এখন তো চারদিকেই পানি। তার ওপর অন্ধকার রাত। রাতে বৃষ্টিও হয়েছিলো। অবশ্য কওসার আগেই দেখে এসেছে, কোন জায়গায় রহমান কারিগরের মুরগির ঘর। আমি রাস্তার ওপর বসলাম। কওসার হাঁটু পানি ভেঙে রহমানের বাড়ির পিছনে আম বাগানে ঢুকলো। কিছুক্ষণ পর কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। তারপর আবার চুপচাপ। প্রায় দশ মিনিট যেতে না যেতেই মুরগির কক্ কক্ আর কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুরু হলো। কওসার মুরগি নিয়েই লাফায়ে পড়লো পানির মধ্যে। তখন রহমান কারিগরও চোর চোর বলে চিল্লায়ে পাড়া মাথায় করলো।
মানুষের কেমন স্বভাব দেখো, মানুষ হোক, শিয়াল হোক আর বাঘই হোক, সে সব না জেনে শুনেই চোর চোর বলে চিৎকার করতে শুরু করে। যদি শিয়াল বা বাঘের কথা বলে, তা হলে কেউ আর ঘর থেকে বের হবে না। যাহোক, আমি রাস্তার ওপর যেখানে বসে ছিলাম, তার আগে-পিছে দুদিকেই বাড়ি। শুধু পশ্চিমে ধানের মাঠ। সেখানেও জায়গায় জায়গায় হাঁটু পানি। ব্যাপার সুবিধার নয় ভেবে আমি শুকনা রাস্তা থেকে নেমে পড়লাম ধানের মাঠে। নেমেই মাটিকাটা খাদের মধ্যে চুবনি খেলাম। একবার শুধু কানে এলো, কাকা পালাও।
রাগে তখন আমার সারা শরীর জ্বলছে। মনে মনে বললাম, আরে বেটা, আমি কি তোর কথা মতো পালাবো? ধানক্ষেতের ভিতর দিয়ে ছুটছি আর ধানের গোছায় পা আটকে পানি-কাদার মধ্যে পড়ছি বারবার। হঠাৎ ভাবলাম, এ আমি কোথায় যাচ্ছি! এটা তো কালা পেতনীর জুলি। তা হলে কি পেতনীই বারবার আমার পা টেনে ধরে কাদা-পানির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে! কওসার গেলো কোন দিকে? এই শয়তানটা আমারে ডুবাবে আজ।
শেষে ঠিক করলাম, কলুর খাল দিয়ে রাস্তায় উঠে পড়ি। মানুষের তো আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই যে, এই মেঘলা রাতে পানি ঝাঁপায়ে আসবে মুরগি চোর ধরতে। একটু পরই গুরুগুরু করে ডেকে উঠলো মেঘ। বৃষ্টিও শুরু হলো। এবার নিশ্চিন্ত হলাম যে-এখন আর কেউ ঘর থেকে বের হবে না।
তুমি তো জানোই খালের দু’দিকে দুটো পড়ো ভিটে। পুরনো বড় বড় গাছ আর লতাপাতায় ছাওয়া। দিনের বেলাতেই গা কেমন ছম্ছম্ করে। চোখ-কান বুজে কোনো রকমভাবে রাস্তায় এলাম। কিন্তু কালীবাড়ির ঐ বুড়ো বটগাছের কথা মনে হতেই পা থেকে মাথা পর্যন্ত শিরশির করে উঠলো। শুনেছি অন্ধকার রাতে মানুষের সাড়া পেলেই গড়গড়ি ভূত তার বৌকে ধরে ঠ্যাংগাতে শুরু করে। তখন পেতনীটা কাঁদতে কাঁদতে বটগাছের নিচে এসে নাকে নাকে বলে, ও মানুষ বিচার করে দাও। তখন গড়গড়ি ভূত রাগে কেবল গড় গড় করতে থাকে।
মাঝখানে কুদ্দুস নানা বলে উঠলো, গড়গড়ি ভূতের কথা আমিও শুনছি।
তাহলেই বোঝ, কী রকম ভয়ানক বিপদের মধ্যে তখন আমি। শেষে ভাবলাম ভয় করে আর লাভ কী, যেতে তো হবেই। তখন ভিজা জামা চিপে মাথার ওপর ছড়ায়ে শুধু চোখ দুটো একটু আলগা রেখে ঝড়ের গতিতে দিলাম দৌড়। খাদের বাঁশ বাগান পার হয়ে মুন্সী দাদার মালদাই আম গাছের নিচে দেখি মাথায় ঘোমটা দিয়ে কে যেনো বসে আছে। আমি থমকে দাঁড়ালাম। ভাবলাম, একি সেই পেতনী? পেতনী আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালো। আমি শক্ত গলায় বললাম, কে?
কওসার হাসতে হাসতে বললো, তোমার জন্য প্রায় এক ঘণ্টা দাঁড়ায়ে আছি। জলদি ধরো, জবাই দিয়ে দেই।
আমি কিছুই বলতে পারলাম না। শক্ত কিছু বলার জন্য মনে মনে তৈরি হচ্ছি। কওসার গামছার ভিতর থেকে দুটো মুরগি বের করে দিলো আমার হাতে। তারপর ছুরি বের করে জবাই করলো।
আমি বললাম, তুই তো আমারে মেরে ফেলার জোগাড় করছিলি। কোন পথে আসলি? কেউ দেখেনি তো?
শালার দুদু চোরা দেখে ফেলেছে।
বলিস কি? দুদু কি কিছু বলেছে?
চোরা দুটো মুরগি দেখে বলে, একটা আমারে দিয়ে যা। একা দুইটা মুরগি কী করবি। আমি বললাম, চোরায় কয় কী। তোর দরকার হয় তুইও নিয়ে আয়। এ মুরগির ভাগীদার আছে।
কেডা।
সলে কাকা।
কওসারের কথা শুনে রাগে আমার ঠাণ্ডা শরীর গরম হয়ে উঠলো। বললাম, এই শয়তানের ডিম, দুদু চোরার কাছে আমার নাম বলতে গেলি কেনো?
কিচ্ছু হবে না। কওসারের সোজা উত্তর।
আমি বললাম, এমনিতেই ফেল করে কারো সামনে যেতে পারি না। তার ওপর…। তুই তো আমারে দেশ ছাড়া করে ছাড়বি। ও বললো, কিচ্ছু হবে না। ঐ দুদু চোরা যদি এ কথা দাঁতের ফাঁস করে তো, ওরে মাটির নিচে পুঁতে ফেলবো না।
কিন্তু দুদু চোরার কাজ দুদু চোরা ঠিকই করলো। সকালে ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হলো আমার। বিছানা ছেড়ে উঠতে না উঠতেই মা এসে বললো, পাস করতে পারিস নে, আবার মুরগি চুরি করতে যাস কোন মুখে?
ব্যস, এতটুকুতেই সব পরিষ্কার হয়ে গেলো আমার কাছে। আমিও বিনা বাক্যে, সুযোগ বুঝে বেরিয়ে পড়লাম। ভাবলাম, পড়ালেখা যখন হবেই না, তখন দেশান্তরি হওয়াটাই উত্তম।
সব শুনে কুদ্দুস নানা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, যাক-যা হবার হয়েছে। এখন আর ওসব চিন্তা করে লাভ নেই।
এক সময় আমরা স্টিমার থেকে নেমে বাস ধরলাম। সন্ধ্যায় এসে নামলাম গাবতলী। মানুষ যার যার কাজে ছুটছে। সবাই ব্যস্ত। কেউ কারো দিকে তাকায় না। আমি কুদ্দুস নানার পিছু পিছু হাঁটছি। সে কোথাও থামলে আমিও থামছি। আবার সে চলছে তো আমিও চলছি অন্ধের মতো। শেষে একটা হোটেলে এসে ঢুকলো কুদ্দুস নানা। আমাকে বললো, ঐ খালি টেবিলটায় বসো।
বেশ বড় হোটেল। নানা হোটেলের ম্যানেজারের সাথে কী সব কথা বলে ফিরে এসে আমাকে বললো, ক্ষুধা তো লাগছে, আগে কিছু খেয়ে নাও। আমি বললাম, তুমি খাবে না? সে বললো, আমার খাওয়া আটকাবে না। তুমি খাও।
গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেতে খেতে ভাবছি, কুদ্দুস নানা কোথায় কী কাজ করে তা তো কিছুই জানা হলো না। রাতে তো তার কাছেই থাকতে হবে। সকালে যা হয় করা যাবে।
হঠাৎ দেখি কুদ্দুস নানা আর সেই কুদ্দুস নানা নেই। শরীরে অন্যরকম পোশাক, মাথায় টুপি আর কাঁধের ওপর ঝুলানো সুন্দর একখানা টাওয়াল। কথার চোটপাটই আলাদা। কণ্ঠটাও আর আগের মতো নেই। অন্যসব ম্যাচিয়ারদের ওপর খবরদারি করছে, আবার নিজেও প্লেট হাতে ছুটছে- লম্বা রুমের এ মাথা থেকে সে মাথা। কাছে আসলেই বললাম, নানা এই কি আসল তুমি?
কুদ্দুস নানা হেসে বললো, এই হোটেলেই আমার চাকরি। হেড ম্যাচিয়ার।
যাহোক, পরদিন সকালে বিস্মিল্লাহ বলে বেরিয়ে পড়লাম বিশেষ এক ব্যক্তির খোঁজে। লোকটা সমাজসেবক। ঢাকার মতো শহরে দশ কাঠার ওপর তার বাড়ি। যাওয়ার সময় কুদ্দুস নানা বলে দিলো, নানা, যাচ্ছো যাও- কোনো অসুবিধা হলে এই ঠিকানায় চলে এসো।
গুলিস্তানের বাস ধরে কাকরাইলের মহব্বতজানের ঠিকানা বললাম হেলপারের কাছে। হেলপার বললো, বসে থাকেন, জাগা মতো আসলেই আমি ইশারা দেবো। গরমে ঘেমে নেয়ে উঠলাম। বাস বোঝাই মানুষ। তবু মানুষের ফাঁক দিয়ে ক্ষণে ক্ষণে হেলপারের দিকে তাকাচ্ছি। হঠাৎ হেলপার ইশারা করতেই লোকজন ঠেলে-ঠুলে নেমে পড়লাম। গায়ে গেঞ্জি ছিলো না। ঘামে পাঞ্জাবিটা লেগে ছিলো শরীরের সাথে। ফলে ঘাড় থেকে মাজা পর্যন্ত হাঁ হয়ে গেলো পাঞ্জাবিটা।
কী আর করা, রাগে দুঃখে চলন্ত বাসটার দিকে চেয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। তারপর মনে মনে বুঝে নিলাম, এই তো শুরু হলো জীবনযুদ্ধ। মন খারাপ করার কিছু নেই। এ রকমই হয়। সিনেমাতেও তো দেখেছি, নায়ক প্রথম প্রথম শহরে গিয়ে কত বিপদেই না পড়েছে। তারপর সেই একদিন হয়ে গেছে হিরো।
যাহোক, মহব্বতজানের ঠিকানা হাতে নিয়ে এপথ সেপথ, এগলি সেগলি করে- শেষবেলা মহব্বতজানের বাড়ির সামনে পৌঁছালাম। মনে মনে যা ধারণা করেছিলাম, এসে দেখি বিশাল অট্টালিকা নয়, ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়। দেয়ালের পাশ দিয়ে কলাগাছ আর উঠনের ওপর একটি বকুল গাছ। একতলার ছোট্ট বাড়ি। এই বাড়িটাই যে স্বনামধন্য মহব্বতজানের এ কথা বিশ্বাস করতে বড় কষ্ট হলো আমার। কি আর করা, বুকল গাছের ছায়ায় একটা চেয়ারে বসলাম। খবর পেয়ে মহব্বত সাহেব বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। আমি সালাম দিতেই তিনি হাসতে হাসতে বললেন, খুব চেনাচেনা লাগছে। আমি অতি শ্রদ্ধাভরে বললাম, স্যার আমার নাম সোলায়মান হোসেন সালু। ঐ যে ঝিনাইদহে ম্যাজিস্ট্রেটের বাসায় দেখা হলো। অনেক আলাপ হলো। আপনি দুস্থ মহিলাদের জন্য ‘নক্সী কাঁথা’ নামে একটা প্রজেক্ট খোলার কথা বলেছিলেন। শেষে আপনার ঠিকানা দিয়ে বললেন, আমি যেনো পরীক্ষা দিয়েই ঢাকা চলে যাই।
মহব্বতজান বললেন, এসে খুব ভালো করেছেন। পথে কোনো কষ্ট হয়নি তো?
না-না-কোনো কষ্ট হয়নি।
রেজাল্ট কেমন হয়েছে?
রেজাল্ট হয়েছে, তবে একটুর থেকে…
ভালো ছেলেদের এমনই হয়। একটুর থেকে প্লেস পাওয়া হয়ে ওঠে না।
তারপর, স্যার ভাবীকে ডেকে বললেন, নয়নের মা দেখো কে এসেছে। ভাবী আসতেই আমি সালাম দিলাম। স্যার বললেন, এই হলো সালু ভাই। খুব ভালো ছেলে। সালু ভাই ভিতরে যান। জামা কাপড় ছেড়ে গোসল করে কিছু খেয়ে রেস্ট নিন।
আমি চেয়ার থেকে উঠে ভিতরের দিকে যেতেই মহব্বত স্যার বললেন, সালু ভাই আপনার পাঞ্জাবিটা এরকম ছিঁড়লো কী করে। আমি হাসতে হাসতে সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম পাঞ্জাবিটা ছেঁড়ার ঘটনা। স্যার বললেন, যাক-যা হবার হয়েছে। ও নিয়ে ভাববেন না।
বুঝলাম মহব্বত স্যার নামেও দিল দরিয়া কাজেও তাই। সংসারে একটি মাত্র ছেলে নয়ন। কেজিতে পড়ছে। স্ত্রী সরকারি অফিসে সম্মানজনক পদে আছেন। স্যার নিজে ক্লাস ওয়ান অফিসার।
একদিন কথায় কথায় বললাম, স্যার বাড়িতে আপনার এতো জায়গা অথচ এমন সাধারণ অবস্থায় আপনি আছেন।
তিনি বললেন, ঢাকা শহরে কোন্ বেটার দশকাটা জমি আছে। এই যে বড় লোকদের চারতলা পাঁচতলা বাড়ি দেখছেন, এরা কি কখনো গরিবের পাতে দুটো ভাত দেয়? এরা পরের খেয়ে, সরকারি অফিসের বারোটা বাজিয়ে বাহাদুরি করে বেড়ায়। ঘুষের টাকায় বাড়ি করে।
কথাটা মিথ্যা নয়। এখানে এসে চারদিকে চলে ফিরে সবইতো দেখছি। এই বাড়িতে ফকিররা আসছে তো আসছেই। তারা জানে গলির ঐ শেষ বাড়িটা থেকে কেউই খালি হাতে ফিরবে না। রাতেও দু’একজন অচল ফকির আসে রাতের খাবার খেতে। তা ছাড়া শুনেছি অনেক অজানা অচেনা আমার মতো বেকাররা এসে দিব্বি আসন গেড়ে বিনা পয়সায় থেকে এবং খেয়ে একটা কিছু জুটিয়ে নিয়ে তারপর ভেগে পড়েছে। তবে, এরা মহব্বত স্যারের বাজার-ঘাট করতো কি না তা জানি না।
আমি একটু বোকা বোকা হওয়ার কারণে স্যারের অনেক কাজের ভারই আমার ওপর ন্যস্ত হয়। যেমন, দোকান থেকে সিগারেট আনা, বাজার করা, নয়নকে স্কুল থেকে নিয়ে আসা, লন্ড্রিতে কাপড় নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। স্যারের সিগারেট খাওয়াটা ছিলো একটি লক্ষণীয় বিষয়। রাত-দিন মিলে সিঙ্গেল প্যাকেটের বিশ প্যাকেট না হলে তার চলতো না। তবে কখনো দু’প্যাকেটের বেশি আনতে দেন না। স্যারের ওয়াইফ অর্থাৎ, ভাবী প্রায়ই বলতেন, একি স্বভাব! একবারে বেশি করে আনালে অসুবিধাটা কোথায়?
স্যার উত্তরে বলতেন, তুমি এসব বুঝবে না। সিগারেট কাছে না থাকলে ভিতরে একটা বিশেষ রকম বোধের সৃষ্টি হয়। একঘেয়োমতা কেটে, পাওয়ার আকাক্সক্ষায় মন ব্যাকুল হয়।
ভাবী হাসতে হাসতে বলতেন, তোমার ঐ দার্শনিক কথাবার্তা আমার মাথায় ঢোকে না। এক কাজ করো, তুমি মনোবিজ্ঞানের ওপর লেখালেখি করো। আমি ঠিক বলতে পারি, ভবিষ্যতে কাজ দেবে।
কী আর লিখবো বলো, এদেশে কি পাঠক আছে? সব চুরির ধান্দায় মগ্ন। কয়জন মানুষ সত্য-সুন্দরের আলো জ্বালাতে চায় নিজের মধ্যে।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই স্যার আমার হাতে একটা একশত টাকার নোট দিয়ে বললেন, সালু ভাই, দু’প্যাকেট সিগারেট আর একটা ব্লেড নিয়ে আসুন। তখনই ভাবী বললেন, দুটো কাপড় কাচা সাবানও আনবেন। আমি বললাম, দুটো সাবান, দু’প্যাকেট সিগারেট আর একটা ব্লেড। স্যার বললেন, না, আগে দু’প্যাকেট সিগারেট, একটা ব্লেড তারপর সাবান। ভাবী হাসতে হাসতে বললেন, একই তো কথা হলো। স্যার বললেন, তুমি এসব বুঝবে না। ভাবী বুঝুক আর নাই বুঝুক, আমি কিছুই বুঝলাম না।
ভদ্র মহিলা বুদ্ধিমতী, অমায়িক। মনটাও পরিচ্ছন্ন। মনের মধ্যে ফালতু কোনো ভাবের প্রশ্রয় দেন না তিনি।
দিন যতই যেতে লাগলো, আমিও পরিবারের বিশেষ একজন হয়ে উঠতে লাগলাম। একটু একটু করে জেনে গেলাম- মহব্বতজানের পারিবারিক কিচ্ছা-কাহিনী। ভাবী মুসলিম পরিবারের মেয়ে নন। হিন্দু ঘরের মেয়ে। কলেজে পড়ার সময় উভয়ের জানাজানি।
প্রায় প্রতিদিন বিকালে মহব্বত স্যারের ইয়ার বন্ধুরা আসেন এই ছোট্ট বাড়িতে। বকুল গাছটার নিচে সবাই বেতের চেয়ারে বসেন। চলতে থাকে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা চালাচালি। ফাঁকে ফাঁকে ঝালমুড়ি, ঘরে তৈরি ডালের বড়া, চানাচুর আর রং চা। তবে আমার সব সময় দুধ চা খেতেই ভালো লাগে। গল্প চলতে চলতে রাত আটটা বেজে যায়। তার মধ্যে স্যারের অফিসের দু’একজন পিয়নও আসে। তারা রাতে খেয়ে, যাওয়ার সময় রিক্সা ভাড়া নিয়ে তবেই যে যার বাসায় ফেরে।
দশকাঠা জায়গার মধ্যে আরো রয়েছে এলোমেলো তিনটি টিনের ঘর। সেখানে ছয়ঘর ভাড়াটিয়া। ঘর ভাড়া দেয়া, নতুন ঘর তোলা, ভাড়াটিয়াদের সাথে কথা বলা, রাজ মিস্ত্রির কাজের তদারকি করা এ সবই আমার দায়িত্ব। যে কারণে স্যার এবং ভাড়াটিয়াদের কাছেও আমি এক অন্য মানুষ। এসব কারণেই স্যারের সাথে কমতে লাগলো আমার দূরত্ব।
একবার পহেলা বৈশাখের দু’দিন আগে স্যার আমাকে বললেন, সালু ভাই কাপড় পরে নিন। চলুন একটু ঘুরে আসি। দু’জন রিক্সা করে যেতে যেতে পুরনো ঢাকার একটা প্রাচীর ঘেরা বাড়িতে গিয়ে ঢুকলাম। প্রাচীরের মধ্যে অনেক জায়গা। ভিতরে অনেকগুলো ওয়াল করা টিনের ঘর। একদিকে ছোট মাপের একটি ছাগলের খামার। খালি জায়গাগুলোতে এলোমেলোভাবে জিনিসপত্র পড়ে আছে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের পোশাক-আশাক এবং কথাবার্তায় বুঝলাম এরা বিহারি।
ছাগলের চোনার উদ্ভট গন্ধ। নাকে রুমাল চেপে দু’তিনটি ঘর পার হয়ে বেশ বড়-সড়ো একটা ঘরে ঢুকলাম আমরা। মহব্বত স্যার গদ-গদ হয়ে লম্বা সালাম দিয়ে তক্তপোষে বসে থাকা ভদ্রলোকের হাতে হাত দিয়ে মোসাফাহা করলেন। দেখাদেখি আমিও করলাম।
আসন গ্রহণের পর মহব্বতজান বললেন, হুজুর আপনি কেমন আছেন?
হুজুর বললেন, আল্হামদুলিল্লাহ। খোদা তায়ালার হুকুমে তবিয়ত ভালোই আছে। বয়স হয়েছে, এখন শুধু তার ডাকের অপেক্ষায় আছি। আখিরাতের জন্য কিছুই তো করতে পারলাম না। কেবল দুনিয়াদারি করতে করতেই সময় পার হলো।
হুজুর বেশ লম্বা। দেখতেও সুন্দর। তার ওপর সাদা লম্বা চুল-দাড়ি। মাথায় সাদা পাগড়ি। নানান কথার পর স্যার অতি বিনয়ের সুরে বললেন, হুজুর, বড় আশা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি।
বলুন কী আশা নিয়ে এসেছেন।
গরিবের বাড়িতে একবার আপনার পায়ের ধুলা দিতেই হবে।
বাসা-বাড়ি কোথায়, কতু দূর?
আমি অতি নগণ্য মানুষ। বাড়ি বলতে দশকাঠার ওপর ছোট্ট একটু কুঁড়েঘর। আমার বাবা নদীয়া থেকে এসে সেই কালে কিনেছিলেন। আমার কিইবা ক্ষমতা আছে যে, আপনার মতো মানুষকে আমি আদর আপ্যায়ন করতে পারি। গরিবের বাড়ি বেশি দূরে নয়, কাকরাইল।
মহব্বত সাহেব, আমার তো কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠে না। শরীরটাও আর আগের মতো নেই।
হুজুর, না বললে তো হবে না। আমার স্ত্রী বড় আশা করে আছে। সামনে পহেলা বৈশাখ। সকালে আমি নিজে এসে আপনাকে নিয়ে যাবো আমার গরিব খানায়। তারপর সবাই একসাথে একটু নাস্তা করবো। আপনাকে আবার পৌঁছে দিয়ে যাবো।
শেষ পর্যন্ত হুজুর কথা দিলেন। আমরাও খুশি হয়ে চলে এলাম।
পরদিন কেনাকাটার ধুম পড়ে গেলো। দেশী এবং বিদেশী যতো প্রকারের ফল আছে সবই কিনলেন স্যার। কেননা বাংলা নববর্ষের প্রথম সকালে হুজুর আসবেন এবং সবাই এক সাথে নাস্তা করবো। এভাবেই বছরের শুভ সূচনার মধ্য দিয়ে সারা বছরের কল্যাণ কামনা। হুজুরের জন্য স্যারের পেরেশান দেখে আমিও তখন অন্যরকম হয়ে গেছি। স্যার যে এমন দিলদরিয়া মানুষ, ভাবতেই অবাক লাগে। পীর-ফকির এবং আল্লাহওয়ালা লোকদের প্রতি তার শ্রদ্ধার শেষ নেই। মনে মনে বলি আমার ভাগ্য সত্যি ভালো যে, সেদিন ফকরুলের সাথে ঝিনাইদহে গিয়ে এমন একজন মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো।
এলো পহেলা বৈশাখ। সূর্য ওঠার সাথে সাথে স্যার চলে গেলেন হুজুরকে আনতে। এদিকে ভাবী বড় বড় প্লেটে যাবতীয় ফল কেটে সাজিয়ে রাখলেন। নয়ন বললো, আম্মা, কে আসবে? ভাবী বললেন, তোমার এক দাদু। দাদুর কথা শুনে নয়ন এতোটাই খুশি হলো যে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা, নয়ন দাদা-নানা কাউকে দেখেনি।
এক সময় নয়ন আমাকে বললো, সালু চাচা, যে দাদু আজ আসবেন তাকে আপনি দেখেছেন?
হ্যাঁ দেখেছি।
দেখতে কেমন?
খুব সুন্দর। দেখলেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে।
হঠাৎ গেটের সামনে স্যারের কণ্ঠ শোনা গেলো। আমরা ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। ভাবী আগেই একটা খাটের ওপর হুজুরের বসবার জন্য যথাসাধ্য সুন্দর করে বিছানা করে রেখেছেন। আমি আর নয়ন এগিয়ে গেলাম। হুজুর এসে বসলেন। ভাবী যথারীতি মাথায় কাপড় দিয়ে সালাম করলেন। নয়নও করলো, আমিও করলাম।
স্যার আদবের সাথে বিনম্র সুরে বললেন, হুজুর এই আমার একমাত্র ছেলে নয়ন। তারপর নয়নকে বললেন, বেটা ইনি তোমার দাদু হন। নিজের দাদুকে তো আর দেখার সৌভাগ্য হয়নি-এখন থেকে ইনিই তোমার দাদু।
হুজুর বললেন, সবই খোদার ইচ্ছা।
ভাবী বললেন, চাচাজি, বেলা হয়েছে-আপনার নাস্তা দেই।
আরে বেটি অস্থির হয়ো না। রিজিকে যা লিখা আছে, তাতো আমাকে খেতেই হবে। বুড়ো মানুষ কিইবা খেতে পারি। যাও নিয়ে আসো।
হুজুর গরুর মাংস ভোনা দিয়ে ঘিয়ে ভাজা একটা পরোটা খেলেন।
ভাবী নিজের হাতে তৈরি করা সুপের পেয়ালাটা এগিয়ে ধরলেন। হুজুর না না বলার পরও বাধ্য হয়ে দু’চুমুক খেলেন। পরে গল্পে গল্পে এক টুকরো তরমুজ আর একটা আঙ্গুর মুখে দিলেন। তারপর আমরা সবাই পটাপট খাওয়া শুরু করলাম।

[চলবে]

SHARE

Leave a Reply