Home জীবনটাকে গড়ব সত্যিকারের শিক্ষিত হও – আমিনুল ইসলাম ফারুক

সত্যিকারের শিক্ষিত হও – আমিনুল ইসলাম ফারুক

আসসালামু আলাইকুম বন্ধুরা! কেমন আছো তোমরা? নিশ্চয়ই ভালো আছো। আমিও তোমাদের দোয়ায় আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তোমাদের মতো কিশোর বন্ধুদের আমি ভীষণ ভালোবাসি। মাঝে মধ্যে ভাবি, যদি প্রতিদিনই তোমাদের সাথে আড্ডা দিয়ে, খেলাধুলা করে ও বই পড়ে সময়টা কাটিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু বলো, চাইলেই কি আর পারা যায়? তাই ভাবছি প্রতি মাসে একবার হলেও তোমাদের সাথে আড্ডা হবে এবং খেলাচ্ছলে কিছু শেখা হবে, অজানাকে জানা হবে। তোমরা তো শিক্ষার্থী। আমিও তোমাদের মতো শিক্ষার্থী। তাহলে প্রকৃত শিক্ষা কী? সেটা নিয়েই আজকের আড্ডাটা হয়ে যাক।

সত্যিকারের বড় হতে গেলে সত্যিকারের শিক্ষিত হতে হয়। আমি বিএ. ও এমএ. পাসের খুব দাম দিই না। তাই বলে তোমরাও যে দাম দিবে না আমি সেটা বলছি না। এমএ. পাস করা কোট-টাই হাঁকানো এমন অনেক যুবক দেখেছি যারা নির্ভুলভাবে এক পৃষ্ঠা বাংলা লিখতে পারে না। কোনো চাকরির জন্য দরখাস্ত লিখতে বললে তোমাদের মতো সেভেন-এইট পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের কাছে করুণা ভিক্ষা করে। অথচ তারা বিশাল ডিগ্রিধারী লোক। তোমরা পরিসংখ্যানে দেখবে, বাংলাদেশের তুলনায় অ্যামেরিকাতে স্নাতকোত্তর কম। তাদের বেশির ভাগ-ই অ্যাকাডেমিক শিক্ষা নেন ইন্টারমিডিয়েট ও গ্র্যাজুয়েট পর্যন্ত। তারপর যিনি যেই বিষয়ে এক্সপার্ট সে বিষয়ে গবেষণা করেন। নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করেন। নানা ধারণার জন্ম দেন। কিন্তু তোমরা শুনলে হয়তো অবাক হবে, গুয়াম নামক রাষ্ট্রটিতে যে পরিমাণ জনসংখ্যা আছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর এম.এ পাস করে সে পরিমাণ লোক! কিন্তু সত্যিকারের শিক্ষাটা কী?
তোমরা মনে রাখবে, শুধু শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকার নামই বেঁচে থাকা নয়। বেঁচে থাকা মানে নতুন কিছু জানা, দেখা ও জয় করা। সারা দুনিয়ায় এ মুহূর্তে কোথায় কী ঘটছে তা সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা রাখা। এর জন্য নিয়মিত খবরের কাগজ পড়তে হয়। ভালো ম্যাগাজিন পড়তে হয়। সিম্পোজিয়াম- সেমিনারে অংশ নিতে হয়। টেলিভিশন দেখতে হয়। সারা দুনিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকাটাই প্রকৃত শিক্ষা।
আমাদের স্রষ্টা কে? পৃথিবীর আনুমানিক বয়স কত? কিভাবে পৃথিবী সৃষ্টি করলেন? মানুষকে কেন সৃষ্টি করা হলো? অতীতে মানুষ কিভাবে জীবন-যাপন করতো? কিভাবে তার বিবর্তন হলো? মানুষের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সমাজ পরিবর্তনের পথে কোন কোন আবিষ্কার তাকে সাহায্য করল? এসব কিছুর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জানাও প্রকৃত শিক্ষা।
যে অন্যদের জানে সে শিক্ষিত। গোটা পৃথিবী সম্পর্কে যে ধারণা রাখেন এবং যার অর্জিত জ্ঞান অন্যের উপকারে আসে সে শিক্ষাটাই যথার্থ শিক্ষা। কিন্তু জ্ঞানী হলো সেই ব্যক্তি যে নিজেকে জানে। জ্ঞান ছাড়া কোন শিক্ষা কাজে লাগে না। মহামতি সক্রেটিসও (৪৭০-৩৯৯ ইঈ) আমাদের সেই একই কথা বলেছেন- “Know thyself” অর্থাৎ নিজেকে জানো। পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য বুদ্ধিই যখন প্রধান অস্ত্র। তখন সেই অস্ত্রের মালিক হতে তোমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সক্রেটিস আরো বলেছেন- “ভালো খাবার ছাড়া যেমন শারীরিক সুস্থতা অর্থহীন তেমনি জ্ঞান চর্চা ছাড়াও আত্মার উন্নয়ন অসম্ভব।” একজন প্রকৃত জ্ঞানীর কাজ হচ্ছে কোন ব্যক্তিকে প্রশ্ন করে তার কাছ থেকে উত্তর জেনে দেখানো যে, জ্ঞানটা তার মধ্যেই ছিল। আমি বলি, গোটা পৃথিবীতে শুধুমাত্র একটি ভালো বন্ধু আছে- বই তথা জ্ঞান। আর একটি শত্রু আছে, অজ্ঞতা।
তবে ইতিহাস সম্পর্কে তোমাদের মোটামুটি একটা ধারণা থাকতেই হবে। যখন তোমরা ইতিহাস পড়বে তখন মনে হবে গত শতক কিংবা সহস্রাব্দের সেরা মানুষগুলোর সাথে কথা বলছো। তাদের জীবনাচার সম্পর্কে জানতে পারছো। আমি দেখেছি, ইতিহাসকে অনেক ছেলে-মেয়ে ভয় পায়। আবার দেখবে অনেক লেখাপড়া জানা লোক শুধুমাত্র সাল মনে না থাকার কারণে ইতিহাস গুলিয়ে ফেলেছে।
ইতিহাসকে চটপটে মনে রাখার জন্য আজই ছোট্ট একটি ক্যাপসুল তৈরি করো। এটা মনে রাখতে পারলে বাংলার ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস এবং গোটা বিশ্বের ইতিহাস অনায়াসেই সারাজীবন মনে থাকবে। প্রথমে ইতিহাসকে BC ও AD এই দু’ভাগে ভাগ করো। BC অর্থাৎ যিশু খ্রিষ্টের জন্মের আগে কী কী ঘটেছে দেখো। AD মানে যিশু খ্রিষ্টের জন্মের পরে যা যা ঘটেছে।
ইতিহাস ছাড়াও বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে একটি যোগাযোগ রাখা চাই। যেমন: বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি ও লেখক কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ফররুখ আহমদ, গোলাম মোস্তফা, জসীম উদ্দীন। তেমনিভাবে শেকসপিয়র, মিল্টন, শেলি, জন ডান ও জন কিটস ইংরেজি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখক। আরবি ও ফার্সি সাহিত্য রচনায় যারা অমর হয়ে আছেন তাদের মধ্যে ইমরুল কায়েস, হাসসান ইবনে সাবিত, আহমদ শাওকি, শেখ সাদী, ওমর খৈয়াম, ফেরদৌসী, হাফিজ অন্যতম।
শহর বা পাড়ার লাইব্রেরিতে খোঁজ করলে এই সকল লেখকের বই পাবে। আজকাল সব শহরেই বইমেলা হচ্ছে। তোমরা উৎসাহী হয়ে বন্ধুদের নিয়ে বইমেলায় যাবে, নতুন ভালো লেখকদের বই কিনবে। বছরে অন্তত আট-দশখানা বই কিনতেই হবে। নইলে বইয়ের প্রতি আকর্ষণ জন্মাবে না।
সত্যিকারের শিক্ষিত হতে চাইলে তোমাকে প্রচুর বই পড়তে হবে। প্রথমে না হয় কোন মজার গল্প কিংবা হাদিসের গল্প দিয়েই পড়ার অভ্যাস তৈরি করো। তারপর ধীরে ধীরে কুরআন মাজিদ, মনীষীদের জীবনী, বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়বে। ভ্রমণ কাহিনী পড়লে তার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে জ্ঞান হবে। গোয়েন্দা উপন্যাস পড়লে উপস্থিত বুদ্ধি তৈরি হবে। কোন বড় মানুষের আত্মজীবনী পড়লে জানতে পারবে তাদের কঠোর জীবনসংগ্রামের কথা। শুধু এমন বইগুলোই পড়বে, যেগুলো পড়লে জ্ঞানার্জন হয় এবং নতুন কিছু জানা যায়। তোমরা ইচ্ছে করলে চব্বিশ ঘণ্টাই কিন্তু বইয়ের মধ্যে কাটিয়ে দিতে পারো। চব্বিশ ঘণ্টা পড়াশোনার কথা শুনে তোমরা হইচই করো না কিন্তু। আচ্ছা বলোতো, আমাদের প্রতিদিন কত ঘণ্টা সময়? সবাই বলবে ক্যান, চব্বিশ ঘণ্টা! আমরা চব্বিশ ঘণ্টায় অর্থাৎ সারাদিনে মোটামুটি প্রধান প্রধান কী কী কাজ করি? পড়ালেখা, গোসল, খাওয়া, নামায, ঘুম ও খেলাধুলা ইত্যাদি।
এবার এসো একটু বিশ্লেষণ করি… গান্ধিজী (১৮৬৯-১৯৪৮) যেখানে গোসল করতেন সেখানে প্রতিদিন একটি করে গীতার শ্লোক লিখে রাখতেন। অতঃপর গোসলের সময় তা গানের সুরে সুরে মুখস্থ করে ফেলতেন। আমরাও এভাবে প্রতিদিন একটি করে মহামনীষীর বাণী শিখতে পারি। শিখতে পারি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) (৫৭০-৬৩২) এর একেকটি সুন্দর হাদিসও। (চলবে)

SHARE

Leave a Reply