Home গল্প খরগোশ ও শিয়াল – জ্যোতির্ময় মল্লিক

খরগোশ ও শিয়াল – জ্যোতির্ময় মল্লিক

খরগোশ এবং শিয়াল একসাথে খাবারের সন্ধানে বের হয়েছে। এটা ছিলো শীতের সময়। গাছের পাতা ঝরে গেছে। ন্যাড়া গাছের ডালে বরফ জমতে শুরু করেছে। কোথাও সবুজের চিহ্ন নেই। প্রকৃতি হয়ে গিয়েছিলো রুক্ষ আর শুষ্ক। হাজার খোঁজাখুঁজি করেও মাঠের মধ্যে তারা কোনো ইঁদুর বা পোকা-মাকড়ের সন্ধান পেলো না।
শিয়ালটা খরগোশকে বললো- আবহাওয়াটাই কেমন জানি ক্ষুধা উদ্রেককারী। আমার পেট ক্ষিধের জন্য চোঁ চোঁ করছে।
খরগোশ উত্তর দিলো- ঠিকই বলেছ। আমি যদি আমার নিজের কান মুখের মধ্যে পুরে দিতে পারতাম, তাহলে কান দুটোই চিবিয়ে খেতাম। পেটে দারুণ ক্ষুধা নিয়ে সামনের দিকে তারা এগিয়ে গেলো।
কিছু সময় পর তারা দেখলো, খুব সুন্দর একটা মেয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তার হাতে একটা বেতের ঝুড়ি। তাই নিয়ে মেয়েটি হেলতে দুলতে তাদের দিকেই আসছে। ঝুড়িটার ভিতর থেকে খুব সুন্দর গন্ধ বের হচ্ছিল। তারা বুঝল, এটা বিভিন্ন ধরনের খাবারে ভর্তি।
মেয়েটাকে আসতে দেখে শিয়ালটা বুদ্ধি করে বললো- এসো, একটা কাজ করি। তুমি মরার ভান করে পড়ে থাকো। আর জানো তো, খরগোশের চামড়া দিয়ে সুন্দর দস্তানা ও ব্যাগ হয়। মেয়েটা তার ঝুড়িটা রেখে কাছে আসবে তোমার চামড়া খুলে নেবার জন্য। আর ততক্ষণে আমি সব খাবার বের করে আনব। তারপর দু’জন মিলে খাবো।
খরগোশ শিয়ালের কথামতো মরার ভান করে মাটিতে পড়ে রইলো। শিয়ালটা একটা বরফের টিলার পেছনে লুকিয়ে রইলো। মেয়েটি সেখানে এসে দেখলো, একটা খরগোশ হাত-পা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আছে। তখন মেয়েটি তার ঝুড়িটা মাটিতে নামিয়ে রেখে তার কাছে এগিয়ে গেলো। ঠিক তক্ষুনি শিয়ালটা দৌড়ে ঝুড়িটা নিয়ে পালিয়ে গেলো। এদিকে মেয়েটি কাছে আসতেই খরগোশটা উঠে পালিয়ে গেলো।
খাবারের ঝুড়িটা এক ঝোপের ভেতর নিয়ে শিয়ালটা গপ্গপ্ করে খেতে শুরু করলো। ঝুড়ির প্রায় সব খাবারই শিয়ালটা একা একা খেয়ে ফেললো। খরগোশটার জন্য কিছুই রাখলো না বলতে গেলে। খরগোশটা দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখলো। এতে তার খুবই রাগ হলো। কিন্তু মুখে কিছুই বললো না।
ঝুড়িতে অবশ্য আরো কিছু খাবার ছিলো কিন্তু শিয়ালটা খরগোশকে এ ব্যাপারে কিছুই বললো না। তারপর তারা আবারো হাঁটতে শুরু করলো। হাঁটতে হাঁটতে তারা একটা পুকুরের কাছে এসে গেলো। তখন খরগোশটা বললো- এসো, একটা কাজ করা যাক, আমরা কিছু মাছ ধরি। তারপর দু’জনে মিলে জমিয়ে খাওয়া যাবে। তুমি শুধু তোমার লেজটা একটু পানিতে চুবিয়ে ধরো। আজকাল মাছেরা কিছু খেতে পাচ্ছে না। মাছগুলো তোমার লেজ দেখে কামড়ে ধরে ঝুলে পড়বে, আর অমনি তুমি টেনে তুলবে। দেরি করো না যেন।
পরিকল্পনাটা শিয়ালের খুব পছন্দ হলো। এতক্ষণ ঝুড়ির বিভিন্ন খাবার খেয়ে তার অরুচি ধরে গিয়েছিলো। ভাবলো, একটু স্বাদ বদলালে মন্দ হয় না। মাছের সাথে পাউরুটি জমবে ভালো। শেয়াল খরগোশের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলো। কিন্তু তখন ছিলো শীতকাল। আর পুকুরের পানি জমে যাবার উপক্রম হয়েছিলো। শিয়াল কাঁধের ঝুড়িটা পুকুরের পাশে নামিয়ে রাখলো।
শিয়ালটা এবার তার লেজ পানিতে ডুবিয়ে দিলো। কিছু সময়ের ভিতরই তার লেজটা শক্তভাবে জমে আটকে গেলো। নড়াচড়ার উপায় রইলো না। এই সব দেখে খরগোশ এগিয়ে এলো। তারপর ঝুড়িটা নিয়ে শিয়ালের সামনেই বসে বাকি খাবার খেয়ে ফেললো। শিয়ালটা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো। খাবার শেষে সে শিয়ালটাকে বললো- কী আর করা, বরফ গলা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। বসন্তকাল আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো, তাতেই হবে। এরপর খরগোশ দৌড়ে সে জায়গা ছেড়ে চলে গেলো। শিয়ালটা ওখানে আটকা পড়ে রইলো। আর রাগে শিয়াল খেপা কুকুরের মতো শব্দ করতে থাকলো।

*জার্মানির রূপকথা The Hare and The Fox-এর বঙ্গানুবাদ

SHARE

Leave a Reply