Home ক্যারিয়ার গাইড লাইন আদর্শ শিক্ষার্থীর বৈশিষ্ট্য – হাফিজ বিলাল হোসেন

আদর্শ শিক্ষার্থীর বৈশিষ্ট্য – হাফিজ বিলাল হোসেন

শুধু দিন-রাত লেখাপড়া করলেই কিংবা বইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুখস্থ করলেই আদর্শ ছাত্র হওয়া যায় না। তার জন্য প্রয়োজন কতিপয় নিয়ম-কানুন মেনে চলা। কারণ প্রতিটি কাজই সুনির্দিষ্ট নিয়মানুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ছাত্রদের ভবিষ্যৎ জীবনকে সুন্দর, সফল ও গৌরবোজ্জ্বল করে গড়ে তুলতে হলে তাদের কতিপয় নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। তাই আদর্শ ছাত্র হওয়ার জন্য নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হলো।

জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য স্থির করা
একজন ছাত্রকে শিক্ষাজীবনের শুরুতেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী হবে তা ঠিক করে নিতে হবে। আমি কী হতে চাই? একজন সুবিজ্ঞ আলেমে দ্বীন, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবেত্তা, অর্থনীতিবিদ, সমাজসেবী, বিজ্ঞানী না অন্য কিছু? কারণ লক্ষ্যহীনভাবে কোনো কাজে সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়।

সুদৃঢ় ইচ্ছা ও বিশ্বাস
বিশ্বাস ও দৃঢ় ইচ্ছা হচ্ছে আত্মার খোরাক। শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠনে এটি জ্বালানি শক্তি হিসেবে কাজ করে। বিশ্বাস হতে চিন্তা এবং চিন্তা হতে কার্যের উৎপত্তি। প্রত্যেক মানবের কার্যই তার বিশ্বাসের অনুরূপ হয়ে থাকে। যে মনে আত্মবিশ্বাস ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই সে মনে কোনো চেতনাও নেই। বিশ্বাস ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা দ্বারা কর্মস্পৃহা ও মনোবল জাগ্রত হয়। বিশ্বাস ও আশা মানুষের মনে কর্মশক্তি জোগায়। সামনে অগ্রসর হতে সাহায্য করে। হতাশা ও নিরাশা মানুষকে করে হতোদ্যম। কবি যথার্থই বলেছেন-
এই জীবনটা যুদ্ধের নাম
লড়াই লড়াই সংগ্রাম।
নিজেকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে হবে, আমি পারবোই। কবি বলেছেন-
“পারিবো না এ কথাটি বলিও না আর
একবার না পারিলে দেখ শতবার।”
ইচ্ছার কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। প্রবাদ আছে- ইচ্ছে করলেই উপায় হয়।
উইলিয়ম হ্যাজলিট বলেছেন- যদি তুমি মনে কর তুমি জিতবে, তবে তুমি জিতবেই, বিজয়ের জন্য জরুরি হলো আত্মবিশ্বাস।
নিজেকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে।
ছাত্রকে সর্বদা এ আশা পোষণ করতে হবে যে, যদি কেউ পরীক্ষায় মেধা তালিকায় প্রথম হয়, সেটা অবশ্যই আমাকে হতে হবে। শুধু পরীক্ষায় পাসের চিন্তা করলে লেখাপড়ায় গতি সঞ্চার হবে না।

অধ্যবসায়ী হওয়া
ভাল ছাত্র হতে হলে তাকে অবশ্যই অধ্যবসায়ী হতে হবে। অধ্যবসায় বলতে বুঝায়Ñ কোনো কাজে সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে বা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছার লক্ষ্যে নিবিষ্ট মনে অবিরাম গতিতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। কোরআনের বাণী : আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো জাতির অবস্থা বদলান না যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের গুণাবলি বদলে ফেলে (সূরা আর-রাদ : ১১)। কারণ, শুধু মেধা থাকলেই হবে না। সে যদি অধ্যবসায়ী না হয়, তবে তার মেধার বিকাশ ঘটবে না।
‘ঈগল পাখির মতো তুমি সাহস রাখো বুকে
শিকার এবং বিজয় দুটো আসবে উৎসুকে।’
কথায় আছে যে, তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশুপক্ষী সহজেই পশুপক্ষী, কিন্তু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় তবেই মানুষ। ডা: লুৎফর রহমান বলেছেন : যে সমস্ত মানুষ ব্যর্থতাকে ভয় করে না, জয়ী হবে এ বিশ্বাসে কাজ করে, তারাই জয়ী হয়।

আজকের পৃথিবীতে এমন কোনও শিক্ষিত মানুষ নেই যে টমাস আলভা এডিসনের নাম জানে না।
বৈদ্যুতিক বাতি, চলচ্চিত্র, অডিও রেকর্ডিং, এনক্রিপটেড টেলিগ্রাফ সিস্টেম, আধুনিক ব্যাটারি, এ ধরনের হাজারের ওপর আবিষ্কার করে তিনি পৃথিবীকে ঋণী করে গেছেন।
১৮৪৭ সালে আমেরিকার ওহাইওতে জন্ম নেয়া এই জিনিয়াসের ছোটবেলায় ‘স্কারলেট ফিভার’ নামে একটি জটিল অসুখ হয়, যার ফলে তিনি কানে প্রায় শুনতেনই না। তার স্কুল জীবন ছিল মাত্র ১২ সপ্তাহের। কারণ তার পড়াশুনার পারফরম্যান্স এতই খারাপ ছিল যে স্কুলে আর তাকে রাখতে চাইছিল না। স্কুল থেকে দেয়া চিঠিতে লেখা ছিল যে টমাস পড়াশুনায় খুবই অমনোযোগী ও তার মেধাও ভালো নয়, এই ধরনের দুর্বল ছাত্রকে স্কুলে রাখা যাবে না। কিন্তু টমাসের মা চিঠি খুলে ছেলেকে শুনিয়ে পড়েছিলেন যে, টমাসের মেধা সাধারণ ছাত্রদের চেয়ে অনেক বেশি, এত বেশি মেধাবী ছাত্রকে পড়ানোর ক্ষমতা সাধারণ স্কুলের নেই। কাজেই তাকে যেন বাসায় রেখে পড়ানো হয়। মায়ের থেকে পাওয়া এই আত্মবিশ্বাস থেকেই টমাস পরে জটিল জটিল সব বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করতে থাকেন। এবং এই আত্মবিশ্বাসের কারণেই তিনি কোনও কিছুতেই ব্যর্থতাকে মেনে নিতেন না। বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কারের সময়ে ১০ হাজারবার তাঁর এক্সপেরিমেন্ট ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু তিনি তবুও চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কারণ ছোটবেলায় তার মা তার মনে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে, কিছুই অসম্ভব নয়।
কটু ভাষায় লেখা সেই চিঠিটি এডিসন অনেক বছর পরে খুঁজে পেয়েছিলেন, তার মা সেটি লুকিয়ে রেখেছিলেন। ততদিনে মা মারা গেছেন। টমাস হয়ে উঠেছেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও ধনী উদ্যোক্তা। চিঠিটি পড়ে টমাস সব বুঝতে পারেন এবং নিজের ডায়েরিতে লেখেন, টমাস আলভা এডিসন এক মেধাহীন শিশু ছিল। একজন অসাধারণ মায়ের প্রেরণায় সে হয়ে উঠে যুগের সেরা মেধাবী।

রুটিন মাফিক পড়াশুনা করা
ছাত্রকে প্রতিদিন রুটিন মাফিক পড়াশুনা করতে হবে। পাঠ্যপুস্তক সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পূর্ণভাবে প্রস্তুতি গ্রহণের লক্ষ্যে একটি রুটিন প্রণয়ন করত তা পড়ার টেবিলের সামনে লটকিয়ে রাখতে হবে। দিন-রাতের সময়গুলোকে ভাগ করে নিয়ে রুটিন তৈরি করতে হবে। রুটিন মাফিক পড়াশুনা করলে সবগুলো বিষয় পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হবে।

নিয়মানুবর্তিতা
শিক্ষাজীবনে নিয়মানুবর্তিতার অনুসরণ করা অতি জরুরি। এটি আদর্শ ছাত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রুটিন মাফিক পড়াশোনার পাশাপাশি সময়মত শিক্ষাঙ্গনে গমন ও প্রত্যাবর্তন, নামাজ-কালাম, খেলাধুলা, পানাহার, গোসল, বিশ্রাম ইত্যাদি নিয়মানুযায়ী করতে হবে।

হাতের লেখা ভালো করা
পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার জন্য হাতের লেখা সুন্দর করা আবশ্যক। কারণ পরীক্ষক যখন উত্তরপত্র মূল্যায়ন করবেন, ঐ সময় যদি উনার চোখের সামনে উজ্জ্বল, সুন্দর ও ঝকঝকে লেখা ভেসে ওঠে, তখন সত্যিই তার মনের মাঝে আনন্দের দোলা দেবে। খুশিতে ভরে উঠবে তার মন। ঐ সময় পরীক্ষক আনন্দে নম্বর দেবেন বেশি। তাই বলে উত্তর ভুল হলে শুধু ভালো লেখায় কাজ হবে না। যার হাতের লেখা ভালো, তার লেখার অনুসরণ করলে হাতের লেখা সুন্দর করা যাবে।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা
সদাসর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা প্রত্যেকের কর্তব্য। হাদিস শরিফে আছে পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।

সুস্বাস্থ্যের জন্য অনুশীলন
কাথায় আছে- স্বাস্থ্যই সম্পদ। তাই শরীর মন সুস্থ রাখার জন্য নিয়মিত শরিয়াহসম্মত- খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটি সমাজ সেবামূলক কর্মকাণ্ড, সাংস্কৃতিক চর্চা করা উচিত।

গভীর মনোযোগী হওয়া
ভালো ছাত্র-ছাত্রী হতে হলে পড়া-লেখায় মনোযোগী হতে হবে। জ্ঞান শিক্ষার প্রতি মনের মধ্যে অনুরাগ ও পিপাসার সৃষ্টি করতে হবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, জল এগোয় না পিপাসাই জলের কাছে এগিয়ে নিয়ে আসে। গভীর মনোযোগের মাধ্যমে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি অনুসন্ধানী দৃষ্টিও প্রখর হয়। এর মাধ্যমে সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী প্রতিভা বিকশিত হতে থাকে।

সময়ানুবর্তিতা বা সময়ের সদ্ব্যবহার
সময় অমূল্য সম্পদ। সময় হাতছাড়া হলে আর ফিরে পাওয়া যায় না। যে সময়টি হাতছাড়া হলো, আর যে তীরটি ধনুক থেকে নিক্ষিপ্ত হলো- এ দুটো জিনিস কখনো স্বস্থানে ফিরে আসে না।
ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে : Time and tide wait for none.
অর্থাৎ সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না।
শিক্ষাজীবন হচ্ছে আত্মগঠনের প্রকৃত সময়। শিক্ষাজীবনে যারা সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাদের জীবনেই সাফল্যে ভরে ওঠে। তারাই কর্মক্ষেত্রে রাখে দৃপ্ত পদচারণা। তাদের পেয়েই দেশ ও জাতি ধন্য হয়। আর যে সব শিক্ষার্থী সময়ের সদ্ব্যবহার করতে জানে না, তারা জীবনে সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। তাই জীবনে সাফল্য অর্জন করতে হলে সময়ের সদ্ব্যবহার করা অতি জরুরি।

শৃঙ্খলা ও আনুগত্য
একজন শিক্ষির্থী সাফল্যের উন্নত শিখরে পৌঁছাতে হলে তাকে কিছু নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব নিয়ম-কানুন মেনে চলা, প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শিখা, দৈনিক কাজ দৈনিক আদায় করা, পিতা-মাতা ও শিক্ষকের গঠনমূলক আদেশ মেনে চলা, তাদের অবাধ্য না হওয়া, তাদের মনে কষ্ট না দেয়া। বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করা, সদা সত্য কথা বলা বা সত্যের সাক্ষ্য হওয়া।

সবসময় আল্লাহর সাহায্য কামনা করা
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নিজেই দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন, হে আমার পালনকর্তা! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।

পরিশেষে ছোট্ট একটি নসিহত দিয়ে শেষ করতে চাই- ইমাম শাফিয়ী রাহমতুল্লাহি আলাইহি তার ওস্তাদ ইমাম ওয়াক্বি রাহমতুল্লাহি আলাইহির কাছে আরজ করলেন, আমার স্মরণশক্তি কম। জবাবে ওস্তাদ বললেন, আপনি গুনাহ করা ছেড়ে দিন। কারণ, ইলম হচ্ছে নূর, গুনাহগারের অন্তরে তা দেয়া হয় না। অথচ ইমাম শাফিয়ী ৩০ দিনে পবিত্র কুরআন মজিদ হিফজ করেছিলেন। তারপরও বিনয় প্রকাশ করে বলেছিলেন তার স্মরণশক্তি কম। আর ওস্তাদও ছাত্রকে বড় বুজুর্গ ছাত্র জানা সত্ত্বেও তাকে গোনাহ থেকে সতর্ক করেছেন, যা আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ নসিহত। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন যেন আমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার তাওফিক দান করেন, আমিন।

SHARE

Leave a Reply