Home প্রচ্ছদ রচনা ব্যতিক্রমী উদ্ভিদ ফ্লাইট্র্যাপ – জাহিদ ইকবাল

ব্যতিক্রমী উদ্ভিদ ফ্লাইট্র্যাপ – জাহিদ ইকবাল

সৃষ্টির শুরু হতে যেদিন পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চার শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে তাদের বৈচিত্র্যময়তার। পুরো পৃথিবীব্যাপী নানা জাতের নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী আছে যাদের সঠিক সংখ্যা জানাও মানুষের পক্ষে অসম্ভব।
বেঁচে থাকার জন্য এসকল উদ্ভিদ ও প্রাণী খাবারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সব প্রাণী পুষ্টির জন্য একই প্রকার খাবারের ওপর নির্ভর করে না। উদ্ভিদের ক্ষেত্রে প্রায় সকল উদ্ভিদেরই পুষ্টি গ্রহণ পদ্ধতি একই রকম হয়ে থাকে। অর্থাৎ এরা মাটি থেকে পানি ও খনিজ লবণ এবং বায়ু থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইডকে কাজে লাগিয়ে খাবার প্রস্তুত করে। কিন্তু কেমন হবে যদি কোনো উদ্ভিদ পুষ্টির জন্য প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল হয় অর্থাৎ সহজে বলতে গেলে প্রাণীদের ভক্ষণ করে! কথাটা অবাস্তব মনে হলেও পৃথিবীতে এমন উদ্ভিদ আছে যাদের মাংসাশী উদ্ভিদ বলে এবং এদের মধ্যে ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ একটি অন্যতম উদ্ভিদ।
ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের দেহেই রয়েছে কীটপতঙ্গের ফাঁদ। পাতা দেখতে চোয়ালের মতো। কপাটের মতো দু’টি পাতার চারপাশে রয়েছে ছোট ছোট কাঁটা। মাংসাশী উদ্ভিদ সারা বিশ্বময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও ফ্লাইট্র্যাপ কেবল আমেরিকার উত্তর ও দক্ষিণ ক্যারোলাইনার স্যাঁতস্যাঁতে জলাভূমি অঞ্চলেই পাওয়া যায়।

অন্যান্য উদ্ভিদের মতোই ফ্লাইট্র্যাপ মাটি থেকে পানি ও খনিজ লবণ অর্থাৎ পুষ্টি এবং বায়ু থেকে প্রয়োজনীয় গ্যাসীয় উপাদান সংগ্রহ করে। কিন্তু বাস্তবে এই পুষ্টি এই উদ্ভিদের জন্য অপ্রতুল এবং এরা মাটি ও বায়ু থেকে খুব কম পরিমাণ পুষ্টিই সংগ্রহ করে থাকে। সাধারণত যেসব পরিবেশে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মাত্রা কম, সেসব পরিবেশে এরা জন্মায়। উল্লেখ্য, নাইট্রোজেন এবং ফসফরাস উদ্ভিদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধারণা করা হয় এ কারণেই ফ্লাইট্র্যাপ বিকল্প পুষ্টির উৎস হিসেবে প্রাণীর প্রতি নির্ভর করে।
জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব উর্জবার্গের বিজ্ঞানীরা উদ্ঘাটন করেছেন ভয়ঙ্কর এ গাছটি সম্পর্কে নতুন একটি তথ্য। তারা জানান, ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের চুলটানা রেখার পাতায় যখন কোনো পোকা স্পর্শ করে তখন ফ্লাইট্র্যাপ স্পর্শগুলো গুনতে পারে।
সাধারণ উদ্ভিদ হতে ভিন্ন কিছু শারীরতত্ত্ব এবং বৈশিষ্ট্যময় অভিযোজনিক ক্ষমতার জন্য চার্লস রবার্ট ডারউইন তার ‘Insectivorous Plants’ নামক রচনায় একে পৃথিবীর সব থেকে অদ্ভুত উদ্ভিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যদিও তিনি এর অদ্ভুত খাদ্যগ্রহণ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতেন, কিন্তু কোনো সঠিক ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি।
এই উদ্ভিদে ৪ থেকে ৭টির মতো পাতা থাকে। এদের পাতা মূলত দুই অংশে বিভক্ত- সালোকসংশ্লেষণে সক্ষম, চ্যাপ্টা, হৃদপিণ্ডসদৃশ অংশ এবং দু’টি চ্যাপ্টা লোব যারা পাতার মধ্যশিরা বরাবর একসঙ্গে যুক্ত থাকে। বলা যায় লোব সদৃশ দু’টি পাতা একসাথে মিলে একটি পূর্ণাঙ্গ পাতা তৈরি করে। লোবের ভেতরের পৃষ্ঠে এন্থোস্যায়ানিন নামক পিগমেন্ট থাকে ফলে তা লাল বর্ণ ধারণ করে এবং এই পৃষ্ঠ মিউসিলেজ নিঃসরণ করে। লোব দু’টির মাঝে একটি ভাঁজ থাকে এবং এদের কিনারা জুড়ে থাকে ট্রিগার নামক কিছু সংবেদনশীল সুতাসদৃশ অংশ। এই ট্রিগার পাতার ফাঁদে আটকা পড়া শিকারকে পালিয়ে যেতে প্রতিরোধ করে।
এরা বুঝতে পারে যার স্পর্শ পেলো তা ভোজ্য উপকরণ নাকি মিথ্যা সংকেত। ফলে যখন এক, দুই, তিন করে পাঁচবার কোনো উদ্দীপক অর্থাৎ, কীটপতঙ্গ তার পাতায় স্পর্শ করে তখন সে উদ্দীপকের ওপর পাচক রস ক্ষরণ করে শুষে নেয় ও অবশিষ্টাংশ ফেলে দেয়।

ফ্লাইট্র্যাপের খাদ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া খুব মজার। পতঙ্গকে আকৃষ্ট করতে এরা এক প্রকার সুগন্ধী রস উৎপাদন করে এবং এই সুগন্ধের প্রলোভনে পতঙ্গ এগিয়ে যায় তার অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির দিকে। গবেষণায় দেখা যায়, ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের পাতায় যখন কোনো পোকা বসে তখন গাছটি প্রথম সঙ্কেত পেয়ে পাতার গায়ের কাঁটা দাঁড়িয়ে যায় ও কপাট বন্ধ করার প্রস্তুতি নেয়। দ্বিতীয় স্পর্শ পাওয়ার পর সে কপাট বন্ধ করে দেয়, এরপর আটকা পড়া শিকারের ওপর পাচক রস ছেড়ে দেয়। এই পাচক রস পোকার দেহকে গলিয়ে দেয়। যদি পতঙ্গটি খুব ছোট হয় তখন লোব দু’টি আস্তে আস্তে বন্ধ হয় যেন পতঙ্গটি বেরিয়ে যেতে পারে।
এর কারণ এই যে ক্ষুদ্র পতঙ্গ থেকে খুব কম পরিমাণ পুষ্টিই পাওয়া যায়। তবে কোনো পতঙ্গ না হয়ে যদি কোনো জড় পদার্থ এই ফাঁদে প্রবেশ করে তাহলে ফাঁদটি ১২ ঘণ্টার মধ্যেই আবার খুলে যায়।
কিন্তু যদি পতঙ্গ আকারে বড় হয়ে যায়, তখন ফাঁদ সহজে এবং সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হতে পারে না। ফলে পতঙ্গটি বেরিয়ে আসতে পারে। এতে করে ব্যাকটেরিয়া ভেতরে প্রবেশ করে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো সিলিয়াকে আক্রমণ করে এবং পাতাকে পচিয়ে ফেলে। পরিশেষে আক্রান্ত পাতাটি ঝরে যায়।
পতঙ্গের বহিরাবরণ বা কঠিন অংশগুলো উদ্ভিদ হজম করতে পারে না। প্রায় পাঁচ থেকে বারো দিনের মধ্যে পরিপাকক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং পাতাটি পুনরায় উন্মুক্ত হয় নতুন পতঙ্গের অপেক্ষায় ।
কঠিন ও অপাচনযোগ্য অংশগুলো পরে বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যায় বা বায়ুপ্রবাহের দ্বারা উড়ে যায়। লোব হতে অ্যান্টিসেপ্টিক রসও ক্ষরিত হয় যা মৃত পতঙ্গটিকে প্রায় ১২ দিন পর্যন্ত সংরক্ষিত ও জীবাণুমুক্ত রাখে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে যদি কেউ উদ্ভিদটিকে খাওয়াতে কোনো মৃত পতঙ্গ এর পাতার ফাঁদে দেয়, তাহলে লোবগুলো বন্ধ না-ও হতে পারে। কারণ জীবন্ত পতঙ্গের নড়াচড়ার কারণেই লোবের ট্রিগার বন্ধ হয় এবং লোব ভাঁজ হয়ে যায়। যেহেতু মৃত পতঙ্গ নড়াচড়া করতে অক্ষম, সেহেতু লোব বন্ধ হতে পারে না। তবে মৃত পতঙ্গটিকে যদি নাড়াচাড়া করানো হয় তখন ফাঁদ বন্ধ হতেও পারে।
গঠনগত এবং বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতার কারণে এই গাছের প্রতি সবার আকর্ষণ বেশি। ভ্রমণকারীরা ভালো লাগার কারণে এই উদ্ভিদগুলো অতিরিক্ত মাত্রায় সংগ্রহ করে যার ফলে এই গাছটি আজ বিলুপ্তির পথে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে গ্রিন হাউজের ভেতর এই উদ্ভিদের চাষ করে সংগ্রহ করা হচ্ছে।

SHARE

Leave a Reply