Home ফিচার কুয়াশার চাদর জড়িয়ে এসেছে শীত – হারুন ইবনে শাহাদাত

কুয়াশার চাদর জড়িয়ে এসেছে শীত – হারুন ইবনে শাহাদাত

ছয় ঋতুর আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। শীতকাল বঙ্গাব্দ বর্ষপঞ্জি অনুসারে পাঁচ নম্বর ঋতু। ফুলে-ফলে শোভিত ঋতুরাজ বসন্তের আগে বর্ষপরিক্রমায় শীত আসে তার নিজস্ব সৌন্দর্য নিয়ে। পৌষ এবং মাঘ এই দুই মাস শীতকাল। এই সময় বাংলাদেশের প্রকৃতি কুয়াশার চাদর জড়িয়ে থাকলেও রঙ আর রূপের কমতি থাকে না। বাংলাদেশের প্রকৃতিতে শীতকাল আসে কুয়াশার চাদরে জড়িয়ে উপহারের ডালি নিয়ে। গ্রামের শাক-সবজির বাগানগুলো ভরে ওঠে হলুদ সর্ষে ফুল, সবুজ পালং, লাল রঙের লাল শাক, লাল-সবুজ রঙের পাকা-কাঁচা টমেটো, লাউ, মুলা, গাজর, শালগমসহ নানান জাত আর নানান রঙের শাক সবজিতে।
ফুলের বাগানগুলোতেও সৌন্দর্য ছড়ায় রঙবেরঙের ফুল। যদিও অধিকাংশ ফুলের আদি জন্মস্থান এ দেশে নয়। মূলত শীতপ্রধান দেশ থেকে এনে এ দেশের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া হয়েছে। এসব ফুলের মধ্যে অন্যতম হলো- ডালিয়া, ক্রিসেন্থেমাম, বাটন, কারনেশন, জিনিয়া, কসমস, পিটুনিয়া, হলিহক, এস্টার, সুইটপি, ফ্লকস্, পর্টুলেখা, ভার্বেনা… সবই অন্য দেশের ফুল। তবে বিদেশী ফুলগুলো এ দেশের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে বলে আমাদের বড় সমাদরের ধন হয়ে উঠেছে। এ দেশে জন্মাতে জন্মাতে এরা যেন এ দেশের শীত মৌসুমের ফুল হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো ফুলের চমৎকার বাংলা নামকরণ করা হয়েছে। ঐ ফুলগুলো এখন পুরোপুরি আমাদের বাংলাদেশী। যেমন ক্রিসেন্থেমামের নাম দেয়া হয়েছে ‘চন্দ্রমল্লিকা’, বাটনকে বলা হয় ‘বোতাম’ ফুল। আর ডালিয়া, কসমস, ক্যালেন্ডুলা, পিটুনিয়া নিজ নিজ নামে জন্ম-জন্মান্তরের চেনা। শীত মৌসুমে এ দেশের দু-চারটি নিজস্ব ফুলও রয়েছে। কৃষ্ণকলি, গাঁদা, দশবাইচণ্ডী… ইত্যাদি। শীতকালের ফুলের মধ্যে কয়েকটি ফুল এ দেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে গাঁদা, ডালিয়া, কসমস, চন্দ্রমল্লিকা, সালভিয়া উল্লেখযোগ্য। এ দেশে জন্মানো ফুলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় গাঁদা ফুল। বিভিন্ন রঙ ও প্রজাতির গাঁদা ফুল রয়েছে। কোনোটা ঝলমলে হলুদ, কোনোটা হলদে কমলায় মেশানো, কোনোটা দেখতে একেবারে কমলা রঙের, আবার হলুদ পাপড়ির থোকার মধ্যে খয়েরি রঙের পাপড়িও কিছু রয়েছে। লাল গাঁদাও চোখে পড়ে কখনও কখনও। ফুলের আকার আকৃতির পার্থক্যও একেবারে কম নয়। কোনোটা ছোট তো কোনোটা বেশ বড়। হাইব্রিড গাঁদার গাছগুলো মাঝারি আকৃতির, আঁটোসাঁটো এদের গড়ন। ফুল বেশ বড় বড় এবং জীবনকালও অন্য গাঁদার চেয়ে বেশি। কৃষ্ণকলি হল বাংলাদেশের শীত মৌসুমের নিজস্ব ফুল। হাত দেড়েক উঁচু গাছে ছোট ছোট ফুল ফোটে। কোনোটির রঙ সাদা আবার কোনোটির রঙ গোলাপি। ফুলটির নাম কেন কৃষ্ণকলি হলো সে এক গবেষণার বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন অনেক গবেষক।
বাংলার নিজস্ব প্রজাতির আরেক ফুল হলো দশবাইচণ্ডী। নামটা বিদঘুটে হলেও ফুলটি দেখতে খুবই সুন্দর। ছোট ছোট গাছের দেহজুড়ে প্রজাপতির মতো দেখতে এক একটি ফুল ফোটে। ফুলের রঙ সাধারণত নীল। তবে হলুদ ও গোলাপি রঙের ফুলও দেখা যায়। বাংলাদেশের শীত মৌসুমের নিজস্ব ফুল কম হলেও বিভিন্ন দেশের ফুল চমৎকারভাবে মানিয়ে গেছে এ দেশের পরিবেশের সঙ্গে। পরিকল্পিতভাবে ফুলের গাছ লাগাতে পারলে কনকনে শীত মৌসুমেও হেসে উঠবে বাগান, আনন্দে উৎফুল্ল হবে মন। চারদিক তখন বাহারি রঙের ফুটন্ত ফুলের আভায় হয়ে উঠবে রঙিন। শুধু কি ফুল? মিষ্টি স্বাদের খেজুরের রস এবং মজার মজার ফলের ডালাও নিয়ে আসে শীতকাল। খেজুরের রস, পিঠা-পায়েস যেন শীতের কনকনে ঠাণ্ডাকেও মিষ্টি করে তোলে। তেমনি আমাদের রসনাকে আরও মিষ্টি করে তোলে শীতের ফল। এ ঋতুর কমলা, কুল, সফেদা, জলপাই, ডালিম, আমলকী ফল মুখের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। এসব ফল ভিটামিন, মিনারেল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও নানা ফাইটো নিউট্রিয়েন্টে ভরপুর থাকে।
আমরা যারা গরম কাপড় কিংবা রুম-হিটারের উষ্ণতার মধ্যে আরামে থাকি তাদের জন্য শীতকাল মজার এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না তাদের কথা যারা তীব্র শীতের সকাল কিংবা রাতে একটু উষ্ণতার অভাবে মৃত্যুর মুখামুখি দাঁড়িয়ে থাকে। আল্লাহর এই অসহায় বান্দাদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব আমাদের সবার। যার যতটুকু সামর্থ্য আছে তাই নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলের এবং শহরের বস্তি আর গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ ও মহিলারা শীতের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে ঠাণ্ডাজনিত নানান রোগে আক্রান্ত হয়, চিকিৎসা ও পথ্যের অভাবে অনেকে মারাও যায়। তোমাদের অতিরিক্ত অথবা পুরনো শীতবস্ত্রগুলো তাদের হাতে তুলে দিলে তারা শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচবে। তোমাদের এই সামান্য সহযোগিতার মূল্য অনেক। তোমাদের আনন্দ আয়োজনের বাজেটে এই বঞ্চিত মানুষদেরও রাখবে।
শীত উপভোগ করতে তোমরা অনেকেই হয়তো যাবে সাগরসৈকত অথবা পাহাড়ে পিকনিক কিংবা শিক্ষাভ্রমণের জন্য তোমাদের এই আনন্দ আয়োজন। এই আনন্দ আয়োজনের বাজেটের একটি অংশ যদি অসহায় মানুষদের জন্য খরচ করো, এতে তোমাদের আনন্দ কমবে না, বরং আরো বরকতময় হবে মহান আল্লাহর রহমতে।
আর একটি কথা, শীতকালে ঠাণ্ডাজনিত রোগ থেকে নিজেকে বাঁচাতে মা-বাবার পরামর্শ মতো চলবে। শীতের কাপড় না পরে বাহাদুরি দেখাতে যাবে না কিন্তু।

SHARE

Leave a Reply