Home খেলার চমক হ্যাটট্রিকের গল্প – আবু আবদুল্লাহ

হ্যাটট্রিকের গল্প – আবু আবদুল্লাহ

হ্যাটট্রিকের গল্প - আবু আবদুল্লাহহ্যাটট্রিক শব্দটি শুনলেই যে খেলার কথা মনে আসে সেটির নাম ক্রিকেট। ফুটবল, হকিসহ অনেক খেলাতেই হ্যাটট্রিক কথাটির প্রচলন রয়েছে, তবে ক্রিকেটের কল্যাণেই শব্দটি সর্বাধিক জনপ্রিয় হয়েছে। ক্রিকেটে কোন বোলার পরপর তিন বলে উইকেট নিতে পারলে সেটিকে হ্যাটট্রিক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। একজন বোলারের জন্য এটি খুবই গৌরবময় একটি কীর্তি। ফুটবল বা হকিতে একজন খেলোয়াড় এক ম্যাচে তিন বা তার বেশি গোল করতে পারলে হ্যাটট্রিকের স্বীকৃতি পান। বন্ধুরা, এই লেখায় আমরা তোমাদের জানাবো ক্রিকেটের হ্যাটট্রিক নিয়ে কিছু তথ্য।

যেভাবে উৎপত্তি

হাটট্রিকের উৎপত্তি ক্রিকেট থেকেই। ক্রিকেটাররা প্রায়ই হ্যাট (যার বাংলা সাহেবি টুপি) পরে মাঠে নামেন। এই হ্যাট থেকেই হ্যাটট্রিকের উৎপত্তি। ঘটনাটি ১৮৫৮ সালের। এক প্রীতিম্যাচে ইংল্যান্ডের কাউন্টি দল সারের বোলার এইচ এইচ স্টিফেনসন বিপক্ষ দলের তিন ব্যাটসম্যানকে পরপর তিন বলে আউট করেন দিলেন। এই কৃতিত্বের পর সমর্থক ও আয়োজকেরা চাঁদা তুলে তাকে উপহার দেয় দামি একটি হ্যাট বা টুপি। এই হ্যাট নিয়ে তিনি সবাইকে অভিবাদন জানান। হ্যাট উপহার পাওয়ার সেই ঘটনাটি থেকেই ধীরে ধীরে বিষয়টির নাম হয়ে যায় হ্যাটট্রিক।

হ্যাটট্রিকের গল্প - আবু আবদুল্লাহপ্রথম হ্যাটট্রিক

প্রথম হ্যাটট্রিক পাওয়ার জন্য ক্রিকেট বিশ্বকে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। ইতিহাসের তৃতীয় টেস্টেই প্রথম হ্যাটট্রিকটি করে ইতিহাস গড়েন অস্ট্রেলিয়ার ফ্রেডরিক স্পোফর্থ। দিনটি ছিল ১৮৭৯ সালের ২ জানুয়ারি। মেলবোর্নে ইংল্যান্ডের ভার্নন রয়াল, ফ্রান্সিস ম্যাকিনন ও টম এমেটকে আউট করে ইতিহাস গড়েন স্পোফর্থ।
একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেন পাকিস্তানের জালালউদ্দিন। ১৯৮২ সালে তিনি পাকিস্তানের হায়দ্রাবাদে এক ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার রডনি মার্শ, ব্রুশ ইয়ার্ডলি ও লসনকে আউট করেন।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে প্রথম হ্যাটট্রিকটি হয় বাংলাদেশের বিপক্ষে। ২০০৭ সালের প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সুপার এইট পর্বে অস্ট্রেলিয়ার পেসার ব্রেট লি পরপর তিন বলে সাকিব আল হাসান, মাশরাফি মর্তুজা ও অলোক কাপালিকে আউট করেন।

ওয়াসিম আকরাম ও লাসিথ মালিঙ্গা

টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটে দু’টি করে হ্যাটট্রিক করেছেন পাকিস্তানের কিংবদন্তি পেসার ওয়াসিম আকরাম। এ ছাড়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও দু’টি হ্যাটট্রিক আছে রিভার্স সুইংয়ের জনকের, তার একটি আবার কাউন্টি ক্রিকেটে। সব মিলে স্বীকৃত ক্রিকেটে তার হ্যাটট্রিক ছয়টি। তাই হ্যাটট্রিক নিয়ে আলোচনা হলে তার নামটি সবার আগে উচ্চারিত হয়। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের প্রচলন হওয়ার আগেই ওয়াসিম অবসর নিয়েছেন। তাই এই ফরম্যাটে তার হ্যাটট্রিক থাকার প্রশ্নই আসে না।
হ্যাটট্রিকের গল্প - আবু আবদুল্লাহহ্যাটট্রিকের আলোচনায় অবশ্য শ্রীলঙ্কার পেসার লাসিথ মালিঙ্গাও আছেন তার পাশেই। একটি দিক দিয়ে বরং মালিঙ্গাই এগিয়ে। সেটি হলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মালিঙ্গার মোট হ্যাটট্রিক পাঁচটি। ওয়ানডেতে তিনটি ও টি-টোয়েন্টিতে দু’টি। তবে টেস্ট ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মালিঙ্গার হ্যাটট্রিক না থাকার কারণে বিশ্লেষকরা ওয়াসিম আকরামকেই এগিয়ে রাখেন।
টেস্টে ওয়াসিম আকরামের দু’টি হ্যাটট্রিক একই দলের বিপক্ষে পরপর দুই ম্যাচে। ১৯৯৯ সালের মার্চে লাহোরে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তৃতীয় ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করার পর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ফাইনালে আবারো একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একই কীর্তি গড়েন। ওয়াসিম আকরামের টেস্ট হ্যাটট্রিক দু’টি যেমন একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে, ওয়ানডে হ্যাটট্রিক দু’টি আবার একই ভেন্যুতে, ছয় মাসের ব্যবধানে। শারজায় ১৯৮৯ সালের অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ও পরের বছর মে মাসে এশিয়া কাপের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গড়েন হ্যাটট্রিকের কীর্তি।
হ্যাটট্রিকের গল্প - আবু আবদুল্লাহমালিঙ্গা আরেকটি জায়গায় এগিয়ে আছেন তা হল বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করে। ওয়াসিম আকরামের বিশ্বকাপে কোন হ্যাটট্রিক নেই। মালিঙ্গার তিন ওয়ানডে হ্যাটট্রিকের দুটিই বিশ্বকাপে। ২০০৭ আসরে গায়ানায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ও ২০১১ বিশ্বকাপে কলম্বোয় কেনিয়ার বিপক্ষে। ৫ মাস পরে একই মাঠে সফরকারী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করেছেন আরেকটি হ্যাটট্রিক।

মোট হ্যাটট্রিক

১ নভেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে হ্যাটট্রিক হয়েছে মোট ৪৪টি। এর মধ্যে দু’টি করে আছে, অস্ট্রেলিয়ার জিমি ম্যাথুস ও হাগ ট্রাম্বল, পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরাম ও ইংল্যান্ডের স্টুয়ার্ড ব্রডের। এদের মধ্যে ম্যাথুস দু’টি হ্যাটট্রিকই করেছেন একই ম্যাচের দুই ইনিংসে। বাংলাদেশীদের মধ্যে টেস্টে হ্যাটট্রিক আছে অলক কাপালির (পেশোয়ারে পাকিস্তানের বিপক্ষে-২০০৩) ও সোহাগ গাজীর (চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে-২০১৩)।
একই দিন পর্যন্ত ওয়ানডে ক্রিকেটে হ্যাটট্রিক হয়েছে মোট ৪৭টি। এর মধ্যে লঙ্কান পেসার লাসিথ মালিঙ্গা একাই করেছেন তিনবার। এ ছাড়া ওয়াসিম আকরাম, সাকলায়েন মুশতাক ও চামিন্দা ভাস করেছেন দুই বার করে। দেশের হিসেবে এগিয়ে আছে শ্রীলঙ্কা। তাদের ছয়জন বোলার ওয়ানডেতে মোট নয়টি হ্যাটট্রিক করেছেন। আর পাকিস্তানের ছয়জন বোলার করেছেন ৮টি হ্যাটট্রিক। বাংলাদেশী বোলারদের মধ্যে শাহাদাৎ হোসেন, আব্দুর রাজ্জাক, রুবেল হোসেন, তাসকিন আহমেদ ও তাইজুল ইসলাম ওয়ানডেতে একটি করে হ্যাটট্রিক করেছেন।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে হ্যাটট্রিক হয়ছে মোট ১১টি। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার লাসিথ মালিঙ্গার দু’টি। মালিঙ্গা (একবার) ও রশিদ খান পরপর চার বলে ৪ উইকেট নিয়েছেন। যেটিকে বলা হয় ‘ডাবল হ্যাটট্রিক’। একই ধরনের কীর্তি মালিঙ্গা ওয়ানডেতেও একবার গড়েছেন (২০০৭ বিশ্বকাপ)।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে (ঘরোয়া ৪ দিনের ম্যাচ) সবচেয়ে বেশি হ্যাটট্রিক ইংলিশ কাউন্টি দল কেন্টের ডাগ রাইটের। ৪৯৭ ম্যাচ খেলে ৭টি হ্যাটট্রিক করেছেন এই মিডিয়াম পেসার। ১৯৩৮ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে ৩৪টি টেস্ট খেলেছেন তিনি।

হ্যাটট্রিকের গল্প - আবু আবদুল্লাহবিচিত্র হ্যাটট্রিক

ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোর্টনি ওয়ালশের হ্যাটট্রিকটি বেশ মজার। তিনি হ্যাটট্রিক করেছিলেন এক ম্যাচের দুই ইনিংস মিলিয়ে। ১৯৮৮ সালের নভেম্বরে ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসের শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে টনি ডডিমেডকে আউট করেছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসের প্রথম দুই বলে মাইকেল ভেলেট্টা ও গ্রায়েম উডকে ফিরিয়ে কীর্তি গড়েন ওয়ালশ। এ ছাড়া তারই স্বদেশী জারমেইন লসনও হ্যাটট্রিক করেছেন দুই ইনিংস মিলিয়ে এবং সেটিও অস্ট্রেলিয়ারই বিপক্ষে। ২০০৩ সালে মে মাসের শুরুতে তিনি ব্রিজটাউনে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসের শেষ দুই বলে ব্রেট লি ও স্টুয়ার্ট ম্যাগগিলকে আউট করেন। দ্বিতীয় ইনিংসের প্রথম বলেই ফেরান ওপেনার জাস্টিন ল্যাঙ্গারকে।
তবে আরো মজার একটি হ্যাটট্রিক আছে অস্ট্রেলিয়ার মার্ভ হিউজের। তিনি হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিন ওভার মিলিয়ে। কি! বিশ্বাস হচ্ছে না? শোন তাহলে- ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে পার্থ টেস্টের দ্বিতীয় দিনে তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের কার্টলি অ্যাম্ব্রোসকে আউট করেন ব্যক্তিগত হিসেবে ৩৬তম ওভারের শেষ বলে। সেটি ছিল অষ্টম উইকেট। এর পরের ওভারে বল করতে এসে টিম মে নবম উইকেটের পতন ঘটান গাস লোগিকে আউট করে। ব্যক্তিগত ৩৭তম ওভার করতে এসে প্রথম বলেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের শেষ ব্যাটসম্যান প্যাট্টিক প্যাটারসনকে আউট করেন হিউজ। ফলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস শেষ হয়ে যায়। হিউজও পান পরপর দুই বলে দুই উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসের প্রথম ওভারের প্রথম বলেই তিনি গর্ডন গ্রিনিজকে আউট কর গড়েন অবিশ্বাস্য সেই হ্যাটট্রিকের কীর্তি।

হ্যাটট্রিকের গল্প - আবু আবদুল্লাহআরো কিছু তথ্য

১. পাকিস্তানের আকিব জাভেদ সবচেয়ে কম বয়সী হিসেবে হ্যাটট্রিক করেছেন (১৯ বছর ৮১ দিন)।
২. সংযুক্ত আরব আমিরাতের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলা পাকিস্তানি ক্রিকেটার জহুর খান আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে এক ম্যাচে পরপর তিন উইকেট নিলেও মাঝখানে একটি ওয়াইড বল করেন (কট, বোল্ড, ওয়াইড, এলবিডব্লিউ)। যার কারণে সেটিকে হ্যাটট্রিক হিসেবে ধরা হয়নি।
৩. ভারতীয় সাবেক পেসার ইরফান পাঠান টেস্ট ক্রিকেটে দ্রুততম হ্যাটট্রিক করেন। করাচিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে তিনি প্রথম ওভারের শেষ তিন বলে সালমান বাট, ইউনুস খান ও মোহাম্মদ ইউসুফকে আউট করে। ওয়ানডেতে দ্রুততম হ্যাটট্রিক চামিন্দা ভাসের। ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে ইনিংসের প্রথম তিন বলেই হান্নান সরকার, মোহাম্মাদ আশরাফুল ও এহসানুল হক সেজানকে আউট করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন ভাস।
৪. ওয়ানডেতে ওয়াসিম আকরামের ২ হ্যাটট্রিকের সবগুলোই ছিল বোল্ড আউট।
হ্যাটট্রিকের গল্প - আবু আবদুল্লাহ৫. ইংল্যান্ডের মরিস অ্যালম (১৯৩০), নিউজিল্যান্ডের পিটার প্যাথেরিক (১৯৭৬) ও অস্ট্রেলিয়ার ড্যামিয়েন ফ্লেমিং (১৯৯৪) নিজ নিজ অভিষেক টেস্টেই হ্যাটট্রিক করেন।
৬. প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করেছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটার জোগিন্দর সিং রাও। দ্বিতীয় ম্যাচে দু’টি হ্যাটট্রিক করেন তিনি, সেটিও আবার এক ইনিংসে। অর্থাৎ প্রথম দুই ম্যাচেই তিন হ্যাটট্রিক। অথচ ৫ ম্যাচ পরেই তার ক্যারিয়ার থেমে যায়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই অফিসার প্যারাস্যুট জাম্প ট্রেনিংয়ে আহত হয়ে ক্রিকেট খেলা ছাড়তে বাধ্য হন। ইংলিশ ক্রিকেটার অ্যালবার্ট ট্রটও কাউন্টি ক্রিকেটে মিডল সেক্সের হয়ে এক ইনিংসে দু’টি হ্যাটট্রিক করেছিলেন।
৮. বিশ্বকাপে মোট হ্যাটট্রিক হয়েছে ১১টি।

SHARE

Leave a Reply