Home উপন্যাস ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস ডাব্বু দ্য গ্রেট – ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

ডাব্বু দ্য গ্রেট – ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

ডাব্বু দ্য গ্রেট - ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থগত সংখ্যার পর

সৌম্য অফিস থেকে ফিরে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। এইটুকুন ছেলের কথা শুনে অবাক হয়ে যান।
– কি বললি রে ডাব্বু? অবোলা? এর মানে তুই জানিস? দুই কাঁধ নাচিয়ে শ্রাগ করে বলে, অফ কোর্স পাপা।
অবোলা মানে যারা বলতে পারে না- ভয়েসলেস। ম্যাম বলেছেন, অবোলা জীব মানে মিউট অ্যানিমেলস।
সোমনাথ, বন্ধু সরফরাজের সঙ্গে কথা বলে বলে আজকাল অনেক হিন্দি শব্দ বলেন। বিশেষ করে খুশিতে থাকলে।
ডাব্বুর কথা শুনতে শুনতে তার কোটরে ঢোকা ফ্যাকাসে দু’টি চোখ খুশিতে চকচক করে ওঠে।
– ক্যায়া বাত গোল্লু।
চিন্টু বলে, – ও দিদি, তোর ছেলের আইকিউ কত রে। ডাব্বু বলতে থাকে, – পুষি ক্যাটও তো অবোলা জীব ছিল, ওকে কষ্ট দিয়ে ড্রাইভার আংকেল মেরে ফেলল কেন?
সৌম্য গম্ভীর স্বরে বলেন, যা হয়ে গেছে তা নিয়ে ভাবতে নেই সোনা। তাহলে তুমি এগোবে কী করে? এখন ময়না পাখিটাকে যত্ন করো-
– ঠিক কথা, ঠিক কথা।
ব্যালকনির ছাদে ঝুলিয়ে রাখা খাঁচা থেকে ময়নাটি রিনরিনে সরে বলে ওঠে।
হাসির ঝড় বয়ে যায় ঘরে।
ঠিক সময়ে ঠিক কথাটি বলতে শিখেছে ময়না পাখিটি। রিনরিনে গলায় আবার বলে, গুড নাইট, গুড নাইট।
পাখিটিকে দেখতে দেখতে গুনগুন করে গাইতে থাকে রিনা।
‘কোয়েলিয়া গান থামা এবার
তোর ঐ কুহু তান ভালো লাগে না আর।’
বিড়ালটির কথা খুব মনে পড়ছে তার। মাছ ভাজা চুরি করলে কিংবা দুধের হাঁড়িতে মুখ দিলে কত দূর ছাই করেছেন। অবোলা জীবের জন্য লুকিয়ে কাঁদতে থাকে রিনা।

সন্ধ্যায় খুব মন দিয়ে পড়তে বসেছে ডাব্বু। এমন সহজে দেখা যায় না। বিস্কিট দিয়ে গলগল করে দুধও খেয়ে নেয় সে।
স্কুলের ছুটি শুরু হয়েছে। রমজানের ছুটি। একটু আগে ফ্ল্যাটের যমজ দু’বোন অথৈ-তাথৈ, পাঁচতলার মাহী দোতলার ফয়সালের সঙ্গে ছাদে ওঠে দেখে এসেছে চাঁদ। সবার সঙ্গে লাফালাফি করে আনন্দ ভাগ করে নিয়েছে ডাব্বু।
এবাড়ি ওবাড়ি থেকে আনন্দের হাসি-গান ভেসে আসছে। রাস্তা থেকে ভেসে আসছে আনন্দের শোরগোল। কাল প্রথম রোজা শুরু হবে। খুশিতে বুকের ভেতর টইটম্বুর হয়ে উঠছে ওর।
দুপুরের পর থেকে বাতাসে ভেসে আসে ইফতারি বানানোর লোভনীয় গন্ধ। মাঝে মাঝে কারো না কারো বাড়ি থেকে ইফতারি আসে। পাপাও মাঝে মধ্যে আলুর চপ বেগুনি নিয়ে আসেন। মা অল্প তেল বা ঘিয়ে মুড়ি ভেজে আনেন। মুচমুচে মুড়ি দিয়ে চপ বেগুনি মেখে খেতে দারুণ লাগে। ডাব্বু খেয়াল করে দেখেছে অন্য সময় এ খাবার খেতে তেমন ভালো লাগে না, তবে রমজানের সময় এ খাবার ভীষণ মজাদার মনে হয়।
স্কুলে যাবার তাড়া নেই, ঢিমে তালে হোমওয়ার্ক করছে ডাব্বু।
রিনা বলে, ছুটির প্রথম দিকে হোমটাস্ক শেষ করে নাও ডাব্বু, শেষের দিকে রিল্যাক্স করতে পারবে।
মায়ের কথা শুনে তাই করছে ও।
মায়ের স্কুল ছুটি, পাপা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসেন। রোজই কিছু না কিছু মজাদার ইফতারির প্যাকেট তার হাতে থাকে।
মা বলে, খুব ভালো লাগছে না এখন?
– হ্যাঁ মা।
– উৎসব এলে এমনই হয়, সবাই হাসি খুশি থাকে। বাতাসেও একটা ছুটি ছুটি গন্ধ থাকে।
গোঁজ হয়ে হোমটাস্ক করতে করতে ডাব্বু বলেছে, ঠিক বলেছ মা।
সরফরাজ আংকেল আর রবিউল আংকেলের সাথে দাদানের জমাটি আড্ডা হয়। দাবা খেলা তো হয়ই, ক্যারাম আর লুডো খেলেন তিনজন মিলে, ডাব্বুও খেলার শরিক হয়।
ক্যারামের রেড ফেলে দিয়ে কিংবা লুডোর ছক্কা মারলে রবিউল বলেন, ডাব্বু তুই আর তোর দাদান মিলে চোট্টামি করছিস কিন্তু।
সরফরাজ বলেন, দাদা খেলাটা তো ব্রেনের খেলা, এখন আর এটা রোজ রোজ খেলব না। এখন ক্যারাম খেলাই হোক। তবে রবিউল, তুম ভি সাচ্চা আদমি নেহি হ্যায়। রেড তো, আঙুল দিয়ে ফেলে দিয়েছ।
রবিউল রেগে বলেন, ইয়ু আর লাইয়িং।
বাসাটা এখন সারাক্ষণ সরগরম থাকে।
ময়নার নাম রাখা হয়েছে মিঠুয়া। সে বলে ওঠে, ঝগড়া করো না গো, ঝগড়া করো না।
সবাই হেসে ওঠে।
এর মাঝে নিরুপিসি নির্মলকাকুকে নিয়ে চলে এলেন। কী আশ্চর্য ব্যাপার! ডাব্বুর মনের ইচ্ছেগুলো কী করে যেন পূরণ হয়ে যায়।
কী দারুণ ব্যাপার! এত আনন্দ, কোথায় রাখে ডাব্বু? রিনা বলে, নিরুপিসি তুমি এসেছ ভালোই হয়েছে। একদিন সবার বাসায় ইফতারি পাঠাতে হবে।
ডাব্বুর দারুণ ভালো লাগে। খুব আনন্দের আমেজ চারদিকে। মিঠুয়া হঠাৎ করে কথা বলে সবাইকে অবাক করে দেয়।
প্রায়ই বিকেলে কেউ না কেউ পেঁয়াজু ছোলা বেগুনি পাঠায়। মা আর নিরুপিসি মিলে নারকেলের নাডু, লুচি, ক্ষীরপুলি, পাটিসাপটা পিঠে আর বিন্নিচালের পায়েস তৈরি করে পাঠান।
বিনিমাসীর সাথে ডাব্বু গিয়ে ইফতারি দিয়ে আসে। গাজালা আন্টি হেসে বলেন, কিতনা আচ্ছা ইফতারি লেআয়া বেটা।
কাছাকাছি যাদের সঙ্গে পরিচয় ওদের বাড়িতে আলী দিয়ে আসে।
রবিউল দাদানের বাড়িতে নির্মলকাকু আর ডাব্বু যায়। রবিউল দাদান দিদুনকে খুশিভরা গলায় ডাকেন,
– অ্যাই এসো না, কত কিছু নিয়ে এসেছে ডাব্বু।
রাতে জানালা দিয়ে সরফরাজ বলেন, তুমহারি ইফতারি লাজবাব থি রিনা।
ঈদে অনেকগুলো ড্রেস হয়েছে ডাব্বুর। ওর অনেক কিছু আছে, তবে কেউ আদর করে কিছু দিলে অন্যরকম আনন্দ হয়।
খুশির দিনগুলো তরতর করে ফুরিয়ে গেল। চান রাতে ছুটোছুটি করে রাত দশটা বেজে যায়।
ঈদের দিন সরফরাজ দাদানের বাড়ি থেকে এলো- পোলাও কোরমা ঝালমাংস আর ফিরনি। বাদামকুচো জাফরান আর গোলাপজল দেয়া ফিরনি বার বার খেয়ে আশ মেটে না ডাব্বুর।
দু’তিন দিন পর মন খারাপ করে ও বলে, ছুটি ফুরিয়ে গেল মা।
নিরুদিদুন বলে, সে তো ফুরাবেই।
আবার স্কুল আবার হোমওয়ার্ক, কাঁচা ভোরে উঠে স্কুল ড্রেস পরে ডিম পাউরুটি-মাখন অল্প চিবিয়ে গিলে খেয়ে নেয়া। ওয়াটার বটল গলায় ঝুলিয়ে মায়ের সাথে রিকশায় ওঠে স্কুলে যাওয়া- ভাবতে ভাবতে মন খারাপের মেঘ ছুঁয়ে যায় ওকে। চোখের পাতা ভিজে ওঠে ওর।
ডাব্বু ভেবেই পায় না- সুখের দিনগুলো এত তাড়াতাড়ি হুঁশ করে চলে যায় কেন?
শনিবার; শেষ ছুটির দিন। আজ কোনো তাড়া নেই। অফিস নেই, ডাব্বুর স্কুল নেই। রমজানের ছুটির পর আসছে কাল স্কুল খুলবে।
নিরুদিদুন বলল, সকালের খাবারটা ধীরে সুস্থে খাও ডাব্বু, কাল থেকে তো তোমার ছুটোছুটি শুরু হবে।
ডাব্বু বলে, কালকে কিন্তু মনে করে মিঠুয়াকে হলুদ মাখা ভাত খেতে দিও।
– সে তোমার ভাবতে হবে না। পুলকো লুচির সাথে মিশেল সবজি আর খইয়ের পায়েস।
সোমনাথ ডাকেন, নিরু তুইও আয়। এক সঙ্গে বসে খাই।
ফুলকো লুচিতে আঙুল ছোঁয়াতেই গরম ধোঁয়া বের হতে থাকে। এ যেন এক ম্যাজিক।
সৌম্য বলেন, পিসি, আমাকে আর একটু সবজি দাও, দারুণ হয়েছে।
ডাব্বু বলে, আমাকেও দাও দিদুন।
যত পাই, তত খাই
আরও চাই আরও চাই-
দিদুন বলে, খাওয়ার সময় এত কথা বলে না দাদু, বিষম খাবে।
চিন্টু বলে, নিরুপিসির রান্নার লোভে আমি কিন্তু আসি। চামচ দিয়ে মুখে খইয়ের পায়েস দিয়ে ডাব্বু বলে, ফ্যানটাসটিক দিদুন। দারুণ হয়েছে। সরফরাজ দাদানকে ডাকি।
কেউ কিছু বলার আগেই জানালার পর্দা সরিয়ে ডাব্বু গলা চড়িয়ে ডাকে,- দাদান, ও সরফরাজ দাদান। জানালার ফ্রেমে সরফরাজের হাসিমুখ।
– হ্যাম রোটি-আন্ডা খাচ্ছে ডাব্বু।
– ওসব তোমার খেতে হবে না। তুমি এক্ষুনি চলে এসো।
– আভি?
– হ্যাঁ, এক্ষুনি।
ডাব্বুর অর্ডার মেনে নিতে হবে। দুই মিনিটের মাঝে উনি এসে হাজির।
খইয়ের পায়েসে চামচ ডুবিয়ে বলেন, ইয়ে পায়াস হ্যায় না? আরে বাহ্-
– পায়েস পায়েস দাদান, ঠিক করে বলো,
পায়েস মুখে দিয়ে আর কথা নেই। বাটি খালি হয়ে যায় নিমেষে। হাসি মুখে বলেন, লা জবাব নিরু বহেন। খই দিয়ে পায়াস হয়, মুঝে নেহি মালুম থা, আজ জানলাম।
হাসি-খুশি গল্পের মাঝখানে রিনা বলে, আগামীকাল রোববার ডাব্বুর স্কুল খুলবে, তোমাকে সোমবারে কিন্তু স্কুলে যেতে হবে।
সৌম্য বলেন, সোমবারে আমি চলে যাবো, অসুবিধের কিছু নেই।
ইংরেজি ক্লাসে ফুল আর ফলের নাম লিখতে লিখতে ডাব্বু ভাবে, পাপা কি স্কুলে এসে গেছে!
হ্যাঁ এসে গেছেন সৌম্য, আরও অনেক মাও এসেছেন। বরাবর রিনাই আসে, আজ এই প্রথম এসেছেন ডাব্বুর বাবা। ক্লাস টিচার বলেন, ওর পড়াশোনায় একেবারেই মন নেই মি. বোস।
– ছোট ছেলে, এ সময় তো এমনই করে।
– নো নো নট অ্যাট অল। ছেলের ফেভারে কথা বলবেন না, প্লিজ। হাসলেন টিপটিপ ম্যাম।
– যা প্রশ্ন করি, মাল্যবান জবাব দেয় তার উল্টোটা। প্রিন্সিপাল বলেন, নামটি চমৎকার, আনকমন। আচ্ছা বলুনতো কোন ভালো কাজের জন্য ওকে মালা পরানো হবে?
ছেলেমেয়ের জন্য অনেক কমপ্লেন শুনতে হচ্ছে মা-বাবাকে। কখনও চুপ করে, কখনও মৃদু গলায় ডিফেন্ড করার চেষ্টা করছেন ওরা।
মাথাটা গরম হয়ে উঠেছে সৌম্যের। আমার ছেলের নাম কী রাখব তা কি স্কুলের প্রিন্সিপাল ঠিক করে দেবে?
– ক্লাসে যখন পড়াই- মাল্যবান তখন জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে। একেবারেই মনোযোগ নেই। অংক আর ইংরেজিতে কত পেয়েছে জানেন? রিপোর্ট কার্ড দেখেননি?
সৌম্য সবার মুখগুলো দেখেন, মলিন মুখে মা-বাবারা বসে শুনছেন ছেলেমেয়েদের মার্কস আর স্বভাবের কথা। অদ্ভুত লাগছে সৌম্যের, এ জন্যই হয়তো রিনা গার্জেন কল করলে আসতেই চায় না। ছেলের জন্য মাথা নিচু করে থাকতে কার ভালো লাগে?
প্রিন্সিপাল ক্রিকেট বলের মত শক্ত মুখ বানিয়ে বলেন, অংকে তেরো, ইংরেজিতে বিশ- এমন যদি রেজাল্ট করে তাহলে কিন্তু আমরা টিসি দিতে বাধ্য হবো।
সৌম্য তেতে ওঠেন, – সাত-আট বছরের বাচ্চাদের আপনারা এভাবে ভয় দেখাবেন?
ম্যাডাম বলেন, ভয় কিসের? টেনশানে না রাখলে ওরা কি ঠিকঠাক মতো পড়াশোনা করবে?
সৌম্য বলেন, বাচ্চারা স্কুলে এসে আনন্দের সাথে পড়াশোনা করবে তা না করে আপনারা ওদের টেনশানে রাখবেন? বলছেন কী?
সৌম্যের সাথে আরও ক’জন মা-বাবা গলা চড়িয়ে বলেন, এ জন্যই বাচ্চারা স্কুলে আসতে চায় না। সৌম্য বলেন, স্যরি টু সে ম্যাডাম, এইটুকুন এইটুকুন বাচ্চাদের পরীক্ষা নিয়ে তারপর অ্যাডমিশন দেন, স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর ক্রমশ ওদের রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে, তার মানে হলো স্কুলে ঢোকার পর পড়াশোনার মাঝে ওরা কোনো আনন্দ পায় না।
আরেক জন মা বললেন, আমরাও কি ছোটবেলায় অল্প নম্বর পাইনি, এটা কোনো ব্যাপারই নয়।
অন্যজন বললেন, আপনারা পড়াচ্ছেন, স্টুডেন্ট বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে, এর মানে হলো পড়ানোর মাঝে ওরা কোনো আকর্ষণ পাচ্ছে না।
কিছুটা মনের অমিল হলো স্কুল-কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অভিভাবকদের, তারপর কিছুটা নমনীয় হলেন দু’পক্ষ, কী করে বাচ্চাদের উন্নতি হয় তাই ভাবা উচিত। এতে স্কুলের যেমন দায়িত্ব আছে, অভিভাবকদের দায়িত্ব কম নয়।
বাড়িতে রিনা খুব টেনশানে রয়েছে। কোনোদিন সৌম্য স্কুলে যাননি। ডাব্বুর কমপ্লেন শুনে কিভাবে রিঅ্যাক্ট করেছেন কে জানে!
নাহ- অফিস থেকে সৌম্য ফিরলেন অন্য দিনের মতো। বললেন, চা খাবো না, কফি দাও।
বাইরে ঝড়ো বৃষ্টি নেমেছে। আষাঢ় মাসে এমন বৃষ্টি হতেই পারে। এমন ভেজা ভেজা দিনে কফি খাওয়া চলতেই পারে।
তার মাথার ভেতরে পাঁক খাচ্ছে শুধু ডাব্বুর কথা। সে কি হাবলু গাবলু হবে? স্কুলে টিচারদের এত কমপ্লেন কেন- এ কথা ভেবে ভেতরে ভেতরে অস্বস্তিতে রয়েছেন সৌম্য।
সন্ধ্যাবেলা ডাইনিং স্পেসে সবাই মিলে গল্প করছে, নিরুপিসি থাকলে এমনই জমজমাট থাকে সারা বাড়ি। বেডরুমে শুয়ে। পত্রিকা পড়তে পড়তে ফের মনে পড়ে যায় ছেলের কথা। সৌম্যের ছেলেটা একটু অন্যরকম। পুষি ক্যাট মরে গেলে কেঁদে কেটে একসা হয়ে যায়। পাখিদের সঙ্গে একা একা কথা বলে।
কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, – বড় হয়ে তুমি কী হবে ডাব্বু? সে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বিজ্ঞানী হবে বলে না, ও বলে আমি শেফ হতে পারব তো দাদান?
– অবশ্যই পারবে।
সোমনাথ খুশিমাখা গলায় বলেছেন, তুমি ফাইভ স্টার হোটেলের শেফ হতে পারবে।
দাদান হাসতে হাসতে বলেছে, এই ছোট ছোট হাত একদিন বড় হবে, মজবুত হবে, নতুন নতুন রান্না এক্সপেরিমেন্ট করবে এই হাত দিয়ে সবাই খেয়ে বলবে, – ফ্যানটাসটিক, সুপার্ব।
রবিউল দাদান-নাতির এসব কথা শুনে বলেছেন, ফিউশন কুকিং করবে তুমি।
– ফিউশন মানে? এ ওয়ার্ড তো কখনো শুনিনি।
রবিউল বলেন, ধরো চাইনিজ নুডলস চিকেন-চিংড়ি মাছ-ডিম দিয়ে মিশিয়ে রিনা তৈরি করে দেয়, তুমি তা দিয়ে ফিরনি বা পায়েস তৈরি করলে।
– এভাবে হতে পারে? ছোট্ট ছেলের অবাক প্রশ্ন।
– হবে না কেন? বাংলাদেশের সঙ্গে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, শ্রীলঙ্কার রান্না মিশিয়ে কিছু একটা তৈরি করলে, যা খেতে ভালো লাগবে, সেটাই তো ফিউশন। গানে হয়, রান্নায় হবে না কেন?
বেডরুম থেকে এসব কথবার্তা প্রায়ই শোনেন সৌম্য। নতুন নতুন কথা শুনে স্বপ্ন জমেছে ডাব্বুর দু’চোখে। সোমনাথ বলেছেন, কারা খেতে যাবে জানিস?
সরফরাজ বলে ওঠেন, ইয়ে পাতলা দুবলা রবিউল, তোর এই বুড্ডা দাদান, আর হামি বাহাদুর সরফরাজ।
তিনজনের হা হা ঘর কাঁপানো হাসির সাথে ডাব্বুর রিনরিনে মিষ্টি হাসি মিশে একাকার হয়ে গেছে সেদিন, রিনা বলেছে, কী অদ্ভুত গপ্পো হচ্ছে- শুনছ।
কথাগুলো বারবার এসে ঝাপটা দিচ্ছে সৌম্যর কানে। ভাবছেন তিনি- বাবা সাইকোলজির অধ্যাপক ছিলেন, তিনি বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বেরিয়েছেন, রিনা বাংলা সাহিত্যে পড়াশুনা করেছে। কী চমৎকার কবিতা আবৃত্তি করে, তানপুরা কাঁধে নিয়ে যখন গায়-
‘তুমি নির্মল করো মঙ্গল করে’- কী যে অদ্ভুত আবেশ ছড়িয়ে পড়ে সারা বাড়িতে।
তাদেরই ছেলে ডাব্বুকে টিচার বলেন, অমনোযোগী মাথায় গোবর, গাধা- এও শুনে যেতে হচ্ছে দুই বছর ধরে।
ড্রাইভার মকবুল আর দারোয়ান আলীও বলে এতো একটা পাগল, বিলাইর লাইগা আবার মাইনষে কান্দেনি!
এই সন্ধ্যারাত সৌম্যর বুকের ওপর ভারী পাথরের মতো চেপে বসে আছে।
– ডাব্বু, ডাব্বু-
– ইয়েস পাপা।
– তুমি এসো তো আমার কাছে।
পাপার সঙ্গ খুব একটা পায় না ছেলে। ডাক শুনে তাই লাফিয়ে লাফিয়ে ঘরে যায়।
– তুমি আমার কাছে বসো ডাব্বু।
বাবার আদর পেয়ে গলে যেতে থাকে ছেলে।
– স্কুলে তোমার টিপটিপ ম্যাম, খুশবু ম্যাম বলেন তুমি অংক কষনা ঠিক মতো। পরীক্ষায়ও তোমার কম নম্বর আসে। পড়াশোনায় মন নেই তোমার।
ডাব্বু বলে, পাপা, ম্যামরা ঠিক মতো প্রশ্ন তৈরি করতেই পারে না।
উৎসুক বাবা বলেন, কী রকম?
– এই যেমন- দশজন সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে, ছয়জনকে যদি গুলি করে মেরে ফেলা হয় তো ক’জন থাকবে?
– এ অংক তো একেবারে ইজি।
ছলোছলো সুরে ডাব্বু বলে, সৈন্যগুলো এমনই দাঁড়িয়ে আছে পাপা, ওদের মারবে কেন বলো।
হ্যাঁ তাইতো। তাহলে অংকটা কষতেই ইচ্ছে করেনি ছেলের। মনের মতো কোয়েশ্চেন নাহলে কি উত্তর দেয়া যায়?
– ম্যাম কিন্তু অন্যরকম অংক তৈরি করতে পারেন?
– কী রকম?
– তোমার গার্ডেনে দশটি রোজ ট্রি রয়েছে।
– হ্যাঁ বুঝলাম, দশটি গোলাপ গাছ, তারপর
– ছয়টি রোজট্রি সরিয়ে যদি মেরিগোল্ড ট্রি লাগানো হয়- তবে কয়টি রোজট্রি গার্ডেনে থাকবে!
বাবা গালে আঙুল ঠেকিয়ে কপট ভাবনায় বলেন, ছয়টি গোলাপ গাছ সরিয়ে গাঁদা ফুলের গাছ লাগানো হলে কয়টি গোলাপ গাছ থাকবে, তাইতো।
– এ ধরনের ইন্টারেস্টিং কোয়েশ্চেন থাকলে কতো ভালো হয়- তাই না পাপা।
সৌম্য শোয়া থেকে উঠে বসেন।
সৌম্য বলেন, আমি হলে গোলাপ গাছ সরাবো না, কারণ গাঁদা ফুলের চেয়ে গোলাপ দেখতে অনেক চমৎকার ও কী মিষ্টি গন্ধ- তাই না?
– ওহ ইয়েস পাপা। ম্যাম আরেকটা কোয়েশ্চেন করেছেন।
– বলো বলো- হারি আপ।
রিনা এসে বলে, কী করছ তোমরা? সোয়া নটা বাজে- ডাব্বু বলে, তুমি আমাদের ডিস্টার্ব করবে না মা।
– ঠিক আছে বাবা ঠিক আছে আমি যাচ্ছি।
সৌম্যের কোলে বসে আছে ডাব্বু, বাবা দু’হাতে জড়িয়ে ধরেছেন ছেলেকে।
– ম্যাম একবার কোয়েশ্চেন করেছেন, একটি ম্যাঙ্গো ট্রিতে বারোটি পাখি বসে আছে, শিকারি যদি বন্দুক দিয়ে তিনটি পাখি মেরে ফেলে- তবে কয়টি পাখি রইল? তুমিই বলো- এমন অংক দেয় ছোটদের? বন্দুক দিয়ে শিকারি কেন বার্ডদের মারবে? ওরা গাছের ডালে বসে হয়তো গান গাইছিল- তাই না পাপা?
সৌম্য বলেন, তুমি বলে যাও ডাব্বু, আমি শুনছি।
– তুমি একদিন বলেছিলে পাপা, কাউকে তুমি জীবন দিতে পারবে না। তাহলে মারবে কেন? তাহলে শিকারি কেন পাখিদের মারবে?
সৌম্যের বুকের ভেতর অনেক আদর ফেনিয়ে ফাঁপিয়ে উঠতে থাকে ছোট্ট ছেলেটির জন্য।
নতুন কিছু ভাবলেই সে বোকা? পরীক্ষায় র‌্যাংক করতে না পারলে সে গাধা, অমনোযোগী?
ম্যাম পড়াবার সময় ঘন সবুজ ঘাসভরা গালচের মতো স্কুলের মাঠের দিকে তাকালেই ও বুদ্ধ? ও হাবা গঙ্গারাম?
সোমনাথ বলেন, কী হলো রিনা? কী কথা বলছে বাবা আর ছেলে? স্কুলে কিছু হয়েছে নাকি? রিনা শুকনো গলায় বলে, কী জানি বাবা, আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে।
সোমনাথ জানালায় মুখ রেখে উঁচু গলায় ডাকেন,
– এই সরফরাজ, এই দোস্ত-
সরফরাজ ভুরু কুঁচকে বলেন- ফের ক্যায়া হুয়া?
– কিছু হয়নি, তুমি আস তো একটু।
– আভি? ইসি ওয়াক্ত? আমি তো ডিনার করব এখন।
– আরে বাবা, একদিন ডিনার না করলে মরবে না।
কোনো কথা শোনা যাচ্ছে না। না বাবার না ছেলের। খুব টেনশান হচ্ছে সোমনাথ, রিনা আর নিরুপিসির।
সরফরাজ এসে বলেন, তাজ্জব কি বাত হ্যায়। বাবা ছেলেকে আদর করছে এতে তোমাদের টেনশানের কী হলো?
সৌম্য ছেলের গালে হামি দিয়ে বলেন, কিছু কি বলবে ডাব্বু? টু বি ভেরি ফ্রাংক, স্পিক আউট।
অভিমান মাখা সুরে ডাব্বু বলে, তুমি এমন করে কখনো তো আমাকে জিজ্ঞেস করোনি পাপা।
– এখন জানতে চাইছি তো- বলো, বলো।
– খুশবু ম্যাম একদিন পোয়েট্রি বলল, শুনতে বেশ ছিল বড় হলে হবোই আমি খেয়া ঘাটের মাঝি-
ম্যাম বলল, তোমরা কে কী হতে চাও খাতায় লিখো। আমার ফ্রেন্ডরা অনেকেই লিখল- আমি বড় হলে মাঝি হবো, ক’জন লিখেছে, ওরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সায়েনটিস্ট হবে।
– তুমি কী লিখেছ সোনা?
– আমি কোনোদিন পাপা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইনি। তা ছাড়া আমি তো কোনোদিন বোটম্যান দেখিনি। আমি টিভিতে স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান, ব্যাটম্যান দেখেছি। থান্ডার ক্যাটস আর স্কুবিডুও দেখেছি বাট আমি কুকুর বিড়াল তো হবো না। আমি খাতায় লিখেছি- আমি সুপারম্যান ব্যাটম্যান নয়তো স্পাইডারম্যান হবো। মাঝে মাঝে সাচকোয়ার্চ হতেও ইচ্ছে করে। আমি যা দেখেছি তাইতো আমি হতে চাইব পাপা।
স্নিগ্ধ আলোর মাঝে মাথাভরা কোঁকড়ানো চুল, আর ডাগর চোখের ছেলেটির দিকে তাকিয়ে থাকেন বাবা। তার মনে হতে থাকে- আমরা যারা বড়, যারা অভিভাবক যারা শিক্ষক- ছোটদের ঠিকঠাক মতো বুঝতে পারি না। কোথায় যেন বড়দের একটা ভুল হয়ে যায়।
– আমি কি খাতায় ভুল লিখেছি পাপা? আই অ্যাম স্যরি।
– নো নো মাই বয়, ইয়ু আর রাইট।
ছেলে তো বোকা নয়। ওর ভাবনা অনেক সুন্দর, অনেক বাস্তব। অনেক মডার্ন। আমরা বড়রাই ওদের থেকে পিছিয়ে আছি।
সরফরাজ এগিয়ে এসে বলেন, বাপ-বেটা মিলে তোমরা চুপিচুপি কী করছ শুনি। এনিথিং রং?
– নো নো আংকেল। আর্কিমিডিস যেমন- আবিষ্কারের পর ‘ইউরেকা ইউরেকা’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, আমারও তেমনই চেঁচাতে ইচ্ছে করছে। এত দিন, ওকে কাছে নিয়ে বসিনি, বুঝতেও পারিনি।
– হি ইজ ভেরি ভেরি শার্প, হি হ্যাজ গোল্ডেন ব্রেন।
রিনা অসময়ে কফি নিয়ে এসেছে। এমন আনন্দের আলোচনা কফির পেয়ালায় ছোট ছোট চুমুক না দিয়ে কি করা যায়।
সোমনাথ বলেন, ও গতানুগতিক ভাবে না, ওর ভাবনাটা অন্য রকম। ওর কথার মাঝে নতুন কথা স্পার্ক করে ওঠে। সরফরাজ সায় দিয়ে বলেন, ওর শোচ আলতা হে, জরা হাট্কে। সোমনাথ কিছুটা রেগে বলেন, স্কুলে যেন ও ব্ল্যাকশিপ হয়ে আছে।
দুদিন পর পর গার্জেন কল, শুধু কমপ্লেন আর কমপ্লেন। চিন্টুমামু বলে, দিয়েগো ম্যারাডোনাকে যদি বলো গিটার বাজিয়ে গান গাইতে- The sun was shining on the sea- খেলোয়াড় ব্যাটা কি পারবে? যার যেখানে ইন্টারেস্ট সে তাই করবে।
সোমনাথ বলেন, তুমি কি জানো সরফরাজ, আইনস্টাইন কিন্তু চার বছর পর্যন্ত কথা বলেননি। পরবর্তীতে সাংবাদিকরা যখন এর কারণ জিজ্ঞেস করেছেন, বিজ্ঞানীর নির্বিকার জবাব- প্রয়োজন পড়েনি, তাই কথা বলিনি।
– ভেরি ইন্টারেস্টিং।
ডাব্বু বোকার মতো সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। ব্যাপারটি কী?
সরফরাজ দাদান আদর করে বলেন, তু বুদ্ধু বুরবাক নেহি হ্যায় রে ডাব্বু, বহুত মেরিটোরিয়াস আছিস। তু তো চার চান লাগা দিয়া।
নিরুমাসী বলেন, সবাই খাবার টেবিলে এসো, খেতে খেতে গল্প করো, সাড়ে দশটা বাজছে যে।
বিনিমাসী খাবার এনে টেবিলে সাজিয়ে রাখছে।
– সরফরাজ ভাইয়া, আপনিও বসুন। রুটি আর মুরগির কারি আছে।
সৌম্য আনন্দে আবেগে ডাব্বুকে কোলে নিতে নিতে বলে, চিয়ার আপ মাই বয়, চিয়ার আপ। ইয়ু আর গ্রেট ডাব্বু।
আষাঢ়ের এই ঝিরিঝিরি বৃষ্টির রাতে পাপার গলা জড়িয়ে ধরে ডাব্বু। পাপা তাকে বুঝতে পেরেছেÑ কথাটি ভেবে কোত্থেকে যেন রাশি রাশি কান্না ওর দু’চোখে উপচে উঠছে। [সমাপ্ত]

SHARE

Leave a Reply