Home প্রচ্ছদ রচনা হারাতে বসেছে গ্রাম-বাংলার পরিবেশ ও প্রকৃতি । আবদাল মাহবুব কোরেশী

হারাতে বসেছে গ্রাম-বাংলার পরিবেশ ও প্রকৃতি । আবদাল মাহবুব কোরেশী

হারাতে বসেছে গ্রাম-বাংলার পরিবেশ ও প্রকৃতি । আবদাল মাহবুব কোরেশীএই গেরামে নেইতো আজ, / সেই আগেকার দিন
মায়ার বাঁধন ভালোবাসা, / আজ হয়েছে ক্ষীণ।
সময়টা বেশি দিন আগের নয়। এই ধরা যাক, বিশ-অথবা পঁচিশ বছর আগের কথা। গেরামের আধাপাকা মেঠোপথ আর বাঁশ দিয়ে বিশেষ কায়দায় তৈরি করা ছোট-বড় খালের ওপর পুল বা সাঁকো। অদূরে কয়েকটি দু’চালা ছনের দোকান। দোকানির কর্মব্যস্ত বিকেল। পেঁয়াজ, রসুন আদাসহ নানান প্রকার সামগ্রী। নিজের ফসলি জমির ফলানো সবজি নিয়ে কাজী-বাড়ির মোসাঈদ মিয়া আর ঘাসিটুলার মো: সাইদুর রহমানের ভাঙা খাঁচায় দু-চারটি মোরগসহ ভিন্ন রকমের পণ্যসামগ্রীর সমাহার। বেচা-কেনার এই স্থানটি গেরামের হাটবাজার নামেই পরিচিত। সপ্তাহের প্রতি শনিবার বেশ আয়োজন করে এ হাট বসে। গেরামের মানুষের কাছে এ হাটবাজার মিলনমেলার কেন্দ্র-ই বলা চলে। একটা অলিখিত নিয়মে ভিন্ন গ্রামের নানান রকম মানুষ নিজেকে সাজিয়ে-গুছিয়ে চমৎকার পরিপাটি করে এ হাটে জড়ো হয়। সপ্তাহের এই দিনটাতে বুড়িকোনার মাইজম ভাইছাব নান্টু মিয়ার চা-স্টলে জমে তুখোড় আড্ডা। মাছের আড়তদার মিরাবাজারের সুমেল মিয়া, কাউয়াদিঘি হাওরপাড়ের আবু লেইচ উল্ল্যা আর রায়পুরের নাঈম উদ্দীনের রসালো গল্প সাথে হাসি উল্লাস। গেরামের মাঝ-বয়সী সুহেব আলী ও তার বাল্যবন্ধু রুমর উল্ল্যা তাদের জীবনের দুঃখ-সুখের গল্প-কাহিনী ভাগ-বাটোয়ারা করে একে-অপরের কাছে। ঐ দূরে, বাজারের শেষ কোনায় আগপাড়ার রুহেল মিয়ার পান-তামাকের দোকানের পাশে আধমরা দুইটা ছাগলের রশি ধরে সুয়েজ আলী তার শালাবাবু জাফু মিয়াকে নিয়ে খদ্দরের আশায় একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ দিকে শহর থেকে বহুদিন পর গ্রামে আসা সাকিব মুন্সি আর নাকিব মুন্সি পরম আনন্দে আর গভীর মমতায় গেরামের মানুষের প্রতি তাদের সর্বোচ্চ ভালোবাসার ডালি মেলে ধরে। গেরামের মানুষেরা তাদের একনজর দেখতে ভিড় করে মরহুম ইরশাদ আলী সাহেবের করিমপুরি রড-সিমেন্টের দোকানে। একটা নিখুঁত আন্তরিকতায় তাদের বরণ করে গেরামের মানুষ। কার ব্যাটা, কার পোলা, বড় কথা নয়। বড় কথা, তারা আমাদের গেরামের পোলা, কলেজপড়ুয়া শিক্ষিত মানুষ। গেরামের অহঙ্কার। কথাগুলো গড়গড় বলে দ্বারকের মোরগ ব্যাপারী ইমন উল্ল্যা দুইটা মুড়ির লাড্ডু তুলে দেয় সাকিব ও নাকিব মুন্সির হাতে। ইমন ব্যাপারীর কথায় মাথাটা কাত করে একটু নেড়ে-চেড়ে সায় দেন গেরামের বয়োজ্যেষ্ঠ মুরব্বি রেনু মিয়া বকস। এরই এক ফাঁকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে উঠে আল্লাহু আকবার, মাগরিবের আজান।
হারাতে বসেছে গ্রাম-বাংলার পরিবেশ ও প্রকৃতি । আবদাল মাহবুব কোরেশীসন্ধ্যাপ্রদীপ হারিকেন আর কুপিবাতির মিটমিটানি আলোতে আলোকিত হয় গেরামের প্রতিটি ঘর। প্রতিটি দোকান। আলোকিত হয় গোটা হাটবাজার। তখনও গ্রামের ছোট্ট ছনের ঘরে বিজলিবাতি বা বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়নি। ইট-কংক্রিটের গাঁথুনিতে কাঁচারাস্তা পাকা হয়ে ওঠেনি। পাঁচ-ছয় গ্রাম খুঁজেও তখন সাদা-কালো টেলিভিশনের সন্ধান পাওয়া ছিলো বিরল। এ রকম অবস্থায় তৎকালীন সময়ে গেরামের মানুষের বিনোদন বলতে যা বুঝাতো- তা ছিলো একেবারে সাদাসিধে ও সাধারণ মানের। বিশেষ করে হেমন্তের প্রতিক্ষণ ছিলো গ্রামের মানুষের বিনোদনের এক বাড়তি আকর্ষণ। এ সময় গ্রামের ঝি-বউরা নতুন ধানের পিঠা-পুলি নিয়ে বাপের বাড়ি নাইয়র যাত্রা ছিলো সবচেয়ে আনন্দের ও খুশির। পুরুষেরা হল্লা করে বিভিন্ন যাত্রাগান অথবা পালাগানের আসরে উপস্থিত হতো। কেউ আবার হেড়ে গলায় ভাটি গানে টান দিতো কেউ বা একতারা, বা বাঁশির সুরে পাগল করে দিতো। প্রথম সারির দর্শক হিসেবে ছেলে, বুড়ো সবাই এতে অংশ নিতো। এ বাড়ি ওবাড়ি নতুন ধানের চাল দিয়ে শিরনি হতো। গেরামের অধিকাংশ মানুষ এটাকে ‘জিয়াফত’ নামে অভিহিত করতো। অসংখ্য খাল আর বিস্তৃত বিল আবহমান বাংলার পরিচয়ে তখন অনেক গ্রাম সমৃদ্ধ ছিলো। এ সমস্ত খাল ও বিলে শত প্রজাতির মাছ কিলবিল করতো। গ্রামের ছেলেরা অনায়াসে এসব মাছ ধরে আনতো। উগার ভরা ধান আর জল ভরা মাছ তখনকার সময়ে ছিলো খুব স্বাভাবিক বিষয়। ‘মাছে ভাতে বাঙালি’র যে উপমা, তার ষোল আনাই ছিলো তখনকার গ্রামে পরিপূর্ণ। বিকালবেলার দৃশ্যটা ছিলো একেবারে ছবির মতো। প্রায় সকল বাড়ির উঠোনে হেমন্তের ধান সংগ্রহ করার দৃশ্য ছিলো চোখে পড়ার মতো। ধানের মুঠি ভেঙে তার ওপর দুইটি গরু এক সাথে বেঁধে অবিরাম চক্কর দেওয়া হতো। তারপর ন্যাড়া ঝেড়ে ঝেড়ে ধান সংগ্রহ করে বস্তাবন্দী করা হতো। এ কাজে গৃহস্থের সাথে বাড়ির গৃহিণীরাও অংশগ্রহণ করতেন। কখনো কখনো কুপিবাতি জ্বেলে সারা রাত জেগে ধান সংগ্রহের কাজ চলতো। গ্রামের সে রকম দৃশ্য আজ আর ঠিক সেভাবে চোখে পড়ে না। চোখে পড়ে না সেই সবুজ সোনালি ধানক্ষেত, আর হলদে ফুলের চোখ ধাঁধানো সরিষাক্ষেতগুলোও। কেমন যেন দিন দিন উধাও হচ্ছে আমাদের কাছ থেকে। গ্রামের পরিশ্রমী মানুষগুলোও কেমন যেন হাতগুটে অলস মনে বসে আছে, কেউ এসব আবাদ করতে আর উৎসাহী নয়। গ্রামের সবচেয়ে কোলাহলমুখর সময়টা ছিলো বিকেলবেলার খেলার মাঠ। সূযর্টা পশ্চিমে একটু হেলে গেলেই গ্রামের ছোট-বড় সব বয়সীরা জড় হতো আর ইচ্ছেমতো উপভোগ করতো ঝরঝরে বিকেলের মিষ্টি প্রকৃতি। কেউ ফুটবল আবার কেউ কাবাডি খেলায় মেতে উঠতো। ছোটরা ছোটাছুটি, দোড়াদৌড়ি, কানামাছি এবং কিশোরের দল লাল, নীল ঘুড়ি উড়াতেই ব্যস্ত থাকতো। গ্রামের মূল প্রবেশপথের দু-পাশে তালগাছ, সুপারি আর খেজুর গাছের সারি ছিলো। মধ্যে মধ্যে শিমুলের গাছও দেখা যেতো। এ সব গাছে শিল্পীপাখি বাবুইয়ের নানা কারুকার্যমণ্ডিত অনবদ্য বাসা ছিলো দেখার মতো। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে শালিকের দল জড়ো হতো শিমুলের ডালে। বাবুই আর শালিকের কিচিরমিচির ডাকে সারাটা গ্রাম মুখরিত হতো। আজকাল সে সব দৃশ্য আর দেখা যায় না। তালগাছ, খেজুর আর সুপারি গাছের বদলে এসেছে আকাশচুম্বী সুদর্শনা ইউক্যালিপটাস, মেহগনি, আকাশিসহ নানা বিদেশি গাছ। এসব গাছ আমাদের গ্রাম তথা বাংলাদেশের পরিবেশের সঙ্গে বড় বেমানান। সে কারণেই কি এমন বেমানান গাছে বসতে চায়না আমাদের গায়ক পাখি, শিল্পীপাখিসহ দেশীয় প্রজাতির কোনো পাখপাখালি। গ্রাম থেকে তাদের আবাসস্থল আম, জাম, বাঁশঝাড় কি চিরতরে-ই বিলীন হবে তা-ই এখন ভাবার বিষয়।
হারাতে বসেছে গ্রাম-বাংলার পরিবেশ ও প্রকৃতি । আবদাল মাহবুব কোরেশীগ্রামের প্রায় আধ কিলোমিটার দূরে ছিলো একটি খাল। নাম ছিলো ‘কুদালিছড়া’। শীতের আগমনে ‘কুদালিছড়া’ মোহনীয় এক রূপ ধারণ করতো। থোকা থোকা শাপলা আর হালকা নীল রঙের কচুরিপানার ফুল কুদালীছড়ার শুভাবর্ধন বহুগুণ বাড়িয়ে দিতো। সূর্যের আলোয় চিকচিক করা স্বচ্ছ পানির অমিয়ধারা গ্রামের মানুষকে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি দিতো। রান্নাকাজে গ্রামের বধূরা মাটির কলসি ভরে পানি নেয়ার দৃশ্য আজও আয়নার মতো চোখে ভাসে। এ ‘কুদালিছড়া’য় ‘হিনানঘাট’ নামে একটি জায়গা ছিলো। যেখানে গোটা গ্রামের শিশু, কিশোর, ছেলে, বুড়োসহ সকল বয়সীর মানুষ দুপুর হতে না হতেই গোসলে আসতো। মনের মতো সাঁতার কেটে গোসল সেরে গল্প-গুজব করে করে যে যার বাড়িতে চলে যেত। বর্ষাকালে কুদালীছড়া ভিন্ন এক রূপ ধারণ করতো। কুল ভাঙা পানির স্রোত তীব্র গতি নিয়ে উদ্দামবেগে সামনে চলতো। ঘোলাপানির টানা স্রোতে উজান থেকে ভেসে আসত ঘন সবুজ কচুরিপানাসহ লতা জাতীয় একপ্রকার ঘাস। তখন খালের পানিতে নামা কারো সাহসে আগ দিতো না। তবে জেলে দলের মাছ ধরার মহোৎসব লেগে যেত। তারা ভিন্ন ধরনের জাল পেতে মাছ শিকার করতো। এসব মাছের মধ্যে পাবদা, পুঁটি, টেংরা ইত্যাদি ছিলো অন্যতম। এ সময় খালের বুক বেয়ে ছোট-বড় নৌকার চলাচল ছিলো নিয়মিত। কৃষকেরা নৌকা ভর্তি ধান বোঝাই করে শহরে এনে বিক্রি করতো। ঘোমটি নায়ে চড়ে বধূরা বাপের বাড়ি নাইওর যেত। ডিঙির মাঝি নায়ে চড়ে দিনের অধিকাংশ সময় ও সারা রাত জাল দিয়ে মাছ শিকার করতো। ভোর হতেই গ্রামের মানুষ টাটকা মাছ কিনতে মাঝির কাছে ধরনা দিতো। সুলভ মূল্যে দেশীয় প্রজাতির এসব মাছের মজা-ই ছিলো আলাদা। অপূর্ব সে সব দৃশ্য আজ বিলীন। গ্রামের সেই খালটি আজ ভরে গেছে নানা আবর্জনায়। গায়ের বধূরাও আর ঘোমটি চড়ে বাপের বাড়ি যেতে দেখা যায় না। দেশীয় মাছের অকাল পড়েছে। খেলার মাঠে গড়ে উঠেছে আকাশছোঁয়া ইট-সিমেন্টের নকশা করা বাড়ি। ছোট-ছোট ছেলে-মেয়েরাও হারিয়েছে তাদের উড়ন্ত মনের দুরন্তপণা। বড়রা কী কারণে ঘরের কোণে আশ্রয় নিয়েছে, তা বলাটাও মুশকিল।
হারাতে বসেছে গ্রাম-বাংলার পরিবেশ ও প্রকৃতি । আবদাল মাহবুব কোরেশীযেহেতু গাঁয়ের কোথাও কোন বিদ্যুৎ ছিলো না সেহেতু সূর্য ডুবার সাথে সাথে জমকালো অমাবস্যা নেমে আসতো গ্রামে। রাত একটু হলেই কোথাও কোন মানুষের সাড়া-শব্দ পাওয়া যেত না। ঘুটঘুটে সন্ধ্যা রাতকেই মনে হতো গভীর রাত। কখনো কখনো নৌকার গলইয়ে বসে, মাঝির সুর করে পুঁথি পাঠ-রাতের আঁধার ভেদ করে কানে আসতো। তার সাথে পাল্লা দিতো শিয়ালের হু-ক্কা, হু-য়া হাঁক। নিকষ এমন জমকালো ভুতুড়ে রাতে, লেবু গাছের তলায় বসতো জোনাকিদের হাট। মিট-মিটানি স্নিগ্ধ আলোয় ভরে দিতো সারা লেবু গাছের তল। খেটে খাওয়া অধিকাংশ মানুষগুলো একটু রাত হলেই খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে যেতো। এ দিকে রাত যতো গভীর হতো গ্রামের পরিবেশ ততই যেন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতো। প্রায়ই বন্য হিংস্র প্রাণীর আক্রমণের খবর পাওয়া যেত। এমনিতেই রাত গভীর হলে দূর থেকে ভেসে আসতো ঝিম ধরা নানা প্রাণীর নানা ঢংগের ডাক। নিশুতি রাতে কুকুরের অবিরাম ঘেউ ঘেউ আর ব্যাঙের অসহায় চিৎকারে শরীরে কাঁটা দিত। কোন কারণে কারো হাট থেকে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়তো ঐ পরিবারে। তাই রাতের অন্ধকারে একাকী পথ চলা ছিলো একদম নিষিদ্ধ। তবে বিশেষ কারণবশত কেউ যদি রাতে কোথাও যেতেই হতো তবে চার-পাঁচজনের একটি গ্রুপ এক সাথে বের হতো। হাতে লাঠি, মুখে উচ্চৈঃস্বরে কোরাস সঙ্গীত, আর ব্যাটারিচালিত হাই-পাওয়ারের টর্চলাইট থাকতো আত্মরক্ষার জন্য।
হারাতে বসেছে গ্রাম-বাংলার পরিবেশ ও প্রকৃতি । আবদাল মাহবুব কোরেশীভোর হবার আগেই ঘুম থেকে জেগে উঠত গ্রামের কৃষক শ্রেণীর মানুষ। হালকা জলখাবার খেয়ে তারা বলদের হাল নিয়ে ছুটতো হাওরের দিকে। বধূরা ব্যস্ত হতো ধান ভাঙার কাজে। তখন ধান ভাঙতে কলের মেশিন ছিলো না। গাইল-ছিয়া অথবা ঢেঁকি দিয়ে ধান ভাঙতে হতো। ধান থেকে চাল বের করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভাত রেঁধে স্বামীর জন্য হাওরে খাবার পাঠাতে হতো। মাটির বাসনে ভাত ভর্তি করে মরিচপুড়া আর আলুভর্তা সাথে সামান্য সবজি দিয়ে একটি কাপড়ে বেঁধে খাবার নিয়ে যেত তার-ই স্কুল বয়সী সন্তান। জমিনের আইলে বসে খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতো কৃষক। অতঃপর তামাকের হোক্কায় টান দিতে মোটেও ভুল হতো না। অনেক সময় খাবার নিতে দেরি হলে, বাবার গালি চুপ থেকে হজম করতে হতো ছেলেকে।
হারাতে বসেছে গ্রাম-বাংলার পরিবেশ ও প্রকৃতি । আবদাল মাহবুব কোরেশীগ্রামের পরিবেশ লেখা-পড়ার প্রতি বরাবর-ই ছিলো অনগ্রসর, হাতেগোনা দু-একটি পরিবারে লেখা-পড়ার প্রচলন থাকলেও অধিকাংশ পরিবারে বাচ্চাদের লেখা-পড়ার কোন আগ্রহ ছিলো না। তাদের মা-বাবারা লেখা-পড়ার চেয়ে নিত্য-নৈমিত্তিক সংসারের কাজকে-ই বড় মনে করতেন। তাই অধিকাংশ ছেলে শিশুরা বাবার গৃহস্থের কাজে সহযোগিতা করতো, আর মেয়ে শিশুরা মায়ের রান্না-বান্নার কাছে নিজেকে নিবেদিত রাখতো। তবে ছেলে-মেয়েদের আরবি শিক্ষায় শিক্ষা দিতে মা-বাবারা ছিলেন খুবই সচেতন। সূর্য উঠার আগে শিশুরা দল বেঁধে গ্রামের মসজিদে মিয়াসাবের কাছে নামাজ, রোজা, কোরআন ও নীতি-নৈতিকতা শিক্ষার তালিম নিত। এ শিক্ষাকে মক্তব শিক্ষা বলা হতো। তাই বাংলা শিক্ষা তাদের কাছে বাড়তি এক বোঝা-ই মনে হতো। যদিও গ্রামের অদূরেই ছিলো সরকারি প্রাথমিক পাঠশালা। তুলনামূলকভাবে কম শিশুরা-ই এ পাঠশালায় পাঠ গ্রহণ করতে যেত। বিদ্যালয়ে বাচ্চাদের উপস্থিত করতে শিক্ষকরা আপ্রাণ চেষ্টা করতেন, তারা অনেক সময় বাড়ি বাড়ি গিয়ে লেখা-পড়ার গুরুত্ব নিয়ে অভিভাবকদের সাথে মত বিনিময় করতেন ও বাচ্চাদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পরামর্শ দিতেন। শিক্ষকদের পরামর্শ মা-বাবারা অন্ধভাবে পালন করতেন। গ্রামের মানুষের কাছে শিক্ষক ও মিয়াসাবদের মর্যাদা-ই ছিলো আলাদা। শিক্ষক এবং মিয়াসাবদের তারা সব সময় সম্মানের চোখে দেখতেন এবং মাস্টার সাব ও হুজুর বলে তাদের খাতির করতেন। নিজের প্রয়োজনে যে কোন সময় তারা মাস্টার সাব ও হুজুরদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। কিন্তু বর্তমানে সে অবস্থা আর নেই। লেখা-পড়ায় গ্রামের মানুষ অনেক সচেতন হলেও শিক্ষক ও হুজুরদের প্রতি যে সম্মানবোধ দেখানো উচিত তার যথেষ্ট ভাটা পড়েছে, যদিও এর পিছনে বহুবিদ কারণ দৃশ্যমান।
হারাতে বসেছে গ্রাম-বাংলার পরিবেশ ও প্রকৃতি । আবদাল মাহবুব কোরেশীবাংলা চৈত্র মাসটা ছিলো গ্রামের মানুষের কাছে এক ভয়ঙ্কর ও নিদানের মাস। এ সময় স্বচ্ছ পানির তীব্র সংকট দেখা দিত। প্রচণ্ড খরতাপে খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, পুকুর-ডোবা সব শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত। পানিবাহিত নানা রোগের উপসর্গ দেখা দিত গ্রামে। বিশেষ করে কলেরা রোগটা ছিলো তখন খুবই ভয়ঙ্কর। এ রোগ একবার গ্রামে ঢুকলে তা মহামারীর আকার ধারণ করতো। প্রতিদিনই শিশু, কিশোর, যুবক, বুড়োদের মৃত্যুর সংবাদ কানে আসতো। তখন গোটা গ্রামে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি বিরাজ করতো। মানুষ অসহায়ের মতো দিগি¦দিক ছোটাছুটি করতো এবং আতঙ্কে পেরেশান থাকতো। আধুনিক চিকিৎসাসেবার তেমন একটা সুযোগ ছিল না তখন। যার কারণে মানুষ নিয়তির ওপর নিজেকে সঁপে দিত। আর মোল্লা, মুন্সির- তাবিজ-কবজ ও পানি পড়ায় ভরসা রাখত। বতর্মানে সব কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে নানা কুসংস্কার রীতিরও। চিকিৎসা সেবার মান যথেষ্ট উন্নত হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও পেয়েছে নতুন মাত্রা। বিজলি বাতির আলোয় আলোকিত হয়েছে গ্রাম। সর্বোপরি লেখাপড়া আর আধুনিক নানা সুযোগ-সুবিধা অনেকটা হাতের নাগালে এসেছে। এসেছে ডিশ অ্যান্টেনা, ইন্টারনেটসহ তথাকথিত প্রগতিশীলতার প্রতিযোগিতাও। সুতরাং এই গ্রাম, আজ আর সেই গ্রাম নেই। সকল আধুনিকতার সুবিধা পেয়ে এই গ্রামের মানুষ, মানুষের প্রতি আন্তরিকতা আর ভালোবাসার কৃত্রিম অভিনয় করতে শিখেছে। শিখেছে-একে অন্যকে, কিভাবে ঘায়েল করলে নিজের আখের শতভাগ গোছানো সম্ভব হয়, সেই সূত্রটাও। মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ অনেকটা লোপ পেয়েছে। ভিলেজ পলিটিকসের বিষাক্ত খেলায় কত ভালো মানুষ যে তার সম্ভ্রম হারিয়েছে তা বলাই বাহুল্য। আজ আর এই গ্রামে, সেই গ্রামের নির্মল বাতাস স্বাধীনভাবে নৃত্য করে না। বিশাল অট্টালিকায় ধাক্কা খেয়ে দখিন হাওয়া কোন ভাবে নিজেকে বাঁচাতেই ব্যস্ত থাকে। সুখে-দুঃখে কেউ আর আগের মতো আগ বাড়িয়ে সহযোগিতার হাত প্রসার করে না। নিজে বাঁচলে বাপের নাম এই প্রবাদ বাক্য মানুষের ধ্যানে, স্বপনে ও কল্পনায় কাজ করে। সেই স্বচ্ছ খালের পানিতে আজ বিষাক্ত কীট কিলবিল করে। ময়লা-আবজর্নার স্তূপ থেকে গন্ধ আসে প্রত্যহ- এই গ্রামে। আমনের ক্ষেত থেকে আর সেই রকম মৌ-মৌ সুভাস ভাসে না। পাখিরাও গান গায় না, উড়ে না নানা রঙের প্রজাপতি, ঝিঁঝি-রা উধাও হয়েছে বহুকাল ধরে। শিশুরা সোনালি বিকেলের প্রকৃতি উপভোগ করে না, উড়ায় না দূর আকাশে লাল, নীল রঙিন ঘুড়ি। কার্টুন আর কম্পিউটারের মায়াবী থাবা তাদের কামড়ে ধরেছে অক্টোপাসের মতো। সুতরাং এমন আধুনিকতা, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে তা গবেষণার দাবি রাখে বটে। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মদের হেলায় ছেড়ে দিতে পারি না। আমরা তাদের আলোয় আলোকিত করে গড়তে চাই। আমরা চাই, সেই সহজ-সরল নীতি-নৈতিকতাপূর্ণ সমাজ, নিখুঁত ভালোবাসা আর নির্মল পরিবেশ, যা বতর্মান আধুনিক সমাজের সাথে মিলে একাকার হয়ে একটি সুন্দর সুস্থ সমাজ, দেশ ও জাতি গঠনে সাহায্য করবে।

SHARE

Leave a Reply