Home গল্প কাঁটাঘেরা পথে । মাহাফুজা নাওয়ার

কাঁটাঘেরা পথে । মাহাফুজা নাওয়ার

কাঁটাঘেরা পথে । মাহাফুজা নাওয়ারসায়েম তার আব্বু আম্মুর সাথে ঢাকায় থাকে। সে এবার চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। তবে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। পরীক্ষার ফল প্রকাশেরও আর খুব বেশি সময় বাকি নেই। আর দু’দিন বাদেই রেজাল্ট বের হওয়ার কথা। সে প্রথম শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত বারবারই প্রথম স্থান অধিকার করে এসেছে। তাই এবারেও প্রথম হওয়ার প্রচণ্ড এক আকাঙ্ক্ষা তার ভেতরে কাজ করছে। সায়েমের মামা গ্রামের একটি স্কুলের শিক্ষক। ঢাকায় আসার খুব একটি সময় পান না। সায়েম এবার বায়না করেছে তাকে ঢাকায় আসতেই হবে। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সায়েমের স্কুল কিছুদিন বন্ধ থাকবে, সাথে মামার স্কুলও। তাই মামাও আর না করেননি। মামা জানিয়ে দিয়েছেন তিনি আসছেন। সায়েম তো অনেক খুশি। মামাকে তার অনেক ভালো লাগে। মামার ব্যক্তিত্ব অনেক আকর্ষণ করে তাকে। তবে মামার ব্যস্ততার কারণে খুব বেশি সময় মামার সাথে কথা হয় না। তবে যে সময়টুকুই কথা হয়, অনেক কিছু শেখা যায় মানুষটার কাছ থেকে।

আজকে সায়েমের রেজাল্ট বের হবে। মামাও আজ রাতের ট্রেনেই ঢাকায় আসছেন। সকাল থেকেই সায়েম কিছুটা চিন্তিত। বিষয়টা তার মায়ের চোখও এড়িয়ে যায়নি। মা সান্ত¡না দিয়ে বললেন-‘চিন্তার কিছু নেই বাবা। যা হবে ইনশাআল্লাহ ভালোই হবে।’ সায়েম স্কুলে চলে যায়। দুপুরের একটু আগে রেজাল্ট দিল। কিন্তু এটা কিভাবে হলো সায়েমের রোল হয়েছে ৫। যে ছাত্র প্রথম শ্রেণী থেকে বারবার প্রথম হয়েই ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত উঠেছে সে এবার পঞ্চম হয়ে গেলো! কথাটা ভাবতেই যেন পুরো আকাশটা ভেঙে তার মাথায় পড়ে যায়!
সবাইকে এবার মুখ দেখাবে কী করে। সবাই এবার তাকে নিয়ে কী ভাববে? এরকম একটা রেজাল্ট করার আগে তো তার মরে যাওয়াই ভালো ছিল। এসব ভাবতে ভাবতে বাড়ি চলে আসে। বাড়ি আসার পর থেকেই শুরু হয়েছে কান্না। আব্বুর-আম্মুর কারো কথাতেই কোনো কাজ হচ্ছে না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই। কাঁদতে কাঁদতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। এদিকে মামা প্রায় মাঝরাতের দিকে ওদের বাড়িতে চলে এসেছেন। মামা আসতেই আম্মু মামাকে সব ঘটনা খুলে বলল। মামা বললেন- ‘চিন্তা করো না। আমি দেখছি।’ বলেই সায়েমের রুমে চলে গেলেন। সায়েম ঘুমিয়ে আছে। কাঁদতে কাঁদতে বালিশটা ভিজিয়ে ফেলেছে। মামা গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই হঠাৎ করে জেগে উঠল। উঠেই আবারো কান্না শুরু করে। মামাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই চলছে। মামা কিছুই বলছে না। শুধু চুপ করে দেখেই চলেছে ঘটনাটা। হঠাৎ করে সায়েম বলে উঠল, ‘আমি আর পড়াশুনা করতে চাই না, মামা। আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। মামা আদর করে সায়েমের চোখে পানি মুছিয়ে দিয়ে বললেন ‘কান্না করাটাই তো সব কিছুর সমাধান না। ব্যর্থতাই সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর পথ। যারা জীবনে সফল হয়েছে তারা হেরে যাওয়ার ভয়ে দুর্ভাবনায় শক্তি ক্ষয় করেনি। বরং জেতার জন্য তাদের চেষ্টাকে আরো সংহত করে তুলেছে।
একদিন, আংশিক বধির চার বছরের একটি শিশু স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরল তার মাস্টারমশাইয়ের একটি চিঠি নিয়ে। মাস্টারমশায় তার মাকে লিখেছেন, ‘আপনার টমি এতই বোকা যে তার পক্ষে লেখাপড়া শেখা সম্ভব নয়। তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিন!’ বালকটির মা প্রতিজ্ঞা করলেন, ‘আমার টমি মোটেই বোকা নয়। আমি নিজেই তাকে পড়াব।’
সেই আংশিক বধির শিশুটিই পরবর্তীতে বিশ্বসেরা বিদ্বান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি আমাদের টমাস আলভা এডিসন। এক ব্যক্তি তাঁর ২১ বছর বয়সে ব্যবসায় ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২২ বছর বয়সে আইনসভার নির্বাচনে পরাস্ত হন। ব্যবসায় আবারো অসফল হলেন তার ২৪ বছর বয়সে। কংগ্রেসের নির্বাচনে পরাস্ত হলেন ৩৪ বছর বয়সে। ৪৫ বছর বয়সে পরাস্ত হলেন সাধারণ নির্বাচনে। ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে ব্যর্থ হলেন ৪৭ বছর বয়সে। সিনেটের নির্বাচনে আবারো হারলেন ৪৯ বছর বয়সে। তার ৫২ বছর বয়সে এসে তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন আব্রাহাম লিঙ্কন। তুমি কি তাদের ব্যর্থ বলবে? তাদের কাছে পরাজয় মানেই সব কিছুর শেষ না, যাত্রাপথ একটু দীর্ঘ হওয়া মাত্র। সমালোচনার ভয়ে যারা কাজকে এড়িয়ে যেতে চায় তারাই ব্যর্থ, যারা হাজার বার ব্যর্থ হওয়ার পরেও আশাহত হন না তারাই সফল। সমালোচনা তো থাকবেই। যখনই কোনো ব্যক্তি ওপরে ওঠার চেষ্টা করবে সমাজের ঈর্ষাকাতর কিছু ব্যক্তি তাকে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করবে। তোমাকে লক্ষ রাখতে হবে তাদের সমালোচনা যেন তোমার লক্ষ্যে পৌঁছানোর অনন্য চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত না করে।

জীবনের কাঁটা ঘেরা এই পথে উত্থান-পতন থাকবেই। কিন্তু ঝড়ের মুখে থেমে যাওয়াটাই জীবনের ধর্ম না। ব্যর্থতা শুধু আমাদের পরাজিত করে, এ কথা ঠিক না। ব্যর্থতার মধ্যে থেকেই আমাদের ভুলগুলোকে শুধরে নিতে হয়, খুঁজে নিতে হয় নতুন সৃষ্টির অনুপ্রেরণা।
৬৭ বছর বয়সে এডিসনের কয়েক মিলিয়ন ডলারের কারখানা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। বয়স্ক এডিসন দেখলেন তার জীবনের সমস্ত প্রচেষ্টার ফলশ্রুতি ভস্মে পরিণত হলো। তিনি মনে মনে বললেন বিপর্যয়ের মধ্যে একটি মহৎ শিক্ষা আছে। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ।
আমরা আবার নতুন করে শুরু করব। এই ঘটনার তিন সপ্তাহ পরেই তিনি Photograph যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন।

SHARE

Leave a Reply