Home ভ্রমণ আড়িয়াল বিলে একদিন । নাহিদ জিবরান

আড়িয়াল বিলে একদিন । নাহিদ জিবরান

আড়িয়াল বিলে একদিন । নাহিদ জিবরানদীর্ঘদিন যাবৎ কোথাও যাওয়া হয় না!
শরীর মন খুবই খারাপ!
এক কথায় বলতে গেলে একঘেয়েমিতে দিন কাটে আমার। বাইরে বের হলেও খুব একটা হাঁটাচলা করতে ইচ্ছে করে না। শরীরের যে অবস্থা তাতে দূরে কোথাও ঘুরতে গেলে ভয় লাগে না জানি আবার কিছু হয়ে যায়। সেই ভয়ে কোথাও যেতে ইচ্ছে করলেও পারি না।
একদিন দুপুরে দেখি আমার গ্রুপ Trip & Trek এ একটা পোস্ট আসছে। আমি পোস্টটা দেখলাম। সেখানে লিখেছে আড়িয়াল বিলে যেতে চাই, কারা কারা যাবেন আমাদেরকে জানান। আমার প্রচুর পরিমাণে ইচ্ছা থাকলেও আমি কোন কমেন্ট করলাম না।
শুয়ে শুয়ে ভাবছি কী করা যায়! বাসা থেকে কি যেতে দিবে? যদি ফিট থাকতাম তাহলে অবশ্যই যেতে দিত। কিন্তু…? সারাদিন কোন মতে পার করলাম। সন্ধ্যার দিকে আমার ফ্রেন্ড আমাকে বললো কিরে যাবি নাকি? আমি বললাম নারে তুই যা। রিয়াজ বললো দেখ তুই ছাড়া আমি কাউকে চিনি না। সেখানে আমি অপরিচিত সবার সাথে মিশতেও তো টাইম লাগে! আমি হু বলে চ্যাট করা অফ করলাম। ভাবছি কী করা যায়। বাসায় বলে দেখি কী বলে। আবার চিন্তা করছি থাক পরে না হয় যাওয়া যাবে। নিজের মনের সাথে সাপ লুডু খেলছি। যোগ-বিয়োগ নিয়ে অংক কষছি।
রিয়াজ ঠিক এক ঘণ্টা পর আবার আমাকে মেসেজ দিলো কিরে যাবি না? বেচারার খুব ইচ্ছে ঘুরে আসার। কিন্তু কাউকে চিনে না তাই আমাকেই বারবার অনুরোধ করছে। ওর অবস্থা আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু কী করবো সেটা বুঝতে পারছি না। এদিকে আর সময় মাত্র ৩ ঘণ্টা। এর মধ্যেই গ্রুপের অ্যাডমিনকে জানাতে হবে।
একটু পরে রিয়াজ ফোন দিয়ে বললো তোর সব দায়িত্ব আমার, তুই চল- না করিস না ভাই? অনেকদিন হলো কোথাও ঘুরতে যাই না। তুই আর অমত করিস না। আমি বললাম আমাকে দশ মিনিট টাইম দে। আমি তোকে জানাচ্ছি। এই বলে ফোনটা রেখে দিলাম। আম্মুকে ডাক দিয়ে বললাম সব কিছু। আম্মু বলে তোর যদি শরীর ভালো থাকে তাহলে যা, তবে কাউকে বিপদে ফেলবি না। আমি মনে মনে খুশি হলাম যাক বাবা রাজি হলো খুব সহজেই, খামাখা ৬ ঘণ্টা নষ্ট করলাম আর আমার বন্ধুকেও খুব কষ্ট দিলাম। রিয়াজকে ফোন দিয়ে বললাম কনফার্ম করছি গ্রুপে কেমন। বন্ধুটা খুব খুশি আমিও খুব খুশি।
আড়িয়াল বিলে একদিন । নাহিদ জিবরানTrip & Trek এর অ্যাডমিন মেহেদী ভাইকে মেসেজ দিয়ে বললাম- কাল কখন রওনা দিবো আমরা। মেহেদী ভাই বললেন সকালে সাড়ে ৮টায় গাড়ি। রাতে আমার আর ঘুম হচ্ছে না আনন্দে। ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে গুছিয়ে নিলাম গুলিস্তানের উদ্দেশে। বাসা থেকে বের হয়ে সবাইকে ফোন দিতে থাকলাম।
সিয়াম ভাইকে ফোন দিতে দিতে আমার আঙুল ব্যথা হয়ে গেছে। অথচ সিয়াম ভাই বলছিলো সকালে ফোন দিতে। প্রায় দুই ঘণ্টা ফোন দিয়ে ব্যর্থ হলাম।
গুলিস্তান বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি আমরা ক’জন। আসলে হঠাৎ করে প্ল্যান অনেকেই রাতে দেখেছে পোস্টটা। এ জন্য তাদের জন্য অপেক্ষা করছি। কোন জায়গায় ঘুরতে গেলে অপেক্ষা করাটা খুবই বিরক্তিকর। তবে আমাদের গ্রুপটা দেখলাম একদম ভিন্ন। যত সময় যাচ্ছে ততোই আড্ডা বেড়ে যাচ্ছে। কারোর কোন খেয়াল নেই যে বাসে কখন উঠবো!
সকাল ১০টায় বাস পেলাম বিআরটিসিতে, গন্তব্য শ্রীনগর। ভাড়া মাত্র ৬০ টাকা। কিছুক্ষণের মধ্যে বাস ছেড়ে দিলো। আনন্দ হই হুল্লোড় শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। আমরা ২৬ জন। খুব ভালো একটা সময় কাটাচ্ছি। রাস্তার বেহাল অবস্থা!
সাড়ে ১২টায় পৌঁছালাম শ্রীনগর। সেখান থেকে ইজিবাইক চারটা রিজার্ভ করে চলে গেলাম আড়িয়াল বিলের উদ্দেশে। রাস্তাগুলো অনেক সরু। আঁকাবাঁকা পথ, রাস্তার দু’ পাশে অসংখ্য গাছ সবুজের চাদরে ঘেরা। যতই এগোচ্ছি ততোই মনটা ভরে উঠছে। যেতে যেতে দেখি দূর থেকে দেখা যাচ্ছে একটা গম্বুজ। ইজিবাইক সেদিকেই নিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে চলেও এলাম।
গম্বুজটার নাম সন মঠ। এখানে হিন্দুরা পূজা করে। কিছুক্ষণ থেকে চলে গেলাম আড়িয়াল বিলের দিকে। সেখানে নেমেই দেখতে পেলাম চারিদিকে পানিতে টইটম্বুর। প্রচুর পরিমাণে গরম। সেখানেও থেমে নেই আড্ডা! ক্রমাগত চলতেই থাকলো ননস্টপ। এক কৃষকের বাড়িতে রান্না হচ্ছে আমাদের জন্য। ওদিকে মেহেদী, সিয়াম আর রাফি ভাই গেছে ট্রলার ঠিক করতে।
দুপুর হয়ে গেছে এখনো খাবার হয়নি। সবাই ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করছে। সিয়াম, মেহেদী আর রাফি ভাই গেলেন বাজারে আমাদের জন্য হালকা খাবার আনতে। কিছুক্ষণ পর চলেও এলেন খাবার নিয়ে। হালকা নাস্তা করে চলে গেলাম ট্রলারের দিকে। ট্রলারে উঠে বসলাম সবাই।
ট্রলার চালু করলো শুরু হলো আবার আড্ডা, গান। ঠাণ্ডা পানি, প্রচুর পরিমাণে বাতাস, মেঘের ভেলা, কিছু কিছু জায়গায় গাছপালা, কচুরিপানা, শাপলা ফুল ফুটে আছে কিছু জায়গায়। সব মিলিয়ে আমার মনটা ভরে উঠলো আনন্দে। সবাই খুবই রসিক, ভালোই মজা করে। আড়িয়াল বিলের কিছু কিছু জায়গায় বড় বড় গাছ। শুনেছি শীতকালে এখানে পানি থাকে না। চাষাবাদ করে এখানকার লোকজন।
আড়িয়াল বিলে একদিন । নাহিদ জিবরানদুপুরের খাবার ট্রলারে বসেই খেলাম। সাদা ভাত, আলু ভর্তা, ডাল আর মুরগি। বেশ তৃপ্তি নিয়েই খেলাম সবাই। খাওয়ার পর আবার ঘুরা শুরু করলাম। কিছুদূর গিয়ে এক গাছতলায় ট্রলারটা থামালো। সেখানে ভাটিয়ালি গান গেলাম, ছবি তুললাম তারপর ঘাটে চলে এলাম। ট্রলার ছেড়ে দিয়েছি। সবাই খুবই ক্লান্ত। সারাদিন টানা রোদের মধ্যে ঘুরে একেকটার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ পড়ে গেছে।
সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। কিছু গ্রুপ ছবি তুলে নিলাম স্মৃতির খাতায় রেখে দিব বলে। আড়িয়াল বিলকে বিদায় জানিয়ে আবার ইজিবাইকে করে শ্রীনগর এলাম। সেখান থেকে বাসে করে গুলিস্তান পৌঁছলাম রাত ৯টায়।
ঢাকা থেকে বেশি দূরে নয় আড়িয়াল বিল। অথচ আমরা চাইলেই যেতে পারি। কিন্তু সময় আর শরীর পেরে ওঠে না। সবুজের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দিন দেখবেন শরীর-মন দুটোই ভালো থাকবে।

SHARE

Leave a Reply