Home ফিচার হেমন্তে বাংলার বিচিত্র রূপ । মুহাম্মদ নূরুল হুদা

হেমন্তে বাংলার বিচিত্র রূপ । মুহাম্মদ নূরুল হুদা

হেমন্তে বাংলার বিচিত্র রূপ । মুহাম্মদ নূরুল হুদাভাদ্র ও আশ্বিনের শরৎ শেষ হয়ে গেলেও এই হেমন্তে শরতের আবহ রয়েই গেছে। হেমন্ত এসেছে কার্তিক ও অগ্রহায়ণকে নিয়ে। ভিন্ন একটি ঋতু হেমন্ত। যার রূপ ও বৈচিত্র্য অন্যটি থেকে পৃথক। কিন্তু তারপরও শরতের কাশফুল হেমন্তে দোলা দেয়, শরতের কৃষ্টি-কালচার হেমন্তে কিছুদিন ধরে চলতে থাকে। হেমন্ত আসে শরতের সরবতা ভেঙে। আসে হেমন্তের প্রচ্ছন্ন সরবতা। হেমন্তের প্রথম কয়েকটি দিন শরতের নির্যাস চলতেই থাকে। দীর্ঘ দুই মাসের হেমন্তে আমাদের জন্য এক বিরাট ঐতিহ্য রয়েছে। কার্তিকের গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি এবং সেকালের মরা কার্তিক হেমন্তকে পানসে করে দিতো। মাত্র দুটো ঘটনাই হেমন্তকে ম্লান করে দিতো। কিন্তু তারপরও সেই সময়কার হেমন্তের ঐতিহ্যের তুলনা হয় না। তুলনামূলক বিশ্লেষণে আগেকার দিনের হেমন্তের ঐতিহ্যের পাল্লা ভারী। সেই সুখ আমরা আজ কেন যেন অনুভব করতে পারি না। সেই সুখ, সেই অনুভূতি আজ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আজকের হেমন্ত স্মরণ, হেমন্ত সন্ধ্যা, হেমন্তে নবান্নের বিষয়টি সবই যেন কৃত্রিম মনে হয়।
কার্তিক ও অগ্রহায়ণ দুই মাস হেমন্ত হলেও দুইয়ের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান বিদ্যমান। মাত্র কয়েক দশক পূর্বে কার্তিক ছিল মরা বা দুর্ভিক্ষের কার্তিক, মাছের কার্তিক, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির কার্তিক, বর্ষার পানি বিদায় নেবার কার্তিক, মশার বিদায় বোঝায় কার্তিক, আবার আশ্বিন-কার্তিকে বন্যার পদধ্বনির কার্তিক। এই কার্তিকই নদী দিয়ে মাছের ঝাঁক যাওয়া, যা পুরনো বা বয়স্ক লোকদের জন্য মধুর স্মৃতি। নদীর বাঁক বা মরা নদী এবং বিলে পাখ-পাখালির নয়নাভিরাম দৃশ্যের কার্তিক, মাঠভরা আমন ধানের (সবুজ) ক্ষেত কৃষককে আনন্দ দেয়। শুধুই কি তাই? আনন্দদায়ক আরও মুহূর্ত যেমন পুকুরপাড়ের কোনায় মাছরাঙা শিকার করার জন্য মাঝারি আকৃতির বাঁশের আগায় সুতা দিয়ে তৈরি বিশেষ যত্নে পেতে রাখা বিলে বক ধরার জন্য এক প্রকার জাল দিয়ে ফাঁদ তৈরি করে পেতে রাখা, ভোর রাতে খুইয়া বা জালি দিয়ে নদীর চর এলাকায় দলের মধ্যে চিংড়ি মাছ ধরা, রাতে হারিকেন জ্বালিয়ে নদীর ধারে (কিনারায়) জালি দিয়ে প্রমাণ সাইজের চিংড়ি ধরা, সন্ধ্যা রাত বা ভোররাতে ঝাঁকি জাল দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নদীর বিচিত্র স্বাদের মাছ ধরা, রাতভর শিবজাল বা খরা দিয়ে সুস্বাদু ছোট-বড় মাছ ধরা, নদীর দুই পাড়ব্যাপী রশিতে অসংখ্য বঁড়শি দিয়ে মাছ ধরা সবই কার্তিকের মধুর স্মৃতি, কার্তিকের এই মধুর স্মৃতির কিছু ধারাবাহিকতা অগ্রহায়ণ মাস ধরেই চলতো। গাঁও-গেরামের মানুষজন এই ঐতিহ্যের সঙ্গী এবং সুবিধাভোগী। তারা কার্তিকের এই সুখ-দুঃখের ভাগীদার। শহুরে বাসিন্দাদের অনেকেরই এগুলো অচেনা, অজানা বিষয়। তারা কিতাবের পাতায় এই ঐতিহ্যের কথা জানেন নতুবা পত্রিকার কদাচিত ফিচার পড়ে পুলকিত হন এবং আনন্দ পান এই ভেবে যে এই বাংলায় এমন ঐতিহ্য রয়েছে।
হেমন্তের অগ্রহায়ণের এমনই ঐতিহ্য যা বাংলার সংস্কৃতিকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। হেমন্তের নবান্ন নামে খ্যাত এই ঐতিহ্য আবহমান বাংলার ঐতিহ্য। এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গর্বের তথা গৌরবগাথার। হেমন্তের নবান্ন মানেই বাঙালির আমন ধানের পিঠা পার্বণের। আমনের আউলা চাল ছাড়া নবান্নের পিঠা জমেই না। তাইতো হেমন্তের প্রথম দিক থেকে বাংলার কৃষকসমাজ আমন ধানের প্রতীক্ষায় থাকেন। এ সময় আমন ধানের জমিতে হাঁটু পরিমাণ বা পায়ের গোড়ালি পরিমাণ এমনকি এর চেয়ে একটু বেশি পরিমাণ পানি বিদ্যমান থাকে। আমন ধানের জমি বিল বা পুকুর সংলগ্ন হলে তো কথাই নেই। তাতে মাছ ধরার একটা প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা থাকে গ্রামের কৃষকদের। তারা এ সময় কই জাল পেতে মজার মজার কই মাছ, মেনি (নুনদা) মাছ, বড়পুঁটি, সরপুঁটি, শিংমাছ, মাগুর মাছ, বাইম মাছ এবং অন্যান্য মাছ ধরতেন। এ মাছগুলো পানি কমার সাথে সাথে আমনের জমি থেকে অধিকতর নিচু স্থান বলে পরিচিত বিল-ঝিল, পুকুর এমনকি নদীতে যাওয়ার চেষ্টা করতো এবং একই জালে এরা ধরা পড়তো। আমনের জমি বলতে গেলে সবুজ, হালকা সবুজ, প্রায় সাদা মিশ্রিত সবুজ (আমনের থোর বের হওয়ার সময়) দেখা যেতো। এই ধারা বর্তমানকালেও কোনো কোনো অঞ্চলে বহমান। আমন ধানের থোর হওয়ার প্রাক্কালে কৃষকরা চিন্তিত থাকতেন যে দমকা বাতাস বা সামান্য বাতাসের কারণে পরাগ বা রেণু ঝরে পড়ে কিনা। এই ধরনের কোনো ব্যত্যয় না ঘটলে কৃষকদের জন্য আনন্দের সুবাতাস বইয়ে দিতো। ধীরে ধীরে আমনের জমির ধানের রং পাল্টে যেতো।
থোর হলে আমন ধানের যে প্রায় সাদা মিশ্রিত সবুজ রং তা আরও কয়েকদিন পরে কিঞ্চিৎ হলুদ রংয়ে রূপান্তর ঘটে। অর্থাৎ যাকে বলা হয় সোনালি রং। রূপার রং থেকে সোনালি রংয়ের এই রূপান্তর কৃষককে অপার আনন্দে ভরিয়ে দিতো।
সোনালি আমন ধানের শুকনো জমি অথবা আধো আধো পানির এই জমির ধান কাটা চলে সন্তর্পণে। তারপর বাইগ কাঁধে ঝুলিয়ে দুই পার্শ্বে আঁটি নিয়ে উঠানে নিয়ে আসা হয়। ধানের মলন শেষে ঘর থেকে ধান আলাদা করা হয়। কাঁচা ধানের পালা আবার রাতভর অথবা ভোর রাতে বড় আকৃতির চুলায় বড় পাতিলে করে সিদ্ধ করা হয়। তারপর ঐ সিদ্ধ ধান কয়েকদিন ধরে শুকানো হয়। এর মধ্যেই আউলা (সিদ্ধছাড়া) ধান নবান্নের পিঠার জন্য আলাদা করে রাখা হয়, রাখা হয় পরবর্তী বছরের বীজধান (বিছন ধান)।
হেমন্তে বাংলার বিচিত্র রূপ । মুহাম্মদ নূরুল হুদাআর হেমন্তের নবান্নের পিঠা অগ্রহায়ণ থেকে শুরু হয়ে তা শীতকালের পুরো পৌষ ও মাঘ পর্যন্ত ধুমধাম চলতে থাকে। হেমন্তের নবান্নের পিঠা পুরো হেমন্তের অবদান হলেও তা শীতকালীন বাহারি পিঠায় পরিণত হয়। হেমন্তে সেকালে (কয়েক দশক পূর্বে) পুকুর ও বিলঝিলে বাহারি মজাদার মাছের সমাহার দেখা যেতো। বিশেষ করে কার্তিকে পুকুরগুলোতে সকাল বেলায় ছোট ছোট মাছের ঝাঁক সবাইকে আনন্দ দিতো। মনে হতো যেন হাতের মুঠোয় মাছ ধরা দিচ্ছে। এই মাছ বড় সখেরও মনে হতো এবং তা ঐ কার্তিকেই ধরা হতো না। বরং পুকুরে গাছের শাখা-প্রশাখার ঝাড় ফেলে তা যত্নে লালিত-পালিত হতো। এই মাছ অগ্রহায়ণ, পৌষ ও মাঘে অনেকটাই স্বাধীনভাবে ধরা হতো। জেলেদের আয়-রোজগার হতো ঐ মাছ থেকে। পুকুর মালিকানাধীন হলেও পুকুরের মাছ তারা কিছু কিছু ধরতো এবং পরে জেলেদের জন্য প্রায় উন্মুক্ত করে দেয়া হতো। তাই জেলেরা এ-পুকুর ও-পুকুর, নদী, খাল-বিল থেকে রাত-দিন মাছ ধরে বিকেলে হাটে নিয়ে যেতো বিক্রি করতে। আগেকার দিনে মাছের বাণিজ্যিক চাষ কমই হতো। প্রাকৃতিক এই মাছ যখন উন্মুক্তভাবে ধরা হতো তখন পুকুর ও বিল এলাকায় চিল পাখির দল উড়ে বেড়াতো এবং ছোঁ মেরে পুকুর থেকে মাছ ধরে নিয়ে যেতো।
কয়েক দশক পূর্বের হেমন্তের ঐ ঐতিহ্য এখন ম্রিয়মাণ। এখন আগের মতো ব্যাপকভাবে আউশ ও হেমন্তের আমন ধানের চাষ হয় না। প্রাকৃতিকভাবে পর্যায়ক্রমে যে মাছের ধারা ছিল তাও এখন অনুপস্থিত। এখন ইরি-বোরো ধানের ব্যাপক বিস্তৃত চাষ হওয়ায় বর্ষা শেষে শরৎ হয়ে হেমন্তে গোছা লাগানো আমন ধানের চাষ হয়। পাশাপাশি অনেক এলাকায়ই প্রায় সারা বছর মাছের চাষ হয়ে থাকে। কাজেই হেমন্তের আগের সেই মাছের মধুর স্মৃতি নেই। কিন্তু তারপরও বর্ষাজুড়ে প্রাকৃতিক মাছের আবহ কিছুটা হলেও রয়ে গেছে। হেমন্তের অনেক ঐতিহ্যের বিলুপ্তির মধ্যেও হেমন্তের আগমনী বার্তাকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। হেমন্ত হেমন্তের সময়ই আসে। পরিবর্তন হয়েছে বাংলার বিচিত্র রূপের, পরিবর্তন হয়েছে প্রকৃতির অপরূপসজ্জিত ঐতিহ্যের। আমাদের কৃত্রিম পরিবেশ-পরিস্থিতি বদলে ফেলতে হবে। তাহলেই ঋতুভিত্তিক ঐতিহ্যকে আমরা ফিরে পাবো।

SHARE

Leave a Reply