Home প্রচ্ছদ রচনা চিত্রা হরিণের বিচিত্র রূপ । মুরাদ মাহফুজ

চিত্রা হরিণের বিচিত্র রূপ । মুরাদ মাহফুজ

চিত্রা হরিণের বিচিত্র রূপ । মুরাদ মাহফুজনিঝুমদ্বীপের মূল আকর্ষণ হচ্ছে হরিণের পাল। এখানে প্রায় ৪০ হাজারের মতো হরিণ রয়েছে। হরিণ দেখতে হলে এখানে নিঃশব্দে চলাচল করতে হবে।

নিঝুমদ্বীপ! চারদিকে সমুদ্র, নদীর মোহনা, কেওড়া বন আর সহস্র হরিণের অভয়াশ্রম এই নিঝুম অরণ্য! অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশে নিঝুমদ্বীপ হলো একটি ছোট্ট দ্বীপ। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি নিঝুমদ্বীপ। দ্বীপটির প্রাচীন নাম চর ওসমান। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই ম্যানগ্রোভ বনটি বাংলাদেশের দৃষ্টিনন্দন পর্যটনকেন্দ্র।
চিত্রা হরিণের বিচিত্র রূপ । মুরাদ মাহফুজবাংলাদেশের বনবিভাগ ৭০-এর দশকে এখানে কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমে ১৯৭৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চার জোড়া হরিণ ছাড়ে। পরবর্তীতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ হাজারে। ২০০১ সালে সরকার জাতীয় উদ্যান ও হরিণের অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে নিঝুমদ্বীপকে।
এখানে কয়েকটি প্রজাতির প্রাণী রয়েছে। স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে রয়েছে নখরবিহীন উদবিড়াল, মেছোবাঘ ইত্যাদি। বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যে রয়েছে নিশিবক, দেশি কানিবক, গোবক, দেশি পানকৌড়ি, ধূসরবক, কাদাখোঁচা, বালিহাঁস, কালোহাঁস, কোড়া, তিলালালপা, তিলাসবুজপা ইত্যাদি। এই উদ্যান দেশি গাঙচষার অন্যতম প্রধান বিচরণস্থল। সরীসৃপের মধ্যে রয়েছে দেশি গুঁইসাপ ও নানান জাতের সামুদ্রিক কচ্ছপ।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই নিঝুমদ্বীপটি বাংলাদেশের প্রাণ। নিঝুমদ্বীপের মূল আকর্ষণ হচ্ছে হরিণের পাল। এখানে প্রায় ৪০ হাজারের মতো হরিণ রয়েছে। হরিণ দেখতে হলে এখানে নিঃশব্দে চলাচল করতে হবে। হইচই বা সামান্য আওয়াজে হরিণ পালিয়ে যায়।
বাংলাদেশে মোট ৫ প্রজাতির হরিণের রেকর্ড আছে। এদের মধ্যে দুই প্রজাতির হরিণ হগ ডিয়ার ও সোয়াম্প ডিয়ার যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাকি তিন প্রজাতির মধ্যে প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে বারকিং ডিয়ার ও সাম্বার ডিয়ার। এদের এখন সিলেটের গভীর বন ও কাপ্তাই, পার্বত্য চট্টগ্রাম, এবং বান্দরবান এলাকায় কালেভদ্রে পাওয়া যায়। স্পটেড ডিয়ার বা চিত্রা হরিণ এদেশে অন্যান্য হরিণের চেয়ে এখনও বেশ ভালো আছে। শুধু সুন্দরবনেই বন বিভাগের তথ্যমতে চিত্রা হরিণের সংখ্যা ৫০-৮০ হাজার।
বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রজাতির হরিণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর চিত্রা হরিণ। এর বৈজ্ঞানিক নাম অীরং ধীরং। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানের বনাঞ্চলে চিত্রা হরিণ দেখা যায়। এরা বনে ঘন গাছঘেরা জায়গায় থাকতে পছন্দ করে। আর চলাফেরা করে দলবদ্ধ হয়ে। নিঝুমদ্বীপে একর প্রতি চিত্রল হরিণের সংখ্যা সুন্দরবনের চেয়ে তিনগুণ বেশি। বাঘের মতো কোনো মাংসাশী প্রাণী না থাকায় দ্রুতগতিতে এদের বংশবৃদ্ধি পাচ্ছে।
চিত্রা হরিণের দেহের লালচে বাদামি লোমের ওপর সাদা ফোঁটা ফোঁটা দাগ আছে। তাই এর ইংরেজি নাম স্পটেড ডিয়ার। এ হরিণের পেট, গলা, পাঁজরের ভেতরের অংশ, পেছনের অংশ, লেজ ও কান সাদা। পূর্ণ বয়সের এ ধরনের হরিণের ওজন ৮৫ কেজির মতো হয়। পরিণত বয়সের চিত্রা হরিণের তিন শাখাবিশিষ্ট শিং থাকে।
চিত্রা হরিণ বাংলাদেশের স্থলজ স্তন্যপায়ীর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও নিরীহ। একসময় বাংলাদেশের অধিকাংশ গভীর বনে এর দেখা পাওয়া গেলেও এখন এর শেষ আশ্রয়স্থল সুন্দরবনসহ কয়েকটি বনে।
আমাদের দেশে হরিণের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও এদের নিয়ে গবেষণা তেমন হয়নি। দিন দিন হরিণের আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে এদের টিকে থাকাই এখন দায়। তাই দেশ-বিদেশ থেকে হরিণ দেখতে আসা পর্যটকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। অথচ পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেয়া হলে পর্যটকদের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
চিত্রা হরিণের সংখ্যা কমে যাবার মূল কারণ বন উজাড় হয়ে যাওয়া। গাছ কেটে বসতি গড়ে ওঠায় আবাসস্থল হারাচ্ছে হরিণ। এ ছাড়াও রাত বিরাতে শিকারিরা হরিণ শিকার করে পাচার করছে। শিয়াল-কুকুরের আক্রমণে হরিণের প্রাণহানি ঘটছে অহরহ। এখানে মিঠা পানির জন্য কোনো পুকুর খোঁড়া হয়নি। দ্বীপের চারদিকে বেড়িবাঁধ না থাকায় নোনা পানি বনে ঢুকে হরিণের খাবার পানি ও খাদ্যসংকট দেখা দেয়। বর্ষা মৌসুমে বনের মধ্যে মশা অনেক বেড়ে যায়। এ ছাড়া এসময় স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশের কারণে খুরা রোগসহ বিভিন্ন ধরনের রোগ সহজেই বিস্তার লাভের সুযোগ পায়।
প্রতি বছরই বিভিন্ন রোগে বহু হরিণ মারা গেলেও এ নিয়ে কারও উদ্বিগ্নতা নেই। আস্তে আস্তে হরিণগুলো তাদের বেঁচে থাকার তাগিদে নদী পেরিয়ে পাশের চরগুলোতে যাবার চেষ্টা করে। এভাবেও কিছু হরিণ মারা যায়। ফলে অনেক সময় প্রাণ বাঁচাতে হরিণ লোকালয়ে এসে ধরা পড়ছে মানুষের হাতে।
চিত্রা হরিণের বিচিত্র রূপ । মুরাদ মাহফুজএভাবে খাদ্য ও আবাস সংকটে হরিণ নিঝুমদ্বীপ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী অন্য দ্বীপগুলোতে চলে যাচ্ছে। দ্বীপে গাছ ও হরিণ কমে যাওয়ায় কমছে পর্যটক। বর্তমান সময়ে হরিণের শত্রু হিসেবে কুকুরকে দায়ী করা হচ্ছে। চার-পাঁচটি কুকুর মিলে দীর্ঘক্ষণ ধরে একটি হরিণকে তাড়া করছে এবং হরিণ ধরে খাচ্ছে। গাছের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় পুরুষ শিংওয়ালা হরিণগুলো দ্রুত দৌড়াতে দিয়ে গাছের সাথে শিং আটকে যায়। আর তখনই কুকুর হরিণকে ধরে ফেলে। এ কারণে কুকুর পুরুষ হরিণকেই বেশি ধরে। তবে বনের মধ্যে হরিণের যত কঙ্কাল পাওয়া যায় তার মধ্যে মেয়ে হরিণের মাথার সংখ্যা বেশি। কারণ পুরুষ হরিণের শিং পর্যটকদের কাছে বিক্রির জন্য মানুষ নিয়ে যায়। খুলিগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে এখানে বাচ্চা হরিণেরও মৃত্যুহার বেশ। হরিণের বাচ্চাগুলোকে শিয়াল ধরে খাওয়ার এক নমুনা হাড় ও মাথার খুলি পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে।
নিঝুম দ্বীপের উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপে গ্রহণ করলে রক্ষা করা যাবে এই চিত্রা হরিণকে। চিত্রা হরিণের চাহিদা বিদেশে অনেক। শুধুমাত্র ভারত, নেপাল, এবং শ্রীলঙ্কার বনে দেখা গেলেও ইদানীং রপ্তানি করা হচ্ছে আর্জেটিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, আমেরিকাসহ অনেক দেশে। বাংলাদেশও চিত্রা হরিণ রপ্তানি করে বিদেশী মুদ্রা অর্জন করতে পারে।
সামান্য প্রচেষ্টায় এখানে ইকোট্যুরিজমের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ব্যতিক্রমী পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়। এখান থেকেই হরিণ ফার্মিংয়ের স্বপ্ন আমরা শুরু করতে পারি। উন্নত দেশে হরিণ ফার্মিং বহু আগে থেকেই শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের চিত্রা হরিণ এত জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও এ নিয়ে আমরা ভাবা শুরু করিনি। এ অবস্থা চলতে থাকলে অন্যতম সম্ভাবনাময় একটি প্রজাতি রক্ষা করতে আমরা ব্যর্থ হবো।

SHARE

Leave a Reply