Home গল্প নোড়ার পায়েস । জ্যোতির্ময় মল্লিক

নোড়ার পায়েস । জ্যোতির্ময় মল্লিক

নোড়ার পায়েস । জ্যোতির্ময় মল্লিকঅনেকদিন আগের কথা। দিনেনাথ নামে এক লোক, বহুদূর দেশে চাকরি করত। অনেকদিন যাবৎ চাকরি করে অবশেষে অবসর নিয়ে সে বাড়িতে ফিরে আসছে। দিনেনাথের নিজের বাড়ি থেকে চাকরিস্থল অনেক দূরে। তাই তার বাড়ি ফিরতে, পথে বেশ কয়েকদিন দেরি হয়। সে সময়তো এখনকার মতো যানবাহন ছিল না। তাই প্রায় সকলকে পায়ে হেঁটে চলাফেরা করতে হতো।
দিনেনাথ সমস্ত দিন হেঁটে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তার সাথে আছে মাত্র একটা পুঁটলি। তা‘নইলে সে একটানা এতটা পথ হাঁটতেই পারত না। সন্ধ্যা হয়ে গেল প্রায়। এখন রাত কাটাবার জন্য একটা আস্তানার দরকার। সন্ধ্যা নাগাদ সে একটা গ্রামে এসে উপস্থিত হলো। দিনেনাথ চিন্তা করতে লাগলো এখন কার বাড়ি যাই! এ গ্রামের কাউকে চিনি না জানি না আর আশ্রয় চাইলে কেউকি আশ্রয় দিতে চাইবে? কিন্তু হেঁটে এসে সে দারুণ ক্ষুধার্ত এবং পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলো। অবশেষে কোন কিছু চিন্তা না করে ফাঁকা দেখে এক বাড়িতে ঢুকে পড়ল।
সেই বাড়িটা ছিল এক বুড়ির। আর বুড়ি ছিল হাড় কেপ্পন। সে কাউকে কিছু দিতে চাইত না। তা সে খাবার জিনিস হোক বা অন্য কিছু হোক। তার জন্য গ্রামের কেউ তাকে পছন্দ করত না। পারতপক্ষে তার বাড়ির দিকেও কেউ ঘেঁষতো না।
দিনেনাথের এত সব জানবার কথাও নয়। সে সরাসরি ঘরে ঢুকে বলল- ‘বুড়িমা আমি অনেক দূর থেকে আসছি। আমি ভীষণ শ্রান্ত এবং ক্ষুধার্ত আমাকে কিছু খেতে দিতে পার! বুড়ি তার রাতের খাবার-দাবার আগেই রেঁধে রেখেছিল এবং ভাবছিল একটু পরে খাবে। কিন্তু এই আগন্তুক এসে পড়ায় সব ভণ্ডুল হয়ে গেল। সে ভাবল আমার খাবার ওকে দিয়ে খাওয়াবো কেন! তার চেয়ে যদি বলি আমার কাছে খাবার নেই তবে লোকটি চলে যাবে।
বুড়ি বলল- বাছা, আমি বুড়ো মানুষ দিনে একবার রেঁধে খাই। তা ছাড়া আজ রাত্রে উপবাস করছি আমি। এই মাত্র ভাবছিলাম শুয়ে পড়ব, তখন তুমি এসে পড়েছ। ঘরে এমন কিছু নেই যা তোমাকে খেতে দিতে পারি। তবে রাত্রে যদি থাকতে চাও তবে থাক। এই বলে ঘরের মেঝেতে বিছানা করে দিলো। তারপর নিজে চৌকির ওপর ঘুমাতে গেল।
দিনেনাথ ভাবলো খাবার পাই আর না পাই রাত্রের আশ্রয়টুকু হারানো যাবে না। সে বলল- ঠিক আছে রাতটুকুই তোমার এখানে কাটাবো। এই বলে এক গ্লাস পানি কলসি থেকে ঢেলে খেয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুম কি সহজে আসে? পেটের ভেতর যে ইঁদুরে ডন কষছে।
বেশ খানিকক্ষণ পর দিনেনাথ বিছানায় উঠে বসল। সে চিন্তা করল বুড়ি যে রকম কেপ্পন তাতে সহজে সে কিছু খেতে দেবে সে আশা বৃথা। বহুক্ষণ চিন্তা করে সে একটা উপায় বের করল। তারপর বিছানায় বসে উস্ খুস্ করতে লাগলো। ওদিক বুড়িও কিন্তু ঘুমায়নি, ঘুমাবে কি করে, তারওতো ওই একই অবস্থা। সে বলল-কিগো বাছা তোমার কি কোন অসুবিধা হচ্ছে? দিনেনাথ বলল- না বুড়ি মা তবে খুব খিদে পেয়েছে কিনা তাই।
বুড়ি বলল- দেখ বাপু আমিতো তোমাকে আগেই জানিয়ে দিয়েছি যে ঘরে কোন খাবার নেই। দিনেনাথ তখন এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে, চৌকির নিচে মশলা বাটার একটা নোড়া পড়ে আছে। সে বলল- বুড়িমা তোমার চৌকির নিচে একটা নোড়া পড়ে আছে দেখছি। ওটা যদি দাও তবে তোমাকে ঐ দিয়ে চমৎকার পায়েস রেঁধে খাওয়াতে পারি। বুড়ি ভাবল বেশ বোকাতো! শুধু নোড়া দিয়ে কি কেউ পায়েস রাঁধতে পারে! পারেতো আমারই লাভ। বিনা খরচে সুন্দর খাওয়া হয়ে যাবে। বুড়ি বলল- তা নাও না বাপু! নোড়া দিয়েই পায়েস রাঁধো।
এরপর দিনেনাথ বুড়ির কাছ থেকে একটা হাঁড়ি নিলো। তারপর নোড়াটিকে বেশ করে ধুয়ে মুছে নিলো। এরপর এক হাঁড়ি পানি নিয়ে তার ভিতর নোড়াটিকে রেখে, উনুনের ওপর চাপিয়ে দিল। এবার একটা হাতা দিয়ে গরম পানি তুলে চেখে দেখেতে লাগল। তারপর আপন মনে বলতে লাগল এর ভিতরে যদি কিছু চাল দেয়া যেতো তবে যা একখানা পায়েস হতো তা আর কি বলব। বুড়ি হাড় কেপ্পন হলে কি হবে আসলে সে ছিল বোকার হদ্দ। বলল- তা বাপু আমার ঘরে কিছু বাড়তি চাল আছে। এই বলে বুড়ি দিনেনাথের কাছে একটা চালের পাত্র এনে দিল।
দিনেনাথ চালগুলো হাঁড়ির ভিতর ঢেলে দিয়ে যথারীতি নাড়তে লাগল। খানিকপরে আবার হাঁড়ি থেকে হাতা দিয়ে সেদ্ধ চাল তুলে একটু একটু করে চাখতে লাগল। তারপর বলল- এর সঙ্গে যদি কিছুটা চিনি দেওয়া যেতো না, তবে তা এমনি সুস্বাদু হতো তা আর কি বলব। বুড়ির তখন নোলায় পানি এসে গেছে প্রায়। সে বলল- আমার ঘরে কিছুটা চিনি আছে বাপু, এখনই এনে দিচ্ছি। এই বলে সে দিনেনাথকে চিনির পাত্র এনে দিল।
দিনেনাথ পরিমাণ মতো চিনি হাঁড়ির ভেতর দিয়ে আবার তা নাড়তে লাগলো। আর আগের মত একটু একটু তুলে চাখতে লাগল! পাশ থেকে সে সুড়–ত করে একটা শব্দ শুনতে পেলো। ফিরে দেখে বুড়ি চৌকির ওপর বসে ঢোক গিললো একটা। বুড়ি বলল- ও ছেলে তোমার পায়েস এবার নামাও। দিনেনাথ বলল- এই হয়ে গেল আর কি, তোমায় কি বলব বুড়ি মা, এর ভেতর একটু দুধ যদি দেওয়া যেতো তবে এমন পায়েস হতো যা কোন রাজাও খায়নি কোনদিন। তবে দুধ যখন তোমার ঘরে নেই তখন এমনি নামাচ্ছি। বুড়ি বলল- না বাছা আগে নামিও না আমি দুধ এনে দিচ্ছি। এই বলে বুড়ি ঘরের তাক থেকে এক পাত্র দুধ এনে দিয়ে বলল- এই নাও এবার হলতো?
দিনেনাথ সেই দুধ হাঁড়ির ভিতর ঢেলে দিয়ে খানিকক্ষণ জ্বাল দিয়ে হাঁড়ি নামালো। পায়েসের গন্ধে সত্যি সত্যি তখন ঘর ম, ম, করছে। সে বলল- বুড়ি মা, তোমারতো আবার উপবাস তোমার পায়েস খাওয়া কি উচিত হবে? বুড়ি বলল- কি যে বলো ছেলে, পায়েস খেলে কি কখনও উপবাস ভাঙে নাকি? এই বলে দুটো থালা এনে দিল। তারপর দু’জন দু’ থালায় বসে পায়েস খায় আর হাসে।
দিনেনাথ বলল- কি রকম লাগছে বুড়িমা। বুড়ি বলল- সত্যি বাছা এমন পায়েস কোনদিনই খাইনি। নোড়া দিয়ে যে এতো ভালো পায়েস রাঁধা যায় তা আমার জানা ছিল না। দিনেনাথ বলল- নোড়াটা যত্ন করে রেখে দিও। যখন তোমার দরকার হবে ওই নোড়া দিয়ে এইভাবে পায়েস রেঁধে খেয়ো।
তারপর পেট পুরে খেয়ে দেয়ে দিনেনাথ রাতে আচ্ছা করে কষে ঘুম দিল। পরদিন সকালে উঠে বুড়ির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।
# একটি রুশ উপকথা

SHARE

Leave a Reply