Home গল্প হৃদয়পটে স্বপ্নছবি । তমসুর হোসেন

হৃদয়পটে স্বপ্নছবি । তমসুর হোসেন

হৃদয়পটে স্বপ্নছবি । তমসুর হোসেনপ্রচণ্ড গরমের সাথে চলছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। মা অফিসে চলে গেলে উপমা ছটফট করতে লাগল। মায়ের চাকরি হওয়ার পর উপমার মন ভালো নেই। মা অফিসে যোগ দেয়ার পরই শুরু হলো বাবার ঢাকায় নয় মাসের একটানা ট্রেনিং। ঢাকা থেকে বাবা মাসে একদিনও বাসায় আসতে পারেন না। পাশের একটি স্কুলে তাকে ভর্তি করে দিয়েছে মা। সকাল সাড়ে ছ’টায় তাকে ক্লাসে দিয়ে আসার জন্য রেডি করতে শুরু করে মা। গরমে রাতে ঘুমাতে পারে না উপমা। সকালে তার চোখ থেকে ঘুমের প্রলেপ সরে যেতে চায় না। মা যখন তাকে জোর করে নাস্তা গেলাতে থাকে তখন তার মুখ ভরে বমি আসতে চায়।
মায়ের তাড়াহুড়া দেখে খুব বিরক্ত হয় উপমা। সে না খেতে চাইলে মা কী ছাড়বে! পটাপট থাপ্পড় দিবে তার মুখে। মায়ের হাতেও তো অনেক কাজ। ওকে স্কুলে রেখে এসে রান্না করবে মা। নয়টায় উপমার ছুটি হলে তাকে বাসায় নিয়ে গিয়ে তবেই মায়ের অফিসে যাওয়া। অফিস থেকে মা ফিরে না আসা পর্যন্ত দাদীর কাছে থাকে উপমা। মায়ের চলে যাবার দৃশ্য করুণ চোখে প্রত্যক্ষ করে সে। যতক্ষণ সে মাকে দেখতে পায় তার ভালো লাগে। কিন্তু মা যখন মোড়ের মসজিদ পার হয়ে রাস্তায় নামে তখন তার কান্না পায়। কেন যে চাকরি নিতে গেল মা। এভাবে একা বাসায় তার কী করে সময় কাটবে!
বাবা যখন ব্র্যাকের রংপুর ব্রাঞ্চে চাকরি করত তখন দর্শনায় একটা সুন্দর বাসায় তারা থাকত। বাসার কাছেই ছিল বাবার অফিস। মাঝে মাঝে পিয়ন চাচা এসে তাকে অফিসে নিয়ে যেত। পিয়ন চাচার মেয়ের নাম ছিল রানী। সে উপমাকে পেলে খুশি হয়ে তার সব খেলনা দিত। রানীদের পাশে আকাশ নামের একটি ছেলে ছিল। গাছের ছায়ায় ওদের সাথে খেলতে খেলতে দুপুর গড়িয়ে যেত।
প্রতিদিন খেলা হতে ডেকে নিয়ে মা তাকে গোসল করাত। গোসল খাওয়া হলে তাকে ঘুমাতে বলত মা। কাজ সেরে মাও ঘুমাত তার পাশে। উপমার চোখে ঘুম আসত না। সে জানালা দিয়ে ঘন নীল আকাশ দেখত। পাশের কাঁঠালগাছে অনেক পাখি এসে কলরব করত। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে সে তাদের সাথে কথা বলত। সেই বাসায় নানা-নানী কাজলমামা আর খালামনিরা আসত। উপমার দিনগুলো আনন্দের স্রোতে বয়ে যেত।
অফিসে যাবার সময় গেটে তালা লাগিয়ে যায় মা। ইচ্ছে করলেও উপমা ঘরের বাইরে যেতে পারে না। আর তালা না দিলেও সে বাসা থেকে বের হয় না। ছেলেধরা তাকে যদি ধরে নিয়ে যায়। ওদের কাছে নাকি বস্তা আর চাকু থাকে। চকোলেট খাইয়ে শিশুকে অজ্ঞান করে বস্তায় পুরে ফেলে ছেলেধরা। তারপর আড়ালে গিয়ে পেট কেটে কিডনি নিয়ে পালিয়ে যায়।
উপমা দেখল একটা লোক বস্তার মত কী যেন ঘাড়ে নিয়ে বাসার দিকে আসছে। তাকে দেখে ভয়ে বারান্দা হতে ঘরের ভেতর চলে যায় সে। দাদীর কাছে গিয়ে জড়সড় হয়ে বসে থাকে। তাকে এভাবে সংকুচিত হয়ে থাকতে দেখে দাদী বলল, ‘অমন চুপ হয়ে আছ কেন?’
‘দেখ গিয়ে বস্তা নিয়ে ছেলেধরা এসেছে। আমাকে ধরতে চায়।’
‘দিনদুপুরে কোথায় ছেলেধরা। কী দেখে কী বলছ !’
‘আমি তো দেখে এলাম। ওখানে দাঁড়িয়ে আছে।’
‘পাতাকুড়ানো লোকটা দেখেছ মনে হয়। চল তো দেখি।’
দাদী এসে কাউকেই দেখতে পেল না। উপমার চোখে ভীতি ছড়িয়ে আছে। সে বিছানার এক কোণে চুপ করে শুয়ে থাকল। গরম এবং ভয়ে গা ঘামছে তার। বিদ্যুৎ নেই, ফ্যান ঘুরছে না। হাতপাখা ঘুরিয়ে গায়ে বাতাস দিল। কিছুক্ষণ পাখা টেনে হাঁফিয়ে উঠল সে। হঠাৎ বিদ্যুৎ এলে সে খুব আরাম পেল। রুমটায় হালকা আঁধার জমে আছে। সুইস টিপে লাইট জ্বালাল সে। ছেলেধরার কথা একদম ভুলে যেতে পারছে না।
বিদ্যুৎ চলে গেলে আবার সে ফাঁপরে পড়ল। তবুও বিছানায় চুপ করে শুয়ে থাকল উপমা। ঘামে তার শরীর ভিজে যাচ্ছে। উপমা ভাবতে লাগল, বিদ্যুৎওয়ালা কেমন মানুষ? বাতির বিদ্যুৎটা না হয় নিক, কিন্তু ফ্যানেরটা নিচ্ছে কেন? একসাথে দুটো নেয়ার কী প্রয়োজন! বাদামওয়ালাকে সে তো চেনে। ওর নাম আবদুল। নানুবাড়ির ওখানেও একটা বাদামওয়ালা আছে। তিশা খালামণি ওকে সালমান শাহ বলে ডাকে। বিদ্যুৎওয়ালা যে কোনটা? একটা লোক মাথায় লম্বা টুপি দিয়ে রোজ সামনের রাস্তা দিয়ে যায়। উপমার ধারণা ওই লোকটাই বিদ্যুৎওয়ালা। দেখা হলে উপমা বলবে ওদের বাসায় যেন ঠিকমত বিদ্যুৎ দেয়।’
গরমে অস্থির হয়ে উপমা বাথরুমে যায়। ট্যাব ছেড়ে পানি ছিটাতে থাকে সারা শরীরে। গায়ের জামা আর পরনের প্যান্ট ভিজে যায় তাতে। একা একা গায়ে পানি ঢেলে দাদীকে ডাকতে থাকে উপমা।
‘ও দাদী আমাকে গোসল করিয়ে দাও।’
‘এখন গোসল কেন। মা আসুক। তখন একসাথে গোসল করবে।’
‘দাদী দাও না গোসল করিয়ে। মা তো এখন আসবে না।’
‘জামা ভিজালে কেন। রাগবে তো মা দেখলে?’
‘দাদী গরম লাগছে। দাও না গোসল করিয়ে।’
গোসল হলে খাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয় উপমা। খেতে খেতে ছেলেধরা সম্পর্কে অনেক কথা বলে সে দাদীর সাথে। শরীর ভালো না দাদীর। বেশি কথা বললে শ্বাসকষ্ট হয়। নামাজের সময় হওয়ায় দাদী পাটি পেতে নামাজে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ দাদীর নামাজ পড়া দেখে বারান্দায় গিয়ে চুপচাপ বসে থাকল সে।
একা একা সে অনেক কিছুই ভাবতে লাগল। এমন করে তার দিনগুলো বদলে গেল কেন? রংপুর থেকে বাবা যখন নীলফামারী বদলি হল তখন শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে বাসা নিলো তারা। উপমা তখন বিকেল বেলা বাবা মায়ের সাথে ঘুরত। মাঝে মাঝে সৈয়দপুর, জলঢাকা, আর কিশোরগঞ্জ বেড়াতে যেত সে বাবার সাথে। তিস্তা ব্যারাজের প্রশস্ত চ্যানেল আর নীল সাগরের ছায়াঘেরা পরিচ্ছন্ন পথে ঘুরে বেড়াত সে মায়ের সাথে। চাকরির প্রমোশন হলে বাবার ব্যস্ততা অনেক বেড়ে গেল। বিভিন্ন ব্রাঞ্চের তদারকি আর হেড অফিসে যোগাযোগ করতে প্রায় সময়ই বাবাকে বাইরে থাকতে হতো। বাবা না থাকলে উপমার ভালো লাগত না। সারাটা দিন মা সাথে থাকত। খালামণিরা পালা করে মোবাইলে কথা বলত। তাতে তার মনের খারাপ লাগা দূর হতো। একটা নামী কেজি স্কুলে ভর্তি হয়েছিল সে। সেখানে তার অনেক ভালো বন্ধু জুটেছিল। তার একান্ত প্রিয় মোনালিসা আর অঙ্কিতা কুণ্ড তার বাসায় বেড়াতে আসত। কত আনন্দে দিন কাটছিল উপমার।
চাকরির নিয়োগ পেয়ে মা তাকে নিয়ে দেশের বাড়িতে গেল জয়েন করতে। অফিসের পিয়নকে বাসা দেখতে বলে বাবাও চলে এল দু’দিন পরে। ফিরে গিয়ে তারা দেখতে পেল জানালার গ্রিল কেটে বাসায় চোর ঢুকেছে। স্বর্ণের অলঙ্কার, পরনের কাপড়চোপড় সবকিছুই নিয়ে গেছে চোর। বাসা চুরির ঘটনায় খুব পুলকিত হলো উপমা। সে অবাক হয়ে দেখতে লাগল চোরটার কাণ্ড। কী সুন্দর করে লোহার গ্রিল কেটে ঘরে ঢুকেছিল চোরটা। উপমার খেলনার বাক্সটা তার চোখেই পড়েনি।
নানুবাড়ির কেউ আসে না এখন ওদের বাসায়। খালামণিরাও আগের মতো কথা বলে না ফোনে। এই প্রাণহীন পরিবেশে দম বন্ধ হয়ে যেতে চায় উপমার। মা যে কেমন মানুষ! নানুভাইয়ের সাথে জিদ করে কাজল মামার বিয়েতে গেলই না শেষ পর্যন্ত। একটাই তো মামা তার। উপমার কত আশা ছিল মামার বিয়েতে যাবে। মজা করে খাবে আর আনন্দ করবে। লালশাড়ি পরা রাঙা বউয়ের কাছে বসে কত ছবি তুলত উপমা। কিন্তু মা তার সে আশা পূরণ হতে দিল না। এসব কথা মনে হতেই মেজাজ বিগড়ে গেল তার। একটা খেলনা পুতুল তুলে জোরে আছাড় দিল সে।
খালামণিদের মায়াভরা ছবি মনে ভাসতেই তার চোখে পানি এলো। তাকে কত আদর করত তারা।
রুমে গিয়ে উপমা তাদের সব ছবি অ্যালবাম থেকে বের করল। ছবিগুলো নিয়ে বারান্দায় গেল সে। অনুচ্চ শব্দে মনের অনেক কথা বলল তাদের সাথে। তাদের স্মৃতি উপমাকে নিয়ে গেল ঘাসের মুক্ত প্রান্তরে। তার ব্যথিত মনে ঝরল চাঁদের জোছনা। এই বন্দিত্ব থেকে কেমন করে মুক্তি পাবে সে।
যে নানী উপমা বলতে পাগল তার হাত থেকে ব্যাগ কেড়ে নিয়ে নানুবাড়ির সাথে সব সম্পর্ক তুলে দিয়ে চলে এসেছে মা। এখন ওকে একা রেখে মা সারাদিন অফিসে থাকে। যে স্কুলে এখন পড়ছে উপমা সেখানে তার পরিচিত কেউ নেই। অঙ্কিতার মত একজন বান্ধবীও জুটল না তার।
রাস্তায় চোখ পড়তেই উপমা চমকে উঠল। মায়ের মত চশমা চোখে একজন মহিলা আসছে। ভালো করে দেখে সে বুঝল ওটা তার মা নয়। আজ মা নীল শাড়ি পরেছে। আর এ মহিলার পরনে গোলাপি সেমিজ পাজামা। উপমা ভাবল বড় হয়ে সেও মায়ের মত হবে। মা রাগ করলে সেও কথা বলবে না। তখন অনেক দূরে একাই একটা বাসা ভাড়া নেবে সে। নানী অসুস্থ হওয়ার কথা শুনেও মা দেখতে যায়নি। তিনা খালামণির পেট অপারেশন হলেও চুপ করে থেকেছে মা। তখন খুব কান্না পেয়েছিল উপমার। খালামণিরা কি আর আসবে না? এভাবে কতদিন একঘরে হয়ে থাকবে সে। নানুভাই তো মায়ের সাথে রাগ করতেও পারে। ওভাবে চলে আসাটা মায়ের কি ঠিক হয়েছে! বিয়েতে যাওয়ার জন্য কত সেধেছিল কাজল মামা। মা সোজাসুজি না বলে দিয়েছিল। মামীটা যে কেমন, তাও দেখা হলো না উপমার। বাইরে আগুনের মতো গরম রোদ। বাড়ির ছাদ, পিচের রাস্তা ঝলসে যাচ্ছে সে রোদে। রোদের দিকে চোখ তুলে তাকানো যায় না। বিদ্যুতের লোডশেডিং জনজীবন অচল করে দিচ্ছে। ভ্যাপসা গরমে গা গুলিয়ে যাচ্ছে উপমার। বাসাটায় একটু ছায়াও নেই। তার নানুবাড়িতে বড় বড় গাছের কত ঘন ছায়া গাছের ছায়ায় বসে বউ বউ খেলতে তার কত ভালো লাগে। গরমে খুব অস্থির হয়ে পড়ল সে। ভন ভন করে মাথা ঘুরতে লাগল তার। কানের মধ্যে এমন বিকট শব্দ হতে লাগল যেন ছাদ পেটান বাড়িটা মাথায় ভেঙে পড়বে। দেয়াল ধরে ধরে দাদীর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করল উপমা। কিন্তু নিজকে সামলাতে না পেরে মেঝেয় পড়ে গেল। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লাগল তার। ‘ও দাদী’ বলে একটা চিৎকার দিল উপমা। চিৎকার শুনে দাদী ছুটে এসে দেখে উপমা মেঝেয় পড়ে আছে। কী করবেন তিনি এই পরিস্থিতিতে! বাইরে তো তালা লাগান। উপায় না দেখে দাদী তার মাথায় পানি ঢালতে লাগল।
প্রচণ্ড গরম ও মানসিক উত্তেজনায় হিটস্ট্রোক হয়েছিল উপমার। ভাগ্যিস মা এসে গেছে একটু পরেই। হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসায় দ্রুত সুস্থ হয়েছে সে। তার অসুস্থ হওয়ার খবর শুনে সবাই এসেছে। নানুভাই, নানী, কাজলমামা ও খালামণিরা দাঁড়িয়ে আছে তার বিছানার পাশে। খুব ভালো লাগছে তার। হাসপাতালের ওয়ার্ড ঝলমল করে বাতি জ্বলছে। ফ্যানও ঘুরছে জোরে মাথার ওপর। তাহলে বিদ্যুৎওয়ালা বাতি আর ফ্যানের কারেন্ট একসাথে দিয়েছে! উপমার হৃদয়পটে স্বপ্নগুলো মূর্ত হয়ে উঠল।

SHARE

Leave a Reply