Home নিয়মিত অস্ট্রেলিয়া । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

অস্ট্রেলিয়া । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

অস্ট্রেলিয়া । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
কুইন্সল্যান্ডের গোল্ড কোস্ট সৈকত ও আকাশচুম্বী ভবনসমূহ

অস্ট্রেলিয়া একটি সার্বভৌম দেশ। সরকারি নাম অস্ট্রেলিয়া কমনওয়েলথ। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের মূল ভূমি, তাসমানিয়া দ্বীপ এবং অসংখ্য ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে দেশটি গঠিত। এটি এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বে ওশেনিয়া অঞ্চলে অবস্থিত। মোট আয়তনের দিক দিয়ে এটি ওশেনিয়ার বৃহত্তম দেশ। দেশটির উত্তরে তিমুর সাগর, আরাফুরা সাগর ও টরেস প্রণালী; পূর্বে প্রবাল সাগর এবং তাসমান সাগর; দক্ষিণে ব্যাস প্রণালী ও ভারত মহাসাগর; এবং পশ্চিমে ভারত মহাসাগর। দেশটি পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার লম্বা এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৩ হাজার ৭শ’ কিলোমিটার চওড়া। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মহাদেশ, কিন্তু ৬ষ্ঠ বৃহত্তম দেশ। অস্ট্রেলিয়ার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তরে পাপুয়া নিউগিনি, ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব তিমুর; উত্তর-পূর্বে সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ও ভানুয়াতু এবং দক্ষিণ-পূর্বে নিউজিল্যান্ড।

অস্ট্রেলিয়া । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
কোয়ালা অস্ট্রেলিয়ার উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণী

অস্ট্রেলিয়ার আয়তন ৭৬ লাখ ৯২ হাজার ২৪ বর্গ কিলোমিটার (২৯ লাখ ৬৯ হাজার ৯০৭ বর্গ মাইল)। জনসংখ্যা ২ কোটি ৫৩ লাখ ৭১ হাজার ৭শ’। জাতীয় ভাষা ইংরেজি। জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ইংরেজ ৩৬.১ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ান ৩৩.৫ শতাংশ, আইরিশ ১১ শতাংশ, স্কটিশ ৯.৩ শতাংশ, চীনা ৫.৬ শতাংশ, ইতালিয়ান ৪.৬ শতাংশ, জার্মান ৪.৫ শতাংশ, ভারতীয় ২.৮ শতাংশ, গ্রিক ১.৮ শতাংশ এবং ওলন্দাজ ১.৬ শতাংশ। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীর সংখ্যা ৬,৪৯,১৭১ জন অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ২.৮ শতাংশ। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে জনসংখ্যার ৫৩ শতাংশ খ্রিষ্টান, ২.৬ শতাংশ মুসলিম, ২.৪ শতাংশ বৌদ্ধ, ১.৯ শতাংশ হিন্দু এবং ৩০ শতাংশ মানুষ কোনো ধর্মই অনুসরণ করে না। এদেশের জনবসতি শহর এলাকায় এবং পূর্ব সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরা। সিডনি বৃহত্তম শহর। এ দু’টি শহরই দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত। দেশটির অন্যান্য প্রধান মেট্রোপলিটান এলাকার মধ্যে রয়েছে মেলবোর্ন, ব্রিসবেন, পার্থ ও এডেলাইড।
বিশ্বের বৃহত্তম প্রবাল প্রাচীর গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত ধরে প্রায় ২ হাজার ১০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। এটি আসলে প্রায় ২৫০০ প্রাচীর ও অনেকগুলি ছোট ছোট দ্বীপের সমষ্টি। কুইন্সল্যান্ডের তীরের কাছে অবস্থিত ফেয়ার ফ্যাক্স দ্বীপ গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের অংশ।
অস্ট্রেলিয়া ৬টি অঙ্গরাজ্য নিউসাউথ ওয়েল্স, কুইন্সল্যান্ড, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া, তাসমানিয়া, ভিক্টোরিয়া ও পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া নিয়ে গঠিত। এছাড়াও আছে দুইটি টেরিটরি, অস্ট্রেলীয় রাজধানী টেরিটরি এবং উত্তর টেরিটরি। বহিঃস্থ নির্ভরশীল অঞ্চলের মধ্যে আছে অ্যাশমোর ও কার্টিয়ার দ্বীপপুঞ্জ, অস্ট্রেলীয় অ্যান্টার্কটিকা, ক্রিসমাস দ্বীপ, কোকোস দ্বীপপুঞ্জ, কোরাল সি দ্বীপপুঞ্জ, হার্ড দ্বীপ ও ম্যাকডনাল্ড দ্বীপপুঞ্জ এবং নরফোক দ্বীপ।

অস্ট্রেলিয়া । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম বসতি স্থাপনকারীরা ছিল এখানকার আদিবাসী জাতিগুলি। ইউরোপীয়দের আগমনের আগে এরা প্রায় ৬০ হাজার বছর ধরে এদেশে বসবাস করে আসছিল। অস্ট্রেলিয়ার নামটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘টেরা অস্ট্রেলিস’ (দক্ষিণাঞ্চলীয় ভূমি) থেকে। এই শব্দ দুটো দিয়ে তখন দক্ষিণ গোলার্ধের কল্পিত মহাদেশকে বুঝানো হতো। ১৭শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ওলন্দাজ অনুসন্ধানীরা এই অঞ্চলে পৌঁছে। তারা এখানকার নামকরণ করে ‘নতুন হল্যান্ড’। ১৭৭০ সালে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব অর্ধাংশ গ্রেট ব্রিটেন দাবি করে এবং ১৭৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে নিউসাউথ ওয়েলস কলোনিতে দণ্ডিত অপরাধী দ্বীপান্তরের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে বসতি স্থাপন শুরু করে। এই তারিখটিই পরে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দিবসে পরিণত হয়। ১৭৮৮ সালে দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার পোর্ট জ্যাকসনে প্রথম স্থায়ী উপনিবেশ সৃষ্টি করা হয়; এটি ছিল ব্রিটিশ কয়েদিদের উপনিবেশ। এটিই পরবর্তীকালে বড় হয়ে সিডনি শহরে পরিণত হয়। পরবর্তী দশকগুলোতে জনসংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং ১৮৫০ এর দশকের মধ্যে স্বর্ণ খনির সন্ধানে গোটা অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে অভিযান চালানো হয় এবং অতিরিক্ত পাঁচটি স্বশাসিত ক্রাউন কলোনি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯শ শতক জুড়ে অস্ট্রেলিয়া এক গুচ্ছ ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে কাজ করত। ১৯০১ সালে পয়লা জানুয়ারি এই ছয়টি কলোনি একত্র হয়ে স্বাধীন অস্ট্রেলিয়া কমনওয়েলথ গঠন করে। সেই থেকে অস্ট্রেলিয়া ফেডারেল সংসদীয় সাংবিধানিক রাজতন্ত্র হিসেবে একটি স্থিতিশীল, উদার, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা বজায় রেখে চলেছে।

অস্ট্রেলিয়া । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
পাভলোভা নামের এই মুখরোচক খাবারটি ডিমের সাদা অংশ, চিনি ও স্ট্রবেরি দিয়ে বানানো হয়

অস্ট্রেলিয়ায় ফেডারেল পার্লামেন্টেরিও গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, যেখানে দ্বিতীয় এলিজাবেথ রানী হিসেবে স্বীকৃত। রানীর প্রতিনিধি হিসেবে আছেন গভর্নর জেনারেল স্যার পিটার কসগ্রোভ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। এদেশে প্রতি ৩ বছর পর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পার্লামেন্ট দ্বিকক্ষবিশিষ্ট; ৭৬ আসনের সিনেট এবং ১৫১ আসনের প্রতিনিধি পরিষদ।
সবচেয়ে প্রাচীনতম, সমতল এবং মরু জনবসতিপূর্ণ মহাদেশ হওয়ায় সামান্য উর্বর মাটিসহ অস্ট্রেলিয়ার আয়তন ৭৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৩০ বর্গ কিলোমিটার (২৯,৪১,৩০০ বর্গ মাইল)। মেগা বৈচিত্র্যময় এই দেশটির আকৃতি ও ভূদৃশ্য খুবই চমকপ্রদ ও বৈচিত্র্যময়। এদেশের মধ্যাঞ্চলে মরুভূমি, উত্তর-পূর্বে গ্রীষ্মমন্ডলীয় বৃষ্টিবহুল জঙ্গল এবং দক্ষিণ-পূর্বে পার্বত্য অসংখ্য রেঞ্চ রয়েছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতিবর্গ কিলোমিটারে ৩.৩ জন, যা বিশ্বে সবচেয়ে কম। অস্ট্রেলিয়া খনিজ রফতানি, টেলিযোগাযোগ, ব্যাংকিং এবং শিল্প উৎপাদনের মাধ্যমে আয় করে থাকে। এদেশের মুদ্রার নাম অস্ট্রেলিয়ান ডলার।

অস্ট্রেলিয়া । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
সিডনি অপেরা হাউজ

অস্ট্রেলিয়া খুবই উন্নত একটি দেশ। এদেশের অর্থনীতি বিশ্বের ১৪তম বৃহত্তম। অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিকে উচ্চ-আয়ের অর্থনীতি বলা যায়। এখানকার মাথাপিছু আয় বিশ্বের দশম বৃহত্তম। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের নবম বৃহত্তম বহিরাগত জনসংখ্যার দেশ। এদেশের জনসংখ্যার ২৯ শতাংশ বহিরাগত। অস্ট্রেলিয়া জাতিসংঘ, জি২০, কমনওয়েলথ অব ন্যাশন্স, আনজুস, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি), বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্যাসিফিক আইল্যান্ডস ফোরাম এবং আসিয়ান প্লাসসিক্স মেকানিজমের সদস্য।
অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া তাৎপর্যপূর্ণভাবে মহাসাগরীয় স্রোতের ওপর নির্ভর করে। এর প্রভাবে উত্তর অস্ট্রেলিয়ায় মাঝে মাঝে খরা এবং মৌসুমি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় নিম্নচাপজনিত ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। আর এর ফলে দেশটিতে নানা পরিমাপের বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। দেশটির উত্তর অংশে গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়া বিরাজ করে। অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তর ভাগ অনুর্বর ও আধা-অনুর্বর। সারা বছরের তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে।

অস্ট্রেলিয়া । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
রাজধানী ক্যানবেরায় অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্ট ভবন

ফুটবল, ক্রিকেট, রাগবি, সাঁতার, এথলেটিক্স, টেনিস ও বাস্কেটবল অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় খেলা। রাজস্ব ও দর্শক আকর্ষণের দিক দিয়ে ফুটবল এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ক্রিকেট দল ক্রিকেট বিশ্বকাপের সব সংস্করণে অংশগ্রহণ করে থাকে। অস্ট্রেলিয়া এ পর্যন্ত পাঁচবার বিশ্ব কাপ ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, যা সারা বিশ্বে একটি রেকর্ড। পানিভিত্তিক খেলাধুলা যেমন সাঁতার ও সারফিংয়ের ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়াকে পাওয়ার হাউজ বলা হয়। এদেশে জাতীয়ভাবে জনপ্রিয় অন্যান্য খেলার মধ্যে রয়েছে ঘোড়দৌড়, বাস্কেটবল ও মোটর (সাইকেল-গাড়ি) প্রতিযোগিতা। অস্ট্রেলিয়া আধুনিক যুগের যে পাঁচটি দেশ সবগুলো গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া এদেশে স্কি খেলাও হয়ে থাকে।
দেশটির সঙ্গে অন্যান্য দেশের সুসম্পর্ক রয়েছে। এই দেশের পাসপোর্টে ১০৯টি দেশে বিনাভিসায় ভ্রমণ করা যায়, যা পাসপোর্ট শক্তিসূচকে ৭ম স্থানে রয়েছে।

SHARE

Leave a Reply