Home গল্প ঈদের ছুটি । সাখাওয়াত সজীব

ঈদের ছুটি । সাখাওয়াত সজীব

ঈদের ছুটি । সাখাওয়াত সজীবসাইফুল সাহেব একজন অবসরপ্রাপ্ত হেডমাস্টার। অবসর নিয়েছেন অনেক বছর পূর্বে। বার্ধক্য নামক এক প্রকার অভিশাপের কারণে তৃতীয় পায়ের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করা তার জন্য দুঃসাধ্য ব্যাপার। তবুও তিনি মন্থর গতিতে প্রতিদিন তার বাড়ির এপাশ-ওপাশ হাঁটেন, আর পর্যবেক্ষণ করেন প্রকৃতি, সমাজ আর মানুষের মধ্যকার পরিবর্তনগুলো। তার বিশাল এ বাড়ির বর্তমান লোকসংখ্যা তার অর্ধাঙ্গিনীসহ দুই।
বিষণœতা ও কষ্টের ছাপ নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা-মার কবরের পাশে।
হঠাৎ করে তাঁর হাল মডেলের নোকিয়া ফোনে রিং বেজে উঠলো। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটি আঁখিদ্বয়ের খুব কাছে নিয়ে পরখ করে দেখলেন তার বড় ছেলের কল।
রিসিভ করে হালকা রাগত স্বরে বললেন, তোদের আর আমাকে কল দিতে হবে না। আমরা খুব ভালোই আছি, আমাদেরকে নিয়ে এত ভাবতে হবে না। আর আমার ঔষধপত্রের ব্যবস্থাও আমি করতে পারবো।
এই বলে কল কেটে দিয়ে ফোন বন্ধ করে রেখে দিলেন। বার্ধক্যে নাকি মানুষ একটু বেশিই ইমোশনাল হয়ে যায়, তাই ঘটেছে প্রাক্তন এই মাস্টার মশাইয়ের ক্ষেত্রে।
ঘটনার সূত্রপাত গত দুই দিন আগে, রমজানের চাঁদ উদয়ের আগে তিনি এক এক করে তার তিন ছেলেকে কল দিয়েছিলেন যে, রমজানে তো তোরা মোটামুটি ফ্রি আছিস (যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছুটি), আমার নাতি-নাতনীদের নিয়ে একটু আগেভাগেই গ্রামে চলে আয়। কতদিন ওদের দেখি না, এত বড় বাড়িতে নিঃসঙ্গ জীবন আর ভালো লাগে না। পুরো বাড়ি খাঁ খাঁ করে।
জবাবে বড় ছেলে বললো: না বাবা, আমার কিছু কাজ আছে সেগুলো শেষ করে ২৭-২৮ রমজানে আসবো।
মেজো ছেলে বললো: বাবা, আমার ছেলেমেয়েদের হোম টিউটর আছে কিভাবে আসবো?
ছোট ছেলে বললো: বাবা, এবারের ঈদটা এখানেই করবো ভাবছি, কোরবানির ঈদে বাড়ি যাবো।
সাইফুল সাহেব ভাবছেন, ছেলেদের তিনি উচ্চশিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন, প্রত্যেকেই সম্মানজনক পেশায় চাকরি করছে। তবুও কোথায় যেন তার অপূর্ণতা রয়ে গেছে। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করছেন, তার মতো প্রত্যেকেই তো চায় সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনীদের সাথে জীবনের শেষাংশটা কাটাতে, কিন্তু কয়জনের ভাগ্যে তা জোটে? ডিজিটাল এই যুগ দেয়ার পাশাপাশি কেড়েও নিয়েছে অনেক কিছু।
হঠাৎ তার চোখের সামনে ভেসে উঠে অতীতের কিছু স্মৃতি। খুব সংগ্রাম করে পড়াশুনা করে অনেক প্রচেষ্টার পর সে শিক্ষকতার চাকরিটি পেয়েছিল, হতদরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও খুশিতে তার অশিক্ষিত, কৃষক বাবা-মা পুরো গ্রামবাসীকে মিষ্টি খাইয়েছিল।
একদিন তার অসুস্থ বাবা যখন তাকে চিঠি পাঠিয়ে ছিল যে, সাইফুল তুই ছুটি নিয়ে একটু বাড়ি আয়, তোকে একটু দেখতে মন চাচ্ছে। নতুন চাকরির চাপে তখন সে একটু বিরক্তই হয়েছিল, মনে মনে বলেছিল-একদিকে এই চাকরির প্যারা আর অন্যদিকে বাবা-মা।
নিজের ব্যস্ততা ও চাকরির কারণে অসুস্থ বাবা-মার পাশেও সে থাকতে পারেনি। এমনকি তার হতভাগ্য বাবা-মা ধরণীর বুকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে একমাত্র ছেলের চেহারাটুকু দেখার ইচ্ছেটাও অপূর্ণ রেখেই চিরবিদায় নিয়েছিল। নিজের চিরবিদায়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। এই ভেবে এবং বাবা-মায়ের প্রতি তার আচরণের কথা ভেবে সাইফুল সাহেবের চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো।

SHARE

Leave a Reply