Home চিত্র-বিচিত্র প্রকৃতির বুলডোজার ওমব্যাট । রিয়াজুল ইসলাম

প্রকৃতির বুলডোজার ওমব্যাট । রিয়াজুল ইসলাম

প্রকৃতির বুলডোজার ওমব্যাট । রিয়াজুল ইসলামবুলডোজার নামে পরিচিত একটি প্রাণী ওমব্যাট। ওমব্যাট এক ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণী। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পশু ওমব্যাট। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ওমব্যাট সাউদার্ন হেয়ারি নোজন ওমব্যাট নামে পরিচিত আর উত্তর অস্ট্রেলিয়ার ওমব্যাটকে বলে নর্দার্ন হেয়ারি নোজন ওমব্যাট।
ওমব্যাট প্রধানত নিশাচর প্রাণী। খরগোশের মত দেখতে এই প্রাণীটি গাছের শিকড়, ঘাস, পাতা খেয়ে বাঁচে। ওমব্যাটের লোমের রঙ হলুদাভ লাল থেকে শুরু করে বাদামি, ধূসর বা কালো হতে পারে। এরা লম্বায় প্রায় ৩৯ ইঞ্চি। এদের ওজন ২০ থেকে ৩৫ কেজি। ওমব্যাট খুব দ্রুত বংশ বিস্তারে সক্ষম।

বর্তমানে এ প্রাণীর তিনটি প্রজাতি জীবিত রয়েছে। জন্ম নেয়ার পর ছোট্ট ওমব্যাট ছানাটি খুবই অসহায় থাকে। সে হাঁটতে পারে না, চলতে পারে না। খেতেও পারে না। এমন অবস্থায় মায়ের সাহায্য ছাড়া বেঁচে থাকা শিশু ওমব্যাটের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়।
স্ত্রী ওমব্যাটের দেহে ক্যাঙ্গারুর মতো থলি রয়েছে। এ থলির মুখ পেছনমুখী। মায়ের পেটে থাকা থলিতে করে মা দীর্ঘ পাঁচ মাস তাকে নিজের শরীরের সাথে আটকে রাখে। নিজের বুকের দুধ খাওয়ায়, শত্রুর হাত থেকে তাকে রক্ষা করে। পাঁচ মাস পরে যখন সে নিজে চলাফেরা করতে শেখে তারপর আরো দু’মাস মা তাকে কাছাকাছি রেখে সব কিছু শিখিয়ে দেয়।
কিভাবে পায়ের নখ দিয়ে মাটি খুঁড়ে বাসা বাঁধতে হয়, কিভাবে ঘাস আর গাছের পাতা খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়, কিভাবে শত্রুর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হয়- সব কিছুই মা তাকে শিখিয়ে দেয়।
অর্থাৎ জন্মের পর থেকে একটি ওমব্যাটের স্বাধীনভাবে চলাচলের জন্য অন্তত ৭ মাস সময় লেগে যায়।
ওমব্যাটের দাঁত ইঁদুরের মতো তীক্ষ্ণ। নখর বেশ শক্তিশালী। ধারালো নখর ব্যবহার করে এরা মাটিতে গর্ত খোঁড়ে। মা ওমব্যাটের থলে পেছন দিকে হওয়ায় গর্ত খোঁড়ার সময় থলিতে ময়লা ঢোকে না।
নিশাচর প্রাণী ওমব্যাট। সারাদিন গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। সন্ধ্যে হলে বের হয় খাবারের সন্ধানে।
ওমব্যাট নিশাচর প্রাণী হলেও মাঝে মধ্যে দিনের বেলায়ও বের হওয়ার ঝুঁকি নেয়। বিশেষ করে ঠাণ্ডা ও মেঘাচ্ছন্ন পরিবেশে দিনের বেলায় খাবারের খোঁজে বের হয়। ওমব্যাট তৃণভোজী প্রাণী। ঘাস, হোগলা পাতা, তৃণলতা, গাছের বাকল, মূল ইত্যাদি খাবার হিসেবে গ্রহণ করে।

প্রকৃতির বুলডোজার ওমব্যাট । রিয়াজুল ইসলামঅস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের কাছে ওমব্যাটের গুরুত্ব অনেক বেশি। শিকারের সময় তাই নিজেদের এলাকার শিকার না করে তারা অন্য এলাকার ওমব্যাট শিকার করে। এ দিকে কৃষকেরা মনে করে ওমব্যাট একটি ক্ষতিকর প্রাণী। ধারালো মুখ দিয়ে এরা সমানে মাটি খুঁড়ে ফেলতে পারে। তাতে নষ্ট হয় ফসলের ক্ষেত এবং ক্ষতি হয় ক্ষেতের ফসল। এ জন্য তাদের নাম দেয়া হয়েছে ‘বুলডোজার অব দ্য বুশ’। মুখ দিয়ে খুঁড়ে এরা ফসলের ক্ষেত নষ্ট করে এবং ক্ষেতের ফসল সাবাড় করে। ফলে কৃষকেরা এদের যেখানে পায় সেখানেই মারে। নানাবিধ কারণে পৃথিবী থেকে অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার কৃষকদের রোষানলে পড়ে হেয়ারি নোজড ওমব্যাটও আজ বিলুপ্তির পথে।

কুইন্সল্যান্ডের ৭৫০ একর জমিতে বনায়ন করে সেখানে এদের জন্য থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সেন্টজর্জের শিকার নিষিদ্ধ এলাকাটিও এদের আর একটি উপনিবেশ। বর্তমানে সেখানে ১৩১ প্রজাতির হেয়ারি নোজড ওমব্যাট আছে। শিকাগোর বুকফিল্ড চিড়িয়াখানায় একটি পুরুষ ওমব্যাট ৩৪ বছর এবং স্ত্রী ওমব্যাট ২৪ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার রেকর্ড পাওয়া গেছে।
এভাবে ওমব্যাট মারার কারণে নর্দার্ন হেয়ারি নোজড ওমব্যাটটি আজ সেখানে মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়েছে। তাদের রক্ষার জন্য ২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় গঠিত হয়েছে ‘গ্র্যান্ড ওমব্যাট কাউন্সিল’। এই কাউন্সিল এদের গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছে। ওমব্যাট দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতীক।
এই প্রাণীটি আজ পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।
এখনই এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে তুলতে না পারলে ডাইনোসরের মতো এরাও হয়তো একদিন পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে। এখনই তাদের রক্ষার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। তাই জনগণকে সচেতন করার জন্য প্রতি বছর অক্টোবর মাসের ২২ তারিখকে তারা ‘ওমব্যাট ডে’ ঘোষণা করেছে। ২০০৫ সাল থেকে দিনটি উদযাপিত হয়ে আসছে।
ওমব্যাট প্রাণীটির আর একটি বিষয় না জানলেই নয়। ওমব্যাটের অদ্ভুত একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে, তার মধ্যে একমাত্র ওমব্যাটই কিউব আকৃতির মল ত্যাগ করে থাকে।
প্রকৃতিতে বহুদিন ধরেই এটি একটা বড় ধরনের বিস্ময়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, এই প্রাণী কিভাবে ও কেন এই আকারের মল ত্যাগ করে, এর রহস্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
একটি ওমব্যাট প্রতি রাতে ১০০টির মতো কিউবাকৃতির মল ত্যাগ করতে পারে। এগুলোকে সে যেখানে থাকে এর চারপাশে জড়ো করে নিজেদের এলাকাকে চিহ্নিত করে রাখে। এর মাধ্যমে তারা অন্যদের জানিয়ে দেয় যে এই এলাকাটুকু তার নিজের।
অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো ওমব্যাটের মলদ্বারও গোলাকৃতির কিন্তু তারপরেও তাদের বিষ্ঠা গোলাকার, নলাকৃতির কিংবা পেঁচানো হয় না। গবেষকরা বলছেন, এই প্রাণীটির পাকস্থলী থেকে মলদ্বার পর্যন্ত খাদ্যনালির যে নিম্নাংশ বা অন্ত্র তার স্থিতিস্থাপকতার কারণেই সে এ ধরনের অভিনব আকৃতিতে মল ত্যাগ করতে পারে।

প্রকৃতির বুলডোজার ওমব্যাট । রিয়াজুল ইসলামযুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির প্যাট্রিসিয়া ইয়াং বলেন, ‘প্রথম কথা হলো জীববিজ্ঞানে এ ধরনের অদ্ভুত জিনিস আমি কখনো দেখিনি। আমার কাছে এটা ছিল বড় ধরনের একটি রহস্য।’
ইয়াংয়ের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীদের একটি দল ওমব্যাটের মলের ওপর গবেষণা চালিয়েছে। এর ফল আটলান্টাতে আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটি ডিভিশন অব ফ্লুইড ডিনামিকসের বার্ষিক সম্মেলনে তুলে ধরা হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রাণীটির খাদ্য হজম করতে দুই সপ্তাহের মতো সময় লাগে। তাঁরা তাঁদের গবেষণায় দেখেছেন, ওমব্যাটের মল তাঁদের খাদ্যনালির শেষ ২৫ শতাংশ অংশে গিয়ে তরল অবস্থা থেকে কঠিন অবস্থায় রূপ নেয়। আর একবারে শেষ ৮ শতাংশ অংশে গিয়ে সেটি কিউবের আকৃতি নেয় তার খাদ্যনালির দেয়ালের স্থিতিস্থাপকতার কারণে।
গবেষক ইয়াং বলেন, ‘কিউব তৈরি করার জন্য বর্তমানে আমাদের কাছে মাত্র দুটো উপায় আছে। ছাঁচের মাধ্যমে কিংবা কেটে কেটে কিউব তৈরি করা যায়। এখন আমরা তৃতীয় আরো একটি উপায় সম্পর্কে জানতে পারলাম। প্রকৃতির বাইরে উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই আবিষ্কার বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে।’

SHARE

Leave a Reply