Home গল্প এই নাও তোমাদের গচ্ছিত ধন । ইকবাল কবীর মোহন

এই নাও তোমাদের গচ্ছিত ধন । ইকবাল কবীর মোহন

এই নাও তোমাদের গচ্ছিত ধন । ইকবাল কবীর মোহনমক্কায় তেরো বছর ধরে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এই দীর্ঘ সময়ে কাফের ও মূর্তিপূজারি কুরাইশরা আল্লাহর দীনকে দাবিয়ে রাখতে অনেক চেষ্টা করলো। তবে তারা ব্যর্থ হলো। তারপরও কাফেররা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিদের ওপর অত্যাচারের স্টিমরোলার অব্যাহত রাখলো। তাদের সীমাহীন অত্যাচার ও নিপীড়ন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলো। এই অবস্থায় মুসলমানদের অনেকে আবিসিনিয়া ও মদিনায় হিজরত করেন। এরপরও কাফেরদের অত্যাচার বন্ধ হলো না। ইসলামের আলো মক্কার গণ্ডি ছাড়িয়ে আবিসিনিয়া ও মদিনায় বিচ্ছুরিত হোক- এটাও কাফের-মুশরিকরা মেনে নিতে চাইলো না। তারা এই অবস্থারও অবসান চাইলো। তাই যে কোনো মূল্যে মুসলমানদের হিজরত ঠেকাতে তারা বিশাল পরিকল্পনা গ্রহণ করলো।
কাফেরদের আশঙ্কা- ইসলামের নবীও যেকোনো দিন মদিনায় চলে যেতে পারেন। এটা তারা নিরাপদ বলে মনে করলো না। কেননা, মক্কার কুরাইশরা সিরিয়ার সাথে সম্পর্ক রাখে। সেখানকার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। মদিনার পাশ দিয়েই চলে গেছে সিরিয়ায় যাওয়ার বাণিজ্যপথ। মদিনায় ইসলাম শক্তি অর্জন করলে এটা তাদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এ জন্য তারা নবীজিকে আগেই শেষ করে দিতে চাইলো। তাই সবাই মিলে পরামর্শ গ্রহণ করলো। সবার এক কথা, মুহাম্মদকে হত্যা করতে হবে। সেই অনুয়ায়ী যাবতীয় প্রস্তুতিও গ্রহণ করা হলো।
এক গভীর রাতে একদল সাহসী যুবক নবীজির বাড়ি ঘেরাও করলো। এ খবর নবীজির অজানা রইলো না। তিনিও মদিনায় যাওয়ার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন। আল্লাহর নির্দেশে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গভীর রাতে মক্কা ছেড়ে মদিনার পথে রওনা হলেন। তাঁর সাথী হলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু। যাওয়ার আগে নবীজি একটা বড় কাজ শেষ করলেন। তাঁর কাছে মক্কার কাফের-মুশরিক ও মুসলিম নির্বিশেষে অনেকের আমানত গচ্ছিত ছিলো। মক্কার লোকেরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমানতদার বা বিশ্বাসী বলে জানতো। তাই তাঁর কাছেই তারা তাদের মূল্যবান সম্পদ আমানত রাখতো। আজ হিজরতের দিনে মানুষের এসব আমানত প্রাপ্য ব্যক্তিদের ফেরত দিতে হবে। এ কথা হিজরতের কঠিন সময়েও নবীজি ভুলে গেলেন না। তিনি এই দায়িত্ব আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর ওপর অর্পণ করলেন এবং তাঁকে নবীজির বিছানায় শুইয়ে থাকতে নির্দেশ দিলেন। পরদিন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু মানুষের আমানত ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা নেবেন।
কুরাইশ যুবকরা সারা রাত নবীজির বাড়ি পাহারা দিলো। কিন্তু এক ফাঁকে নবীজি আল্লাহর রহমতে ঘর থেকে নিরাপদে বের হয়ে গেলেন। প্রহরারত যুবকরা এর কিছুই টের পেলো না। সকালবেলা কুরাইশ যুবকরা নবীজির ঘরে ঢুকলো। কিন্তু একি! বিছানায় নবীজি নেই! তাঁর বিছানায় শুয়ে আছেন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু। হজরত আলীকে দেখে যুবকরা ক্রোধে ফেটে পড়লো। তারা আলীকে তরবারির খোঁচায় জাগিয়ে তুললো এবং বললো, ‘এই বল, মুহাম্মদ কোথায়?’
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু আরবের সেরা বীর ও নির্ভীক এক টগবগে তরুণ। তিনি মোটেও ভয় পাওয়ার পাত্র নন। তাই আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আমি সারা রাত ঘুমিয়েছি, আর তোমরা পাহারা দিয়েছো। সুতরাং আমার চেয়ে তোমরাই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ভালো করে জানো।’
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর জবাব শুনে কুরাইশ যুবকদের ক্রোধ আরও বেড়ে গেলো। তারা আলীকে শাসিয়ে দিয়ে বললো, ‘মুহাম্মদের সন্ধান তাড়াতাড়ি বলো, নতুবা তোর রক্ষা নেই।’
এ সময় আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুও কঠোর কণ্ঠে বললেন, ‘আমি কি তোমাদের চাকর যে তোমাদের শত্রুর গতিবিধি লক্ষ রেখেছি? কেনো তোমরা আমাকে বিরক্ত করছো?’
একটু থেমে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু কয়েকজনের নাম ধরে ডাকলেন। তিনি তাদের বললেন, ‘তোমরা আমার সাথে এসো। তোমাদের জন্য শুভ সংবাদ আছে।’
কথা শেষ করে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু পথ চলতে শুরু করলেন। যাদের নাম তিনি উল্লেখ করলেন তারাও তাঁর পিছু পিছু চললো। সবার হাতে নাঙা তলোয়ার। তাদের মনের কোণে বারবার উঁকি দিচ্ছিলো একটি ক্ষীণ আশা। তারা ভাবছিলো, হয়তো আলী তাদের মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধান দিতে নিয়ে চলেছেন। চলতে চলতে অবশেষে তারা এক গৃহদ্বারে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু পেছনে ফিরে ওদের বললেন, ‘দাঁড়াও তোমরা। আমি এখনই ফিরে আসছি।’
এরপর তিনি ঘরের ভেতরে চলে গেলেন। পেছনে কয়েকজনের অন্তর তখন কাঁপছিলো। তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ভয় কাজ করছিলো। কী করেন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু। হঠাৎ কোনো একটা কিছু করে বসেন কি না। কারণ, এই মহাবীরের আক্রমণ রোধ করা হবে কঠিন কাজ। তাই তারা উলঙ্গ তরবারি হাতে পরিস্থিতি মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকলো।
এমন সময় আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁর হাতে ছিলো ধন-রতেœর কয়েকটি থলে। তিনি লোকদের সামনে উপস্থিত হলেন এবং ধন-রত্নের থলে তাদের সামনে ধরে বললেন, ‘নাও, তোমরা নাকি বহুদিন পূর্বে তোমাদের ধন-রতœ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গচ্ছিত রেখেছিলে? ভেবেছিলে, গচ্ছিত ধন আর পাবে না। আজ তিনি তোমাদের অত্যাচারে দেশত্যাগ করে চলে গেছেন। কিন্তু তোমাদের গচ্ছিত সম্পদ তোমাদের হাতে পৌঁছে দেয়ার সব ব্যবস্থা করে গেছেন। এই নাও তোমাদের গচ্ছিত ধন।’
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর কথা শুনে কাফের কুরাইশরা যেনো স্তম্ভিত হয়ে গেলো। অবাক-বিস্ময়ে তারা আর কিছুই বলতে পারলো না। এত শত্রুতার পরও তারা যে তাদের আমানত ফিরে পাবে, সেই আশা তারা করেনি। তাই তারা বিস্ময়বিমূঢ় হলো এবং এই ঘটনা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলো। সত্যিই মুহাম্মদের ন্যায় বিশ্বাসী ও সত্যবাদী লোক বিশ্বে আর নেই! তবে কি তিনি সত্য পথেই আছেন? আর আমরা ভ্রান্ত পথে আছি? তাঁকে আমরা আঘাতের পর আঘাত দিয়েছি। আর বিনিময়ে আমরা পেয়েছি তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং মানুষ হওয়ার উত্তম উপদেশ। আজ আমরা তাঁর প্রাণ নিতে এসেছিলোম। কিন্তু এই কঠিন সময়েও তিনি ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন গচ্ছিত ধন-রত্ন! আহ! মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো আসলেই মহামানব। তিনি যদি আমাদের ধর্মের বিরোধী না হতেন, তাঁর পদানত দাস হয়ে থাকতেও আমাদের কিছু মাত্র আপত্তি ছিলো না।

SHARE

Leave a Reply