Home নিবন্ধ রবীন্দ্রনাথের শিশু মন । দেলোয়ার হোসেন

রবীন্দ্রনাথের শিশু মন । দেলোয়ার হোসেন

রবীন্দ্রনাথের শিশু মন । দেলোয়ার হোসেনআমাদের এই সুন্দর পৃথিবীতে রয়েছে নদ-নদী, পাহাড়, সাগর-মহাসাগর এবং ছোট-বড় অগণিত বন-জঙ্গল। রয়েছে নানান রকম পশু-পাখি ও রঙবেরঙের ফুলের সমাহার। আমরা জানি পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। এই এক ভাগ স্থলে রয়েছে অসংখ্য দেশ। প্রতিটি দেশেই রয়েছে মানুষের বসবাস। সেই মানুষ মনের কথা মনের ভাব প্রকাশ করে কিছু শব্দের মাধ্যমে- সেই শব্দই তাদের ভাষা। এক এক দেশে এক এক রকম ভাষা।
তাদের সেই ভাষার মাধ্যমেই তারা নিজেদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে উন্নতির শিখরে। সব দেশেই রয়েছে লেখক, কবি, শিল্পী, বিজ্ঞানী এবং অন্যান্য গুণী ব্যক্তিরা। আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা। যা আমরা শিশুকাল থেকেই আপনা-আপনি শিখে ফেলি মায়ের কাছ থেকে। তারই নাম মাতৃভাষা। আমাদের বাংলা ভাষার ওপর কবিতা গল্প, গান এবং নানান রকম প্রবন্ধ লিখেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি পশ্চিম বাংলার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর অসাধারণ কবিপ্রতিভা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে খ্যাতির শীর্ষ চূড়ায়। তাঁর গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস আমাদের অমূল্য সম্পদ।
সব বড়রা কিন্তু শুধুই বড়দের জন্য লেখেননি। তাঁরা লিখেছেন, ছোটদের জন্যও প্রচুর কবিতা, গল্প, নাটক এবং রূপকথা। কবিদের বয়স যতই হোক, কিন্তু তাঁদের মন শিশুদের মত স্নিগ্ধ ও পবিত্র। হাসি আনন্দে ভরপুর। তাঁরা সবাই জানেন তিনিও তো একদিন শিশু ছিলেন। এই বিষয়টি আবার সবার মনের সাথে মিলবে এ-আশা করা যায় না। তবে, কবিদের মন-হৃদয় অন্যরকম। তাঁদের সাথে সাধারণ মানুষের তুলনা হয় না। শিশু মনের আকাশে কত যে রঙবেরঙের ছবি আর সুন্দর মায়াময় জালপাতা তা- সত্যি মনকে ভরিয়ে তোলে। সেই বিশাল মনোরাজ্যের সম্পদই ছড়িয়ে দিয়েছেন শিশু, কিশোরদের জন্য। তিনি যা কিছু তাঁর ভাবনার জালে জড়িয়ে ছিলেন- সেই ছোট মনের ছোট-ছোট কথায় লিখে গেছেন সারাবিশ্বের শিশুদের জন্য। যা সত্য, যা অনুভবের তা কেউ মনে রাখে না। কিন্তু কবিদের অন্তরের সিন্দুকে তা জমা থাকে।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশু’ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশকাল- বাংলা তেরশো দশ সালে। তারপর শত-শত বার পুনঃমুদ্রণ হয়েছে গ্রন্থটি। এই কাব্য গ্রন্থটিতে বাষট্টিটি কবিতা স্থান পেয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি কবিতা এখানে আলোকপাত করছি।

কবিতায় রয়েছে-
শিশু মনের আকাশ, শিশুর চাওয়া-পাওয়া, শিশু-কিশোরদের সরল মনের সুরভি ছড়ানো যত কথা।
জগৎ পারাবারের তীরে, কবিতায় কবি বলেছেন- অন্তহীন আকাশের নিচে কত কিছু ঘটছে দিবা-রাত্রি। সমুদ্রের জল নাচ্ছে অবিরাম অনন্তকাল ধরে, মানুষ জীবন-যাপনের চক্রবালে করছে কোলাহল। ছেলেরা-মেয়েরা ঝিনুক কুড়ায়, পাতার নৌকা ভাসায়। তারা ডুবুরির মত মুক্তা খোঁজে না। সমুদ্রের ঢেউ শিশুর কানে সুরের দোলনা হয়ে দোলে। কত ঝঞ্ঝা কত মরণ দূত যায়- আসে এই জগৎ পারাবারের তীরে, তাতে শিশুদের কিছু যায়- আসে না- তারা তাদের খেলায় মেতে থাকে। যার মধ্যে প্রাণের চঞ্চলতা আছে কিন্তু স্বার্থের ছায়া নেই।

জন্ম কথা কবিতায় কবি বলেছেন-
খোকা মাকে বলছে, মা- আমি কোথা থেকে তোমার কোলে এলাম। তুমি আমাকে কোথায় কুড়িয়ে পেয়েছো?
মা হেসে বলে- তুই ছিলি আমার মনের মাঝে ইচ্ছে হয়ে। তুই ছিলি আমার পুতুল খেলার মধ্যে। তোকে কতবার ভেঙেছি আর কতবার মনের মত করে গড়েছি। আমার সকল ভালোবাসার মধ্যেই ছিল তোর বাস। তুই লুকিয়ে ছিলি গৃহ দেবীর কোলের মধ্যে।
হারায় হারায় ভয়ে গো তাই
বুকে চেপে রাখতে যে চাই,
কেঁদে মরি একটু সরে দাঁড়ালে।
জানিনে কোন মায়ায় ফেঁদে
বিশ্বের ধন রাখবো বেঁধে
আমার এ ক্ষীণ বাহু দু’টির আড়ালে।

খোকা কবিতায় কবি বলেছেন-
খোকার চোখে যে ঘুম আসে- সে ঘুম কোথা থেকে আসে, তা কি কেউ জানো? রূপকথার গাঁয়ে জোনাকি জ্বলা এক বনে পারুল কুঁড়ির মধ্যে তার বাসা। সেখান থেকেই ঘুম আসে আবার চলে যায়। ঘুমের মধ্যে খোকা যে মধুর হাসে- সে হাসি আসে শিশু চাঁদের কিরণ যেনো চমক লাগায় খোকার ঠোঁটে। এ-ছাড়াও খোকার গায়ের রঙ, খোকার কোমলতা ইত্যাদি নিয়ে মায়ের মায়াঝরা বর্ণনা।
রবীন্দ্রনাথের শিশু মন । দেলোয়ার হোসেন‘ঘুম চোরা’ কবিতায় কবি তার মায়ের কথাটাই বলছেন। আমি আমার খোকাকে ঘুম পাড়িয়ে গেলাম, সেই ঘুম কখন কিভাবে কে চুরি করলো! মা যখন ঘট কাঁখে ওপাড়ার দিঘিতে জল আনতে গিয়েছিল তখন রোদ ভরা আকাশ, ছেলেরা খেলা ছেড়ে গেছে। পাখিরা ঝোপ-ঝাড়ে ছায়ায় বসে। শুধু পায়রার খোঁপে চলছে- বাক-বাকুম। তখন রাখাল গরুর পাল রেখে বটতলায় ঘুমিয়ে পড়েছে। জলাতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে বকেরা সেই ফাঁকে ঘুম চোর এসে খোকার ঘুম চুরি করে উড়ে গেছে আকাশে। মা এসে দেখে তার খোকা একা-একা ঘরময় হাঁমাগুড়ি দিয়ে ফিরছে।
মা বলছে, সেই চোরকে যেখানে পাই সেখান থেকেই ধরে আনবো, লুকাবে কোথা ত্রিলোকে-… আমি যাবো গুহার কিনারে ঝর্ণার পাশে, যেখানে রয়েছে কালো কালো পাথর। যাবো বকুল বনে, বুড়ো বট গাছটার তলায়। যাবো সাঁঝের বেলা ঝোপের পাশে, যেখানে জোর ঝিল্লি ডাকে, জোনাকিরা আলো জ্বালে। আমি তাদের বলবো, আমার খোকার ঘুম চোর কি তোমাদের জানাশোনা কেউ?
যখন সাঁঝেরবেলা ভাঙিবে হাটের মেলা,
ছেলেরা মায়ের কোল ভরিবে
সারারাত টিটি পাখি টিটকারি দিবে ডাকি,
ঘুম চোরা কার ঘুম হরিবে।
বিচার কবিতায় মা বলছে, আমার খোকার কী দোষ আছে না আছে সবই আমি জানি; তার ভালো মন্দ নিয়ে বোঝাপড়া হবে আমার সাথে। বাইরে থেকে যতই তোমরা তাকে দোষারূপ কর, খোকা আমার কতখানি তা- তোমরা জানো না- বোঝও না। তোমরা শুধু দোষ-গুণ তার খোঁজো। আমি তাকে বুকে বেঁধে শাসন করি। আমি নিজে কেঁদে তাকে কাঁদাই। আমি তার বিচার করি, শাসন করি আবার তার দোষও ধরি যা- আমার খুশি।
তোমার শাসন আমরা মানিনে গো।
শাসন করা তারই সাজে
সোহাগ করে যে গো।
চাতুরী কবিতায় মা বলছে- আমার খোকা যদি ইচ্ছে করে যে আমি পারিজাতের বনে উড়ে যাবো; যেতে পারে। কিন্তু সে যায় না- কারণ মায়ের বুকে মাথা রেখে সে শুয়ে থাকতে ভালো বাসে। মায়ের মুখটা না দেখতে পেলেই যে তার চোখে জল আসে।
আমার খোকা সব কথায় জানে। তার ভাষা কেউ বোঝে না তাই মৌন থাকে। সে শুধু মায়ের বলা কথা শিখতেই আকুল থাকে, তাই তো চেয়ে থাকে মায়ের চাঁদ মুখের দিকে।
নির্লিপ্ত কবিতায় মা বলছেন- বাছারে তুই যে ধুলার মধ্যে বসে লতা-পাতা নিয়ে খেলা করতে-করতে বেলা গেল- আমি তোর কাণ্ড দেখে কেবলই হাসি। আমিও যে হিসাবের খাতায় হিসাব মিলাতে-মিলাতে আমার মাথা ঘুরে যায়। আমি ভাবি তোকে খেলনা কিনে দিবো। সে খেলনা কোথায় পাবো। তার জন্য সোনা-রূপার ঢেলা জমাই। কিন্তু আমার মনের চাওয়ার মতো কিছুই তো আমি খুঁজে পাই না কোথাও। যেন মধুর কবিতায় মা বলছে, তোর লাল টুক্টুকে হাতে যখন খেলনা দেই তখনই বুঝি প্রভাতে কেন এত রঙ ছড়ায় মেঘে। কেন জলের মধ্যে রঙের আলপনা, কেন ফুলের পাপড়িতে এমন রঙ ধরে। আমি গান গেয়ে যখন তোকে নাচাই তখনই বুঝি কেন যে শাখায়-শাখায় পাতায়-পাতায় এমন নাচা-নাচি এমন সুর ঝরে। যখন চুমি তোর মুখখানি তুই হেসে উঠিস। তখন বুঝি- আমার কোন সুখে এত আলো ঢেলে দেয় আর বায়ু অমৃত্যের মত ভরিয়ে দেয় বুক।
রবীন্দ্রনাথের শিশু মন । দেলোয়ার হোসেনখোকার রাজ্য কবিতাতেও ঐ একই রকম মায়ের মনের অব্যক্ত ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। মায়ের এমনই ভাবনা যে, আমি যদি খোকার মনের মাঝখানটিতে থাকতে পারতাম তা’হলে দেখতে পেতাম রবি, শশী, তারা আমার খোকার সাথে দিবস-রাতে গোপনে কত কি যে কথা বলে। রঙিন ধনু হাতে আকাশ থেকে নেমে আসে মাঠে, শালবনে। তখন মেঘেরা আমার খোকার সঙ্গে খেলার জন্য কত রকম কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। আর যা কিছু আমাদের থেকে নীরব আছে, যা- আশার অতীত।
কবির মনে দোলা দেয় মায়ের মনের না বলা কথা। আর নিজের ছোটবেলার সেই সব কথা- যা সে তখন বলতে পারেনি, অথচ ভেবেছে। সেই সব না বলা কথা আর ভাবনার বহিঃপ্রকাশই আমরা কবির শিশু কবিতার মধ্যে লক্ষ করে থাকি। কবি ভাবের জগতে বিচরণ করেন যা- অন্য আর দশ জনের কাছে নিতান্তই মূল্যহীন।

SHARE

Leave a Reply