Home প্রচ্ছদ রচনা পবিত্র ঈদুল আজহা । এস.এম রুহুল আমীন

পবিত্র ঈদুল আজহা । এস.এম রুহুল আমীন

পবিত্র ঈদুল আজহা । এস.এম রুহুল আমীনবন্ধুরা, ঈদের কথা শুনলেই মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। হৃদয়রাজ্যে বয়ে যায় খুশির জোয়ার। আন্দোলিত হয় প্রাণ। আনন্দিত ও আন্দোলিত হবে না কেন? ঈদ মানেই তো খুশি। ঈদ মানেই তো আনন্দ। আমাদের প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ সা. বলেছেন, অন্যান্য ধর্মের লোকদের জন্য যেমন খুশি ও উৎসবের দিন রয়েছে আমাদের জন্যও তেমন রয়েছে দুটো খুশির দিন বা ঈদের দিন। এক, ঈদুল ফিতর দুই, ঈদুল আজহা।
হ্যাঁ বন্ধুরা, আজকে দ্বিতীয় ঈদ- ঈদুল আজহা নিয়েই বলবো। আল্লাহ প্রদত্ত মানুষের ওপর অর্পিত বিধি বিধানের অন্যতম হচ্ছে ঈদুল আজহা। যা এসেছে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম আ.-এর মাধ্যমে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন তাঁর শরয়ী বিধান বাস্তবায়নের জন্য। তারই একজন হযরত ইবরাহীম আ.। জন্ম নিয়েছিলেন বর্তমান ইরাকের তৎকালীন বাবেল শহরে। দ্বীনের দাওয়াত প্রচারে হয়েছিলেন দেশান্তরিত। হিজরত করেছেন বর্তমানের ফিলিস্তিন ও মিসরেও।

কোরবানি কী?
এই ঈদুল আজহাকেই বলা হয় কোরবানির ঈদ। কোরবানি শব্দটি আরবি ‘কুরবুন’ শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ কাছাকাছি, নৈকট্য, সান্নিধ্য, নাগাল প্রভৃতি। ইংরেজিতে বলা হয় Nearness, Closeness, Sacrifice ইত্যাদি। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় কোরবানি বলতে বুঝায় “আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টির জন্য আরবি জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সুবহে সাদিক থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত তাঁরই নামে সুস্থ সবল গৃহপালিত পশু জবেহ করা।” আল্লাহ তা’য়ালার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের আশায় তাঁর পথে রাসূল সা. প্রদর্শিত ও নির্দেশিত পন্থায় নিজের জান-মালের মাধ্যমে আত্মত্যাগকেও কোরবানি বলা হয়। সূরা আল আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন- ‘বলো, হে নবী! নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু সবকিছুই মহান রাব্বুল আলামিনের জন্য।”
মহান আল্লাহ তা’য়ালা সূরা আল কাউসারেও বলেছেন, “হে নবী! নিশ্চয়ই আপনাকে অনেক কিছু (কাউসার) দিয়েছি, অতএব আপনি সালাত আদায় করুন এবং আপনার রবের জন্য কোরবানি (ত্যাগ) করুন। আপনার বিরোধী শক্তিই মূলত লেজকাটা বা অন্তসারশূন্য।”

পবিত্র ঈদুল আজহা । এস.এম রুহুল আমীনকোরবানির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
কুরআনুল কারিমের সূরা আল হজের ৩৪ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে জানা যায় কোরবানির ইতিহাস অতি প্রাচীন ও মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক উম্মাহর জন্য আমি কোরবানির একটি নিয়ম বা বিধান ঠিক করে দিয়েছি, যাতে সে উম্মতের লোকেরা সে পশুদের ওপর আল্লাহর নাম নেয় যেগুলো তিনি তাদের দিয়েছেন।’
সূরা আল মায়িদার ২৭ নম্বর আয়াতে আদি পিতা হযরত আদম আ.-এর ছেলে হাবিল-কাবিলের কোরবানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, যুগে যুগে প্রায় সকল নবী-রাসূলের উম্মতেরাই কোরবানি পালন করেছেন। অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে করেছেন ত্যাগ স্বীকার। কিন্তু প্রভুপ্রেম ও নিঃশর্ত আল্লাহর আনুগত্য মহান রবের কাছে বেশি পছন্দ হয়েছে হযরত ইবরাহিমের। তাই মহান আল্লাহ তা’য়ালা কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের কাছে এ নির্দেশ পৌঁছে দিতে কোরবানির বিধান সচ্ছল ও সামর্থ্যবানদের ওপর করেছেন ওয়াজিব।

হজরত ইবরাহিম ও হযরত ইসমাইলের কোরবানি
হযরত ইবরাহিম আ. ছিলেন খলিলুল্লাহ বা আল্লাহর বন্ধু। আর বন্ধু হওয়ার জন্য তাঁকে দিতে হয়েছে অনেক পরীক্ষা। সম্মুখীন হয়েছেন হাজারো মুসিবতের। করতে হয়েছে অনেক ত্যাগ স্বীকার। তাকে পাস করতে হয়েছে সকল পরীক্ষায় গোল্ডেন পেয়ে শতভাগ। করেছেনও তিনি। সফলতা লাভ করে আস্থা অর্জন করেছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মহান রবের। আর এসব কারণেই তাকে করা হয়েছে বিশ্ববাসীর ইমাম বা নেতা। যে কথা উল্লেখ করা হয়েছে সূরা বাকারার ১২৪ নম্বর আয়াতে। আল্লাহ বলেন- “যখন ইবরাহিমকে তার পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর তিনি তাতে উত্তীর্ণ হলেন, তখন আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা করবো। তিনি বললেন, হে আমার রব! আমার বংশধর থেকেও কি এই ওয়াদা? আল্লাহ বললেন, আমার অঙ্গীকার জালিমদের পর্যন্ত পৌঁছুবে না।”
পবিত্র ঈদুল আজহা । এস.এম রুহুল আমীনআসুন বন্ধুরা, জেনে নিই হযরত ইবরাহিম আ.-কে করা আল্লাহ তা’লার কয়েকটি পরীক্ষা। ক. দ্বীনি দাওয়াত প্রচারের কারণে দেশ ত্যাগ খ. শিশুপুত্র ইসমাইল ও প্রিয়তমা স্ত্রী হাজেরাকে নির্জনে নির্বাসনের নির্মম পরীক্ষা, গ. নিজ পিতা কর্তৃক সংসার থেকে বহিষ্কার আদেশ ঘ. নিজের ভাতিজা ও স্ত্রী ছাড়া কেউ দাওয়াত কবুল না করা ঙ. মিসর সম্রাটের বদ নজরে পড়ে স্ত্রী সারা অপহরণের শিকার হওয়া চ. আশি বছর বয়সে নিজের খাতনা নিজে করার পরীক্ষা ছ. রাজদরবারে সম্রাটের সাথে তর্কযুদ্ধ ও বিনিময়ে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরীক্ষা জ. সর্বশেষ বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার বয়সে জন্ম নেয়া রক্তের বাঁধন, শৈশবে পা দেয়া প্রাণের চেয়েও প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করার পরীক্ষা।
হাজার হাজার বছর পূর্বের আরব মরুভূমি। চেহারায় স্পষ্টত বার্ধক্য রেখার ছাপ। হযরত ইবরাহিম আ. আল্লাহর নবী। আল্লাহ স্বপ্নে বললেন, “তোমার প্রিয় বস্তু আল্লাহর নামে কোরবানি করো।” এ স্বপ্ন দেখলেন একাধারে পরপর তিন দিন। প্রতিদিন জবেহ করলেন একশত করে উট। তিন দিনে জবেহ করলেন তিন’শটি। পুনরায় স্বপ্নাদেশ হলো হে ইবরাহিম তোমার প্রিয় বস্তু কোরবানি করো। আল্লাহর হাবিব ইবরাহিম আ. বুঝতে পারলেন তাকে কোন বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে। কাল বিলম্ব না করে তিনি স্বীয় পুত্র ইসমাইলকে তাঁর স্বপ্নাদেশ ও ইচ্ছার কথা জানালেন অকপটে। যেমন পিতা তেমন পুত্র। এ জন্যই কথায় বলে ‘বাপকা বেটা’। এ সম্পর্কে সূরা আস সাফফাতের ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “সে পুত্র ইসমাইল যখন তাঁর সাথে কাজকর্ম করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহিম একদিন তাঁকে বললো, হে পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখি তোমাকে আমি জবেহ করছি, এখন তুমিই বলো তুমি কী মনে করো এবং আমি কী করতে পারি? পুত্র ইসমাইল বললো, হে আমার শ্রদ্ধেয় পিতা! আপনাকে যে হুকুম দেয়া হয়েছে আপনি তা-ই করুন। অবশ্যই আল্লাহ যদি চান এ কাজে আপনি আমাকে সবরকারী হিসেবেই পাবেন।”
আরবের মিনা প্রান্তরে উপস্থিত হলেন। হযরত ইবরাহিম আ. প্রাণের পুত্র ইসমাইলকে সাথে নিয়ে। উপুড় করে শুয়ে দিলেন জবেহ করার জন্য হযরত ইসমাইলকে। হজরত ইবরাহিম নিজের চোখ বেঁধে পুত্রের ঘাড়ে চালালেন ধারালো ছুরি। আল্লাহর হুকুমে ও ব্যবস্থাপনায় ইসমাইলের পরিবর্তে জবেহ হলো বেহেশতের দুম্বা। এ প্রসঙ্গে সূরা আসসাফাতের ১০৪-১০৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “শেষ পর্যন্ত যখন এরা দু’জন আনুগত্যের শির নত করে দিলো এবং ইবরাহিম পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিলো তখন আমি আওয়াজ দিলাম, হে ইবরাহিম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছো। আমি সৎকর্মকারীদের এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চিতভাবেই এটি ছিলো একটি প্রকাশ্য পরীক্ষা। একটি বড় কোরবানির বিনিময়ে আমি এ শিশুটিকে ছাড়িয়ে নিলাম এবং বংশধরদের মধ্যে চিরকালের জন্য তাঁর প্রশংসা রেখে দিলাম। সালাম বা শান্তি বর্ষিত হোক ইবরাহিমের প্রতি।”
পবিত্র ঈদুল আজহা । এস.এম রুহুল আমীনআত্মত্যাগের এত বড় অনুপম উপমা পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আর ঘটেনি বলেই আমরা জানি। বিষয়টি আল্লাহর কাছে এতোই প্রিয় হলো যে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য কোরবানির বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দেন। নির্দিষ্ট করেন অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে।
রাসূল সা. বলেছেন, “কোরবানির দিন রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে প্রিয় কোনো আমল আল্লাহর কাছে নেই।”
কোরবানির রক্ত জমিনে পতিত হওয়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায় অতএব, তোমরা কোরবানি আদায়ে নিঃসংকোচ ও প্রফুল্লমন হও।”
ত্যাগ ও কোরবানি মুসলিম উম্মাহর নিত্য সঙ্গী। ছিলো অতীতে, আছে এখনো। এখনো আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইবরাহিম ও ইসমাইলের উত্তরসূরিরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দেশত্যাগ করে নিত্য ও নিয়মিত। এভাবে ত্যাগ ও কুরবানি করে যাবে মুমিনগণ কালের পর কাল। যুগের পর যুগ। সবাই মিলেমিশে তৈরি করবে মুক্তির মোহনা।
এসো আজ পাঠ করি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত কোরবানি ও শহীদি ঈদ নামক কবিতার কিছু লাইন। তিনি কোরবানি কবিতায় বলেন-

আজ শোর ওঠে জোর, খুন দে, জান দে, শির দে, বৎস’ শোন।
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন’

এয় ইবরাহিম আজ কোরবানি কর শ্রেষ্ঠ পুত্রধন’
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন’

শহীদি ঈদ নামক কবিতায় তিনি বলেছেন-
শহীদের ঈদ এসেছে আজ
শিরোপরি খুন- লোহিত তাজ
চাহি না ক’ গাভী দুম্বা উট
কতটুকু দান? ও দান ঝুট।

চাই কোরবানি, চাই না দান।
রাখিতে ইজ্জত ইসলামের
শির চাই তোর, তোর ছেলের,
দেবে কি? কে আছ মুসলমান?

তাই এসো বন্ধুরা, আমরা শপথ নিই। উজ্জীবিত হই সত্য চেতনায়। জাতীয় কবির কোরবানি ও শহীদি ঈদের আহ্বানে জেগে ওঠি। আবার বিশ্বকে গড়ে তুলি।
নব উৎসাহ আর উদ্দীপনায় নিজেকে বিলিয়ে দেই আল্লাহর রাহে। ভোগ নয়, ত্যাগ ও কোরবানির মহিমায়। তাহলেই সার্থক হয়ে উঠবে আমাদের জীবন। সার্থক হয়ে উঠবে আমাদের কুরবানির মতো ত্যাগের মহিমা।

SHARE

Leave a Reply