Home চিত্র-বিচিত্র আলপনার কারিগর । রিয়াজুল ইসলাম

আলপনার কারিগর । রিয়াজুল ইসলাম

আলপনার কারিগর । রিয়াজুল ইসলামসাগরের নিচের জগৎটি আজব! আমরা জানি পৃথিবীর তিন ভাগ পানি আর এক ভাগ মাটি। এর বেশির ভাগই সমুদ্রের পানি। সমুদ্রের পানি যে কত গভীর তা বলে বুঝানো সম্ভব না। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতটিকেও অনায়াসে সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে ফেলা সম্ভব, সমুদ্রগুলোর গভীরতা এতই বেশি।
সমুদ্রে রয়েছে নানা প্রজাতির মাছ। আমরা জানি মাছ মানেই সুস্বাদু এবং শরীর স্বাস্থ্যের জন্য ভালো বা উপকারী। তবে সব ধরনের মাছই যে উপকারী হবে সেটা ঠিক নয়। পাফার-ফিশ তেমন একটি মাছ।
পাফার মাছ সমুদ্রে চলাচল করে। অর্থাৎ এদের নিবাস সমুদ্রের তলদেশে। বিচরণও করে এখানে। চলাফেরা করে সমুদ্রপৃষ্ঠে উপরিতল থেকে পাঁচ থেকে পঁয়ত্রিশ ফুট গভীরে। পাফার-ফিশের দেহের গড় দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ ইঞ্চি। এদের বেশি দেখা যায় ফ্লোরিডা, বাহামা, ব্রাজিলের দক্ষিণাংশসহ বিশ্বের প্রায় সব সাগরেই। এই মাছের চোখের ওপরে নিচে সুন্দর বাদামি রেখা দেখতে পাওয়া যায়।
সমুদ্রের লোনা পানির পাশাপাশি কিছু প্রজাতি স্বাদু পানিতেও বাস করতে পারে। সামুদ্রিক মাছ হওয়া সত্ত্বেও এদের মধ্যে যারা মিঠা পানিতেও বাস করে, তারা বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে পটকা মাছ, ফোটকা মাছ বা টেপা মাছ হিসেবে পরিচিত। জাপানিরা পাফার মাছকে ডাকে ফুগু।
পাফার মাছ নকটারনাল বা নিশাচর প্রাণী। দিনের বেলায় ঘাপটি মেরে বসে থাকে নানা ফাঁকফোকরে। রাত হলে এরা বের হয়। সাঁতরে বেড়ায় সাগরে।
আলপনার কারিগর । রিয়াজুল ইসলামপাফার মাছ সাধারণত অমেরুদণ্ডী প্রাণী ও জলজ উদ্ভিদ খায়। পটকা মাছের পাখির ঠোঁটের মত বাঁকানো চারটি দাঁত আছে। এরা এগুলোকে বিভিন্ন খোলসযুক্ত মাছের খোলস ভেঙে ফেলতে, আবার কখনো কখনো প্রবাল বা পাথর চেঁছে ফেলার কাজে ব্যবহার করে। এরা এদের দাঁতগুলোকে একত্র করে মুখকে ঠোঁটের মতো করে শামুক, কাঁকড়ার খোলস ফাটিয়ে ফেলতে পারে। এসব জলজ প্রাণীই এদের খাবার। অন্যদিকে ডলফিন ও হাঙ্গর এবং পেলাজিক অঞ্চলের বিভিন্ন শিকারি মাছ এদের প্রধান শত্রু।
এই মাছের শরীর জুড়েই রয়েছে অসংখ্য কাঁটা। এদের শরীরের কাঁটাগুলো দেখতে খুব ভয়ঙ্কর। এ কারণে অনেকে এ মাছকে কাঁটা মাছও বলে থাকে। শরীর ফুলালেই সেই কাঁটাগুলো হয়ে যায় ভয়ঙ্কর। হয়ে যায় অনেকটা সজারুর কাঁটার মতো শক্ত।
পাফার মাছের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এরা শরীরের ভেতরে প্রচুর পানি ঢোকাতে পারে। প্রচুর পানি ধরে রাখার মতো ফাঁকা জায়গাও আছে শরীরের ভেতর। আর শরীরে যখন এরা প্রচুর পানি ঢোকায় তখনই এ ধরনের ফিশকে বলা হয়ে থাকে পাফার ফিশ। যখন এরা ফুলে বেলুনের মতো রূপ ধারণ করে তখন এদের মাছ বলেই মনে হবে না। ফুলে বেলুনের মতো হয়ে যায় বলে অনেক দেশের শিশুরা এ মাছকে বলে থাকে বেলুন মাছ। আর যখন এরা ফুলে যায় তখন এদের কাঁটাগুলো হয়ে যায় খুবই শক্তিশালী। ধারণা করা হয়, অনেক সময় আত্মরক্ষার জন্য এরা এ কাঁটাগুলো কাজে লাগায়। পাফার মাছের গায়ের কাঁটার জন্য অনেক ধরনের জলজপ্রাণী ভয়ে এদের পাশ দিয়েও যেতে চায় না। ফলে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করে।
পাফার বা বেলুন মাছের রয়েছে চমৎকার গুণ। জাপানিজ উপকূলের ওমামি ওশিমা দ্বীপের কাছে সমুদ্রতলের বালিতে ইয়োজি ওকাতা নামের একজন আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার সেই অদ্ভুত নকশার একটি সচিত্র প্রমাণ রাখতে পেরেছেন। শিল্পী আর কেউ নয়, বেলুন মাছের একটি অচেনা প্রজাতি।
তবে এই বৃত্ত বেলুন মাছগুলো অকারণেই করে না। এই বৃত্তের নকশা এবং আকার তাদের বেঁচে থাকার জন্য খুবই জরুরি। অদ্ভুত নকশার এই বৃত্তগুলো আসলে Torquigener albomaculosus প্রজাতির বেলুন মাছগুলোর ডিম পাড়ার সময় হলে ডিমকে রক্ষা করার জন্য তৈরি করা বাসা। এই ডিজাইনের জন্য বেলুন মাছের ডিমগুলো সমুদ্রের স্রোতের মধ্যেও নিরাপদে থাকে। এমনকি সমুদ্রের ঘূর্ণি বা আক্রমণকারী অন্য প্রজাতি থেকেও ডিমগুলোকে রক্ষা করে। এই একটি বাসা এই মাছ একবারই ব্যবহার করে।
আলপনার কারিগর । রিয়াজুল ইসলামদেখতে আকর্ষণীয় হলেও পাফার ফিশ খাওয়া মানুষের জন্য মোটেই নিরাপদ নয়। কারণ এটি এক ধরনের বিষাক্ত মাছ। বলা যেতে পারে মেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত মাছের তালিকায় নাম উঠেছে পাফার-ফিশের। এমনকি অনেক প্রজাতির পাফার ফিশের ত্বকও মারাত্মক বিষাক্ত।
জাপানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ফুগুর ত্বক ও শরীরে থাকে প্রচণ্ড বিষাক্ত টিউরোটক্সিন নামক উপাদান, যা সায়ানাইডের তুলনায় ১২০০ গুণেরও বেশি কার্যকর বিষ। এর বিষ কোনোভাবে মানুষের পেটে গেলে সাথে সাথে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায় শরীর। আর অল্পক্ষণের মধ্যেই মানুষ মারা যায় অ্যাফাইজিয়াথন রোগে। এর কোনো চিকিৎসাও এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ মাছ এমন বিষাক্ত জেনেও তা আবার অনেক সময় মজা করে খেয়ে থাকে জাপান, চীন, কোরিয়া প্রভৃতি দেশের মানুষ। ধারণা করা হয়, এ মাছের শরীরের যে অংশে বেশি বিষাক্ত পদার্থ আছে তা কেটে ফেলে দিয়ে ওই স্থান ভালো করে ধুয়ে রান্না করা হয়। মৎস্যবিজ্ঞানীরা বলেন, সতর্কতার সাথে এ মাছ রান্না করে না খেলে তা হতে পারে আত্মহত্যার মতো।

SHARE

Leave a Reply