Home প্রবন্ধ আমাদের প্রিয় কবি আল মাহমুদ । মামুন মাহফুজ

আমাদের প্রিয় কবি আল মাহমুদ । মামুন মাহফুজ

আমাদের প্রিয় কবি আল মাহমুদ । মামুন মাহফুজআধুনিক বাংলা কবিতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আল মাহমুদ। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, নতুন চেতনায় ও বাকভঙ্গিতে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। লিখেছেন উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছোটগল্প এমনকি শিশুসাহিত্যেও তার পদচারণা ছিল উল্লেখ করার মতো।
এইতো কয়দিন আগেই তিনি প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেলেন; পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে।
কিন্তু তিনি অনেক আগে থেকেই অনেক স্বপ্ন নিয়ে এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন। তার একটি কবিতায় তিনি এই শেষযাত্রার কথাটি মনের সমস্ত বিশ্বাস আর আবেগ দিয়ে বাঙময় করে রেখে গেছেন। কী প্রগাঢ় দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে অপেক্ষা করেছেন মৃত্যুর জন্য। কবিতায় তিনি বলেন :
“কেন জানি মনে হয় আমি যেভাবেই যাই শেষ পর্যন্ত তোমার কাছে গিয়েই পৌঁছুব।
সবাই যেমন বলে মুল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত। তুমিই আমার মনজিল।
কী হবে তখন যখন আমার দিশেহারা চোখ তোমাকে দেখতে পাবে?”
কাব্য : আমি, দূরগামী/ কবিতা: পরিসমাপ্তির বিশ্রাম
আবার একই সাথে তার মনে ভয় জাগে যদি সেই চোখের অপারেশন করা রোগীর মতো চোখ খুলে কাউকে দেখতে না পায়…
“আমিও ভয় পাই।
যদি শেষ পর্যন্ত তোমার কাছে গিয়ে পৌঁছতে না পারি?
ধরো, পৌঁছেও যদি তোমাকে না পাই? কিংবা আছো কিন্তু আমার সাথে কোনও অজ্ঞাত কারণে দেখা করলে না। ভাবো তখন আমার কী আর থাকবে?”
একজন বিশ্বাসী কবির বৈশিষ্ট্য এটাই তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন পরকাল, হাশর-নশর, ইহজগতের পরিসমাপ্তি। এমনকি আল্লাহর দিদার লাভেরও কী বিপুল আকাঙ্ক্ষা ছিল তার। চলো এই কবি সম্পর্কে, তার জন্ম ও শৈশব সম্পর্কে কিছু জেনে নিই। কবি আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাইস্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। কিন্তু এর পর ঢাকায় এসে শুরু হয় তার সাফল্যের কাব্যযাত্রা।
আমাদের প্রিয় কবি আল মাহমুদ । মামুন মাহফুজশিশুসাহিত্য বা শিশু-কিশোর সাহিত্য নিয়ে নানান জনের নানান রকমের ধারণা বিদ্যমান। দু’শ বছর আগেও এর প্রকাশিত রূপ পাওয়া যায়। তবে বাংলা সাহিত্যে এই শিশুসাহিত্য অভিধাটি প্রথম চালু হয় রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদীর মাধ্যমে। তিনিই সর্বপ্রথম বালক-বালিকাদের জন্য লেখা বা ঘুমপাড়ানি ছড়া, ছেলে- ভোলানো ছড়াকে শিশুসাহিত্য বলে অভিহিত করেন। তিনি যোগীন্দ্রনাথের সঙ্কলিত ‘খুকুমণির ছড়া’ বইয়ের ভূমিকায় বলেন, “আমি আধুনিক যুগের কৃত্রিম শিক্ষার প্রভাবে নির্মিত সাহিত্যের কথা বলিতেছি না, বাঙ্গালীর অকৃত্রিম প্রাচীন নিজস্ব সাহিত্যের কথা বলিতেছি; এবং এই অকৃত্রিমতার হিসাবে বাঙ্গালীর শিশুসাহিত্য বা ছড়া সাহিত্য, যাহা লোকমুখে প্রচারিত হইয়া যুগ ব্যাপিয়া আপন অস্তিত্ব বজায় রাখিয়াছে, কখনও লিপিশিল্পের যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হয় নাই, সেই সাহিত্য সর্বতোভাবে অতুলনীয়।”
এই শিশুসাহিত্যের কিন্তু বেশ কিছু যুগপরিক্রমা রয়েছে। একটা সময় ছিল যখন শিশুসাহিত্য মানে ছিল উপদেশ আর উপদেশ। রবীন্দ্রযুগের আগে এই উপদেশ যুগের কবিদের নাম কিন্তু অনেকেরই জানা। যেমন অক্ষয়কুমার, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। কারই বা মনে পড়ে না… মদনমোহনের সেই ছড়াটি
পাখী-সব করে রব, রাতি পোহাইল।
কাননে কুসুমকলি, সকলি ফুটিল॥
রাখাল গরুর পাল, লয়ে যায় মাঠে।
শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে॥
ফুটিল মালতী ফুল, সৌরভ ছুটিল।
পরিমল লোভে অলি, আসিয়া জুটিল॥
গগনে উঠিল রবি, লোহিত বরণ।
আলোক পাইয়া লোক, পুলকিত মন॥
শীতল বাতাস বয়, জুড়ায় শরীর।
পাতায় পাতায় পড়ে, নিশির শিশির॥
উঠ শিশু মুখ ধোও, পর নিজ বেশ।
আপন পাঠেতে মন, করহ নিবেশ॥
দেখলেতো কতো উপদেশ উপাচারে ভরা ছিল সেই সময়ের ছড়াগুলো? এ ছাড়া অক্ষয় কুমারের চারুপাঠ, বিদ্যাসাগরের বোধোদয়, শিশুশিক্ষাসহ অনেক রচনাই ছিল ঠাসা ঠাসা উপদেশ আর নীতিকথার। তবে রবীন্দ্র-নজরুল যুগে এসে শিশুসাহিত্যে সরাসরি শিশুরাই জায়গা করে নিলো। নজরুলের লিচু চোর, কারই বা না মন কেড়েছে বলো?
“বাবুদের তালপুকুরে
হাবুদের ডালকুকুরে
সেকি বাস করলে তাড়া
বলি থাম একটু দাঁড়া!
পুকুরের ঐ কাছে না
লিচুর এক গাছ আছে না
হোথা না আস্তে গিয়ে
য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে
গাছে গ্যে যেই চড়েছি
ছোট এক ডাল ধরেছি,
ও বাবা মড়াৎ করে
পড়েছি সড়াৎ জোরে!
পড়বি পড় মালির ঘাড়েই
সে ছিল গাছের আড়েই।”
লিচু চোর : কাজী নজরুল ইসলাম
এ ছাড়া ‘ভোর হলো দোর খোলো খুকু মনি ওঠরে’, ‘কাঠবেড়ালি কাঠবেড়ালি পেয়ারা তুমি খাও’…কত কত ছড়া যে নজরুল শিশুদের জন্য নিয়ে এলেন ডালা ভরে। তারই উত্তরসূরি যেন এই কবি আল মাহমুদ। নজরুলের মতোই তিনি শিশুদের অন্তরে ঢুকে পড়েছিলেন কবিতা লেখার সময়। নয়তো তিনি কী করে লিখলেন হতো যদি ঘূর্ণিঝড়, উড়ে যেত স্কুল ঘর, জুম্মাবারে সিন্নি দিতাম মনের বাসনায়… কিংবা দেখো এই ছড়াটি! ঠিক যেন শিশুদের মনের কথাটাই তুলে ধরেছেন কবি:
আম্মা বলেন পড়রে সোনা
আব্বা বলেন মন দে;
পাঠে আমার মন বসে না
কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।
আমার কেবল ইচ্ছে জাগে
নদীর কাছে থাকতে,
বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে
পাখির মতো ডাকতে।
সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে
কর্ণফুলীর কূলটায়।
দুধভরা ওই চাঁদের বাটি
ফেরেস্তারা উল্টায়।
ছড়া সমগ্র: পাখির মতো পৃ: ৩১
একটা কথা ভেবে দেখা দরকার। ছড়াটা পড়তে যতো মজাই লাগুক, এটা কিন্তু শুধু মজার জন্য লেখা ছড়া নয়। এই যে এই লাইনটা “সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, কর্ণফুলীর কূলটায়। দুধভরা ওই চাঁদের বাটি ফেরেস্তারা উল্টায়।” এটা কিন্তু কোনও সাধারণ লাইন নয়। কেন? মনে নেই এর আগেও আমরা এমন ছড়া পড়েছি; “খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কীসে?” এই খোকা কিন্তু সাধারণ খোকা নয়। এই খোকা দেশের সৈনিক, যার হাতে দেশরক্ষার ভার। সে ঘুমিয়ে গেছে বলে, সে পরাজিত হয়েছে বলে, মারা পড়েছে বলে সবাই ঘুমিয়ে গেছে, পাড়া শান্ত। আর এই শান্ত পরিবেশে বর্গীরা মানে অত্যাচারী শাসক ইংরেজরা এলো, খাজনার জন্য অত্যাচার করলো। ধান কেটে নিয়ে গেলো। মানে আমাদের দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করলো।
তাই খোকাকে ঘুমিয়ে গেলে চলবে না, তাকে জেগে থাকতে হবে। সেই একই কথা আল মাহমুদও তার খোকাদের বলছে সবাই যখন কর্ণফুলীর কূলে ঘুমিয়ে পড়েছে তখন দুধভরা মানে সম্পদে পরিপূর্ণ দেশের ভাগ্যটা উল্টে দিচ্ছে ব্রিটিশরা। কী মজার একটা প্রতীক তিনি ব্যবহার করলেন, তাই না? ফেরেস্তা বললেন ইংরেজদের? কেন? এটাকে বলে শ্লেষ, আইরোনি বা বক্রোক্তি। আজ আমরা দেখি ব্রিটিশরা আমেরিকানরা সবচেয়ে ভদ্রজাতি হিসেবে পরিচিত। তারা সন্ত্রাস দমনে ব্যস্ত… অথচ তারা বিভিন্ন দেশে হামলা চালায় আর বলে আমরা সন্ত্রাস নির্মূল করছি। মানে সবাই অপরাধী আর তারা ফেরেস্তা।
যাই হোক, কবি নতুন প্রজন্মকে কৌশলে জাগিয়ে তোলার জন্য অনেক চেষ্টা কিন্তু করেছেন। কারণ, তিনি কেন মেনে নেবেন ভিনদেশীদের দৌরাত্ম্য? কেন মেনে নেবেন অন্যের দাদাগিরি?
হয়তো সে কারণেই তিনি কিশোরদের জন্য লিখলেন ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’।
মাঝে মাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে মনে হয় রক্তই সমাধান, বারুদই অন্তিম তৃপ্তি;
আমি তখন স্বপ্নের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে উঠি।
জেগেই দেখি কৈশোর আমাকে ঘিরে ধরেছে।
যেন বালিশে মাথা রাখতে চায় না এ বালক,
যেন ফুৎকারে উড়িয়ে দেবে মশারি,

না এখনও সে শিশু। মা তাকে ছেলে-ভোলানো ছড়া শোনায়।
বলে, বালিশে মাথা রাখোতো বেটা। শোনো
বখতিয়ারের ঘোড়া আসছে।
আসছে আমাদের সতের সোয়ারি।
হাতে নাঙ্গা তলোয়ার।
কাব্য : বখতিয়ারের ঘোড়া/কবিতা : বখতিয়ারের ঘোড়া

বাঙালি জাতির আরেক গৌরব-ইতিহাস হলো একুশে ফেব্রুয়ারি। তিনি লিখেছেন
ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়
বরকতের রক্ত।
——
প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা
বিষাদগীতি গাইছে পথে
তিতুমীরের কন্যা।
ছড়াসমগ্র : একুশের কবিতা
এমনিভাবে সাহিত্যের চিরায়ত আঙ্গিক ব্যবহার তিনি দেশের স্বাধীনতা, দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি, মানুষের মুক্তি, সংস্কৃতির উজ্জয়নী শক্তির জন্য সাহসী সম্ভাষণ জানিয়ে গেছেন মৃত্যু অবধি। বাংলাদেশের গৌরবময় প্রতিটি সংগ্রামই যেন তার লেখনী সত্তার ভেতর দিয়ে নবরূপে জাগিয়ে দিয়েছে সমাজটাকে।
“আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেছে শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।”
কবিতা : নোলক
কবি খুঁজে বেড়াচ্ছেন সোনার নোলক। মানে আমাদের দেশের রত্ন, রত্নভাণ্ডার ঐতিহ্যকে, সোনার মানুষদেরকে। সবচেয়ে বড় সম্পদ, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে। ঠিক যেমন মায়ের নোলক। এমন শক্তিশালী উপমার ব্যবহার করে কবি আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যে নিজের একটি দৃঢ় অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। কিন্তু তিনি ছিলেন বিশ্বাসী মানুষের পক্ষে, তাই তার আদর্শিক শত্রুরা কখনও কখনও তার কবিতারও শত্রু হয়ে উঠেছেন।
আমাদের প্রিয় কবি আল মাহমুদ । মামুন মাহফুজতবু তিনি লিখেছেন;
ফুল ফুটাতেও যুদ্ধ লাগে
কুঁড়ির মুখে পানি
স্বাধীনতার শব্দ দিয়ে
সাজাই বাগান খানি।

গোলাপ কেন রক্ত বরণ
গোলাপ কেন লাল
বাংলাদেশের নিশান জুড়ে
হাসছে মহাকাল।
ছড়াগ্রন্থ : মোল্লাবাড়ির ছড়া/ ছড়া: ফুল ফোটাতে
১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি পাকিস্তানি শত্রুর বিরুদ্ধে লড়েছেন, এরপর লড়েছেন দেশী শত্রুদের বিরুদ্ধে। তবে সে লড়াই ছিল ফুল ফোটানোর জন্য। ঠিক যেন ওই গানটি মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি।

এই যুদ্ধ আমাদের চলবে অবিরাম। আমরা থেমে গেলে, ঘুমিয়ে গেলে দুধভরা বাটিটা উল্টে দেবে শত্রুরা। তাই সকলকে আবার জেগে উঠতে হবে। স্বপ্নের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে ওঠো তবেই হবে কবির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
শিশুমনের ভাবনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন শিশু ভোলানাথ, শিশু, খাপছাড়া, নজরুল লিখলেন ঝিঙে ফুল, খুকি ও কাঠবেড়াালি, ঘুম জাগানো পাখি আর আল মাহমুদ লিখলেন মোল্লাবাড়ির ছড়া, একটি পাখি লেজ ঝোলা, পাখির কাছে ফুলের কাছে। শিশুমন অতিমাত্রায় খেয়ালি, স্বপ্নময় ও কল্পনাপ্রবণ। তার ভালো লাগে ভয়ের গল্প, ভালো লাগে সাহসের গল্প, ভালো লাগে বিচিত্র অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। সবদিকেই খেয়াল রেখেছেন আল মাহমুদ। খেয়ালি শিশুটির দিকে তাকিয়ে তিনি লিখেছেন :
আমাদের প্রিয় কবি আল মাহমুদ । মামুন মাহফুজএকটা ছেলে, এই ছেলেটা
নখ ভরা যার মাটি।
ময়লা হাতে খায় সে খাবার ধরে দুধের বাটি।
মাছি ভন ভন মাছি ভন ভন
সর্দি ভরা নাক
নাকের ওপর পড়ছে মাছি
যেন কাকের ঝাঁক।
ছড়াগ্রন্থ : একটি পাখি লেজ ঝোলা; কবিতা: বাঁচার জন্য
আবার বিজ্ঞানমনস্ক শিশুশিক্ষার্থীর মনের একান্ত নিজস্ব ভাবনাগুলো তুলে ধরেছেন:
গ্লোবের পেটে কান লাগিয়ে খোকন শোনে কান্না
বিশ্বগোলক ফুঁপিয়ে ওঠে আর পারি ন আর না।
মানুষ নামের বিজ্ঞানীরা আমায় নিয়ে খেলছে
আমার সাগর পাহাড় নদী রোলার দিয়ে বেলছে।
শিশুরা স্বাধীনতাপ্রিয়। তারা নিষেধের নিগড়ে বন্দী থেকে হাঁপিয়ে ওঠে। তাদের সেই কষ্টটা খুব বুঝতেন কবি। আমাদের প্রিয় কবি আল মাহমুদ । মামুন মাহফুজবললেন:
চতুর্দিকে নিষেধনামা, চতুর্দিকে বেড়া,
যেন খাঁচার লোহার জালি কুঞ্জলতায় ঘেরা;
আম্মা লাগান গুণার বাঁধন আব্বা ঝোলান দড়ি
বুবুর হুকুম, বন্ধ রাখো জানালা খড়খড়ি।
আমি তখন কি করি আর? আমার বুকের কাছে
অবাধ্য সব পাখপাখালি বসলো গাছে গাছে।
ছড়া সমগ্র : বদ্ধ ঘরে আমি
তারপর শিশুটির চাওয়া হলো সে হবে নদীর মতো, পাহাড়ে বন বাদাড়ে ছুটে চলা দুরন্ত বালক। কিন্তু তা তো সে পারে না। তাই নদীর হয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করে
“কে তুমি ভাই পড়ছো বসে চোখের জলে ভেসে
মেশাও তোমার চোখের পানি আমার জলে এসে।”
এভাবে প্রতিটি ছড়ায় কবিতায় গল্পে তিনি শিশুদের মনে কথা বলতে গিয়ে নিজেই যেন শিশু হয়ে গেলেন। তিনি তার এক সাক্ষাৎকারে স্বীকারও করলেন তিনি এক বৃদ্ধশিশু। শিশুর মতো সারল্য, অকপট সাহস আর চাতুর্যহীন জীবনের প্রতিচ্ছবি এঁকে একটু একটু করে তিনি আমাদের ছেড়ে কর্ণফুলী নদীর কূল ছেড়ে, বাংলা মায়ের নোলক ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা ক’রে ক’রে বখতিয়ারের ঘোড়ার স্বপ্ন নিয়ে ঐ দেখ আসছে বখতিয়ার এমন স্বপ্ন দেখাতে দেখাতে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার রাত ১১টার দিকে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন। তার শোকে বড়রা যতটা না শোকাহত তার চেয়ে বেশি শোকে মুহ্যমান শিশুরা। কারণ তারা তাদের মানসবন্ধুকে হারিয়েছে। তাদের অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা যিনি অবলীলায় বলে দিতেন কবিতার ভাষায়। সচেতন করে দিতেন অভিভাবকদের… সেই বন্ধুকে হারিয়েছে। তিনি বলতেন
“তোমরা যখন শিখছো পড়া মানুষ হবার জন্য,
আমি না হয় পাখিই হবো, পাখির মতো বন্য।”
সবাই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবে না। কেউ কেউ কবি হবে, প্রকৃতির লালিত বন্য পাখি হবে। যে যা চায়, মন যা চায় তাকে তাই হতে দাও। জোর করে শিশুমনে কোনও আঘাত দিও না। শিশুদের কবি জাগৃতির কবি প্রকৃতির কবি আল মাহমুদ আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন চিরকাল। মানুষের জন্য, শিশুদের জন্য যে ভালোবাসা তিনি বিলিয়ে দিয়েছেন, দেশ মাটি সংস্কৃতি ধর্মের প্রতি যে প্রেম তিনি রচনা করে গেছেন পরকালে তার প্রতিদানে তিনি ধন্য হবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

SHARE

Leave a Reply