Home গল্প আল মাহমুদের গল্প – বেপরোয়া

আল মাহমুদের গল্প – বেপরোয়া

নাম সফিক। বয়স সতেরোর বেশি হবে না। বাড়ি কোথায় তা জানি না। তবে সব সময় তাকে শহরের অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়াতে দেখি। কখনও দেখি স্টেশনের বারান্দায় বাউণ্ডুলে ছেলেদের সাথে বসে কী সব খেলছে। অথবা ফেরিওয়ালা ছেলেদের সাথে মারপিট করে রক্তাক্ত দেহে রাস্তা দিয়ে চলেছে। সব সময় তাকে দেখা যায় গায়ে ছেঁড়া কোট, পরনে ময়লা প্যান্ট, মাথায় চাইনিজ টুপি- যার নিচে চোখ দু’টি ওঁৎ পেতে আছে সাহেবদের পকেট মুখো।
পকেটমার? চুপ! আস্তে বল, শুনতে পেলে জিভ টেনে ঝুলিয়ে দেবে তোমার। নিজের বদনাম সে শুনতেই পারে না। নিজের জাত-ভাইদের ঘৃণা করে সে। সফিকের মতে তারা চুরি করতে জানে না, শুধু মার খেতে জানে। সেও তো চোর, কিন্তু দেখ তার বাহাদুরি, কখনও সে জেলে যায়নি বা ধরা পড়েনি। তার ভাই-বেরাদরেরা ধরা পড়ে যখন বেদম মার খেতে থাকে, সে সময় সফিক কোটের কলারটা উঁচু করে হাসতে হাসতে ওদের দিকে এগিয়ে যায়, ঘৃণাভরে বলে, মারো বেটাদের মেরে ফেল। তারপর জুতো দিয়ে ঠোক্কর মারে চোরটার পিঠের ওপর। বলে, মর বেকুব, মরে যা… আদ্দির পকেটে হাত আটকে যায়? বিষ খেয়ে মরতে পারো না, ছিঁচকে চোর কোথাকার…।
সাহেবদের দিকে ফিরে বলে, ‘ছেড়ে দিন সাব, আমি বানিয়ে দিচ্ছি; আমার হাতে ছেড়ে দিন।’ তারপর ছেলেটাকে টেনে তোলে, ওঠ্… উঠে আয়। এভাবে চোরটাকে নিয়ে সরে আসে সফিক। চোরটা জালিমের হাতে পড়েছে ভেবে সাহেবরা নিশ্চিন্ত মনে পথ ধরেন। এদিকে সফিক চোরটাকে তার চুলের মুঠি ধরে নিরালা জায়গায় নিয়ে আসে। তারপর বলে, এ লাইন ছেড়ে দে, বড় কষ্ট রে, কত মার আর খেতে পারবি। তা ছাড়া জেলে যেতে আর কতক্ষণ। ছেলেটা কান্নাভেজা চোখে হেসে ফেলে। খুশিতে সফিককে প্রশংসা করতে যায়- 
‘তুমি আমার…।’
‘চারটা পয়সা দে বলছি, চা খাব।’
‘পয়সা দেব কোথা থেকে?’
‘ভাগ…।’ লাথি উঁচিয়ে বলে সফিক। ছেলেটা দ্রুত দু’পা পিছিয়ে যায়।
‘আবার দাঁড়িয়েছিস?’
চিৎকার করে উঠে সফিক। তাড়াতাড়ি ছেলেটা সরে যায়। এভাবে তাদের বাঁচায় সফিক। সেদিন সন্ধ্যায় সফিক বসেছিলো চায়ের দোকানটায়। কোনো আড্ডা থেকে সবেমাত্র বেরিয়েছে সে। তিন বাজিতে সমস্ত বন্ধুবান্ধবকে ফতুর করে দিয়ে এসেছে।
একশো টাকা চৌদ্দ সিকি দাম তার ছেঁড়া পাতলুনের বাঁ দিকের পকেটটার, মুখে মৃদু হাসি থেবড়ে আছে। ছেলেদের খেলার মার্বেলগুলোর মতো চোখ দুটো চকচক করে জ্বলছিল তার। ধূমায়িত চায়ের কাপটা সামনের টেবিলটায় ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হচ্ছে।
এমন সময় ট্রেন এসে থামলো স্টেশনে। পিঁপড়ের সারির মতো পিলপিল করে প্যাসেঞ্জার বের হয়ে আসতে লাগল প্লাটফর্ম হতে। সফিকের দৃষ্টি এসে থেমে গেল তাদের ওপর। ভিড়ের ভিতর হতে হঠাৎ একটা লোক চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল, ব্যাগ, আমার ব্যাগ…।
জনতার ভিড় ঘিরে ধরল তাকে।
‘কী হয়েছে মশায়?’
‘পকেট মারা গেছে নাকি?’
‘কত টাকা ছিল দাদা?’
এক ঝাপটা প্রশ্ন সাথে সাথে ঝরে পড়ল।
আমার সর্বনাশ হয়েছে ভাইসব, আমার সব গেছে, আমার ছেলের ফিসের টাকা নিয়ে পালিয়েছে…।
কেঁদে ফেলল লোকটা। আবার জনতার মুখ হতে প্রশ্ন ঝরে পড়ে, কত টাকা ছিলো, য়্যা… কী করে নিল মশায়… ছেলেটা কোন ইয়ারে পড়ে ভাই…। অর্ধেক খেয়ে কাপটা টেবিলের ওপর রেখে উঠে দাঁড়াল সফিক। ক্যাপটা নামিয়ে দিল চোখের ওপর। কোটের কলারটা খাড়া করে দিয়ে ভিড়ের দিকে এগিয়ে যায়। ভিড়ের ভেতর ঢুকে সোজাসুজি লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
‘কত টাকা খোয়া গেছে বললেন?’
‘সত্তর টাকা দু-আনা। আমার ছেলের ফিসের টাকা।’ বলেই আবার হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল লোকটা। লোকটার আপাদমস্তকে দৃষ্টি বুলাতে লাগল সফিক।
পরনে খদ্দরের ময়লা পাঞ্জাবি, ছেঁড়া ধুতির কোচা খসে রাস্তায় লুটোচ্ছে, বয়স পঞ্চাশের ওপর হবে, ভাঁজপড়া গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে চোখের পানি।
‘কোন স্টেশনে টাকাটা খোয়া গেছে বললেন?’
‘এইখানে, এই প্লাটফর্মের ভেতর।’
‘কী করে বুঝলেন?’
‘গাড়ি থেকে নামবার সময় পকেটে হাত দিয়ে দেখেছি টাকাটা আছে, আর এক্ষুনি…।’
কাঁদবেন না, আসুন আমার সঙ্গে। লোকটার হাতে ধরে টেনে ভিড় থেকে আলাদা করে আনল সফিক। পেছন ফিরে তাকাল একবার। ভিড় তার অনুসরণ করছে কি না। ওর পেছনে লোক যারা আসছিল, তাদের দিকে কটমট করে তাকাল সফিক। বলল, ‘কোথায় আসছেন আপনারা? কী চান… চলে যান, চলে যান যে যার পথে। কেন আসছেন, কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবেন ওর টাকা?’
ভিড় ভেঙে গেল। সফিক লোকটাকে টানতে টানতে নিয়ে এল হোটেলের এক ঘুপচিতে। নিজের ময়লা ব্যাগটা খুলল।
‘কত খোয়া গেছে?’
লোকটা কথা বলতে পারল না, অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সফিকের দিকে।
‘কথা বলছেন না যে?’
‘সত্তর টাকা!’ কাঁপতে কাঁপতে বলল লোকটা।
নিন, লাল দশ টাকার সাতটা নোট এগিয়ে দিল সফিক লোকটার দিকে।
‘একি তুমি দেবে কেন?’
‘এমনি দিচ্ছি না, দান নয়। যেই আপনার টাকা নিক না কেন ঠিক আদায় করে নেব। নিন।’ লোকটার হাতে টাকা কয়টা গুঁজে দিল সফিক। ‘সাবধান, টাকা পাওয়ার কথা কাউকে বলবেন না যেন, চুপচাপ চলে যান এই ফাঁড়ি রাস্তা ধরে।’
‘তুমি…।’
‘চুপ! কথা বলবেন না, টাকা পেয়েছেন, চলে যান। হাঙ্গামা বাড়াবেন না। বুড়ো হয়েছেন তবু নিজের পকেট সামলাতে পারেন না। চোখ বুজে চলাফেরা করেন নাকি?’
‘ধন্যবাদ বাবা, দীর্ঘজীবী হও…।’
‘থাক প্রশংসার দরকার নেই।’
‘সত্যিই দেবতা তুমি…।’
‘আমি পকেটমার… চলে যান বলছি।’ চিৎকারে ফেটে পড়ল সফিক। খুশি মনে বিড়বিড় করতে করতে পথ ধরলো লোকটা।
হোটেলের বয়কে চিৎকার করে ডাকল : ‘কলিম, এদিকে আয়।’
‘কি? কিছু চাই নাকি ভায়া? কী দেব বলো? ভেড়ার মাংস আছে আজ, দেব একটু?’ হাত কচলাতে কচলাতে কাছে এসে দাঁড়াল ছেলেটি।
‘বোকার মতো দাঁত বের করেছিস কেন?’
‘ছেলেটার কলার ধরে টানল সফিক। হ্যাঁচকা টান খেয়ে ছেলেটার মাথা নুইয়ে পড়ল তার মুখের কাছে।
‘কি মারধর করছ কেন?’
‘মারব না, শোন…।’
ছেলেটার কান সফিক তার মুখের কাছে টেনে আনল।
‘আজ যদি ছিঁচকে চোরদের কেউ এখানে মাংসের অর্ডার দেয় আমাকে তার নাম জানাতে পারবি?’
‘নিশ্চয়ই পারব।’
‘পুরস্কার পাবি।’
পুরস্কারের কথা শুনে হাসল ছেলেটি।
‘কেন বল তো?’
‘ছিঁড়ে ফেলব তাকে।’
দাঁতে দাঁত ঘষল সফিক।
‘ফাঁকি দিয়েছে বুঝি?’
‘না, চুরি করেছে। একজন গরিবের টাকা। এতদিনে বুঝলাম, চুরি জিনিসটা ভালো না। নিজেদেরও বিশেষ কিছু হয় না আবার আর একজনেরও সর্বনাশ। যাতে এখানে আর চুরি না হয় তাই করব রে। সবার আজ চুরি ছাড়িয়ে তবে ছাড়ব। দুনিয়ায় আর কত কাজ আছে। এর চাইতে রিক্সা টানা ভালো।’ বলল সফিক।
ছেলেটা হতভম্ব হয়ে গেল। একি কথা, ও যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।

SHARE

Leave a Reply