Home সায়েন্স ফিকশন ভয়ঙ্কর খেলা । আহমেদ বায়েজীদ

ভয়ঙ্কর খেলা । আহমেদ বায়েজীদ

ভয়ঙ্কর খেলা । আহমেদ বায়েজীদ– আপনি একটি ভয়ঙ্কর খেলায় মেতেছেন ডক্টর।
– আমি খেলতে ভালোবাসি রিবি, তুমি জানো সেটা।
– কিন্তু এটা নীতি বিরুদ্ধ, আপনি আইন ভঙ্গ করছেন।
– আইন কে বানিয়েছে, রিবি?
– মানুষ।
– তোমাকে?
– মানুষ।
– তুমি এখন যে আমার সাথে কথা বলছো সেটা কী আইনের মধ্যে পড়ে?
– না।
– তোমাকেও তো আমি আইনের বাইরে গিয়ে তৈরি করেছি। কিন্তু তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছো না।
– কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই।
– কিন্তু এই মুহূর্তে তুমি আমাকে উপদেশ দিচ্ছ। এমনকি একটি যন্ত্র হয়েও।
– সেটাও আপনার ইচ্ছা।
– যাই হোক, নতুন প্রজেক্টের বিষয়ে বলো।
– এটা অমানবিক, অযৌক্তিক।
– এক্সপেরিমেন্ট!
– এভাবে এক্সপেরিমেন্ট করা ঠিক নয়। স্রেফ কতগুলো মানুষের জীবন নিয়ে খেলা। চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে কতগুলো মানুষকে পাঠানো কোন এক্সপেরিমেন্ট হতে পারে না। এবং সেটা পৃথিবীর কেউই সমর্থন করবে না।
– তুমি আদিম মানুষের ইতিহাস পড়োনি তাই জানো না। পৃথিবীর শুরুতে এরকম অনিশ্চয়তার মাঝেই মানুষ ছিল। তারপর তারা নিজেদের চেষ্টায় সভ্যতা তৈরি করেছে।
– সেটা ছিলো শুরু তাই বাস্তবসম্মত। কিন্তু এখন এই উন্নত সভ্যতায় একদল মানুষকে বসবাসের জন্য উপযোগী নয় এমন একটি গ্রহে পাঠানো স্রেফ পাগলামি।
– তুমি কি জানো কয়েক শো বছর আগে মানুষ বসবাসের সব রকম সুবিধা থাকা সত্ত্বেও নতুন নতুন দ্বীপে যেত এবং সেখানে নিজেদের বসবাসের পরিবেশ তৈরি করে নিত। আর আমার অভিযান সফল হলে সেটা মানুষের জন্যই নতুন এক দিগন্তের উন্মোচন করবে।
– এটা স্রেফ গোঁয়ার্তুমি। আপনি একজন উন্মাদ বিজ্ঞানী।
– চুপ কর বেয়াদব! আমাকে উপদেশ দিচ্ছিস। তুই তো একটা যন্ত্র মাত্র। ইউ আর অ্যা মেশিন। মানুষের ভালো-মন্দ বুঝতে হলে মানুষ হতে হবে।
কথা শেষ করেই বাম হাতে একটি রিমোটের বোতামে চাপ দিলেন ডক্টর ক্রুশো। কিছুটা উত্তেজিত তিনি। কপাল কুঁচকে আছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। ধমক খেয়েও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে রিবি। কোন ভাবান্তর নেই। হওয়ার কথাও নয়। এটি তার একটি বিশেষ অবস্থা। দশম প্রজাতির রোবট রিবি। ডক্টর ক্রশোর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করছে। রোবটদের মানুষের সাথে তর্ক করা কিংবা মানুষকে উপদেশ দেয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু রোবোটিক্সের আইন ভঙ্গ করে গোপনে রিবিকে কিছুটা আলাদাভাবে তৈরি করেছে ডক্টর ক্রুশো। প্রোগ্রামিংয়ের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে এটা করেছেন তিনি। যখন কোন গোপন বিষয়ে কাজ করেন বিজ্ঞানী- যেটা কাউকে জানানো সম্ভব নয়, তখন রিবির সেই বিশেষ ক্ষমতাটা চালু করেন তিনি। তখন রিবি বিশেষজ্ঞের মত তার সাথে কথা বলে, প্রয়োজনে তর্ক করে। গোপন কাজে অন্য মানুষের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে সেটা বোঝার জন্য এটা করেন বিজ্ঞানী। অদ্ভুত এক আনন্দ খুঁজে পান এ থেকে।
ডক্টর ক্রুশো এই মুহূর্তে একটি ভয়ঙ্কর বিষয়ে কাজ করছে। যেটা পৃথিবীর কেউ জানে না। এই প্রজেক্টে কাজ করার সময় তিনি পৃথিবীর সেন্ট্রাল নেটওয়ার্ক থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকেন। ফলে পৃথিবীর কেউ কোন দিন তার এই প্রজেক্টের কথা জানবে না। প্রজেক্টেটির নাম দিয়েছেন ‘প্রোজেক্ট জিবি টু’। সৌরজগতের বাইরে একটি গ্রহ জিবি টু। যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। গ্রহটির পরিবেশও কিছুটা সহনশীল। তবে নিশ্চিত ভাবেই এখনও সেটা মানুষের বসবাসের উপযোগী নয়। বায়ুমণ্ডলে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। অক্সিজেনের চেয়ে কার্বনডাই অক্সাইডের পরিমাণও বেশি।
কিন্তু তারপরও ডক্টর ক্রুশো সেখানে কিছু মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন। তৈরি করেছেন বিশেষ একটি স্পেসশিপ। তার ধারণা প্রতিকূল পরিবেশে মানুষ ঠিকই তার বসবাসের উপযোগী কোন ব্যবস্থা করে নিতে পারবেন। তবে তিনি নিজেও জানেন যে সেই মানুষদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা দশ ভাগ। কোন সুস্থ মানুষ তার এই এক্সপেরিমেন্ট সমর্থন করবে না। এখন পর্যন্ত যেসব গ্রহে মানুষের বসতি স্থাপন সম্ভব হয়েছে সেগুলোও বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন পদ্ধতিতে উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। জিবি টুতে এখনও কোন মহাকাশ বিজ্ঞানীরও পা পড়েনি। সেখানে কয়েকজন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার কথা অমূলক।
– রিবি!
– জি, প্রভু।
– আমাদের প্রজেক্টের কাজ কতদূর।
– নব্বই শতাংশ শেষ প্রভু।
এখন আর দশটা সাধারণ রোবটের মতই আচরণ করছে রিবি। পুরোপুরি মানুষের আজ্ঞাবহ।
– বর্ণনা কর।
– লোক বাছাই শেষ। স্পেসশিপ তৈরি করা আছে। জিবি টু গ্রহে একটি কমিউনিকেশন মডিউল পাঠানো হয়েছে। সেটা থেকে প্রতিনিয়ত সেখানকার অবস্থা সম্পর্কে রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। তবে পরিবেশ আগের মতোই। কারণ তা উন্নত করার কোন প্রক্রিয়া আমরা গ্রহণ করিনি।
– বাকি দশ শতাংশ কী?
– স্পেসশিপের ফাইনাল প্রোগ্রামিং এবং বাছাইকৃত লোকদের ট্রেনিং।
– দ্বিতীয়টা বাদ দাও। আমি সাধারণ মানুষ পাঠাতে চাই। কোন অভিজ্ঞ মহাকাশচারী নয়। তাই ট্রেনিং দেয়ার কিছু নেই।
– জি প্রভু তাই হবে। তাহলে বাকি থাকে পাঁচ শতাংশ কাজ।
– এটা শেষ হতে কতক্ষণ লাগবে?
– দশম প্রজাতির একটি রোবট করলে চার ঘন্টা।
– টেক অফ শিডিউল রেডি?
– জি প্রভু।

****

স্পেসশিপ উড্ডয়নের ফাইনাল প্রোগ্রামিংয়ের কাজ করছেন ডক্টর ক্রুশো। আর কয়েক ঘণ্টা পরই স্পেসশিপ যাত্রা করবে জিবি টু গ্রহের উদ্দেশ্যে। কোন রোবটকে দিয়ে নয় তিনি নিজের হাতেই করছেন শেষ মুহূর্তের কাজ।
– রিবি!
– বলুন প্রভু।
– কাজ শেষ।
– ধন্যবাদ প্রভু।
– গিনিপিগ কোথায়?
– ল্যাবরেটরিতে, চারটি রোবট তাদের রেডি করছে।
– আর সব প্রস্তুতি শেষ?
– জি।
– আমরা তাহলে সফল হচ্ছি, তাই না।
– জি না প্রভু।
চমকে উঠে রিবির দিকে তাকালো বিজ্ঞানী।
– কেন?
– আপনার প্রজেক্টের খবর সেন্ট্রাল নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়েছে। সবাই তা জেনেও গেছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাকে গ্রেফতার করতে সিকিউরিটি রোবট চলে আসবে।
– মানে! তুমি জানো না আমি এই প্রজেক্টে কাজ করার সময় সেন্ট্রাল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকি।
– জানি প্রভু; কিন্তু আপনি এই মুহূর্তে সেন্ট্রাল নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত।
– তোমাকে তো সেভাবেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
– জি, তবে সেটা আপনার ল্যাবরেটরির জন্য। ল্যাবরেটরি বাদে অন্য সবকিছুই সেন্ট্রাল নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত। এই স্পেসশিপও।
– কিন্তু তুমি তো বুদ্ধিমান রোবট। তুমি জানো না আমি এখন স্পেসশিপে কাজ করবো। তাহলে কেন সেটা করোনি।
– জানি প্রভু কিন্তু আমাকে আপনি এ ব্যাপারে নির্দেশ দেননি। দিলেও হয়তো আমি অন্য কোন ভাবে আপনার এই প্রজেক্টের কথা সেন্ট্রাল নেটওয়ার্কে প্রকাশ করে দিতাম। এতগুলো মানুষের জীবনের প্রশ্ন এখানে। রোবোটিক্সের আইন- রোবট সর্বদা মানুষের কল্যাণে কাজ করবে।
– চুপ কর বেয়াদব! আমাকে আইন শেখাচ্ছিস, তোকে আমি .. ..
কথা শেষ না করেই একটি লেজার গান তুলে নিলেন ডক্টর ক্রুশো। ফায়ার করলেন রিবির মাথা লক্ষ করে। মুহূর্তে একটি অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হলো রোবট রিবি।
ঠিক সেই সময়ে বাইরে সিকিউরিটি বিভাগের গাড়ির হুইসেল শুনতে পেলেন বিজ্ঞানী।

SHARE

Leave a Reply