Home নাটিকা মুখোশ । মোস্তফা রুহুল কুদ্দুস

মুখোশ । মোস্তফা রুহুল কুদ্দুস

চরিত্রলিপি : কলাকুশলী
চেয়ারম্যান : অসৎ চেয়ারম্যান
আক্কেল : চেয়ারম্যানের চামচা
হেডমাস্টার : নামেই পরিচয়
নুরু মাস্টার : আদর্শবান শিক্ষক
সবুর : সাধারণ মানুষ
সাগর : প্রতিবাদী ছাত্র
মেম্বার : ইউপি মেম্বর
নিমাই : গ্রামবাসী
আরমান : গ্রামবাসী
হাসেম : গ্রামবাসী
অন্যান্য প্রতিবাদী ব্যক্তিবর্গ

মুখোশ । মোস্তফা রুহুল কুদ্দুসকাহিনী সংক্ষেপ
একজন দুর্নীতিপরায়ণ ইউপি চেয়ারম্যান। সরকারি রাস্তার গাছ চুরি, ডোনেশনের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ, ভিজিএফ কার্ডের মাল আত্মসাৎ ও বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ লুটপাট করে অঢেল অর্থ সম্পদের মালিক হয়। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তার নেতৃত্বে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে গ্রামবাসী। অবশেষে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে চেয়ারম্যান। উন্মোচিত হয় চেয়ারম্যানের মুখোশ।

দৃশ্য-১

(চেয়ারম্যানের বাড়ি। একটা হাতাওয়ালা চেয়ারে আরিফ চেয়ারম্যান। পাশে আরও চেয়ার। একটি চেয়ারে মেম্বার। দু’জনের একান্ত আলাপ)

চেয়ারম্যান : মেম্বার, ইলেকশন করতি যায়ে জমি বেচিচি, হালের বলদ বেচিচি। তোমারও কম খরচ হয়নি। একন ইট্টু বুজে শুনে না চললি ঘরের টিন বেচে খাতি হবেনে।
মেম্বার : আপনি ১৬ গ্রামের চেয়ারম্যান। আর আমি এক গ্রামের মেম্বার। তাও পাঁচ লাখের উপরে খরচ হয়েছে।
চেয়ারম্যান : এইবার আমাগের ইউনিয়নের জন্যি ৪ শ’ মণ গম বরাদ্দ হয়েছে। ইট্টু বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ কল্লি সব খরচা উঠে যাবেনে।
মেম্বার : এইডে কি সম্ভব?
চেয়ারম্যান : এদেশে অসম্ভব বলে কিচু নেই। একদিন ঘোমেত্তে উঠে দেকপা গোডাউনের তালা ভাঙা, ভেতরে কিচু নেই। তারপর থানায় জিডি। পিপারে বড় বড় হেডিংয়ে খবর-‘গোডাউনের তালা ভাঙে টেস্ট রিলিপের গম লুট।’ পুলিশ আর সাংবাদিকগের ম্যানেজ কত্তি পারলি ইডা কোন কঠিন কাজ না।
মেম্বার : আপনার মাতায় সত্তি বুদ্ধি আচে।
চেয়ারম্যান : চুল কি আর রোদে পাকেচে। আক্কেল, শিগগির চা নিয়ে আয়। চা খালি মাতাডা আরিট্টু পরিষ্কার হবেনে। মেম্বার, তুমার ওয়াডে ভিজিএফ কাড হয়েচে?
মেম্বার : না।
চেয়ারম্যান : তালি দু’হাত তুলে আল্লাহর কাচে দুয়া কর, যেনো বন্যা আসে। পানিতি যেনো গিরামডা তলায় যায়।
মেম্বার : একি কচ্চেন চেয়ারম্যান সায়েপ। গেরামে বন্যা ডাকে আনবো?
(চা নিয়ে আক্কেলের প্রবেশ)
চেয়ারম্যান : মেম্বার, বন্যা আমাগের জন্যি আশীর্বাদ। বন্যা না আসলি আমাগের কপাল খোলবে না বুঝচো?
আক্কেল : হুজুর ঠিক কতাই কয়েচে। আমাগের কপালে তালা মারা। আর তালা খুলতি হবে বন্যার পানি দিয়ে।
মেম্বার : এইবার নতুন মেম্বার হইচি। কিসি লাব আর কিসি ক্ষতি একোনো বুজে উটতি পারিনি।
চেয়ারম্যান : ইউনিয়নে একন ৬ শ’ ভিজিএফ কাড আচে। আমি আবার বয়ান টয়ান পচন্দ করিনে। বন্যা হলি এই কাড বাড়ে দুই তিন গুণ হবেনে। তকন পতি কাডে দুই কেজি করে চাল বাচাতি পারলি কয় কেজি বাচপেনে তা হিসেব করে দেকিচির।
আক্কেল : হে.. হে.. সেই চাল রাকতি আরো দুডো গুলা বানাতি হবেনে।
মেম্বার : কিন্তু বন্যা যদি না হয়?
চেয়ারম্যান : হবে হবে। না হলি বন্যা জন্ম দেবানে। আক্কেল, নুরু মাস্টারের খবর কী?
আক্কেল : দুই এক দিনির মদ্দি পজেক্টের কাজ শেষ হবে।
চেয়ারম্যান : ভয় ছিলো অই একজনরে নিয়ে। বড় একটা পজেক্ট দিয়ে তার মুক বন্দ করে রাকিচি। একন সব পত পরিষ্কার। ইউনিয়নে আমাগের বিরুদ্দে কতা কওয়ার মত আর কেউ নেই। আক্কেল… ককন কি হয় কওয়া যায় না। চোক কান খুলা রাকিস। যা, ইবার ভিতরে যা।
আক্কেল : জে হুজুর.. (প্রস্থানোদ্যত)
চেয়ারম্যান : ও হ্যাঁ, শিগগির আমার গাড়িডা বার কর। একনি স্কুলি যাতি হবে। ম্যানিজিং কমিটির মিটিং আচে।
(আক্কেলের প্রস্থান)
মেম্বার, তুমি আমার কাচের লোক। তাই তুমারে নিয়ে অনেক পিলান কল্লাম। তুমি, আমি, আর আল্লাহ ছাড়া এই কতা কোন পশু পাখি যেনো জানতি পারে না।
নেপথ্যে : হুজুর গাড়ি রেডি।
(দৃশ্যান্তর, মোটর সাইকেলের শব্দ)

মুখোশ । মোস্তফা রুহুল কুদ্দুসদৃশ্য-২

(স্কুলের একটি কক্ষ। ম্যানেজিং কমিটির মিটিং। চেয়ারম্যান, হেডমাস্টার, নুরু মাস্টার ও অন্য কয়েকজন সদস্য।)

হেডমাস্টার : আমাদের এবারের এজেন্ডা শিক্ষক নিয়োগ। আপনারা জানেন, একজন শিক্ষক সরকারি চাকরি পেয়ে স্কুল ছেড়ে চলে গেছেন। আরেক জন অবসর নিয়েছেন। পদ দুটো শূন্য রয়েছে প্রায় তিন মাস, এ বিষয়ে আপনাদের সুচিন্তিত মতামত আশা করছি।
নুরু : শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে ইতঃপূর্বে বেশ দুর্নাম হয়েছে। ডোনেশনের লোভে আমরা ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারিনি। পুরো টাকাও স্কুল ফান্ডে জমা হয়নি। তাই আমার প্রস্তাব কোনো প্রকার ছাড় দেয়া হবে না। যাচাই বাছাই করে যোগ্য শিক্ষক নিতে হবে।
হাসেম : নুরু ভাইর সাথে আমরাও একমত।
চেয়ারম্যান : তোমাগের কতা ঠিক না। এই যে অফিস রুম, আলমারি কিভাবে হয়েছে? সবই ডোনেশনের টাকায় বানানো। ইনশায়াল্লাহ ভবিষ্যতে আরও হবে। আমি স্কুল কমিটির সভাপতি হয়ে যা করিচি, অতীতে কেউ তা করতি পারিনি। কারণ কারো খেদমত করতি না পারলি আমার ঘুম হয় না। তাই কচ্চিলাম এবারও শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্বটা আমার ওপর ছাড়ে দাও।
নুরু : কোন প্রতিষ্ঠানের কাজ এককভাবে কারো ওপর ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়।
(চেয়ারম্যান আড় চোখে তাকায়, মাথা নাড়ে।)
হেডমাস্টার : আমার মনে হয় এ বিষয়ে আর কারো আপত্তি তোলা ঠিক হবে না। সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, আমাদের এবারের এজেন্ডা আসবাবপত্র সংগ্রহ। আমাদের নতুন শিক্ষাবর্ষের ছাত্রছাত্রীরা বেঞ্চের অভাবে বেশ কষ্ট করছে। এই মুহূর্তে কিছু চেয়ার বেঞ্চ প্রয়োজন।
নুরু : পাকা রাস্তার পাশে দুটো বড় মেহগনি গাছ আছে। একটা হলেই সব সমস্যা মিটে যায়। দরকার শুধু ইউএনও সাহেবের অনুমতি।
হেডমাস্টার : আমাদের সভাপতি এই ইউনিউনের চেয়ারম্যান। ইউএনও সাহেবের সাথেও বেশ খায় খাতির আছে। আমার মনে হয় দায়িত্বটা তার উপরে ছেড়ে দেয়া যায়।
চেয়াম্যান : আরিফ চেয়ারম্যান পারে না এমন কোন কাজ নেই। আরে আমি আবার বয়ান টয়ান পচন্দ করিনে। আমার দাদার বিশাল জমিদারি ছিলো, যেদিকে চোক যাতো সেদিকিই ছিলো দাদার জমি। সেই জমি শেষ হইচে মানসির খাওয়াইয়া। আমিও কারো খালি মুকি ফিরাতি পারিনে। অতচো পল্লী মঙ্গল হাইস্কুলের সভাপতি হয়ে এতটুকু কত্তি পারবো না। পারবো পারবো। সরকারি গাছ না পালি পকেটের টাকা দিয়ে চেয়ার বেঞ্চি বানায়ে দেবো।
নুরু : শুনেছি, আপনার দাদা জমিদারের আদায়কারী ছিলো। সারাদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাজনা আদায় করতো।
চেয়ারম্যান : এটা অপপ্রচার। যাকগে, পুরনো কতা টানে আর লাভ নেই। মাস্টার সাহেব, আর কোন এজেন্ডা আছে?
হেডমাস্টার : না চেয়ারম্যান সাব।
চেয়ারম্যান : তালি আজকের সবা একেনেই শেষ কচ্চি।
(দৃশ্যান্তর)

মুখোশ । মোস্তফা রুহুল কুদ্দুসদৃশ্য-৩

(কাউন্সিল চত্বর। চুরির খবর শুনে জনতার ভিড়)

আরমান : হায় হায় হায়। এতো চুরি নয়, ডাকাতি। বড় বড় তালা ভেঙে শ’ শ’ মণ চাল নিয়ে গেচে। অতচো কেউ টের পালো না।
নিমাই : আসলেই ডাকাতি, লুটপাট। কাল রাত্রির নাকি নাইট গাডের ছুটি ছিলো। সেই সুযোগটাই ডাকাতে কাজে লাগাইচে।
আরমান : না না এইডে মানে নিয়ে যায় না। নিচ্চয় এর মদ্দি কোন প্যাচাল আছে।
নিমাই : এসব সাজানো নাটক। শিগগির চেয়ারম্যানরে খবর দাও।
করিম : চেয়ারম্যানরে খবর দেবে কি কত্তি। এসব চেয়ারম্যানের ইশারায় হয়েচে।
সবাই : হ্যাঁ হ্যাঁ চেয়ারম্যানই এর জন্যি দায়ী। (হট্টগোল)
(নুরু মাস্টারের প্রবেশ)
নুরু : আপনারা চুপ করেন, ঠাণ্ডা হন। সরকারি গোডাউন থেকে সরকারি মাল চুরি হয়েচে। ইনভেস্টিগেশন ছাড়া কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। চেয়ারম্যানকে খবর দেয়া হয়েছে। এখনই এসে পড়বেন। ও ওই তো এসে গেছে।
(চেয়ারম্যানের প্রবেশ)
চেয়ারম্যান : আপনারা সবাই সাক্ষী গোডাউনের তালা ভেঙে চাল গম চুরি অইচে। আমি থানায় যাচ্ছি। আপনারা কোন কিছুতে হাত দিবেন না। তালা চেয়ার টেবিল যেকেনে যেভাবে আছে সেকেনেই থাক। সবকিচু পুলিশরে দেখাতি হবে। (চেয়ারম্যানের প্রস্থান)
নুরু : কি, সকলে সাক্ষ্য দেবেন তো?
আরমান : আমি কিচু দেকিনি, কিভাবে সাক্ষ্য দেবো?
নিমাই : আমরাও কিচু দেকিনি। সকালে মানসির হৈ চৈ শুনে ছুটে আইচি।
নুরু : থ্যাংক ইউ। যে যা দেখেছেন তাই বলবেন। কোন মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না।
(দৃশ্যান্তর)

মুখোশ । মোস্তফা রুহুল কুদ্দুসদৃশ্য-৪

(ইউনিয়ন কাউন্সিল। চেয়ারম্যানের কাছে সমস্যা নিয়ে এসেছে সবুর)

চেয়ারম্যান : কোন প্যাঁচ পোচ বুজিনে। আমার সুজা কতা। শামসু মৌরির নামে মামলা কত্তি হবে।
সবুর : হাসে ধান খায়েচে। একদম ছিমপিল ঘটনা। এই নিয়ে থানা পুলিশ করবো।
চেয়ারম্যান : এটা ফৌজদারি ব্যাপার। আইন নিজের হাতে তুলে নিলি আমাগেরই বিপদে পড়তি হবেনে।
সবুর : এটা ফৌজদারির ভয় দেকিয়ে নুরপুরের ছদরুদ্দিরে থানায় পাঠাইলেন। সেই ছদরুদ্দি এক মামলা চালাতি চালাতি একন পতের ফকির।
চেয়ারম্যান : বেশি বুজতি যায়ে না, যা কলাম তাই করো। আরিফ চেয়ারম্যান পাচে থাকলি কোন ভয় নেই। আামি আবার বয়ান টয়ান পচন্দ করিনে। আমার দাদা শরিফ তরফদারের নাম শুনিনি এমন লোক রহমতপুরে নেই। সেই দাদা একবার সুন্দরবনে যায়ে কি করিলো জানো। বাগের সাতে লড়াই করিলো।
সবুর : বাগ মানুসি লড়াই?
চেয়ারম্যান : বাগতো না। একদম রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সেই টাইগার দাদার এক ঘুষিতেই কুপোকাত।
সবুর : ঘুষি খেয়ে বাঘ মরে গেলো !
চেয়ারম্যান : আমি হলাম সেই দাদার নাতি। কাজেই পেরেশানি করতে হবে না। সব বিপদ আপদ আমিই ট্যাকেল দেবো।
(পেছনে ভ্যানের বেল বাজে, আক্কেলের প্রবেশ)
আক্কেল : হুজুর নুরু মাস্টার প্রজেক্টের চাল ফেরত পাটাইচে।
চেয়ারম্যান : ফেরত পাটাইচে? ক্যান চাল কি পচা না পোকায় ধরেচে?
আক্কেল : জানিনে, তবে চালির সাতে এই চিটিডা দেচে।
চেয়ারম্যান : দেকি.. (চিঠিটা নিয়ে পড়ে) চেয়ারম্যান সাহেব, সালাম নিবেন। প্রজেক্টের কাজ শেষ। সব খরচ খরচার পর ৭ বস্তা চাল বেঁচে গেলো। তাই ফেরত পাঠালাম। ইতি আপনার স্নেহধন্য নুরু মাস্টার। (স্বগত) সেকি প্রজেক্টের চাল বাঁচে গেলো সেই চাল আবার ফেরত পাঠালো! সবুর ভাই, নুরু মাস্টার কি পাগল হয়ে গেচে?
সবুর : না না তা হবে কেন?
চেয়ারম্যান : নুরু মাস্টাররে আমি একটা ভালো প্রোজেক্টের চেয়ারম্যান বানালাম সেই প্রোজেক্টের চাল বরাদ্দ ছিল এক শ’ কুড়ি মণ। ভাবলাম অভাবী মানুষ, কিছু কামাতি পারবেনে ও বাবাহ! একন দেকচি চাল ফেরত পাঠাইচে। কও পাগল ছাড়া এমন কাজ কেউ কত্তি পারে?
সবুর : প্রোজেক্টের চাল ফেরত দেচে বলে মাস্টার পাগল হয়ে গেলো?
আক্কেল : পাগল পাগল। চোক-মুক, হাত-নাক সব গোল।
চেয়ারম্যান : কি কলি?
সবুর : নুরু মাস্টার খুব ভালো মানুষ। এটা ইউনিয়নের সব মানুষি জানে।
চেয়ারম্যান : তুমার কতা বুজতি পারলাম না। একন আসল কতায় আসা যাক। শামসু মৌরির বিরুদ্ধে আজই মামলা করতি হবে। তুমি টাকা নিয়ে রেডি হয়ে আসোগে।
(সবুরের প্রস্থান)
চেয়ারম্যান : একনই শামসু মৌরিরে মোবাইল লাগা। নম্বর সেফ করা আচে। (মোবাইল টিপে চেয়ারম্যানের হাতে দেয়)
আক্কেল : হুজুর রিং হচ্চে।
চেয়ারম্যান : (মোবাইল নিয়ে) কিডা? শামসু, আমি আরিফ চেয়ারম্যান। তুমার নামে সবুর মোল্লা মামলা কচ্চে। আরে না না চিন্তার কোনো কারণ নেই। সবুরির নামে আরেট্টা পাল্টা মামলা কত্তি হবে। আমি থাকতি তুমার কোনো অসুবিদা হবে না। (মোবাইল রেখে) কি বুজলি আক্কেল।
আক্কেল : জ্বে হুজুর । এই না হলি চেয়ারম্যান। একন টাকা আসপে দুইদিক দিয়া।
(দৃশ্যান্তর)

মুখোশ । মোস্তফা রুহুল কুদ্দুসদৃশ্য-৫

(স্কুলের অফিস কক্ষ। হেডস্যার ও নুরু মাস্টার বসে। সালাম দিয়ে প্রবেশ করে সাগর।)

সাগর : আসতে পারি স্যার?
হেডস্যার : এসো।
সাগর : আমার নাম সাগর। ২০১৬ সালে এ স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছিলাম। এখন সিটি কলেজে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছি।
নুরু : মুক্তিযোদ্ধা কিতাব আলীর ছেলে না?
সাগর : জি স্যার।
নুরু : আরে বসো বসো। তোমরা আমাদের অহঙ্কার।
সাগর : থাক স্যার। একটা মামলার কাজে বাড়ি এসেছিলাম। এসে যা শুনলাম তাতে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। তাই ছুটে এলাম। যদি কিছু মনে না করেন..
হেডস্যার : আরে বলো বলো। ছাত্রের কথায় শিক্ষক কখনো মাইন্ড করে না।
সাগর : হলদিপোতার রজব আলি খুবই গরিব মানুষ। তার ছেলে ইরফান এ স্কুল থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছিল। তারপর প্রধানমন্ত্রী তাকে ঢাকায় নিয়ে সোনার মেডেল উপহার দিয়েছিলেন। শুনলাম এবার শিক্ষক নিয়োগের সময় সেও একটা দরখাস্ত করেছিলো। কিন্তু চাকরি হয়নি। চাকরি হয়েছে বাহাদুরপুরের করিম কন্টাক্টরের ছেলে হারুনের।
হেডস্যার : ইন্টারভিউয়ে যে টিকবে সেই চাকরি পাবে। এটাই নিয়ম।
সাগর : যে ছেলে ম্যাট্রিক পরীক্ষাতে তিন তিনবার ফেল করলো, সে টিকলো ইন্টারভিউতে? স্যার যদ্দূর শুনেছি ইরফান কোন টাকা দিতে পারেনি। আর হারুন দিয়েছে পনেরো লাখ টাকা।
নুরু : না না এটা ঠিক না। স্কুল একটা ফ্যান আর একটা আলমারি পেয়েছে।
হেডস্যার : নুরু সাহেব ঠিকই বলেছেন। তা ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ তো আর এক হাতে হয় না। এর সাথে অনেকেই জড়িত। স্কুলের একটা স্বার্থেরও ব্যাপার আছে। কখনো প্রধান শিক্ষক হলে টের পাবে।
সাগর : কাজটা ঠিক হয়নি স্যার। টাকার লোভে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিলে ছাত্ররা লেখাপড়া শিখবে কার কাছ থেকে!
হেডস্যার : সেটা তোমাকে ভাবতে হবে না। স্কুলের ভালো মন্দ নিয়ে ভাবার অনেক লোক আছে।
সাগর : ঠিক আছে স্যার। আমি আসি, বেয়াদবি হলে মাফ করবেন। (প্রস্থান)
নুরু : দেখলেন, কোন কথা গোপন থাকে না। স্কুল পেলো কয় টাকা। অথচ নেয়া হয়েছে পনেরো লাখ।
হেডস্যার : সেটা আমরাও শুনেছি। কিন্তু কী করবো বলুন।
নুরু : বেঞ্চ বানানোর জন্য একটা গাছ মারার কথা ছিলো, সেখানে দশটা গাছ মারা হয়েছে। এর বেশির ভাগই ঢুকবে একজনের পেটে।
হেডস্যার : নুরু সাহেব, আমরা হলাম শিক্ষক। সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র অবহেলিত মানুষ। রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে আমাদের কিইবা করার আছে।
নুরু : আমরা যারা মানুষের ভালো চাই, মানুষের কল্যাণ চাই, তাদের এক হওয়া উচিত।
হেডস্যার : এ কথাতো সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি-সৎ ও যোগ্য লোক ছাড়া সমাজে শান্তি আসবে না। কিন্তু কোন পরিবর্তন তো দেখতে পারলাম না।
নুরু : তবুও সান্ত¡না, সত্য পথে আছি। আজ না হোক একদিন এর পুরস্কার পাবোই।
(দৃশ্যান্তর)

মুখোশ । মোস্তফা রুহুল কুদ্দুসদৃশ্য-৬

(নুরু মাস্টারের বাড়ি। একটা সাদামাটা চেয়ার, টেবিল ও প্রাইভেট পড়ানোর বেঞ্চ। নেপথ্যে মোটরসাইকেলের শব্দ।)

নেপথ্যে : মাস্টার সাহেব, বাড়ি আছো?
(চেয়ারম্যানের প্রবেশ)
আরে চেয়ারম্যান সাহেব! গরিবের বাড়িতে হাতির পা। বসেন বসেন।
চেয়ারম্যান : (বসতে বসতে) এসব?
নুরু : কোচিং সেন্টার। সকাল সন্ধ্যায় ছাত্রছাত্রীদের প্রাইভেট পড়াই।
চেয়ারম্যান : তোমারে সব সময় গেরামের সমাজ সামাজিকতায় দেকি। প্রাইভেট পড়াও কহন?
নুরু : যেটুকু সময় পাই, ভালো কাজ করার চেষ্টা করি। তা বলেন, সাত সকালে গরিবখানায় কী মনে করে ?
চেয়ারম্যান : তুমার সাথে এট্টা কতা কতি আসলাম।
নুরু : বলেন।
চেয়ারম্যান : চাল ফেরত পাটালে কেন? জানো, সরকারি মাল একবার গুদামের বাইর আসলি, আর ফেরত যায় না।
নুরু : কী করবো, কোন কাজে লাগেনি।
চেয়ারম্যান : প্রোজেক্টের কাজে না লাগুক তোমার বাড়িতে লাগতো। মাস্টার তুমি একজন সম্মানী মানুষ। কত ভাল ভাল মানুষ তোমার বাড়িতে আসে। তাগের একটু আদর যত্ন করে সুফায় বসাবা। ডাইনিং টেবিলি খাতি দিবা। কিন্তু তুমার বাড়িতে কিচ্চু নেই। তাই দয়া করে তোমার প্রোজেক্টের চেয়ারম্যান বানাইলাম। ইচ্চা কল্লি এক প্রোজেক্ট থেকে অনেক কিচু কত্তি পাত্তে।
নুরু : মাফ করবেন চেয়ারম্যান সাহেব। ওই টাকা আমার দরকার নেই। আল্লাহ যেভাবে রেখেচে ভালোই আছি।
চেয়ারম্যান : ঠিক আচে। তোমার ভালো কাজে আমি বাধা দিতি চাইনে। তবে একটা কতা মনে রাখো পানিতি বাস করে কুমোরের সাথে আড়ি করে লাভ নেই।
নুরু : মানে ?
চেয়ারম্যান : বুদ্ধিমানের জন্যি ইশারাই যথেষ্ট। আসি।
(প্রস্থান)
নুরু : চেয়ারম্যান সাহেব কি বলতে চান? না, না, কুচ পরওয়া নেহি। সৎ পথে চলতে গেলে বিপদ আপদ তো আসবেই। (সাগরের প্রবেশ) কী ব্যাপার সাগর?
সাগর : স্যার মামলা নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়েছি। থানা কোর্ট করতে করতে লেখাপড়ার বারোটা বাজার উপক্রম। হাঁসে ধান খাওয়ার মত একটা তুচ্ছ ঘটনাকে রঙ চড়িয়ে রূপকথার বিশাল কাহিনী বানিয়েছে। আর সেই মিথ্যা মামলার সাক্ষী করেছে আমাকে। বলুন তো কী করি?
নুরু : সবুর ভাইকে আমি আগেই বলেছিলাম তুচ্ছ ঘটনায় থানায় যাওয়া ঠিক হবে না। এখন স্থানীয় ভাবে সালিশ বিচারের বহু পথ খোলা আছে। ইউনিয়ন পরিষদ, শান্তি শৃঙ্খলা কমিটি, পারিবারিক আদালত সবই হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য।
সাগর : কিন্তু চেয়ারম্যানতো অন্য কথা বলেন। কিছু ঘটলেই ফৌজদারি আইনের ভয় দেখিয়ে মামলা করার পরামর্শ দেন।
নুরু : তারপর শুরু করেন তদবির, তাই না?
সাগর : হ্যাঁ দুই পক্ষেরই তদবির করেন। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে একটা মিথ্যা মামলার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা হচ্ছি পথের ফকির। আর চেয়ারম্যানের মত মধ্যস্বত্ব¡ভোগীরা হচ্ছে আঙুল ফুলে কলাগাছ। স্যার, আপনি আমার শিক্ষক, অনুমতি দিলে এইসব মুখোশধারী সমাজসেবকদের আসল চেহারা জনগণের সামনে খুলে দিতে পারি।
নুরু : বেশি বিপ্লবী হবার দরকার নেই। নিজে ভালো হও, অন্যকে ভালো হবার পরামর্শ দাও। সময়ই বলে দেবে কে ভালো কে মন্দ। মনে রেখ, পাপ কখনো গোপন থাকে না। দুর্নীতিবাজদের মুখোশ একদিন খুলবেই। আজ হোক কাল হোক তার প্রায়শ্চিত্ত অবশ্যই ভোগ করতে হবে।
সাগর : থ্যাংক ইউ স্যার। আপনার পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ।
(সাগরের প্রস্থান। দৃশ্যান্তর)

মুখোশ । মোস্তফা রুহুল কুদ্দুসদৃশ্য-৭

(নিজ বাড়িতে চেয়ারে বসে চেয়ারম্যান। মাথার পাকা চুল বাছে আক্কেল)

চেয়ারম্যান : আক্কেল, নুরু মাস্টার মনে হয় ইলেকশন করবে। বিরাট প্রতিবাদী কণ্ঠ। ফুলের মত পবিত্র, প্রোজেক্টের চাল ফেরত দিয়ে ফেরেস্তা সেজেছে, যেনো নবী-রাসূলের আওলাদ। সেই কথা আবার মানসির মুকি মুকি।
আক্কেল : চাল ফেরত দেয়ার কথা পেপারেও লিকেচে। নুরু মাস্টার খুব ভালো মানুষ হুজুর।
চেয়ারম্যান : না, না, এই কতা আমি মানতি পারলাম না। এর মদ্দি নিচ্চয় কোনো মতলব আছে। আরে টানা ২৭ বছর এই উপজিলায় পলিটিক্স করচি। মেম্বার চেয়ারম্যান মন্ত্রী এমপি বহুত দেখচি। কিন্তু সরকারি মাল বাঁচে গেলি কারো ফেরত দিতি দেকিনি। নুরু মাস্টার চমক দেকিয়ে কিছু কত্তি চায়।
আক্কেল : জ্বে হুজুর, ইলেকশন কত্তি চায়।
চেয়ারম্যান : ঠিক ধরিছিস আক্কেল, তোর মাতায় বুদ্দি আছে।
নেপথ্যে : ভিতরে আসতি পারি?
চেয়ারম্যান : কিডা?
(সবুর ও ভাইপো সাগরের প্রবেশ) ও সবুর ভাই। এ আবার কিডা।
সবুর : আমার ভাইপো সাগর।
সাগর : কিচু কতা বলতে চাই।
সবুর : সিটি কলেজে পড়ে। মামলার এক নম্বর সাক্ষী।
চেয়ারম্যান : অবশ্যই। মানসির খেদমত করাই আমার কাজ। কারোর খেদমত কত্তি না পাল্লি আমার ঘুম হয় না।
আক্কেল : মানসির জন্যি হুজুর জান পরান কুরবান করে দেচে। একন আপনাগে পবলেম কন।
চেয়ারম্যান : হ্যাঁ কও দেহি তোমাগের কি খেদমত কত্তি পারি।
সবুর : টাকা পয়সা বহু নষ্ট করিচি। আর মামলা চালাতি পারচিনে। আপনি থেকে একটা মীমাংসা করে দেন।
সাগর : শুনচি শামসু মৌরিকে পাল্টা মামলা করার পরামর্শ আপনিই দিয়েছেন।
আক্কেল : ছি, ছি, ছি, একি কচ্চো? আমার হুজুরের নামে বদনাম।
চেয়ারম্যান : না, না এসব ঠিক না। আমি হলাম জনগণের একজন নগণ্য খাদেম। কেউ বিপদে পড়ে আমার কাছে ছুটে আলি বিমুক করতি পারিনে। এহন তোমাগের কি কত্তি হবে তাই কও।
সাগর : কিছুই করতে হবে না। আসামিদের অ্যারেস্ট করার জন্য যে টাকা দিয়েছেন, তা ফেরত দেন।
চেয়ারম্যান : টাকা কি আর আমি খাইছি। সব থানায় দিচি।
আক্কেল : একদম সত্যি কতা, পুলিশ টাহা ছাড়া কোন কাজ করে না।
সবুর : খোঁজ নিয়ে জানিচি পুলিশ একটা টাকাও পাইনি।
সাগর : এতোদিন আমরা থানা পুলিশ কিচ্ছু চিনতাম না। এখন বুঝতে শিখেছি। যত কেস হবে আপনার আয় ইনকাম ততো বাড়বে। তাই আপনি ভালো জায়গায় ঘা বানিয়ে, অপকর্মের নাটক সাজিয়ে, মানুষকে দিয়ে মামলা করান।
সবুর : আর তদবিরের নামে টাহা নিয়ে নিজের পকেট ভরেন।
চেয়ারম্যান : এসব তোমরা কি কচ্চো ! সব মিচে কতা।
আক্কেল : হ মিচে কতাই। সত্যির কোনো বালাই নেই।
সাগর : সত্যি সবই সত্যি। মানুষ আপনার আসল চেহারা চিনে ফেলেছে। মানবসেবার কথা বলে কারো চোখে আর ধুলো দেয়া যাবে না।
চেয়ারম্যান : এই, বেশি ফটর ফটর করবিনে। তুই হলি সেদিনের কচি খুকা, মুক টিপলি একনো দুদ বেরোই। তোর মুখে বড় কতা মানায় না।
আক্কেল : হুজুর.. ..
চেয়ারম্যান : আমারে চিনিস? আমি আবার বয়ান টয়ান পছন্দ করিনে। আসল কতা শোন। সেই শরিফ তরফদারের নাতি আমি। কাজেই আমারে হুমকি দিয়ে কাজ হবে না। তোর মত পোলাপানকে হজম কত্তি সময় লাগবে না।
সাগর : ঠিক আছে। তবে ভুলে যাবেন না, আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি মারা গেলেও তার রক্ত এখনো মরে যায়নি। চলেন চাচাজান।
চেয়ারম্যান : (কটাক্ষ করে) উহ মুক্তিযোদ্ধাার পোলা।
(সবুর ও সাগরের প্রস্থান)
চেয়ারম্যান : আক্কেল, কিছু বুঝতি পারলি?
আক্কেল : কি আর বোজবো, পাছে লোক লাগচে।
চেয়ারম্যান : সেই লোকটাই অইলো নুরু মাস্টার। জানিস, উইপোকার পাখনা ওঠে কহন ?
আক্কেল : মরনের সময় হুজুর।
চেয়ারম্যান : নুরু মাস্টারের সেই পাখনা উঠেছে। ওরে আমি ভালো করে দেকতি চাই।
আক্কেল : জ্বে হুজুর দুরবিন লাগিয়ে দেকতি হবে।
চেয়ারম্যান : তুই একনই নুরু মাস্টারের পাচে লাগে যা। ও কনে কি করেচে সব কিচু খুঁজে বার করবি বুজিচির ?
আক্কেল : জ্বে হুজুর।
(দৃশ্যান্তর)

মুখোশ । মোস্তফা রুহুল কুদ্দুসদৃশ্য-৮

(কাউন্সিল অফিস। চেয়ারম্যান একবার বসে একবার উঠে পায়চারি করে)

চেয়ারম্যান : কাল রাত্রির তিন তিনডে ঘুমির বড়ি খাইচি কিন্তু কোন কাজ হলো না। শুনিচি চা সিগারেট খালি টেনশন দূর হয়। না, তাও হলো না। আক্কেল.. (আক্কেলের প্রবেশ)
আক্কেল : জ্বে হুজুর।
চেয়ারম্যান : কি চা বানাইচির? খায়ে পড়তা হলো না।
আক্কেল : হুজুর সাংঘাতিক খবর-ঐ যে সাগর, টাউন থেকে আয়েচে। ও আপনার বিরুদ্ধে সই নিয়ে বেড়াচ্চে।
চেয়ারম্যান : আমার বিরুদ্ধে সই নিয়ে ও কী করবে?
আক্কেল : শুনলাম পুলিশির কাচে পিটিশন দেবে।
চেয়ারম্যান : এসব ওই নুরু মাস্টারের কাজ। ওই শয়তানের বাচ্চা আমারে জাত সাপের মতন কামড়াচ্চে। সেই কামড়ে আমার সারা শরিল জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্চে। তোর এট্টা কাজ দিলাম করিচির?
আক্কেল : জ্বে হুজুর।
চেয়ারম্যান : ক নুরু মাস্টারের আকাম-কুকাম খুঁজে পাইছির।
আক্কেল : মাফ করবেন হুজুর। রহমতপুরের কেউ মাস্টারের দোষ দেখাতি পারলো না।
চেয়ারম্যান : থাক থাক আর কতি হবে না। আমার টেনশন বাড়ে যাচ্চে। উহ.. কি যে করি..। আরে নুরু মাস্টারের নাই দোষ পালি নে। ওর বাপ, দাদা, পদদাদা চৌদ্দ গোষ্ঠীও কি কোন আকাম করিনি?
আক্কেল : (মাতা চুলকাতে চুলকাতে) হুজুর, তা এট্টা পাওয়া যায়। তকন নুরুর জন্ম হয়নি। তার মার মামুর খালাতো ভাইর বন্ধু এক হিন্দু মায়ে বিয়ে করিলো।
চেয়ারম্যান : (উল্লাসে) কী! কী কলি .. তকন নুরুর জন্ম হয়নি! হু .. (একটু চিন্তা করে) .. ঠিক আচে তাই হবে। সেইডেই আমার বড় অস্ত্র।
(হাঁপাতে হাঁপাতে মেম্বারের প্রবেশ)
মেম্বার : চেয়ারম্যান সাব, সর্বনাশ হয়ে গেচে। গোডাউনের চাল লুটির ঘটনায় দুদক চার্জশিট দেচে। আপনিই তার প্রধান আসামি।
চেয়ারম্যান : অ্যা.. ! দু..দু.. দুদক চার্জশিট দেচে। আ..আ..আমি আসামি!
আক্কেল : দোজকের কতা দোজকে হবে। একন দুনিয়া নিয়ে ভাবেন।
মেম্বার : আরে পাগল, দোজক না দুদক। দুদক হচ্চে দুন্নিতি দমন কমিশন, বুজিচির। তাগের কাচে মুন্ত্রি এমপি কেউ মাপ পাচ্চে না।
চেয়ারম্যান : হায়.. হায়.. হায়.. একন আমার কী হবেনে। (দৃঢ়কণ্ঠে) না.. না.. ভয় পালি হবে না। আমারে রহমতপুর উপজেলার এমপি হতি হবে। মেম্বার, সবকিচুর মুলি ওই নুরু মাস্টার। আমার বিরুদ্ধে আবার নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেচে। পুলিশির কাচে পিটিশন দিয়ার জন্যি মানষির সই নিয়ে বেড়াচ্চে। শোন দেশজুড়ে মাদক বিরোধী অভিযান চলতেছে। আমার বিরুদ্ধে যারা পিটিশনে সই করচে তাগের আমি ওই মামলায় ঢুকাবো। লাল দালানের ভাত খাওয়াবো।
মেম্বার : মানসির মতি গতি ভালো মনে হচ্চে না। একন আবার মামলা করে নতুন বিপদ ডাকে আনবেন।
চেয়ারম্যান : আরে মেম্বার, তুমি আরিফ চেয়ারম্যানের চিনতি পারোনি। যাগের জেলে ঢুকাবো, তাগের আবার এক এক করে ছাড়াই নিয়ে আসপো। তালি সবাই আমার ভক্ত হয়ে যাবেনে। আর নুরু মাস্টার হয়ে যাবেনে একা। এই সুযোগে ফাইনাল গোলটা দিয়ে দেবো। ফকিরির বাচ্চার লাশও খুঁজে পাওয়া যাবে না। হ্যাঁ.. হ্যাঁ.. হ্যাঁ..
আক্কেল : হে.. হে.. হে..হুজুর ঠিক পিলান করেচে।
চেয়ারম্যান : মেম্বার কাল আমার জনসবা আচে। তুমি আজই মাদক ব্যবসায়ীগের এট্টা তালিকা তৈরি করে ফ্যালো। আমি সন্দের আগেই তালিকাডা নিয়ে থানায় যাবো। আমার বিরুদ্ধে মানে, আমার বিরুদ্ধে যারা সই করেছে, তাদের পিটিশন করার মজা সকলে চোকি আঙুল দিয়ে দেকাই দিতি হবে।
আক্কেল : জ্বে হুজুর, ভালো করে দেকাই দিতি হবে।
চেয়ারম্যান : মেম্বার, তুমি লিস্ট করো। আমরা ইট্টু ঘুরে আসি। চল আক্কেল বীর পালোয়ানের বাচ্চারা কনে আচে দেকে আসি।
(প্রস্থান, দৃশ্যান্তর)

মুখোশ । মোস্তফা রুহুল কুদ্দুসদৃশ্য-৯

(গ্রামের চা স্টল। মেম্বার ও আরমান গল্প করছে)

আরমান : আমাগের গিরাম অন্যান্য গিরামের চেয়ে উঁচু। তিন পুুরুষে কেউ এই গিরামে বন্যা দেকিনি। একন জামিতে পানি, উঠোনে পানি স্কুলে পানি। ডাঙা ডুঙি সব পানিতি তলায় গেচে, চার দিকে পানি থই থই করচে। আসমানের পানিতি বন্যা হলি আমাগের কোন দুঃখ ছিলো না। এই বন্যা আমরাই ডাকে নিয়ে আইচি।
মেম্বার : না না ঠিক না। বন্যা হলো আল্লাহর গজব।
আরমান : বড় রাস্তার কালভার্টের মুকি বান্দাল দিয়ে কদমতলার দুই মস্তান মাছ ছাড়েচে। শুনলাম, চেয়ারম্যান সাহেবের লিখিত অনুমতি আচে।
(জাল খালোই নিয়ে নিমাই প্রবেশ করে)
নিমাই : মেম্বার সাহেব তুমারে পায়ে ভালোই হলো। আমরা কাড পাইচি কিন্তু টিকমত চাল পাচ্চিনে। কাডে লিকা ১০ কেজি আর পাচ্চি ৬ কেজি।
আরমান : একতা আমিও শুনিচি। ১০ কেজি চাল কেউ পাচ্চে না।
মেম্বার : কী করে পাবে? অফিসারগে কমিশন, ভ্যান ভাড়া, ইঁদুর বান্দর সবাইকে দিয়ে তোমাগের দিতি হচ্চে। যা পাচ্চো তাই লাভ।
নিমাই : সেই কতা ভাবে কিচু কইনে।
আরমান : একন গিরামের বড় সমস্যা হলো পানি। বান্দালডা কাটে দিলি দু’-একদিনির মদ্দি সব জাগে টপেনে। তুমি আমাগের মেম্বার। এই কাজডা তুমারই কত্তি হবে।
মেম্বার : ঠিক আচে। আমি একনি চেয়ারম্যানের সাতে কতা কচ্চি। আসি।
(মেম্বারের প্রস্থান)
আরমান : দেকলে নিমাইদা কেউ দায়িত্ব নিতি চায় না। বন্যার জন্যি সবাই ওপরওলার কান্দে দোষ চাপায়ে নিজি বাঁচতি চায়। তা কও জাল নিয়ে ব্যান বেলায় কনে যাচ্চো?
নিমাই : শুনলাম স্কুলির মাটে মাচ হচ্চে। তাই জাল খালই নিয়ে বার হলাম। সরকারি সাহায্যের দিকি তাকায় থাকলিতো আর পেট চলবে নানে।
আরমান : দিনকাল যা পড়েচে-কারো ওপর ভরসা করে বসে থাকলি হবে না। সবাইকে একন নিজির পায়ে দাঁড়াতি হবে। নিমাই দা, দ্যাকোতো কিডা আসতেচে, আমাগের নুরু মাস্টার না? মাজায় গামচা হাতে কুদাল। একদম জন-মুজুর মনে হচ্চে।
নিমাই : হ্যাঁ, হ্যাঁ আমাগের নুরু ভাই। এলাকার গরিব দুঃখীর কষ্ট ওই একজনই বোজে। সেদিন পেপারে কি লিকেচে জানো ? চৌরাস্তা থেকে ভান্ডারির মোড় পর্যন্ত রাস্তা বানানোর পর ৭ বস্তা চাল বাচে গেচে। নুরু মাস্টার সেই চাল সরকারের ঘরে ফেরত দেচে। সত্যি আরমান ভাই, এই যুগে এমন ভালো মানুষ খুঁজে পাওয়ায় মুশকিল।
(নুুরু মাস্টারের প্রবেশ। পেছনে তার সমর্থকরা। চা স্টলের সকলে উঠে দাঁড়ায়।)
নুরু মাস্টার : কেমন আছেন নিমাই দা। আরমান ভাই?
নিমাই : উঠোনে হাঁটু পানি। চেয়ারম্যান চুপচাপ। আমরা পড়িচি বিপদে।
আরমান : তা ভাই কুদাল নিয়ে কনে গিলে?
নুরু মাস্টার : শেষ পর্যন্ত রিস্কটা আমিই নিলাম। লোকজন নিয়ে কালভার্টের বাঁধটা কেটে দিলাম। দেকা যাক মাস্তানরা শক্তিশালী না পাবলিক। যাহোক, আপনাদের সময় নষ্ট করতে চাচ্ছিনে। আসি।
(প্রস্থানোদ্যত)
নিমাই : না, না, আমি আজ মাছ ধরবো না। তোমার কতা খুব ভাল লাগতাছে।
আরমান : নুরু ভাই, মানসির জন্যি অনেক কিচুই করচেন। এইবার ইট্টু স্কুল নিয়ে ভাবেন।
নুরু : আমি শিক্ষক প্রতিনিধি। ম্যানেজিং কমিটির একজন নগণ্য সদস্য। তারপরও স্কুলের অনিয়ম স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পিছপা হই না। কিন্তু পারি না। কেন যে পারি না তা আপনারাও কমবেশি জানেন।
আরমান : চেয়ারম্যান সাহেব যদ্দিন কমিটিতে থাকবে, তদ্দিন স্কুলের কোনো উন্নতি হবে না।
নিমাই : অসৎ মানসির চেয়ারম্যান বানাই জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে গেলাম।
নুরু : একটা কথা আপনাদের ভুলে গেলে চলবে না আরিফ চেয়ারম্যান শুধু পল্লীমঙ্গল হাইস্কুলের সভাপতি না। একটা দলের বড় নেতা। রহমতপুর উপজেলার ভাবি এমপি। তার সাথে লড়াই করে টিকতে পারবেন ?
আরমান : আমাগের পিট দেয়ালে ঠেকে গেছে। আর পেছনে যাবার জাগা নেই।
নুরু : সমাজের ভাল মন্দ, সৎ অসৎ নিয়ে আপনাদের মধ্যে যে চেতনা সৃষ্টি হয়েছে তা খুবই ভালো। এখন প্রয়োজন ঐক্য। আমি বিশ্বাস করি, মহান আল্লাহ হিন্দু-মুসলিম সবাইকে সমানভাবে আলো বাতাস দান করেন। দুনিয়ার সম্পদেও তাদের সমান অধিকার রয়েছে। এ অধিকার আদায়ে আমরা সবাই ভাই ভাই। ধর্ম গোত্রের বৈষম্য ভুলে সকলকে অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। নিমাই দা, আরমান ভাই আসি।
(নুরু মাস্টার ও সমর্থকদের প্রস্থান)
নিমাই : সত্যি ভালো মানুষ। মাস্টারের কতা শুনে আমার চোক খুলে গেচে। একন থেকে সব কিছু ভেবে চিন্তে করবো। আর যারে তারে ভোট দেবো না।
আরমান : একতা সবাইকে বুজাতি হবে। অশান্তির জন্যি কপালের দোষ দিলি হবে না।
(দৃশ্যান্তর)

মুখোশ । মোস্তফা রুহুল কুদ্দুসদৃশ্য-১০

(রাস্তার মোড়। চেয়ারম্যান বিরোধী বিক্ষুব্ধ জনাতার ভিড়। প্রবেশ করেন চেয়ারম্যান)

চেয়ারম্যান : এখানে এতো লোক কেন? (সাগরকে) এই ছ্যামড়া তোর হাতে ঐডে কী। দেকি কিসির কাগজ।
সাগর : আপনার বিরুদ্ধে পিটিশন। মানুষের খেদমত করার কথা বলে আপনি যা প্রচার করে বেড়ান তা সবই বয়ান ভাঁওতাবাজি। চেয়ারম্যান হয়ে জনগণের জন্য যা করেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি করেছেন নিজের জন্যে।
চেয়ারম্যান : যেমন ?
সাগর : সাতজন শিক্ষক নিয়োগের সময় প্রত্যেকের কাছ থেকে ১১ লাখ করে টাকা নিয়েছেন। স্কুলে দেচেন মাত্র ৩৫ হাজার টাকার ফার্নিচার। আর সব টাকা গেছে আপনার পকেটে। আপনি সহজ সরল মানুষের ঘাড়ে মামলা চাপিয়ে নিঃস্ব করছেন। আর দুই পক্ষে তদবিরের নামে লাখ লাখ টাকা কামিয়েছেন।
চেয়ারম্যান : (কটাক্ষ করে) পাহাড় সমান অভিযোগ। (সাগরের গায়ে মুখে হাত বুলিয়ে) কি তুলতুলে শরীর। লক্ষ্মী, সোনা মানিক এসবের কোন প্রমাণ আচে?
সাগর : প্রমাণ আপনার সম্পদ। চেয়ারম্যান হওয়ার পর আপনার দুইচালা টিনের ঘর ছিলো। এখন দোতলা বিল্ডিংয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। এসব কি করে হয়েছে?
চেয়ারম্যান : আমি বয়ান দিচ্চিনে। শরিফ তরফদারের নাতি ককোনো গরিব ছিলো না। শোন, যারা ঘুষি দিয়ে বাঘ মারে তারা হুলো বিড়ালের ম্যাও ম্যাওতে ভয় পায় না। এবার ভালো মুকি কচ্চি পিটিশনটা দিয়ে দে।
সাগর : না না কক্ষনো না।
চেয়ারম্যান : (দরখাস্ত কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলে।) জানি তুমাগের কোন দোষ নেই। সব দোষ ওই নুরু মাস্টারের। সেই সরল মানসির পলিটিক্সে জড়ায়ে গিরামের শান্তি সিরিংখলা নষ্ট কত্তি চায়। সেই সুযোগ আর দিয়া হবে না।
সাগর : একটা পিটিশন ছিঁড়ে হাজার হাজার দুর্নীতি লুকাতে পারবেন না। দেশে দুর্নীতিবিরোধী সরকারি-বেসরকারি বহু সংস্থা রয়েছে। তারাই আপনার মুখোশ খুলে দেবে। মনে রাখবেন, পাপ কাউকে ক্ষমা করে না।
চেয়ারম্যান : চুপ শয়তানের দল। আর একটাও কতা শুনতি চাইনে। (সাগরকে) ফকিরির বাচ্চা। ফের কোন কতা কলি তোরে গুলি করে মাতার খুলি উড়োই দেবো।
(চারিদিকে বাঁশি বেজে ওঠে। হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করে আক্কেল)
আক্কেল : হু.. হু.. হুজুর-কা..কা..কালো বাহিনী !
চেয়ারম্যান : কালো বহিনী? র‌্যাব! আমি কনে যাবো, কী করবো। কনে পালাবো। (এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে)
আক্কেল : সব দিক ঘিরে ফেলেছে। কোনদিকে পত নেই।
(চেয়ারম্যান আক্কেলের পালানোর চেষ্টা, সবাই ফ্রিজ। নেপথ্যে গান … কোনদিকে পথ নেই সবদিকে বন্ধ দুয়ার …)
[যবনিকাপাত]

SHARE

Leave a Reply