Home সায়েন্স ফিকশন মাস্টার অব স্পেস । গ্রেগরি প্যাট্রিক ট্যাভার্স । অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ

মাস্টার অব স্পেস । গ্রেগরি প্যাট্রিক ট্যাভার্স । অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ

মাস্টার অব স্পেসজোনাস হারপার, স্পেস লগ: ০০৮, মহাকাশ তারিখ: ৫ নভেম্বর, ২৩১৬। কয়োলা। গ্যালাক্সি ফেডারেশনের মেগাসিটি ও রাজধানী। ক্রায়ো-ঘুম থেকে বেরিয়ে এসেছি আমি। আমি পৃথিবীর অন্যতম সেরা নিউ ওয়ার্ল্ড টিভির একজন খ্যাতিমান উপস্থাপক জোনাস হার্পার। এক বিশেষ কাজে এসেছি এখানে। পৃথিবী থেকে এখানে পৌঁছার পর এখানকার আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। আর সেটা করা হয় ক্রায়ো-ঘুম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এখনো আমি ক্লান্ত, ঘুম ঘুম ভাবটাও কাটেনি, তবে আমার দায়িত্বে থাকা ডাক্তার আমাকে আশ্বস্ত করেছেন যে আমি ভালো করছি, আমার অবস্থা ব্যতিক্রমধর্মী রকম ভালো। সুতরাং যে বিশ্রী মাথাব্যথা আর পেট ব্যথাটা এখনো আছে তা খুব শিগগিরই আর থাকবে না।
এসব সমস্যা থাকার পরও সকালে আমার মনে হলো যে কোয়ার্টারের বাইরে যাবার শক্তি বোধ হয় আমার শরীরে এসেছে। আর তাই যদি হয়, তাহলে মাত্র কয়েক গজ দূরের ক্যাফেটেরিয়ায় তো আমি যেতেই পারি। স্পেস কোর হয়ে এখানে পৌঁছেছি। এখানকার খাবারগুলো আমার পছন্দের তালিকার মধ্যে পড়ে না, তারপরও স্পেস কোরে তারা আমাকে যা খাইয়েছে সেগুলোর মতো পুরনো নয় এ খাবারগুলো। আমার মনে হচ্ছে যে ইউএস স্পেস কোর মহাজাগতিক স্বাধীনতা ফাউন্ডেশন নামক তলাবিহীন ঝুড়ির এ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনার যে অর্থ ব্যয় করছে তাতে এর বেশি কিছু প্রত্যাশা করা ঠিক নয়।
শরীরে শক্তি ফিরে আসার ফলে আমার চিন্তা-ভাবনার ক্ষমতাও বেড়েছে। মনে হচ্ছে, আমার ভেতরে ছোটবেলার নিষ্কলুষ আনন্দগুলো ফিরতে চাইছে। আমাদের নিউ ওয়ার্ল্ড টিভির আগামী মাসের এপিসোডের ‘তারা এখন কোথায়’ নামের পর্বটির জন্য ‘মাস্টার অব স্পেস’ খেতাবের অধিকারী ক্যাপ্টেন ড্যান মাইকেলের সাক্ষাৎকার নিতে আমার এ মহাকাশ সফরে আসা। টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হিসেবে আমার সুনাম আছে। তাই এ পর্যন্ত বহু তারকা ব্যক্তিত্বের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ আমার হয়েছে। তবে তাদের কেউই খ্যাতির দিক দিয়ে ক্যাপ্টেনের সমতুল্য নন। ক্যাপ্টেন মাইকেল একই সাথে যে রকম প্রশংসিত ও নিন্দিত, মানব ইতিহাসে তার মতো আর কেউ নেই। কারো কারো কাছে তিনি স্রষ্টা প্রেরিত এক মহামানব যিনি যা কিছু শুভ, সেসবের রক্ষাকারী। আর অন্যদের কাছে তিনি বিশ্বকে ধ্বংসকারী এক অশুভ দৈত্য যার নিঃশ্বাসে সবকিছু জ্বলে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। গোটা মহাবিশ্ব তার পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত। বলা ভালো, তাদেরকে যে কোনো একটা পথ বেছে নিতে হয়েছে। তবে আমি তার ব্যাপারে কারো মতকেই হিসেবে ধরি না। আমি আসলেই জানি যে আমার কাছে ক্যাপ্টেন মাইকেল কী?
মহাবিশ্বে ড্রাগিমিয়ান হামলা চলার সে দিনগুলোতে আমি ছিলাম নেহায়েতই এক শিশু। পৃথিবী গ্রহের বাইরের অসংখ্য গ্রহের সবার সাথে আজো মানুষের যোগাযোগ হয়নি। মহাবিশ্বের সীমাও আজ পর্যন্ত চিহ্নিত হয়নি। তবে লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার দূরের বেশ কয়েকটি গ্রহের সাথে পৃথিবীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এসব গ্রহের অধিবাসীরা কেউ পুরোপুরি না হলেও প্রায় মানুষেরই মত, কেউ কিছুটা বা বেশ আলাদা। তবে সবার চিন্তা-ভাবনার মধ্যে মিল আছে। শান্তি ও উন্নতি চায় সবাই। আগত দিনগুলোতে নিজেদের বসবাসের জন্য নিরাপদ মহাবিশ্ব চায়। এ রকম কয়েকটি গ্রহ মিলে গঠন করেছে একটি ঐক্যজোট। তার নাম দিয়েছে গ্যালাক্সি ফেডারেশন।
ফেডারেশনের বাইরেও বহু গ্রহ-উপগ্রহ রয়েছে। তারা এখনো কেউ সমস্যার সৃষ্টি করেনি। কিন্তু হুমকি সৃষ্টি করে ড্রাগিমিয়ান গ্রহ। এ ড্রাগিমিয়ানরা মানুষ নয়, মানুষের কাছাকাছি। তাদের দেহগঠন বিচিত্র, কিছুটা সরীসৃপের আকৃতি। তাদের অনেকে চারহাত বিশিষ্ট যা তাদেরকে অদ্ভুত প্রাণীর রূপ দিয়েছে। তারা বর্বর, ধ্বংসপিয়াসী, আধিপত্যপ্রয়াসী। মহাবিশ^কে তাদের দখলে নিতে চাইছিল তারা। নেতা হচ্ছে সম্রাট জ্যানথক। নিকট দূরত্বে থাকা পরস্পর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি গ্রহ দখল করেছে জ্যানথক। তারপর নিজেকে সম্রাট বলে ঘোষণা করে। তার এ আগ্রাসী কার্যকলাপ মারাত্মক অশান্তি সৃষ্টি করে মহাবিশ্বে। এরপরই তারা হামলা চালায় গ্যালাক্সি ফেডারেশনে। তখন ফেডারেশন কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে পৃথিবীর সাহায্য চায়।
আমার সে দিনগুলোর কথা খুব ভালোই মনে আছে। ভয়ঙ্কর ড্রাগিমিয়ানদের সাথে ফেডারেশনবাসীদের যুদ্ধ চলছিল। যুদ্ধ মানেই ধ্বংস আর মৃত্যু। সমস্যা, বিষাদ, শোক। সে সবের ভয়াবহতা সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল না। লিভিং রুমে বসে আমার বাবা-মা টেলিভিশন দেখতেন। আতঙ্ক ঘিরে রাখত তাদের। চারহাতসম্পন্ন সরীসৃপ জাতি ড্রাগিমিয়ানরা গ্রহের পর গ্রহে হামলা করার পর টার্গেট করেছিল ফেডারেশনকে। তারা চাইছিল ফেডারেশনের সব ইলেকট্রোম্যাগনেটিক প্রযুক্তি ধ্বংস করতে। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য পাঠানো ফেডারেশনশিপের ঝাঁকগুলো দেখে আমি খুশি হয়ে উঠতাম আর চিৎকার করে উৎসাহ দিতাম। মিত্র হিসেবে পৃথিবী থেকে তাদের নানাভাবে সহায়তা দেয়া হচ্ছিল।
পৃথিবীর বহু মানুষই এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিপক্ষে ছিল। এই বিরোধীরা বলত, এত দূর এলাকার যুদ্ধে পৃথিবীর সম্পদ ব্যয় করা বোকামি। তা ছাড়া যুদ্ধে আমাদের যোগদান ড্রাগিমিয়ানদের খেপিয়ে দেবে। এর ফলে ইতোমধ্যে এক বিভীষিকায় পরিণত হওয়া সম্রাট জ্যানথক ও তার রক্তপিপাসু সেনাবাহিনীর জন্য অজুহাত তৈরি হবে। তখন তারা আমাদের দাস বানাতে ও সকল প্রযুক্তি ধ্বংস করতে এ গ্রহেও হামলা করবে। একটি শিশু হিসেবে আমি ব্যাপারটা জানতাম না। এই ড্রাগিমিয়ানরা অনেকটাই যন্ত্রমানবের মতো। তাদের মস্তিষ্ককোষ এমনভাবে গঠিত যা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফ্রিকোয়েন্সি প্রেরণ করতে পারে। মানুষের মস্তিষ্কও এসব সঙ্কেত প্রেরণ করে। সরীসৃপ জাতীয় এ ড্রাগিমিয়ানরা সংখ্যায় বেশি না হলেও যথেষ্ট শক্তিমান। তাদের হত্যা করা সহজ নয়। মানুষের মতো চট করে মৃত্যু হয় না তাদের। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হচ্ছে তাদের মস্তিষ্ক খুলির বাইরে বের করে আনা ও ধ্বংস করা। এ বিষয়টি বহু মানুষকে ভীত করে তুলেছিল।
পৃথিবীতে আমার বাবা-মার মত ভিন্ন চিন্তার প্রচুর মানুষও আছেন। তারা মনে করেন যে কেউ যদি বিপদে পড়ে তাহলে তাকে সাহায্য করা উচিত সে যে জাতির বা যতদূরের গ্রহের অধিবাসীই হোক না কেন। তাকে কোনো প্রশ্ন করা বা তার কাছ থেকে ধন্যবাদ পাওয়ার প্রয়োজন নেই।
রাতের পর রাত আমরা আঠার মতো টেলিভিশনের সামনে বসে যুদ্ধের খবরাখবর দেখি ও শুনি। তারপর একদিন রাতে তার শেষ হলো। খবরটা জানাল নিউ ওয়ার্ল্ড মিডিয়া নামের একটি সংবাদ সংস্থা। তারা বলল, দুষ্ট সম্রাট জ্যানথক যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে। সে এখন বন্দি হয়ে ফেডারেশন কারাগারে আছে। সে একাই বন্দি হয়েছিল। আর সে কাজটা করেছেন ড্যান মাইকেল নামের এক তরুণ সাহসী সেনা। তিনি এখন ফেডারেশনের সর্বোচ্চ খেতাব ‘মাস্টার অব স্পেস’-এর সাথে ফেডারেশনের রক্ষাকর্তার মর্যাদা লাভ করেছেন। গ্যালাক্সির সর্বত্র বিজয় উৎসব পালিত হলো। কৃতিত্বের জন্য তাকে গ্যালাক্সি এস-৫ নামক একেবারে নতুন এক ব্যাটলশিপের ক্যাপ্টেন নিয়োগ করা হয়েছে। আনন্দের খবর হলো, তিনি পৃথিবীর মানুষ। ফেডারেশনের সাথে সাথে তিনি আমাদের সবার গর্ব, আশা ও শান্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তবে একটা কথা। জ্যানথকের আটকের সাথে ড্রাগিমিয়ানদের ঝামেলা শেষ হয়নি। জ্যানথক যেসব গ্রহ দখল করে সাম্রাজ্য তৈরি করেছিল সেসব গ্রহকে মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। তারা এখন স্বাধীন। ড্রাগিমিয়ানদের একটি অংশ ফেডারেশনের আনুগত্য স্বীকার করেছে বটে, কিন্তু তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বিদ্রোহী হয়ে গেছে। প্রায়ই তারা ফেডারেশনের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোসহ নানা সমস্যার সৃষ্টি করছে।
সেদিনের পর তিরিশ বছর পেরিয়ে গেছে। ক্যাপ্টেনের জীবনেও এ দীর্ঘ সময়টা কেটেছে নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে। তবে তার সময় যে খুব ভালো কেটেছে তা নয়। প্রথম কথা, পত্র-পত্রিকাগুলো তাকে ছাড়েনি। তার বিলাসবহুল জীবন আর আনন্দমুখর পার্টির পর পার্টি আয়োজনের সব খবর ফলাও করে ছেপেছে তারা। শুধু তাই নয়, মাদক চক্রের সাথে তার যোগসূত্র, নেশাজাতীয় পানীয়র প্রতি দুর্বলতা, বিভিন্ন ঘটনায় পেশিশক্তির প্রয়োগ সংক্রান্ত খবরও ছাপা হয় অনেক। এরপর আরেকটি বিব্রতকর খবর ছাপা হলো যে মিল্কিওয়ে স্পেস মলে মূল্যবান জিনিস চুরি করে ধরা পড়েছেন তিনি। ক্যাপ্টেনের মতো বিখ্যাত ব্যক্তি এ রকম কাজ করবেন? এ যে অবিশ্বাস্য! তবে এসব ধাক্কাই কাটিয়ে উঠছিলেন তিনি। কিন্তু তখনি বের হলো আরেকটি গুরুতর সংবাদ। তাতে বলা হলো যে ক্যাপ্টেন এক ফেরারি সন্ত্রাসীকে গ্রেফতারের চেষ্টায় একটি চাঁদের কক্ষপথ পরিক্রমণকারী একটি রোমিলিয়া ৬ মহাকাশ যান উৎক্ষেপণ করেন। কিন্তু তারপরও সন্ত্রাসীকে ধরা সম্ভব হয়নি তো বটেই, চাঁদটিও ধ্বংস হয়ে গেছে। এসব উল্টাপাল্টা ও মারাত্মক রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী কাজ তার মান-মর্যাদাকে প্রায় ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। গোটা গ্যালাক্সিতে তিনি এক অচ্ছ্যুত ব্যক্তিতে পরিণত হন। এ যেন আকাশের নক্ষত্রের ভূতলে পতন।
কিন্তু এত কিছুর পরও হঠাৎই হয়তো ক্যাপ্টেন মাইকেলের কথা বলে বসে কেউ। আমি নিজেও তাদের একজন। এখনো তার সেই মহান ভূমিকা ও কাজের কথা আমি স্মরণ করি যা তাকে প্রতীকী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। আমার ইচ্ছা যে সবাইকে আমি ক্যাপ্টেনের কথা স্মরণ করিয়ে দেবো। তিনি যা করেছিলেন তাতে এটা তার প্রাপ্য।
ভাবছি, পৃথিবীতে ফিরে আমাকে ছুটি নিতে হবে কিছু দিন, কারণ ক্লান্তি ও অবসন্নতা আমাকে দ্রুত কাহিল করে ফেলে। আগামীকাল গ্যালাক্সি এস-৫ মহাকাশ স্টেশনে ভিড়বে। রক্ষীরা এসকর্ট করে স্থায়ী ফেডারেশন ব্যাটলশিপে নিয়ে যাবে আমাকে। সবার কাছে আমাকে জানতে হবে ফেডারেশনের জাতীয় বীর ক্যাপ্টেন ড্যান মাইকেল সম্পর্কে। তার এ সাক্ষাৎকারটা সেরা একটা সাক্ষাৎকার হবে। এক সময় তার প্রচণ্ড অনুরাগী ছিলাম আমি। তাই অত্যন্ত মনোযোগ দিতে হবে এ কাজটায়।

মাস্টার অব স্পেসপ্রশ্নকালীন সময়ের বিবরণ: মহাকাশ তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২৩১৬।
আমরা ব্যাটলশিপ গ্যালাক্সি এস-৫-এ পৌঁছেছি। সুসজ্জিত কনফারেন্স রুমে অপেক্ষা করছি ক্যাপ্টেন মাইকেলের জন্য। আমার সাথে রয়েছেন ফেডারেশনের জনসংযোগ প্রতিনিধি। আমাকে সব ধরনের সহযোগিতা করতেই সাথে দেয়া হয়েছে তাকে। শিপটিতে এক ধরনের কম্পন টের পেলাম।
জোনাস : আমরা … আমরা কী পাক খাচ্ছি?
ফেডারেশন জনসংযোগ প্রতিনিধি : হ্যাঁ। আচ্ছা, আমরা তৈরি তো? সম্মানিত ক্যাপ্টেন আমাদের সাথে যোগ দেয়ার আগে আমি আরো একবার আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেবো যে তিনি এসে পৌঁছলে আপনি উঠে দাঁড়াবেন, তাকে স্যালুট করবেন এবং তিনি যতক্ষণ বসতে না বলেন ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন। আমি আপনাকে আবারো স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে বিদ্রোহী সেনাবাহিনী বিষয়ক কোনো প্রশ্ন থেকে দূরে থাকবেন। জি.এল.এফ (গ্যালাক্সি ল ফেডারেশনের সংক্ষেপ) সরকারি অবস্থান হচ্ছে বিদ্রোহী বাহিনী বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। তাই বিদ্রোহী সেনাবাহিনী বিষয়ক কোনো প্রশ্ন পৃথিবীর মানুষের প্রতি ফেডারেশনের মধ্য থেকে সরাসরি অসততা বলে গণ্য হবে। এটা বরদাশত করা হবে না। আমার কথা বুঝতে পেরেছেন?
জোনাস : হ্যাঁ, বুঝেছি।
প্রতিনিধি : বেশ। এখন ক্যাপ্টেন আমাদের সাথে যোগ দেবেন। উঠে দাঁড়ান ও স্যালুট দিন।
দরজা খুলে যায়। ক্যাপ্টেন প্রবেশ করেন।
প্রতিনিধি : ক্যাপ্টেন মাইকেল, পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি হচ্ছেন নিউ ওয়ার্ল্ড মিডিয়া চ্যানেলের বিখ্যাত উপস্থাপক জোনাস হারপার।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়ান জোনাস।
জোনাস : আপনাকে ধন্যবাদ। প্রশ্ন শুরু হওয়ার আগে আমি আপনাকে বলতে চাই যে ছোটবেলায় আপনি আমার কাছে একজন মহান বীর ছিলেন। আপনাকে আমি কী বলতে চাইছি তা আশা করি বুঝেছেন। আমি অত্যন্ত আনন্দিত আপনার সাক্ষাৎ লাভ করে।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : আপনার কথায় হৃদয় জুড়িয়ে গেল পৃথিবীবাসী বন্ধু। এস-৫-এ আপনার অবস্থান আনন্দময় হোক। তা কেমন লাগছে এখানে?
জোনাস : অসাধারণ স্যার। মনে হচ্ছে ব্যাটলশিপ নয়, কোনো রিসোর্ট হোটেলের মতো কোথাও আছি।ক্যাপ্টেন মাইকেল : ঠিক বলেছেন। এখানে গ্যালাক্সি-৬-এর মত অত চাকচিক্য বা নতুন বিলাসবহুল গ্যাজেট হয়ত নেই, কিন্তু এ যানটি একজন প্রিয়তমা নারীর মতোই বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত সঙ্গিনী। মহাকাশে বহু কঠিন ও বিপজ্জনক অভিযান চালিয়েছে এটা। সে যাক, কোথা থেকে শুরু করব আমরা?
জোনাস : আমি একেবারে গোড়া থেকেই শুরু করতে চাইছি- আপনার শৈশব দিয়ে। বিশেষ করে আপনার বাবা-মার প্রসঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ক্যাপ্টেন মাইকেল : অবশ্যই। আমার মা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষিকা, আর আমার বাবা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। স্কুলের সময়টা খুব ভালো ছিল না। আপনি বোধ হয় জানেন, স্কুলের শিশুরাও নিষ্ঠুর হতে পারে। একবার ভাবুন তো, তারা যখন জানতে পারল যে আমার বাবা মন্ত্রী তারা আমাকে উত্ত্যক্ত করতে শুরু করল। আর তার মন্ত্রিত্ব যখন শেষ হলো স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা আমাকে ভীষণ উপেক্ষার চোখে দেখতেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, একদিন আমার বাবা স্কুলে এলেন, কিন্তু তাকে প্রাপ্য সম্মানটাও দেয়া হলো না। ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। কান্না এসেছিল।
জোনাস : কিন্তু….
ক্যাপ্টেন মাইকেল : কিন্তু …. হ্যাঁ, ব্যাপারটা আমার মনকে শক্ত করে তুলল। আমি বুঝলাম যে হিংসা, শত্রুতা এগুলো আমাকে অতিক্রম করতে হবে, আর সমাজে উঁচুতে উঠতে হবে। মধ্যবিত্ত বা মাঝ পর্যায় কোনো পর্যায় নয়, একটাই পর্যায় আছে আর তা হচ্ছে উচ্চ পর্যায়। আমার পছন্দসই পেশার মধ্যে শিক্ষকতা পেশা ছিল না। আর যেমন নম্বর, ডাটা, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয় আমার কাছে ছিল গুরুত্বহীন। যারা কিংবদন্তি সৃষ্টি করে তারা চুপ করে বসে থাকে না, তারা সমস্যার মধ্যে আটকে থাকে না, সেখান থেকে বেরিয়ে আসে ও নতুন কিছু সৃষ্টি করে। তারা তারুণ্যদীপ্ত, অনুপ্রাণিত ও অভিযানপ্রিয়। আমি যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ কোরের জন্য আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিলাম। এনট্রান্স পরীক্ষায় ফ্লাইং কালার নিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আমি একজন ক্যাডেট হলাম।
জোনাস : তিরিশ বছর আগে ড্রাগিমিয়ান দখল আমলের একটি ঘটনা। প্ল্যানেট জেটা৪বি মুক্ত করার অভিযানে গিয়ে আপনার ব্যাটেলিয়ন থেকে আপনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। এটাই ছিল সেই কিংবদন্তির মিশন। আপনি শত্রুদের শক্তঘাঁটিতে আঘাত হেনেছিলেন। প্রচণ্ড লড়াই করে পরাজিত ও বন্দি করেছিলেন সম্রাট জ্যানথককে। আপনি সে সময়টার কথা আমাদের বলতে পারেন? বলবেন কী যে আপনার মাথায় কোন ভাবনা চলছে? আপনি চাইলে আমাদের সামনে সে ছবিটা তুলে ধরতে পারেন স্যার।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : তাই! আচ্ছা, তাহলে শুনুন। দেখুন, আমার বয়স হয়েছে, তবে এতটা বুড়ো হইনি যেসব কিছু ভুলে গেছি। আপনি একটু আগেই বললেন না যে প্ল্যানেট জেটা৪বি-র ওই যুদ্ধে আমি আমার ব্যাটেলিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম! ঘটনা হচ্ছে, ড্রাগিমিয়ান পদাতিক বাহিনীর দুই সৈন্যকে আমি অনুসরণ করি। তারা বোধ হয় তাদের ইউনিট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। আশ্চর্য যে তাদের পিছু নিয়ে আমি তাদের ঘাঁটিতে পৌঁছে যাই। ঘাঁটির প্রবেশপথে তারা পাহারা দিতে শুরু করল। হঠাৎ দেখি, তাদের রাজা জ্যানথক ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তার সাথে আর কেউ নেই। সম্ভবত ড্রাগিমিয়ানদের ক্রমাগত বির্যয়ের মুখে একা হয়ে পড়েছিলেন। সৈন্য দু’জনের সাথে কথা বলতে শুরু করলেন তিনি। আমি দেখলাম, কিছু করতে চাইলে দ্রুত করতে হবে। তাকে এ রকম অবস্থায় পাওয়ার কথা ভাবাই যায় না। নিজের নিরাপত্তার কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেলাম। অতর্কিতে বেরিয়ে এলাম আমার গোপন অবস্থান থেকে। আমার অস্ত্র থেকে দু’টি গুলি ছুঁড়ে নিকেশ করলাম দুই সৈন্যকে। এবার অস্ত্র তাক করলাম সম্রাটের দিকে। কঠিন চোখে চাইলাম। তার চোখে তখন আতঙ্কের ছায়া। কিন্তু কিছু বলার অবস্থা তার ছিল না। বললামণ্ড
: দীর্ঘজীবী হোক নিউ ওয়ার্ল্ড।
পর মুহূর্তেই গুলি করলাম তার পায়ে। মাটিতে পড়ে গেলেন তিনি। দেখলাম জ্ঞান হারিয়েছেন।
তার পরপরই আমাদের ঘাঁটির সাথে আমার যোগাযোগ ফিরে এলো। আমাকে ট্রেস করতে সক্ষম হলো আমার ব্যাটালিয়ন। এই হলো সম্রাট জ্যানথককে আমি কিভাবে আটক করলাম সে কাহিনী।
জোনাস : ওহ্! একেবারে অবিশ্বাস্য। কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : হ্যাঁ, সে রকমই বটে।
জোনাস : সম্রাট জ্যানথককে গ্রেফতার করায় আপনাকে জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। আপনি পান মর্যাদাপূর্ণ ‘মেডেল অব হার্ট’ পদক। পদোন্নতি দিয়ে আপনাকে সেই ব্যাটলশিপের ক্যাপ্টেন করা হয়। আপনাকে ভূষিত করা হয় সাদা ও হলুদ রঙের মাঝখানে উজ্জ্বল রঙের বজ্রের এমব্রয়ডারি শোভিত বিখ্যাত পোশাকে। গোটা গ্যালাক্সি জানে যে এ পোশাক অতুলনীয় বীরত্বের প্রতীক। এ বজ্র প্রতীক এখন সকল ফেডারেশন ইউনিফর্মে সংযুক্ত। এ প্রতীক কিভাবে এলো, তা কী আপনি জানেন?
ক্যাপ্টেন মাইকেল : আসলেই এ এক কাব্যিক ব্যাপার। ফেডারেশন শিপ যখন জেটা৪বি ছেড়ে আসছিল সে সময় আমি একটি জানালা দিয়ে মহাকাশের বিশাল বিস্তারের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তখন বজ্রপাত হলো। এত বড় যে এই শিপের আকারের। ঘন অন্ধকারে তা এমনভাবে ঝলসে উঠল যে মনে হলো স্রষ্টা নিজেই সেখানে আছেন, আমাদের পাশেই চলেছেন, আমাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন।
জোনাস : আমি নিশ্চিত যে আপনি রূপক হিসেবে এটা বলছেন, যেমন রূপকভাবেই আপনি মহাকাশে বজ্রপাত হতে দেখেছেন।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : না, আক্ষরিকভাবেই। আমি আমার চোখের সামনেই বজ্রপাত ঘটতে দেখেছি। তার উদ্ভাস এত বিশাল যে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই যেন এর মধ্য দিয়ে আবির্ভূত হলেন।
জোনাস : এটা কী আপনি যা বোঝাতে চাইছেন সে রকমই কিছু? কিন্তু বিষয় হচ্ছে যে মহাশূন্যে বজ্রপাত ঘটা বাস্তবিক পক্ষে অসম্ভব। কারণ, মহাকাশে কোনো বায়ুমণ্ডল নেই।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : হ্যাঁ, সেটা ঠিক। কিন্তু এটা মহাকাশে ঘটেছে। বহুদূরে মহাকাশের অনন্ত বিস্তারের গভীরে।
জোনাস : এতে কোনো কিছুর পরিবর্তন হবে না। দেখুন, ইলেকট্রন কোনো বায়ুমণ্ডল ছাড়া স্থুলাণুতে পরিণত হয় না। সে কারণেই মহাশূন্যে কোনো বজ্রপাত ঘটা সম্ভব নয়। আপনি অবশ্যই ভুল বলছেন।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : কিন্তু মহাকাশের বিশাল বিস্তারে অবশ্যই এটা ঘটেছে। গভীরে, অনেক গভীরে ঘটেছে এটা।
জনসংযোগ প্রতিনিধি : আমরা বোধ হয় অন্য প্রশ্নে যেতে পারি।
জোনাস : আমি নিশ্চিত … আপনি যে সময় খ্যাতির চূড়ায় আরোহণ করলেন, তখন পত্রিকাগুলোতে আপনি খুবই গুরুত্ব পেতেন। কিন্তু ক্রমেই আপনার সামরিক মহিমার গুণগান করে লেখালেখির পরিমাণ কমে আসতে থাকল, আপনার প্রভাব হ্রাস পেতে থাকল, আপনার ভক্তের সংখ্যাও কমে এলো।
ক্যাপ্টেন হাসলেন। বললেন, হ্যাঁ, সে এক দারুণ সময় ছিল। সে সময় বহু খবর প্রকাশিত হয়েছে, আমি ছিলাম তারকা, আর কারা না তোয়াজ করেছে আমাকে।
জোনাস : আচ্ছা, বিখ্যাত অভিনেত্রী ও মডেল জুলি সান্টিনাকে আপনি বিয়ে করেছিলেন। সেটা ছিল আপনার প্রথম বিয়ে যা মাত্র চল্লিশ দিন টিকেছিল। আপনি কি এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলবেন?
ক্যাপ্টেন মাইকেল : আহ, জুলি! সে ছিল একটা আতশবাজি, চোখধাঁধানো নারী। নয় কি? দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের ইউনিয়নটা হলো আবেগের চেয়েও বেশি রাজনীতিনির্ভর। চাঁদে আমাদের জমকালো বিয়ের অনুষ্ঠানের পর সে পৃথিবীতে ফিরে গেল। আর আমি চলে এলাম দূর মহাকাশে। তার ক্যারিয়ার আর আমার জনপ্রিয়তার তখন আকাশ ছুঁই ছুঁই অবস্থা। কিন্তু পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ার সাথে সাথে ক্যামেরার মুখ তার দিক থেকে ঘুরে গেল। ফলে আমাদের সেই আলো ঝলমলে অবস্থা আর রইল না। এটা সত্যিই এক দুঃখজনক ব্যাপার। তারপর আমার সম্পর্কে যখন খারাপ খবরগুলো বের হতে শুরু করল, বিয়েটা ভেঙে গেল।
জোনাস : হ্যাঁ, খবরটা যখন পত্রিকায় বের হলো, সে সময়ের কথা আমার মনে আছে। আপনার বিরুদ্ধে বোধ হয় সাঁইত্রিশটা অভিযোগ উত্থাপিত হয়।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : না, আটত্রিশটা।
জোনাস : দুঃখিত। আমার ভুল হয়েছে।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : মজার ব্যাপার, না? একটা কথা, আমি কখনো ভাবিনি যে মানবজাতির সাথে অ্যালিয়েনদের সম্পর্ক স্থাপিত হওয়া এবং দু’ জাতির নারী-পুরুষের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মধ্যে দিয়ে মিশ্র ধারার সন্তানের জন্ম হতে পারে। কিন্তু এ রকম অবস্থা এসে গেছে।
জোনাস : আপনি কী বলতে চাইছেন যে অদ্ভুতুরে এক প্রজাতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে? এ ধরনের সন্তান আসতে পারে কী?
জনসংযোগ প্রতিনিধি : ক্যাপ্টেন যা বলছেন তা অর্থহীন কথা। এর কি কোনো যুক্তি আছে?
জোনাস : ঠিক আছে। দেখুন, এখন এমন একটা সময় যখন পৃথিবীর মানুষের জনমত পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের তরুণীদের মধ্যে ভীষণ রকম পরিবর্তন এসেছে। তারা এত বেশি অত্যাধুনিক, ফ্যাশনসর্বস্ব এবং পুরুষদের মতোই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে যা অবিশ্বাস্য। কোনো জাতির নারীদের যখন এ রকম অধঃপতন শুরু হয়, সে জাতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। যাহোক, মানুষ ক্রমেই দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে পড়ছে। আর তাদের এ অবস্থাই চন্দ্রপরিক্রমণরত মহাকাশযান রোমিলিয়া ৬ ধ্বংসের কারণ।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : এ অবস্থা আজ হোক কাল হোক হতোই। আমি এক সন্ত্রাসীকে ধাওয়া করেছিলাম। তার শিপকে রোমালিয়া ৬-এ ধাওয়া করেছিল। আমাদের কাছে জোর প্রমাণ ছিল যে সে যে শিপে ছিল তাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ছিল যা দিয়ে সে তুলকালাম কাণ্ড ঘটাতে পারত। আমরা তার পৃষ্ঠপোষক নেতাদের অনুরোধ করেছিলাম পলাতক সন্ত্রাসীকে আমাদের কাছে তুলে দিতে। কিন্তু তারা অস্বীকার করল।
জোনাস : তারা অস্বীকৃতি জানাল কেন?
ক্যাপ্টেন মাইকেল : কারণ তারা আমাদের ঘৃণা করে। তারা আমাদের স্বাধীনতাকে এবং আমরা গ্যালাক্সিকে যে স্বাধীনতা দিয়েছি তাকে ঘৃণা করে। তারাই সেই লোক যারা অভিশপ্ত বিদ্রোহীদের ….
জনসংযোগ প্রতিনিধি : ক্যাপ্টেন মাইকেল, আপনি কী বলতে চাইছেন তা আমি বুঝতে পারছি না। আসল কথার কিছুই বলছেন না আপনি। আমি অনুরোধ করব যে আপনি মূল বিষয়ে আসুন।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : জোনাস, শুনুন। ফেডারেশন সন্ত্রাসীদের সাথে কোনো আলোচনা করবে না। এটা হচ্ছে প্রথম কথা। হ্যাঁ, আমার কাজের জন্য আমাকে প্রচণ্ড ধকল সইতে হয়েছে। বহু লোকেরই কথা যে ঐ চাঁদটি উড়িয়ে দেয়াটা আমার প্রচণ্ড বাড়াবাড়ির ফল। কিন্তু আসল কথাটা কে বলবে? আমি বলব। আমি যদি জানতাম যে একটি চাঁদ না থাকা আমাদের গ্রহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, আর তাতে এ রকম সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়া হবে তাহলে আমি হয়তো যা করেছি তা করার ব্যাপারে আরেকবার ভাবতাম। আচ্ছা, সঠিক ব্যাপারটা কে জানে বলুন? আমি জানি এটা স্বস্তিকর অবস্থা নয়, কিন্তু মহাবিশ্বকে রক্ষা করতে হবে তো। আমি যা ঠিক মনে করেছি তাই করেছি।
জনসংযোগ প্রতিনিধি : আমার মনে হয়, আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত।
জোনাস : অবশ্যই। গ্যালাক্সি এস-৫ তিন দশক ধরে নক্ষত্রপুঞ্জের মধ্য দিয়ে চলছে। আপনি সাহায্য করা, যুদ্ধ করা ও মুক্ত করার অসংখ্য অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এসব কর্মকাণ্ডে আপনি কি কখনো তাকে দেখেছেন? সেই খ্যাতিমান যোদ্ধা যাকে তারা ‘দি হ্যান্ড’ বলে। আসলে কি তার অস্তিত্ব আছে?
জনসংযোগ প্রতিনিধি : আমার মনে হয় প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যাপ্টেনকে অনেক প্রশ্ন করা হয়ে গেছে। ফেডারেশন তথাকথিত ‘দি হ্যান্ড’-এর অস্তিত্বের কথা স্বীকার করে না। এটা একটা গুজব। একটি মিথ। আমার মনে হয়, সন্ধ্যার জন্য আপনার কোয়ার্টারে যাবার সময় হয়ে গেছে। আগামীকাল আপনি ক্রুদের সাথে তাদের নিয়মিত টহলে বের হতে পারবেন।
জোনাস : এটা চমৎকার ব্যাপার হবে। আপনাকে ধন্যবাদ। আপনাকে ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন মাইকেল।
জনসংযোগ প্রতিনিধি : তাহলে আজকের মতো ইতি।

মাস্টার অব স্পেসজোনাস হারপার, স্পেস লগ: ০০৯, মহাকাশ তারিখ : ৬ নভেম্বর, ২৩১৬
বিশ্বাসই হচ্ছে না যে আমি এটা লিখছি। আমি শুধু ক্যাপ্টেন মাইকেলের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। আমার নিজেকে এক চঞ্চল কিশোরের মতো মনে হচ্ছে। খানিকটা বিব্রতও, এ জন্য যে আমি তার মধ্যকার সূক্ষ্ম কৌতুকের দিকটি ঠিকমত ধরতে পারিনি। আমি বলতে চাইছি যে তিনি বজ্রপাতের যে গল্পটা বললেন এটা কোনো কৌতুক হতে পারে কি না। তার প্রথম জীবনে ছেলেবেলার স্কুল জীবনের দুঃখজনক অভিজ্ঞতার কথা, সাবেক প্রতীরক্ষা মন্ত্রী তার বাবাকে অসম্মান করার কষ্ট তার বুকে জমে আছে। যাই হোক, মানুষটি যেমন সাহসী তেমনি মজারও। এ ধরনের লোক এখন বেশি দেখা যায় না।
ক্যাপ্টেন উচ্চপর্যায়ের মানুষ। আমি যতটা জানি তিনি কোনো বাজে মানুষ নন, বরং খাঁটি মানুষ। এখন কিছুটা টোল খাওয়া অবস্থা তার, কিছুটা বিব্রতও বটে। এদিকে আমিও খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। পারিবারিক বন্ধনে আমারও ফাটল ধরেছে। স্ত্রী ন্যান্সির সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। সে ধাক্কাটা এখনো সামলে উঠতে পারিনি। এ সময় ক্যাপ্টেনের সাথে আমিও নিজেকে সমব্যথী বলে আবিষ্কার করলাম যা আগে ভাবিনি। আমরা দু’জনই যেন পরাজিত মানুষের দলে যারা আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। আমার ভেতরের লেখক সত্তা এ অবস্থার মধ্যে গভীরতর অনুভূতির বলে কিছু একটা আবিষ্কার করতে চাইল। যাহোক, আমাকে এখন বিশ্রাম নিতে হবে। এদিকে জনসংযোগ প্রতিনিধি আমাকে বলেছেন যে আমি যখন হেলম ক্রুদের সাথে শিপে কোথাও যাবো তখন কোনো কিছু রেকর্ড করতে পারব না। কিন্তু একজন সাংবাদিক হিসেবে বহুদিন আগেই আমি জেনেছি যে এ অবস্থার মধ্যেও কিছু করার একটা পথ সবসময়ই থাকে। আমি তাই আমার সাথে দু’টি মিনিয়েচার রেকর্ডার রেখেছি। সেগুলোর একটা আমার শার্টে আর একটা প্যান্টে বিশেষভাবে সেলাই করা। শক্তিশালী ওয়্যারলেস ফ্রিকোয়েন্সিতে সেগুলো চলে। সেগুলো রেকর্ড করা সব কিছু শিপে আমার কোয়ার্টারে থাকা হার্ড ড্রাইভে পাঠায়। বিশেষ ব্যবস্থা থাকার কারণে প্রয়োজন মতো আমি সেসব শুনে নিতে পারব।

মাস্টার অব স্পেসজোনাস হারপার, শার্ট মাইক্রোফোন, ট্রান্সক্রিপ্ট ফিড, মহাকাশ তারিখ : ৭ নভেম্বর, ২৩১৬
স্লাইডিং ডোর খুলে গেল। ভেতরে ঢুকল এক ড্রাগিমিয়ান এসকর্ট।
জোনাস : আসুন।
ড্রাগিমিয়ান এসকর্ট : ব্লানাকিস্তা (চলুন)।
আমরা কনফারেন্স রুমে পৌঁছলাম।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : আহ! জোনাস, স্বাগতম। ড্রাগিমিয়ান এসকর্টকে আপনার সাথে দেখছি। আপনি কি জানেন, সে একজন ড্রাগিমিয়ান? যথেষ্ট স্মার্ট তাই না? বহু স্পেস ক্যাপ্টেনই ড্রাগিমিয়ানদের নিয়োগ করবে না। এর কারণ প্রযুক্তির প্রতি তাদের বিদ্বেষ, তাদের আদিম রক্ততৃষ্ণা ও শিষ্টাচারের অভাব। গ্যালাক্সিএস-৬-এর তরুণ ক্যাপ্টেন বিল উইলিয়ামকে তো চেনেন। আপনি কি জানেন সে কেমন লোক? জানেন না? সে একটা কট্টর বর্ণবাদী।
জনসংযোগ প্রতিনিধি : ক্যাপ্টেন, এ বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। আপনি আপনার সহযোগী একজন ক্যাপ্টেনকে বর্ণবাদী বলে অভিযুক্ত করতে পারেন না।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : বেশ। আমি নিশ্চিত যে সে নতুন, সুসজ্জিত গ্যালাক্সি এস-৬-এর কমান্ডার হিসেবে খুবই ভালো আছে। আমাকে বলুন, সে এখন কোথায়?
জোনাস : আপনি কি ড্রাগিমিয়ান নিয়োগ পছন্দ করেন না?
ক্যাপ্টেন মাইকেল : অবশ্যই নয়। তাদের বিশ্বাস করা যায় না। এ লোকটিকে নিয়োগ করা ঠিক হয়নি।
ড্রাগিমিয়ান এসকর্ট : শান্ত হোন, শান্ত হোন।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : আচ্ছা ঠিক আছে। এখন তুমি আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও। তোমাকে দেখতে চাই না।
ড্রাগিমিয়ান এসকর্ট বাইরে চলে যায়।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : লোকটি যথাযোগ্য সম্মানও জানাতে জানে না।
জোনাস : লোকটিকে আমারও পছন্দ হয়নি।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : হ্যাঁ, খুবই বিরক্তিকর। আচ্ছা, আপনাকে বিখ্যাত গ্যালাক্সি এস-৫-এর ক্রুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। তারা আমার চোখ, আমার কান, আমার বিশ্বস্ত সাথী। তিনি ডাকলেন- ববি?
এ সময় ক্যাপ্টেনের সহচর ববি বলে: ইয়েস ক্যাপ্টেন মাইক!
ক্যাপ্টেন চোখ পাকিয়ে তার দিকে তাকালেন। বললেন: আমার নাম মাইকেল, মাইক নয়।
ববি: আপনি উত্তেজিত হবেন না মামা।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : তোমাকে আমি বলেছি ডিউটিতে থাকার সময় আমি তোমার মামা নই। আমি তোমার ক্যাপ্টেন। আর আমাকে কখনো মাইক বলবে না।
ববি: কিন্তু আপনার নামের শেষ অংশ তো প্রথম নাম।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : হ্যাঁ আমি তা জানি। প্রত্যেক বড় ব্যক্তির দু’টি প্রথম নাম থাকে। সবাই সেটা জানে। (জোনাসের দিকে ফিরে) আমার মনে হয় আমাদের আর বসে না থেকে যাওয়াটাই ভালো হবে। আপনাকে বলি, আমার এ সহচরটি আমার ভাগ্নে- নাম ববি গিজোউইটজ।
জোনাস : গিজোউইটজ?
ক্যাপ্টেন মাইকেল : হ্যাঁ গিজোউইটজ। আমার বোনকে আমি সব রকমভাবে বোঝানোর চেষ্টা করার পরও সে এক বাদামি চুলের ইহুদিকে বিয়ে করে। এই মোটা, লজ্জা-শরমহীন ছেলেটি তাদেরই সন্তান।
ববি : ধন্যবাদ মামা।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : তুই সব সময় আমার জন্য বিরক্তিকর।
জোনাসের দিকে তাকিয়ে বললেন : তার বাবা-মা তাকে যতগুলো প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করেছিল সেগুলোর সব ক’টি থেকেই বেরিয়ে আসে সে। তখন আমি তাকে আমার উইং-এর অধীনে নেই। ববি এখন আমাদের ভারপ্রাপ্ত হেড অব রেফারেন্স, সংক্ষেপে এইচওআর।
এবার ববির দিকে ফিরলেন : তুই একটা নোংরা ছেলে, নোংরা কাজ করিস। তাই নয় কি?
ববি : এসব বাদ দিন না মামা। আমি লজ্জা পাচ্ছি।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : তুই সব সময়ই লজ্জা পাওয়ার কাজটিই করিস। এটা তোর রক্তের দোষ।
জোনাস : ফেডারেশন হেড অব রেফারেন্সের কাজ কী?
ববি : তথ্য ও সংবাদ সংক্রান্ত সব কিছু দেখা ও রেকর্ড আপ টু ডেট রাখা। যেমন, আমরা যখন কোনো গ্রহ অতিক্রম করি তখন সেখানে উল্লেখযোগ্য কী কী দেখলাম সে বিষয়ে সব তথ্য কম্পিউটারে সংরক্ষণ করি। তা থেকে অন্যদের জানানোর মতো কিছু আছে মনে করলে যথাসময়ে তা জানিয়ে দেই।
জোনাস : তা কাজটা তো ভালোই।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : ভালো, তবে জটিল। তাই ও ঠিকমত পারে না।
ববি : না, তা নয়। আমি তো যথেষ্ট সুনামের সাথে কাজ করি।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : যাই হোক, এবার আপনাকে আমার নাম্বার টু ম্যান ও প্রধান নেভিগেটর কোর্ট-এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। এই যে, এ হচ্ছে কোর্ট।
কোর্ট : গ্রিটিংস।
জোনাস : গ্রিটিংস। আমি জোনাস।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : কোর্ট প্ল্যানেট জেটা৪বি থেকে এসে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। আপনি জেটানদের বিষয়ে বেশি জানেন কিনা জানি না। তাদের মহাবিশ্বের সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান জাতিগুলোর মধ্যে একটি বলে গণ্য করা হয়। তারা আবেগের চেয়ে যুক্তিতে অধিক বিশ্বাসী যদিও আমি জানি না যে তাদের মধ্যে আসলে আবেগ বলে কিছু আছে কি না। তাদের এমন কিছু ব্যাপার আছে যেগুলোর মধ্যে আমি কোনো যুক্তি দেখি না। যেমন তারা অসম্ভব বড় চুল রাখে ও সে চুলের বিন্যাস অন্যরকম। তার ফলে তরমুজের মতো মাথাটা আছে বলে আর মনে হয় না। অদ্ভুত!
কোর্ট : দেখুন, মাথায় বড় চুল রাখা ও তার বিন্যাসের এ পদ্ধতি যে কত উপকারী তা বলার নয়। চুলের পুরু স্তর আমাদের মাথার খুলিকে যেভাবে ঢেকে রাখে তাতে আঘাত পেলেও খুলিতে সহজে চিড় ধরে না। তা ছাড়া চুল বিন্যাসের এ কৌশল মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাই এ চুল রাখা সম্পূর্ণ যৌক্তিক।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : তাহলে বুঝুন কী ধরনের মানুষের সাথে আমি থাকি। যাকগে, কোর্ট আমাদের সেরা নেভিগেটর, তার চেয়ে ভালো নেভিগেটর আমি আর দেখিনি। তবে পার্টিতে সে খুব ভালো করতে পারে না, বেমানান। অনেকেরই নানা দোষ আছে। তার মধ্যে সে সব কিছু নেই। এক গ্লাস আপেল জুস হাতেই গোটা সময়টা কাটিয়ে দেয় সে। কোনো সাদা বা কালো সুন্দরীর ডাকেও সাড়া দেয় না। আরে একি! মনিটরে যে আমাদের গ্যালাকটিক অ্যাম্বাসাডর সাশা ব্যাংকসকে দেখছি। কেমন আছেন সুশ্রী মহিলা? আপনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি জোনাস, পৃথিবী থেকে এসেছেন, বিখ্যাত সাংবাদিক।
সাশা : হ্যালো হ্যান্ডসাম! কেমন আছেন?
জোনাস : হ্যালো সুইট লেডি, আপনার সাথে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : সাশা আমাদের চৌকস কূটনীতিক। তার গুণ ও যোগ্যতা অনেক। সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে তিনি ৪০টি অ্যালিয়েন ভাষা জানেন, মার্শাল আর্টের ৫টি শাখায় তার প্রশিক্ষণ আছে। অথচ তার মধ্যে নাক উঁচু ভাব নেই মোটেই।
সাশার গলায় মিষ্টি স্বরে আপত্তি ধ্বনিত হয় : আহ ক্যাপ্টেন!
জোনাস : উনি তো অসাধারণ এক মহিলা! আচ্ছা, আমি আপনাদের সবার সাথে একটু কথা বলতে চাই। ক্যাপ্টেন সম্পর্কে আমার কিছু প্রশ্ন আছে।
ববি : আমি কোনো আজেবাজে প্রশ্নের জবাব দিই না। সাংবাদিকরা সাংঘাতিক মানুষ।
জোনাস : না না, ভয়ের কোনো ব্যাপার নেই। এটা অফ দি রেকর্ড সাক্ষাৎকার হবে। শপথ করে বলছি। ক্যাপ্টেন সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্যমূলক সাক্ষাৎকার হবে এটা। আপনারা অল্প একটু সময় দিলেই চলবে।
কোর্ট : আমার কোনো আপত্তি নেই।
সাশা : আপনি ক্যাপ্টেন সম্পর্কে জানতে চান? ঠিক আছে। আপনার প্রশ্নগুলো করুন।

সাশার সাক্ষাৎকার
জোনাস : আচ্ছা, ক্যাপ্টেনকে আপনি কতদিন ধরে চেনেন? তার সাথে আপনার পরিচয় কিভাবে?
সাশা : বিশ বছর আগে আমাকে গ্যালাক্সি এস-৫-এ গ্যালাকটিক রাষ্টদূত হিসেবে নিয়োগ করা হয়। প্রায় শুরু থেকেই আমি ক্যাপ্টেনের সাথে আছি। মূল রাষ্ট্রদূত ফ্রাংকলিন ফ্রাংকলিন হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। তবে আমি এ কথা বিশ্বাস করি না। সে সময় ক্যাপ্টেনের চিকিৎসা চলছিল। জাতীয় বীরের মর্যাদা লাভ করার কারণে তার জন্য সর্বোত্তম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেরা ডাক্তাররা চিকিৎসা করছিলেন। ভক্তরা সবাই তার চিকিৎসাবিষয়ে খোঁজ রাখত। অত্যন্ত ভালো চিকিৎসা হয়েছিল তার। আমার মনে হয়েছিল, তরুণ সৈনিক খুব বড় রকম বাহাদুরি দেখাতে গিয়েছিলেন সেদিন। সে সময় পরিস্থিতি ছিল অন্যরকম। সুদূর মহাকাশে ভ্রমণ করা ছিল নতুন। কোনো তদারকিও ছিল না।
আমি যখন এখানে এলাম, ক্যাপ্টেনের অবস্থা তখন খুব খারাপ। বন্দরে পড়ে থাকা একটা ভাঙা জাহাজের মত লাগত তাকে। তারপর তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে থাকলেন। সেটা কিন্তু খুব সহজ ছিল না। বিশেষ করে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন তিনি। খুবই খারাপ ছিল আঘাতটা। আমার বিশ্বাস যে তারপর থেকে তার মাথায় একটা সমস্যা হয়ে গিয়েছিল, আর সেটাই রোমিলা ৬ দিয়ে চাঁদ ধ্বংসের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দায়ী। তার মাথা ঠিক অবস্থায় ছিল না।
জোনাস : কিছু মনে করবেন না, আপনাদের মধ্যে কোনো রোম্যান্টিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল কী?
সাশা : অন দি রেকর্ড? না। ক্যাপ্টেন শিপের সাথে বিবাহিত ছিলেন। সে জীবনই ছিল তার পছন্দের। আর সেটাই হওয়ার কথা। তরুণীরা কে না ছিল তার ভক্ত? কিন্তু গ্যালাক্সি এস-৫-এ মেয়েদের মধ্যে একমাত্র আমিই তাকে তার প্রথম নাম ধরে ডাকতে পারতাম। তবে আপনার সাক্ষাৎকারে যেন এ কথা লিখবেন না। ঠিক আছে?
জোনাস : অবশ্যই না। আপনি বরং ক্যাপ্টেনের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে একটু আলোকপাত করুন।
সাশা : দেখুন আমি জানি যে পৃথিবীর মানুষ আমাদের এক ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন জঙ্গি স্বভাবের প্রাণী হিসেবেই দেখে। এ শিপের ক্রুদের কেউ ড্রাগিমিয়ান ভাষা বলতে পারে না, কিন্তু আমি পারি। আপনার এস্কর্ট যখন এলিভেটরে আমাদের উদ্দেশে চিৎকার করে কথা বলছিল তখন সে কী বলছিল জানেন? সে আমাদের বলছিল যে আপনার কাছে রেকর্ডিং যন্ত্র আছে। ফ্রিকোয়েন্সিগুলো তার কাছে চকবোর্ডে আঙুলের নখের মতো। আপনি তার কাজের যন্ত্রণাটা কি অনুভব করতে পারবেন যার প্রতিদিন শিপে কাজ হচ্ছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ফ্রিকোয়েন্সি পাঠানো, আর কিছু নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে প্রতিদিন কাজে আসে ও নিজের কাজ করে। কেন? কারণ, সে আরেকজন যোদ্ধার চেয়ে আরো বেশি কিছু হতে চায়। আর ক্যাপ্টেনের ক্ষেত্রে … আপনি তার সম্পর্কে আজেবাজে কথা লিখে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলার জন্য পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার আগে আপনার একটা কথা জানা উচিত। তাহলো যে ক্যাপ্টেন ড্যান মাইকেলের চেয়ে সৎ, বিশ্বাসী এবং মহাবিশ্বের নিরাপত্তার জন্য দৃঢ়সঙ্কল্প কোনো মানুষ আমি কখনো দেখিনি।
জোনাস : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সাশা। আপনি অনেক সুন্দর কিছু কথা বলেছেন। তবে আপনার জানা দরকার যে আমি ক্যাপ্টেনের কোনো ক্ষতি করতে আসিনি, কিংবা আপনার বা ক্রুদের কারোরই নয়। আমি তার সম্পর্কে সাধারণ লোকদের ধারণা জানতে চাইছিলাম, এর বেশি নয়।
সাশা : আপনার কথাগুলো শুনে খুব ভালো লাগল।
জোনাস : বেশ। আপনার সাথে সাক্ষাৎ একটা আনন্দময় ব্যাপার হয়ে থাকবে। তাহলে এবার অন্যদের সাথে কাজটা সারি, কেমন?

কোর্টের সাক্ষাৎকার
জোনাস : হ্যালো কোর্ট, আপনাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা যেতে পারে তো!
কোর্ট : নিশ্চয়ই। করুন।
জোনাস : ক্যাপ্টেনের সাথে আপনার পরিচয় কত দিনের?
কোর্ট : আমার নিজ গ্রহের পর আমি লিবারেশন ফেডারেশনের জন্য আবেদন করেছিলাম। ক্যাপ্টেনকে ধন্যবাদ যে তিনি আমাদের ড্রাগিমিয়ান শাসন থেকে মুক্ত করেছেন। আমার বাবা আমাকে বলেছিলেন, মহাবিশ্বে অনেক এলিয়েন জাতিই অন্যদের নিপীড়নের শিকার। তাদের মুক্ত করার জন্য কেউ কেউ কাজ করছে। আমি যেন সুযোগ পেলে এই নিপীড়িতদের মুক্তির মহান কাজে নিয়োজিতদের সাথে যোগ দেই।
জোনাস : পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে যারা বলে যে নিপীড়নের শিকার এলিয়েনদের মুক্ত করার জন্য ফেডারেশন কাজ করছে বটে, তবে তারা আর বেশিদিন তাদের রক্ষাকর্তা থাকতে পারবে না। নিপীড়নকারীরাই প্রধান শক্তিতে পরিণত হবে।
কোর্ট : হ্যাঁ, মানুষ ঠিকই বলেছে। তারা নিঃসন্দেহে এক মজার প্রাণী। তারা আস্থার সাথে কাজ করে গর্বিত হয়। এটা তাদের জন্য আশীর্বাদ। কিন্তু তাদের সব কিছুর সাথে আমি একমত নই। এটা যুক্তির কথা যে কোনো প্রাণী যদি বাধা বা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয় তখন তার সামনে তিনটি পথ থাকে: হয় জয় করতে হবে, নয় মেনে নিতে হবে, নয় আত্মসমর্পণ করতে হবে। মানুষেরা সমস্যাকে দূর থেকে দেখে এবং সে সমস্যা কিভাবে মোকাবেলা করবে তা বিচার করে, অন্যদিকে অতি জরুরি সমস্যা তারা উপেক্ষা করে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এ জন্যই তারা সুদূর মহাকাশে রাজনৈতিক যুদ্ধের ব্যাপারে আগ্রহী, কিন্তু তাদের নিজের গ্রহে যে প্রতিবেশ ব্যবস্থা দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সেদিকে দেখে না।
জোনাস : এই যদি ঘটনা হয়ে থাকে তাহলে আপনি কেন একজন পৃথিবীবাসীর অত্যন্ত অনুগত হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন?
কোর্ট : মহাবিশ্বের সব প্রাণী যদি একই বস্তুতে গঠিত হয়ে থাকে তাহলে এটা মনে করা যৌক্তিক যে আমরা আমাদের চারপাশে মহাবিশ্বের বৈশিষ্ট্যগুলোর উত্তরাধিকারী হবো। এ মহাবিশ্বে মহা যুক্তি ও সীমাহীন বিশৃঙ্খলা উভয়েরই সম্মিলিত রূপ দেখা যায়। এটা বলা খুব সহজ যে একটি বৈশিষ্ট্য অন্যটির চেয়ে অনেক ভালো, কিন্তু উভয়েই আসল। এটা নির্ভর করে কোথায় দাঁড়িয়ে আপনি বলছেন তার ওপর। জীবনের মহা নাট্যমঞ্চের জন্য উভয়েরই খুব প্রয়োজন। এ জন্যই…..
কথা থামিয়ে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে সে- ক্যাপ্টেন দেখুন, রাডারে একটা অপরিচিত ক্রুজার দেখা যাচ্ছে।
ক্যাপ্টেন হেইলিং ফ্রিকোয়েন্সির সুইচ টিপলেন- হ্যালো অপরিচিত ক্রুজার! আমাদেরকে তোমাদের পরিচয় জানাও। কিন্তু কোনো জবাব এলো না।
ববি : ক্রুজারের মডেল দেখে এটা কয়েক সপ্তাহ আগে বিদ্রোহী সৈন্যদের চুরি করা ক্রুজারের মত মনে হচ্ছে।
জনসংযোগ প্রতিনিধি : আপনারা মনে রাখবেন বিদ্রোহীদের ব্যাপারে ফেডারেশনের অবস্থান হচ্ছে বিদ্রোহী বলে কিছু নেই।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : ধুত্তোরি। কেউ তো জবাব দিচ্ছে না। এ খেলা আর চলতে দেয়া যায় না। এরা বিদ্রোহী না হয়ে যায় না। কয়েক বছর ধরেই তারা ফেডারেশনের কার্গো শিপগুলো চুরি করছে। থাকছে আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। শয়তান জেটান ওদের নেতৃত্ব দিচ্ছে। কোর্ট, কুইনজার আলিকে খোঁজো।
জোনাস : কুইনজার আলি! আমি তার নাম কখনো শুনিনি।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : সে একটা মহা ধুরন্ধর, একেবারে নরকের প্রতিনিধি। ভয়ঙ্কর লোক। জানথকের সবচেয়ে প্রিয়পাত্র। তাকেও বন্দী করে জানথকের পাশের সেলে আটকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, সে যেভাবেই হোক বেরিয়ে এসেছে। কিছু একটা ঘটনা ঘটিয়েছে। এ ক্রুজারে সেই আছে।
ববি কম্পিউটারে কুইনজার আলিকে খুঁজছিল। বলল, এই তো, কুইনজার সম্পর্কে তথ্য পেয়েছি।
কম্পিউটার তথ্য দিচ্ছিল। কুইনজার আলি। মা জারাকিন আলি, পিতা অজ্ঞাত, গ্যালাকটিক বিদ্রোহের নেতা। জেটান ও পৃথিবীবাসীর সম্মিলিত রক্তের প্রথম ফসল। বিরোধীদের নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংস করার জন্য কুখ্যাত। সম্প্রতি প্ল্যানেট টাইটানে এক গোপন মিশনে গেলে ক্যাপ্টেন বিল উইলিয়ামস তাকে আটক করেন।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : ওর ব্যবস্থা করার জন্য আমার থাকা দরকার ছিল, ক্যাপ্টেন উইলিয়ামসের মতো ভালো মানুষ নয়। যাক, ক্রুজারটাকে ফলো কর।
কোর্ট : ওটা একটা ব্ল্যাক হোলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : এখন সেই চিরকালীন প্রশ্নটা এসেছে….. আমি যদি ব্ল্যাক হোলের মধ্যে ঢুকি, ফিরে আসতে পারব কি?
সাশা : আমি জানি না ক্যাপ্টেন, আপনি পারবেন কি?
কোর্ট : ক্যপ্টেন, রাডারে গ্যালাক্সি এস-৬ দেখা যাচ্ছে। ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস আমাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : তাকে স্ক্রিনে আনুন।
রাডার স্ক্রিনে এলেন ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস : হ্যালো ক্যাপ্টেন মাইকেল!
ক্যাপ্টেন মাইকেল : ভীষণ আনন্দ হচ্ছে ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস আপনাকে দেখে। কেমন আছেন? তা কী ব্যাপার!
ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস : আমি চুরি যাওয়া ফেডারেশন ক্রুজারের সন্ধান করছি। শুনুন, আপনি এখন থেকে আমার নির্দেশ মত চলবেন। ক্রুজারটা খুঁজে বের করতেই হবে। কারণ, ওটা ফেডারেশনের সেরা ও সর্বাধুনিক ক্রুজার। আপনি ফলো করুন আমাকে।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : আপনি আমার ঊর্ধ্বতন নন। আপনিও ক্যাপ্টেন আমিও ক্যাপ্টেন। আমাদের পদমর্যাদা সমান। আপনি আমাকে আদেশ দিতে পারেন না। যা বলেছেন, তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করুন।
ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস : মোটেই নয়। জনগণ আসলে আমাকে সম্মান করে, আপনাকে নয়। আমার শিপও আপনার শিপের চেয়ে অনেক উন্নত। আমার ক্রুরাও আপনার ক্রুদের চেয়ে ভালো। আপনার চেয়ে আমার বয়সও কম। আমি আপনার চেয়ে অনেক হ্যান্ডসাম। আমি সে ব্যক্তি নই যে বুঝতে পারে না যে তার অবসর নেয়া উচিত। আমার পরামর্শ, নিজের প্রতি সদয় হোন, আপনার শিপ নিয়ে হয় এখানে থাকুন নয় আমার নির্দেশ মতো আমাকে অনুসরণ করুন।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস। যান, আপনি আপনার কাজে যান। কোর্ট, ব্ল্যাকহোলের দিকে ধাবমান ঐ ক্রুজারটাকে ধাওয়া কর। তুমি কি আমার কথা শুনতে পেয়েছ?
কোর্ট : হ্যাঁ ক্যাপ্টেন। আমরা দিক পরিবর্তন করছি। কাউন্টডাউন শুরু … ১০, ৯, ৮. ৭…
সাশা : থামুন।
কোর্ট : ৪, ৩. ২..
ববি : কী হচ্ছে….
কোর্ট : …১…
জোনাস : আরে ব্যাপারটা কী? ……

মাস্টার অব স্পেসজোনাস হারপার, স্পেস লগ: ০১০, মহাকাশ তারিখ: ৭ নভেম্বর, ২৩১৬
ঘটনা এখন ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। আমি রীতিমতো শঙ্কিত যে ক্যাপ্টেনের সাক্ষাৎকার শেষ করে আমি জীবিত ফিরে যেতে পারব কি না। হায় ক্যাপ্টেন! গত কয়েক ঘণ্টা সময়ে তার সম্পর্কে এত কথা জেনেছি যে এখানে না এলে তা কোনোভাবেই জানা যেত না। এখন দেখছি লেকটি জালিয়াত ছাড়া কিছু নয়।
আমাদের শিপটা ব্ল্যাকহোলের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। কিন্তু ব্ল্যাকহোল পেরিয়ে অপর পারে যেতেই হামলার মধ্যে পড়ে গেলাম আমরা। একটা বিশাল আকারের ব্যাটলশিপ, গ্যালাটিক্স শিপগুলোর চেয়ে দুই বা তিনগুণ বড়, তাদের অপহরক রশ্মিতে আমাদের আটকে ফেলল। স্ক্রিনে সম্রাট জ্যানথক ও একজন জেটানকে দেখা গেল। কে লোকটা? তখনি সে তার নিজের পরিচয় দিলো- কুইনজার আলি, বিদ্রোহীদের নেতা।
এই সেই কুইনজার আলি! অবাক হয়ে দেখছিলাম লোকটাকে।
: আপনারা সবাই যে আমার কথা শুনে খুব বিভ্রান্ত হয়ে পড়বেন, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। গা জ্বালানো একটা  হাসি দিয়ে কথা শুরু করে সে- আপনারা মনে করেছিলেনযে সম্রাট জ্যানথক ও আমি উভয়েই কোনো অন্ধকার সেলের মধ্যে আটক রয়েছি। না, তা যে নেই তা দেখতেই পাচ্ছেন। আপনারা জানেন না, জানার কথাও নয়, ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস আমার লোক। আমি চেয়েছিলাম যে সে আমাকে আটক করুক। কারণ শুধু এভাবেই আমি সম্রাট জ্যানথককে মহাকাশ কারাগারের সেল থেকে বের করে আনতে পারতাম। তা যথাসময়েই করেছি। আমার আরো পরিকল্পনা ছিল আপনাদের দু’জনকেই আটক করা। ভদ্র মহোদয়গণ! এখন মহাবিশ্বের বিরুদ্ধে আপনাদের অপরাধের মাশুল দেয়ার সময় এসেছে।
ক্যাপ্টেন মাইকেল কাঁধ ঝাঁকালেন। তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন, তাই নাকি? তা ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস আর সৈন্যরা! তাদের কী করবে?
তখনি জ্যানথক নামে পরিচিত চারহাতবিশিষ্ট জন্তুটি কথা বলে ওঠে। তার চোয়াল ঘিরে স্থাপন করা এক অনুবাদক যন্ত্র তার কথা অনুবাদ করে আমাদের দিকে ছুঁড়ে দেয়-
: জানিয়ে দাও, তাদের স্রফে হজম করে ফেলব আমি- ভয় ধরানো সে রোবোটিক কণ্ঠস্বর শুনে মনে হল স্বয়ং শয়তান কথা বলছে- তারা কী বলছে? তারা কী মহাবিশ্বের সবাইকে বলতে চাইছে যে তারা মহাশক্তিমান জ্যানথককে আটক করেছে ও বন্দি রেখেছে?
তার কথা শুনে হেসে ওঠে কুইনজার। বলে-
: হ্যাঁ সে রকমই। আচ্ছা ক্যাপ্টেন মাইকেল, আপনি কী সমগ্র মহাবিশ্বকে বোকা বানাননি? কিন্তু সত্যটা কি জানেন? তাহল যে কয়েক বছর আগে জ্যানথককে আপনি পরাজিত করেননি, এটা যে করেছিল সে হচ্ছে ঘাতক ‘দি হ্যান্ড’। সেই আপনাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল ও জ্যানথককে বন্দি করেছিল। তারপর আপনার ব্যাটেলিয়ন এসে আপনার সাথে যোগ দেয়ার আগেই সে চলে যায়, আর কৃতিত্বটা নেন আপনি। কী দুরবস্থা আপনার!
ক্যাপ্টেন মাইকেল মাথা নাড়লেন।
সাশা : এ কথা কী সত্যি? জেটানরা কখনো মিথ্যা বলে না এটা জেনেও প্রশ্নটা করে সে। সে আশা করছিল যে আধা জেটান ও আধা মানুষ কুইনজার এ ব্যাপারে প্রকৃত সত্যটা নিশ্চিত করুক।
তবে তার দরকার হলো না।
ক্যাপ্টেন মাইকেল : তার কথার সবটাই সত্য। আমি মিথ্যা বলেছিলাম। মহামান্য ‘দি হ্যান্ড’ আমাকে উদ্ধার করেছিলেন …।
জনসংযোগ প্রতিনিধি তার হাত শূন্যে ছুঁড়ে বলে, এ যে অবিশ্বাস্য!
সমগ্র শিপে ভীষণ নীরবতা নেমে এসেছে। আমরা, ক্রুরা কারোর মুখে কোনো কথা নেই। যে মানুষটিকে সবাই একজন বিরাট নেতা, একজন শ্রেষ্ঠ সেনা হিসেবে জানে, যিনি মহাবিশ্বের এক আইকন হয়ে উঠেছেন, সেই মানুষটি তার এতদিনের গড়ে ওঠা নাম ও খ্যাতির প্রাসাদের ভিতটি ধ্বংস করে দিলেন! সবাই তার মাদক নেশার প্রতি আসক্তি, নারীদের প্রতি দুর্বলতা, চাঁদ ধ্বংসসহ অন্য অপকর্ম ক্ষমা করে দিয়েছিল। তা শুধু এ জন্য যে তিনি একা মহাবিশ্বের ভয়ঙ্কর শত্রু ড্রাগিমিয়ান সম্রাটকে পরাজিত ও আটক করেছিলেন। কিন্তু এখন অবিশ্বাস্যভাবে সবকিছু পাল্টে গেছে। দেখা যাচ্ছে ক্যাপ্টেন মাইকেল তা করেননি। আর তিনি নিজমুখেই তা স্বীকার করেছেন।
বিজয়ের হাসি হেসে শয়তান কুইনজার আলি বলে, আপনাদের শিপ ও আপনারা সবাই এখন আমাদের অপহরক রশ্মিতে আটক হয়ে রয়েছেন। কোনো কিছু করার চেষ্টা করবেন না। কোনো লাভ হবে না। আপনাদের গ্রেফতার করা হবে। যদি বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন তা আপনাদের ক্ষতি ডেকে আনবে। সুতরাং সে চেষ্টা না করাই ভালো।
স্ক্রিন থেকে আউট হয়ে গেল কুইনজার আলি।
আমার মাথায় নানা চিন্তা ঘুরছে। যে কোনো সময় এসে পড়বে কুইনজার আলি। নিজের রুমে ফিরে এলাম। শেষ পর্যায়ে যা ঘটেছে তা রেকর্ড করলাম। এখন যেকোনোভাবেই হোক, এ প্রমাণ রক্ষা করতেই হবে। পৌঁছে দিতে হবে পৃথিবীতে ক্যাপ্টেন মাইকেলের তথাকথিত বীরত্বের প্রকৃত ঘটনা ও সত্যের কথা। তাদেরকে জানাতে হবে সব। কিন্তু আমার ভয় যাচ্ছে না। আমি আশা করছি যে ন্যান্সি এখানে আছে, আমরা আমাদের মধ্যকার বিভেদের কথা ভুলে যাব, আবার একে অন্যের পাশে দাঁড়াব। তার প্রতি আমার সব ঘৃণার কথা ভুলে গেলাম, কারণ কাউকে আঁকড়ে ধরতে হবে আমাকে। পৃথিবীকে এ মুহূর্তে খুব মিস করছি। আমি আমার স্ত্রীকে মিস করছি। মহাকাশে আমি একা।
সে অবস্থার মধ্যে একটি বিষয় আমার হাসির উদ্রেক করল। ববি আশা করছিল যে আমি তার সাক্ষাৎকার নেব। সে বলছিল, সে কলুষমুক্তভাবে একটা পরিষ্কার আত্মা নিয়ে মরতে চায়। আমি তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম যে আমি যাজক নই আর আমার এ সাক্ষাৎকার তার কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নয়। আমার এখনো মনে হচ্ছে না যে ব্যাপারটা সে বুঝেছে।
আমাদের যেকোনো সময় বন্দি করা হতে পারে। আমি ঠিক করেছি আমার সাথে গোপনে আরেকটা মিনিয়েচার রেকর্ডার রাখতে হবে। আমার মনে হচ্ছে, মৃত্যুর মুখেও আমার ভেতরের সাংবাদিক সত্তা তার দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত। আমি এখনো একটা বড়সড় খবরের সন্ধান করছি।

মাস্টার অব স্পেসজোনাস হারপার, শার্ট মাইক্রোফোন ২ ট্রান্সপোর্ট ফিড, মহাকাশ তারিখ : ৭ নভেম্বর, ২৩১৬
পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। আমরা এখন বন্দি। ক্যাপ্টেন উইলিয়ামসকে এনে আমাদের সাথে রাখা হয়েছে। আমাদের সবাইকে রাখা হয়েছে শিপের নিচের এই নোংরা সেলে। সবার মনে শঙ্কার মেঘ জমেছে। এ অবস্থায়ও ববি চাইছে তার সাক্ষাৎকারটা নেয়া হোক।
ববি : আপনি কি আপনার মাইক্রোফোন অন করেছেন?
জোনাস : হ্যাঁ, এই মাত্র সুইচ অন করেছি।
ববি : বলুন, আমার কাছে আপনি কী জানতে চান?
জোনাস : আমি বুঝতে পারছি না এ পরিস্থিতিতে কোনো সাক্ষাৎকার নেয়া যাবে কি না। আমাদের সবাই এখন আটক। অপেক্ষা করছি মৃত্যুর। এখন মনের অবস্থা স্বাভাবিক নয়। কোনো কিছু গুছিয়ে চিন্তা করতে পারছি না।
ববি : আরে খামোখা আপনি চিন্তা করছেন। এটা কোনো ব্যাপারই না। আমার মামা এ রকম ঝামেলায় অনেক পড়েছেন আমি দেখেছি, আবার কাটিয়েও উঠেছেন। এসব দেখে আমি অভ্যস্ত। আপনি আমার সাক্ষাৎকারটা নিয়ে নিন।
জোনাস : আপনার ব্যাপারটা কী? আপনি কি পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পারছেন না?
ববি : দেখুন, আমার মামা সব সময় বলেন যে এ চাকরিটা তিনি আমাকে দিয়েছেন। আর এভাবে আমাকে তার ছত্রছায়ায় রেখেছেন। কিন্তু আমি অকৃতজ্ঞ ও আরো নানা কিছু। কিন্তু তিনি তার জীবনটা নিয়ে সব সময় ছিনিমিনি খেলেছেন। আমার মনে হয় না জীবনে একটি দিনও তিনি আসলে কাজ করেছেন। তিনি আমার সম্পর্কে মন্তব্য করার কে?
জোনাস : আপনার জন্য আমার করুণা হচ্ছে। আপনি পরিস্থিতিই বুঝতে পারছেন না। এ মুহূর্তে মৃত্যুর আশঙ্কাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়। সেটা নিয়েই আমি চিন্তিত। এর মধ্যে আপনি ক্যাপ্টেন মাইকেলের সমালোচনা করছেন?
ববি : আরে, এ রকম বোকার মত কথা বলবেন না তো! আমরা মরতে যাচ্ছি না। এ রকম ঘটনা প্রায়ই ঘটে। আমি অনেক দেখেছি। মরতে গিয়েও কয়েক সেকেন্ড আগে বেঁচে গেছি। কোনো না কোনো ভাবে। আপনি কি জানেন যে ক্যাপ্টেন মাইকেল ফেডারেশন স্পেস কোরে প্রথম স্থানে আছে শুধু আমার নানার জন্য। তিনিও এ ফেডারেশনেরই।
জোনাস : ক্যাপ্টেন আমাকে বলেছেন যে তিনি ফ্লাইং কালার পেয়ে প্রশিক্ষণে উত্তীর্ণ হন।
ববি : ক্যাপ্টেন তো বহু কথাই বলেছেন। তার প্রায় সবই ভুয়া। তার ক্যাপ্টেন পদে প্রমোশন পাওয়ার মতো? যে কারণে তিনি যা পেয়েছেন তা হচ্ছে তিনি জানথককে একা আটক করার কৃতিত্বের কারণে। দেখুন, জানথক একটা পশু, আর মাইকেল মামা হচ্ছেন একটা বিড়াল। একমাত্র ‘হ্যান্ড’-এর মতো বেপরোয়া লোকই জানথককে ঠেকাতে পারে। আমি মামার চেয়ে ভালো কিছু করার চেষ্টা করব। আমার বাবা ফেডারেশন বাহিনীর একজন ডেমোলিশন বিশেষজ্ঞ ছিলেন, মা ছিলেন স্কুলশিক্ষিকা। আমার শেষ নাম হচ্ছে গিজোউইটজ। এখন আপনাদের সাথে চার হাতওয়ালা জন্তুদের দ্বারা আটক হতে চলেছি। তবে ওদের পরোয়া করি না আমি।
জোনাস : তাহলে ওদের ভয় পান না আপনি, তাই তো!
ববি : ঠিক তাই।
কোর্ট : শ্ শ্ …চুপ! একজন রক্ষী আসছে এদিকে…
সাশা : আমাদেরকে হত্যার জন্য নিতে আসছে বোধ হয়।
ববি : এখন আমি ভয় পাচ্ছি। আমরা বোধ হয় মরতে চলেছি। ওহ্! এটা কেমন ব্যাপার? আমাকে মরতে হবে কেন বলুন তো! আমি এখনো বিয়েই করিনি।
ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস : আমি যদিও আপনাদের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পরছি না তবু বলছি, আপনারা ভয় পাবেন না। আমি গ্যালাক্সি এস-৬-এর ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস আপনাদের রক্ষা করব।
ধমকে উঠলেন ক্যাপ্টেন মাইকেল, চুপ করুন বিল। আপনিও আমাদের মতোই একজন বন্দি।
ববির দিকে চেয়ে জোনাস বলে, তাদের সম্পর্ক খুবই খারাপ দেখা যাচ্ছে। দু’জনই পরস্পরের ওপর খেপে আছে।
ববি : মাইকেল মামা ভালো-খারাপ মেশানো মানুষ। তার বিশ্বাস যে তিনি গ্যালাক্সি-৬ পেতে যাচ্ছেন। তিনি একটা চাঁদ ধ্বংস করেছেন। ভাবছেন এস-৬-এর ক্যাপ্টেন নিযুক্ত হতে চলেছেন। মা আমাকে বলেছে, মাইকেল বংশের রক্তধারার স্বভাব অনুযায়ী তিনিও অন্যদের মতোই মনে করেন যে কারো দুটি প্রথম নাম থাকা তার মহত্ত্বকে প্রকাশ করে। এবার আসুন বিল উইলিয়ামসের কথায়। তিনি অনেক তরুণ, পেশায় সফল, মানুষের প্রশংসা পেয়েছেন। তিনি লোক হিসেবে মাইকেল মামার চেয়ে অনেক ভালো। তারও দু’টি প্রথম নাম আছে। এ জন্য মামা তাকে পছন্দ করেন না। যাক, আপনার রেকর্ডার এখন বন্ধ করাই ভালো। সাবধানে লুকিয়ে রাখুন। জ্যানথকের রক্ষীরা যদি তা দেখতে পায় তাহলে আপনার কপালে খারাবি আছে।
জোনাস : আপনার কি মনে হয় ওরা আমাদের হত্যা করার জন্য নিয়ে যাবে?
ববি : হ্যাঁ, মৃত্যু এবং মৃত্যুই আমাদের পরিণতি।
জোনাস : হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন।

মাস্টার অব স্পেসজোনাস হারপার, স্পেস লগ, ০১১, মহাকাশ তারিখ : ৮ ডিসেম্বর।
আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। ববি গিজোউইটজের কথাই ঠিক। মৃত্যু যখন নিশ্চিত সে অবস্থায় জ্যানথক ও কুইনজারের কবল থেকে পালিয়েছি আমরা। রেকর্ডের উদ্দেশ্যে আমাদের পলায়নের বিশদ বিবরণ উল্লেখ করা দরকার।
একটা চেম্বারের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল আমাদের। সেখানেই সবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। দুই শয়তান আমাদের অভিনন্দন জানাল। কুইনজার আলি ও জ্যানথক। স্ক্রিনে নয়, সশরীরে। তারা কখন যেন এসে পৌঁছেছে। ইতোমধ্যে ক্যাপ্টেন মাইকেলকে কুইনজার আলি ও জ্যানথকের সামনে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছে রক্ষীরা। আমরা দাঁড়িয়ে আছি অসহায়ের মত।
কুইনজার আলি : ফেডারেশনের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ ও অন্য সবাই এখন কুইনজার আলির রোষের শিকার। কী বোকা তারা? তারা আমাকে বন্দি করে পাঠিয়েছিল জ্যানথকের কাছে একই কারাগারে। তারা জানে না তারা কী বোকামি করেছিল। এখন তার মাশুল দিচ্ছে। এখন সবার প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হবে। কিন্তু এটা যাতে একটি মিষ্টি ঘটনার মতো হয় সে জন্য কিছু আয়োজন করা হয়েছে। হা! হা!! হা!!!
আমরা বন্দিরা বিস্ময় নিয়ে পরস্পরের দিকে চাইলাম। এ আবার কি নিষ্ঠুর রসিকতা! বয়সে তরুণ ও সাহসী ক্যাপ্টেন উইলিয়ামসের দিকে তাকায় ববি। বলে-
: কিছু করুন ক্যাপ্টেন। মৃত্যু তো ঘনিয়ে এলো।
তরুণ ক্যাপ্টেনের চেহারা থেকে ততক্ষণে সাহস ও বীরত্বের ছাপ মিলিয়ে গিয়ে সে জায়গায় অসহায়ত্ব ও ভীতির ছাপ ফুটে উঠেছে। তিনি আর কোনো দায়িত্ব নিতে সক্ষম বলে মনে হচ্ছে না। তিনি বললেন-
: আমি দুঃখিত। কী করে বুঝব যে এ রকম হবে?
এ সময় ভয়েস বক্সে জ্যানথকের কণ্ঠ শোনা গেল-
: তৈরি হও সবাই। এবার আমার প্রতিশোধ নেয়ার পালা। যে মানুষটি আমাকে গ্রেফতারে বড় ভূমিকা পালন করেছিল সে এখন হাঁটু ভাঁজ করে বসে আছে আমার সামনে। তোমার কিছু বলার আছে পৃথিবীর মানুষ?
আমি প্রতিবাদ করলাম তার কথার। তার রক্ষীরা টেনে হিঁচড়ে আমাদের এখানে এনেছে। শরীরে আঘাত করেছে। গালি দিয়েছে। বিশ্রী ব্যবহার করেছে সাশার সাথেও। সবাইকে অপমানের চূড়ান্ত করেছে। একচুলও সম্মান করেনি তারা আমাদের। এখন চারদিক থেকে সবাইকে ঘিরে রেখেছে। এসব সহ্য করা যায় না। আমি এগুলো আর দেখতে পারছিলাম না।
: আপনি একটা বাজে লোক।
সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে আমার মাথায় আঘাত করল এক রক্ষী। তারপর প্রচণ্ড এক ধাক্কায় ফেলে দিল মেঝেতে। ভীষণ নির্দয় হয়ে উঠল সে। দমাদম লাথি মারছে। কেঁপে কেঁপে উঠছে আমার শরীর। প্রতিটি অস্থিসন্ধিতে তার লাথি এসে পড়ছে। আমার দম ফুরিয়ে যাচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ঠিক সে মুহূর্তেই তাকিয়ে দেখি যে জ্যানথক ও তার রক্ষী দু’জনেই হঠাৎ করে কাঁপতে শুরু করেছে। নিজেদের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হচ্ছে না। আমাকে আর আঘাত করছে না রক্ষীটা।
সে সময় দেখতে পেলাম, জ্যানথকের মেদহীন দেহের সবুজ পায়ের পাশে আমার রেকর্ডিং ডিভাইসটা লাল আলোর রশ্মি ছড়াচ্ছে। আমাকে যখন রক্ষীটা মাথায় আঘাত করে নিচে ফেলে দেয়, তারপর শরীরে দমাদম লাথি মারতে শুরু করে তখনি কিভাবে যেন তা ছিটকে পড়ে গেছে। মনে পড়ল, সাশা বলেছিল যে আমাদের প্রযুক্তির ফ্রিকোয়েন্সি তাদের কাছে চকবোর্ডের ওপর নখের মত। কী ঘটেছে তা লক্ষ করেছে সাশা এবং আমার মতই সেও বুঝে গেল যে ড্রাগিমিয়ানরা নিয়ন্ত্রণ হারাতে যাচ্ছে। পায়ের ওপর লাফিয়ে উঠল সে, মুখে হুংকার ছড়ল- ইয়াহু! তারপর পা ঘুরিয়ে ভীষণ জোরে লাথি কষাল সে এক রক্ষীর পেটে। লোকটি জ্ঞান হারিয়ে ধপাস করে পড়ে যায় মেঝেতে। ববিও এ সময় সক্রিয় হলো। চোখের পলকে মুঠি পাকিয়ে সে ঘুষি মারে এক রক্ষীর চোখে। দু হাতে চোখ ঢেকে বসে পড়ে লোকটা।
পেছনে তাকাতেই দেখলাম, ক্যাপ্টেন মাইকেল কুইনজার আলির সাথে লড়াই শুরু করেছেন। তবে পেরে উঠছেন না তিনি। কারণ তার বয়স হয়েছে, অন্যদিকে কুইনজার আলি যুবক। এ লড়াইতে সুবিধাই হয়েছে তার।
ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস তখনো চুপ করে দাঁড়িয়ে। রাগে চেঁচিয়ে উঠলাম-
: ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস, দাঁড়িয়ে থাকবেন না। যান, ক্যাপ্টেন মাইকেলকে সাহায্য করুন।
হায়! ক্যাপ্টেন যেন ভয়ে পঙ্গু হয়ে গেছে। একবার পা বাড়িয়েও পরক্ষণেই টেনে নেয়। তার চোখে পানি। আমি তার এ অবস্থা দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে সে একজন ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন মাইকেলের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, কিন্তু বিপদের মুহূর্তে তিনি ঠিকই লড়াই শুরু করেছেন। ক্যাপ্টেন উইলিয়ামসের মত অথর্ব নন তিনি।
এ সময় দেখলাম যে জ্যানথক রেকর্ডিং ডিভাইসের দিকে এগোচ্ছে। তবে তার গতি ধীর হওয়ায় ও ইলেকট্রোম্যাগনেটিক সিগন্যাল বুঝতে না পারার কারণে সে জিনিসটা এখনি হাতে পেয়ে যাবে যদি দ্রুত তাকে থামানো না যায়।
ঠিক সে মুহূর্তে সবাইকে চমকে দিয়ে আমাদের মাথার ওপরের বায়ু চলাচলের শ্যাফটটা খুলে গেল। কড়া থেকে খুলে প্রচণ্ড শব্দে মেঝেতে আছড়ে পড়ে শ্যাফটের দরজাটা। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, মেঝেতে লাফিয়ে নামলেন এক রহস্যময় আগন্তুক। সবাই বিস্মিত, স্তম্ভিত। আমি একে একে চাইলাম সবার মুখের দিকে। বুঝতে পারলাম, সবাই তাকে চেনে, শুধু আমিই তাকে জীবনে কখনো দেখিনি। ববি চিৎকার করে বলল-
: দি হ্যান্ড এসেছেন।
আমি সেই কিংবদন্তির খুনির সামনে দাঁড়িয়ে। ক্যাপ্টেনকে রক্ষা করতে আবার তিনি এসেছেন যেমন তিনি এসেছিলেন তিরিশ বছর আগে। অবাক হয়ে চেয়েছিলাম তার দিকে। তাকে দেখে কিংবদন্তির তেমন আভাস পেলাম না। মাথায় বেগুনি লাল ও ক্রিম কালারের হেলমেটের সাথে তার বুক ও কাঁধের কয়েক দশকের পুরনো বর্ম তার দেহরক্ষার উপকরণ। এ সবের নিচে একটি ময়লা রং ফিকে হয়ে আসা একটি টি-শার্ট, কোনো ডিপার্ট স্টোরের লট শেষের জিন্সের প্যান্ট ও স্নিকার। এ বেশে তাকে দেখে এক বয়স্ক শিশু মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আমার মনে হচ্ছিল, আমার পাড়ার সস্তায় জিনিসপত্র বিক্রি করা স্টোর থেকে এসব কিনে এনে কেউ তাকে দিয়েছে। তবে এ রহস্যময় ব্যক্তিটি একজন কালো মানুষ। সমগ্র মহাবিশে^র আর কোনো প্রজাতি পৃথিবীর আফ্রিকান বংশোদ্ভূত এ ব্যক্তির গায়ের রং শেয়ার করে না। হ্যাঁ, ‘দি হ্যান্ড’ একজন পৃথিবীবাসী।
দি হ্যান্ড ও জ্যানথকের মধ্যে লড়াই শুরু হলো। আমরা বোবা দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে সে লড়াই দেখছি। সহসাই বোঝা হয়ে গেল যে দি হ্যান্ডের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ড্রাগিমিয়ান সম্রাটের নেই। দি হ্যান্ডের হাত বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠছে, আর তার প্রচণ্ড ঘুষিগুলো হাতুড়ির মতো আঘাত হানছে জ্যানথকের দেহে। কোনো সুযোগই পাচ্ছে না জ্যানথক পাল্টা আঘাত করার। দি হ্যান্ডের এ সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে উঠলেন ক্যাপ্টেন মাইকেল। লড়াইতে নামলেন তিনিও। তার আক্রমণের গতি আরো দ্রুত, আরো প্রচণ্ড। শরীরের সমস্ত শক্তি তিনি জড়ো করলেন হাতে। তারপর প্রতিপক্ষকে একের পর এক ঘুষি ছুঁড়ে চললেন। খুব দ্রুতই কাবু হয়ে পড়ল কুইনজার আলি।
জ্যানথক ও কুইনজার দু’জনই মাটিতে আশ্রয় নিয়েছে। নড়াচড়ার শক্তিও হারিয়েছে তারা। ‘দি হ্যান্ড’-এর দিকে ফিরলেন ক্যাপ্টেন মাইকেল-
: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, এবারের জয়ের পুরো কৃতিত্বই আপনাকে দেবো।
‘দি হ্যান্ড’ ক্যাপ্টেনের হাতে তার হাত রাখলেন। মুখোশের নিচ থেকে বললেন-
: দরকার নেই। আমি কিংবদন্তি, কিংবদন্তি হয়েই থাকি। আমাকে কেউ দেখতে আসছে না।
সবাই দেখলাম, এক সুন্দর মায়াবী নীল আলো দি হ্যান্ডকে ঘিরে নিলো। তাকে আর দেখা গেল না। তিনি চলে গেছেন।
ততক্ষণে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছেন ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস। দাঁড়ালেন আমাদের কাছে এসে। তাকে বিজয়ীর মত দেখাচ্ছে। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন-
: আমরা পেরেছি। ঐ অশুভ শক্তিকে পরাজিত করতে পেরেছি। আর কোনো ভয় নেই।
সাশা : তাই নাকি হানি! ক্যাপ্টেন উইলিয়ামসের কথা শুনে বেদম হাসছে সে। তা হানি! আপনি কী করলেন এতক্ষণ? আমরা তো দেখলাম আপনি এক পা এগানো আর এক পা পেছানোর খেলা করছিলেন।
ববি : ঠিক বলেছেন। আমি তো তাও একজনকে একটা ঘুষি মেরেছি। আর এ কাপুরুষটা কিছুই করল না। এ একটা আবর্জনা ছাড়া কিছু নয়। কী দরকার এ রকম আবর্জনার? এর জায়গা তো ময়লার ভাগাড়ে।
ববির কথায় আমরা সবাই হেসে উঠলাম। শুধু ক্যাপ্টেন মাইকেল ছাড়া।
: যথেষ্ট হয়েছে, বলে উঠলেন ক্যাপ্টেন মাইকেল। তার সে কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বরে হাসি থেমে যায়, সবাই মনোযোগ দেয় তার দিকে। তিনি বলেন, আমার বয়স যখন ক্যাপ্টেন উইলিয়ামসের মতো ছিল, তখন আমিও মিথা বলেছি। ভুয়া কথা বলেছি সাহস দেখানোর। তার কাপুরুষতা আমার নিজের লজ্জাকর কাজের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সে সব করেও আমি যদি আজ সাহসী ও বিজয়ী ক্যাপ্টেনের তকমা পেতে পারি তাহলে তিনি পারবেন না কেন? আমি মনে করি তার এখনো আশা আছে। আমরা তাকে সহযোগিতা করলে সম্ভাবনাকে বাস্তব করতে পারবেন তিনি।
ক্যাপ্টেন উইলিয়ামসকে দেখে মনে হলো ক্যাপ্টেন মাইকেলের কথা তার মৃতপ্রায় দেহ ও মনে নতুন করে জীবনের সঞ্চার করেছে। চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার। ক্যাপ্টেন মাইকেলের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন-
: সত্যি বলছেন? হ্যাঁ, আমার সামনে সময় আছে, সুযোগও হবে। জানেন, আমার হিরো কিন্তু আপনি। আমি অন্ধের মত আপনাকেই অনুসরণ করেছি। আমি প্রমাণ করব যে আমি আপনাকে অনুসরণ করে ঠিক করেছি। দেখবেন।
: কখনো পিছিয়ে যাবেন না, বললেন ক্যাপ্টেন, আপনার মধ্যে বিরাট একজন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সবচেয়ে বড় কথা আপনার দু’টি প্রথম নাম আছে। সুতরাং বড় কিছু হওয়া আপনার জন্মগত অধিকার।
কুইনজার মেঝেতে পড়ে আছে হাত-পা বাঁধা অবস্থায়। হাহা করে হাসে সে। বলে-
: তোমাদের আমি ছাড়ব না। আমি ঠিকই প্রতিশোধ নেবো। আমার কথা মনে রেখ। গোটা ফেডারেশনকে একদিন আমার সামনে মাথা নত করিয়ে বসিয়ে ছাড়ব।
কুটিল হাসি হাসতে থাকে সে।
তার কথার দিকে মনোযোগ দেয় না কেউ।
আমার মহাকাশ অভিযান শেষ। ক্রায়ো ঘুমে ফিরে যাওয়ার জন্য আমি এখন মহাকাশ স্টেশনে ফিরছি। দীর্ঘ পথ। চুপ করে বসে নানা কথা ভাবছি। ক্যাপ্টেন মাইকেলের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়ে গেছে আমার। সাক্ষী হয়েছি এক ঐতিহাসিক ঘটনার। এ এমন এক ঘটনা যা সহজে ভুলবে না কেউ। ক্যাপ্টেন মাইকেল ড্যানকে নিয়ে লেখা ‘তারা এখন কোথায়?’ নামের এ সাক্ষাৎকারটি লেখা শেষ করে প্রকাশ করতে হবে। সে জন্য তাড়াতাড়ি পৃথিবীতে ফিরতে হবে আমাকে।
আমার টিভি সাক্ষাৎকার পর্বের নাম ‘তারা এখন কোথায়?’ এ প্রশ্নের জবাব খুব সহজ। তারা আছে। এখন মহাবিশ্বকে রক্ষা করছে।

*গ্রেগরি প্যাট্রিক ট্যাভার্সের জন্ম ১৯৮৫ সালে। তিনি কানাডার ভ্যাংকুভার নগরীতে বাস করেন। কিশোরদের জন্য ইন্টারনেটে সায়েন্স ফিকশন লিখে খ্যাতি লাভ করেছেন। ‘মাস্টার অব স্পেস’ নামের এ ছোট উপন্যাসটি ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইন্টারনেটে প্রকাশিত হয়।

SHARE

Leave a Reply