Home ফিচার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ঈদ । মুহাম্মদ নুরুল হুদা

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ঈদ । মুহাম্মদ নুরুল হুদা

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ঈদ । মুহাম্মদ নুরুল হুদাঈদের অর্থ হচ্ছে নতুনকে পাওয়া, আনন্দকে পাওয়া। ঈদের দিন হচ্ছে মানুষে মানুষে মিলনের অঙ্গীকার। ঈদের দিনে আত্মীয়তার একটি বন্ধন নির্মিত হয়। এ আত্মীয়তা হচ্ছে সকলের মধ্যে আত্মীয়তা। আমরা ঈদের দিনে একে অন্যের খুব কাছে আসি। আমরা একে অন্যের সাথে মিলিত হবার চেষ্টা করি। ঈদের জামাতে সকল শ্রেণির লোক, সকল পেশার লোক, সকল অবস্থার লোক একত্রিত হয় এবং পৃথিবীর সকল দেশের মুসলমানের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। আর ঈদ হচ্ছে নব জীবনের উৎসব, জীবনের পরিতৃপ্তি এবং আনন্দের উৎসব।
মুসলমানদের ঈদ-ঐতিহ্য অন্যান্য ধর্মের বিভিন্ন আনন্দ উৎসবের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির একটি বার্তা বহন করে থাকে। ঈদের দিনে কেবল নতুন জামাকাপড়, অলংকার-গহনা পরিধান করা, হালুয়া-সেমাই বা উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করা, কোলাকুলি, পার্ক ভ্রমণ কিংবা আমোদ-প্রমোদের মধ্যে ঈদের উৎসবকে সীমাবদ্ধ করা হলে প্রকৃত ঈদ উৎসবকে সীমাবদ্ধ করা হবে। প্রকৃত ঈদ উদযাপন করা হবে না যতক্ষণ না ফিতরা প্রদানের তাৎপর্য অনুধাবন করা হবে।
পবিত্র রমযান মাস শুরু হবার সাথে সাথে বিভিন্ন স্তরে ঈদের আমেজ শুরু হয়ে যায়। বিশেষত ঈদের বাজারের চমক দেখার মত হয়। রমজান মাসের শেষে কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। ঈদের কেনাকাটা বা বেচাকেনার প্রতিযোগিতা দেখলে মনে হবে এ দেশে গরিব বলে কোন লোক নেই। পক্ষান্তরে জুমাবারের মসজিদগুলোর সামনে, শবেকদরের দিবাগত রাতে, মাজারে, গোরস্থানে, যাকাতের কাপড় বিতরণের কাতারে এবং আরো নানাস্থানে ফকির-মিসকিন, অন্ধ-বধির, খোঁড়া-আতুর, বিকলাঙ্গ, এতিম, অসহায়, দুস্থ, নিরন্ন, অভুক্ত অসংখ্য বিচিত্র ধরনের নারী, শিশু, পুরুষ, যুবক, যুবতীর আর্তনাদ ও হাঁকডাক এবং দলে দলে ভিক্ষুকের পদচারণা লক্ষ করলে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে ঈদ কাদের জন্য। ঈদের এই আনন্দের দিনে অসহায় ও ছিন্নমূল শিশু শ্রমিকরা কি শরিক হতে পারে? সেটাই আজ প্রশ্ন। সমাজের বিত্তবানরা কি তাদের আনন্দে শরিক করে নেয় এসব শিশুশ্রমিককে। এদেশের শিশুশ্রমিকরা সাধারণত বেকারি, কুটির শিল্প, লৌহ শিল্প, চামড়া শিল্প, কাঠ, কাপড় ও জুতা শিল্প, ম্যাচ শিল্প, বাঁধাই খানায়, দোকান এবং গৃহ পরিচারিকার কাজ করে। এছাড়া পানি, ফল বিক্রির কাজও এরা করে থাকে। অসহায় ও ছিন্নমূল শিশুরা সাধারণত নগর এলাকায় হোটেল বয়, হকার, কুলি, জুতা পালিশ, ঠেলা গাড়ি ও রিক্সা চালনা বা ভিক্ষাবৃত্তির কাজ করে। দারিদ্র্যাবস্থা এসব শিশুদের কাজ করতে বাধ্য করে। গ্রামীণ ভূমিহীনদের ছেলেমেয়েরা অধিক পরিমাণে শ্রমে নিযুক্ত হয় এবং এসব শিশু ঘরে বাইরে দুই জায়গায়ই কাজ করে থাকে। গ্রামের ভূমিহীন, কর্মহীন ছিন্নমূল মানুষগুলো বেঁচে থাকার জন্য শহরে ভিড় করে। কাজ ও ভাতের আশায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের শ্রমিক হতে বাধ্য করে।
শহরে শিশুরা কোন কোন ক্ষেত্রে গ্রামের চেয়েও বঞ্চনার শিকার। দোকান, বাসা, এমনকি কারখানার সহযোগী হিসেবে কাজ করে অত্যন্ত অল্প পারিশ্রমিকে। তাদের শ্রমকে যেমন মূল্য দেয়া হয় না, তেমনি মেধা বিকাশে সুযোগও দেয়া হয় না। এদেরকে টোকাই, পথকলি ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। নগর এলাকার এসকল শিশু অসংগঠিত, আধা সংগঠিত এবং সংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করে। অসংগঠিত ক্ষেত্রের অন্যতম শিশু-শ্রমিক হলো গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু এবং এদের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। গৃহকর্মে শিশুরা লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ও মারধরের শিকার হয়। এসব শিশু সারা দিনরাত পরিশ্রম করে এবং ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা অনেক সময় পায় না। অন্যান্য শ্রমিকদের তুলনায় এদের কাজের সময়সীমা অধিক এবং মজুরি নিতান্তই কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এদের ওপর শারীরিক নির্যাতন করে কঠোর পরিশ্রম করতে বাধ্য করা হয় এবং বিনিময়ে উচ্ছিষ্ট খাবার ও খুবই সামান্য মজুরি দেয়া হয়ে থাকে।
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ঈদ । মুহাম্মদ নুরুল হুদাশিশু-শ্রমিকদের ওপর গৃহকর্ত্রীর কর্তৃত্ব বেশি থাকে বলে তার মর্জি ও মানসিকতার ওপরে এদের সব কিছু নির্ভর করে। অনেক সময় শিশু শ্রমিকদের কাছ থেকে কোন জিনিসপত্র ভেঙে গেলে বা নষ্ট হলে তাদের বেতন থেকে কর্তন করার বহু নজির আমরা দেখে থাকি। এদের ওপর অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের বীভৎস চিত্র বিভিন্ন মাধ্যম থেকে পাওয়া যায়। কিশোরকণ্ঠের সোনাবন্ধুরা! তোমরা কি জানো, অনেক সময় গৃহকর্তা-কর্ত্রীদের ঘরে আগত মেহমানদের দ্বারা ক্ষয়ক্ষতি জনিত জিনিসপত্রের দায়দায়িত্ব পড়ে শিশু ভৃত্যটির ওপর। টাকা পয়সা থেকে শুরু করে ঘরে সোনার গহনার ক্ষয়ক্ষতির জন্য এ শিশুকে দোষারোপ করা হয় নানা কৌশলে। বাড়ির সদস্যদের অনুপস্থিতিতে গৃহে তাদের বন্দি জীবনযাপন করতে হয়। অনেক সময় তাদেরকে অনাহারে দিনাতিপাত করতে হয়। বাসা থেকে বের করে দেয়া এমনকি গচ্ছিত টাকা ফেরত না দেয়া ইত্যাদি শাস্তিও তাকে ভোগ করতে হয়। এদের চরম শাস্তি হল শারীরিক নির্যাতন, আগুনে শিক গরম করে দগ্ধ করা, গরম পানি ঢালা, বাথরুমে তালাবদ্ধ অবস্থায় আটকে রাখা এবং শরীরে আঘাত করা। এসব নির্যাতনের অন্যতম কারণ শিশুদের বয়স, যোগ্যতা এবং দক্ষতা কম থাকার কারণে তাদের নিয়োগকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর ভাষার প্রতিবাদ করতে না পারা। শ্রমজীবী শিশু অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভিভাবকদের আর্থিক অসচ্ছলতা এবং জীবন যাপনের নিরাপত্তাহীনতার অভাবের কারণে এসব নীরবে সহ্য করে। গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু শ্রমিকরা বা ছিন্নমূল শিশুরা বিশ্রাম পায় না বললেই চলে। চিত্তবিনোদনের মতো মৌলিক প্রয়োজন থেকে এরা প্রায় সম্পূর্ণই বঞ্চিত। মূলত ছিন্নমূল শিশুরা স্বাধীনসত্তার বিকাশ ঘটাতে পারে না।
ঈদ মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসব। মহা আনন্দের উৎসব। ঈদ একান্তভাবে কোন বাড়ি বা পরিবারের নিজস্ব উৎসব নয়। কোন পাড়া বা মহল্লায় তা সীমাবদ্ধ নয়। এ উৎসব গোটা সমাজের। এদিনটি হলো আপনাকে বিলিয়ে দেবার। সবার সঙ্গে অনাবিল আনন্দ ভাগ করে নেবার। এজন্য ফিতরা দানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঈদের বেশ আগেই বিত্তবানেরা ফিতরা দেবে বিত্তহীন বা সঙ্গতিহীনদের। ঈদের বেশ পূর্ব থেকেই ঈদের বাজার সরগরম থাকে। দোকানপাটে উপচে পড়া ক্রেতার ভিড়। ব্যবসায়ের ধুম। বাজারে বিত্তবানদের আনাগোনা। বিত্তহীন বিশেষ করে অসহায় শিশুশ্রমিক এ বাজারে প্রবেশ করতে পারে না। বর্তমান যুগেও ঈদের আনন্দ এমন হওয়া উচিত যা আমরা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর একটি মাত্র উদাহরণে দেখতে পাই। তিনি যে অসহায় ও ছিন্নমূল শিশুদের কত ভালবাসতেন তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। একবার আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) ঈদের নামাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। হঠাৎ দেখলেন ঈদগাহের এককোণে বসে একটি অসহায় শিশু কাঁদছে। নবীজি তার কাছে গেলেন এবং মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তিনি আদর করে জিজ্ঞেস করলেন কী হয়েছে তোমার? তুমি কাঁদছ কেন? প্রিয় নবীজির আদর পেয়ে অসহায় শিশুটি কান্না থামিয়ে বলল, যুদ্ধে আমার আব্বা মারা গেছেন, আম্মাও বেঁচে নেই। আমি এতিম। এই বলে শিশুটি কাঁদতে লাগল। মহানবী তাকে বুকে টেনে নিলেন এবং তার চোখের পানি মুছে দিলেন। আমাদের প্রিয় নবীজি বললেন আমিও তোমার মতই এতিম। ছেলেবেলায় আমার মাকে হারিয়েছি। আর আব্বাকে তো দেখিই নি। কিশোরকণ্ঠের সোনা বন্ধুরা জানো, নবীজির বুকে মাথা রেখে অসহায় ছিন্নমূল শিশুটি সব দুঃখ ভুলে গেল। এরপর নবীজি শিশুটিকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন এবং বিবি হযরত আয়েশাকে (রা) ডেকে বললেন তোমার জন্য একটি শিশু নিয়ে এসেছি। হযরত আয়েশা (রা) ছেলেটিকে কোলে তুলে নিয়ে গোসল করিয়ে তাকে সুন্দর জামাকাপড় পরালেন। শুধু তাই নয়, কাছে বসিয়ে ভালো ভালো খাবার খাওয়ালেন। আমাদের প্রিয়নবীর মেয়ে হযরত ফাতিমাও (রা) শিশুটিকে পেয়ে খুব আদর করলেন। এতে শিশুটির মনের দুঃখ দূর হয়ে গেল এবং মুখে মধুর হাসি ফুটে উঠলো। এই উদাহরণের পর আমাদের জন্য আর কোনো উদাহরণের দরকারই হয় না।

SHARE

Leave a Reply