Home দেশ-মহাদেশ তাইওয়ান কি স্বাধীন দেশ? । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

তাইওয়ান কি স্বাধীন দেশ? । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

তাইওয়ান কি স্বাধীন দেশ? । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
তাইপের বিশ্ব রেকর্ড একটি আকাশচুম্বী ভবন

তাইওয়ান পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপরাষ্ট্র। সরকারিভাবে বলা হয় চীন প্রজাতন্ত্র (রিপাবলিক অব চায়না- আরওসি) তাইওয়ান প্রণালীর পূর্বে চীনা মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে এর অবস্থান। তাইওয়ান ইউরোপ এশিয়া প্লেট ভূগঠন প্রণালি দ্বারা গঠিত। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পশ্চিমে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন (পিপলস রিপাবলিক অব চায়না- পিআরসি), উত্তর-পূর্বে জাপান এবং দক্ষিণে ফিলিপাইন। তাইওয়ান সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র এবং বড় অর্থনীতির দেশ, যদিও দেশটি জাতিসংঘের সদস্য নয়। তাইওয়ানের রাজধানী তাইপে।

তাইওয়ান কি স্বাধীন দেশ? । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলামসপ্তদশ শতাব্দীর আগে হাজার হাজার বছর ধরে তাইওয়ান দ্বীপে আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করতো। ঐ শতাব্দীতে ওলন্দাজ ঔপনিবেশিকরা দ্বীপটিতে হান সম্প্রদায়ের লোকদের গণবহিরাগমন উন্মুক্ত করে। তুং নিং রাজ্যের সংক্ষিপ্ত শাসনের পর চীনের কিং রাজবংশ ১৬৮৩ সালে দ্বীপটি কুক্ষিগত করে এবং ১৮৯৫ সালে জাপানের অনুকূলে ছেড়ে দেয়। ১৯৪৫ সালে জাপানের আত্মসমর্পণের পর চীন প্রজাতন্ত্র তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। উল্লেখ্য, চীন প্রজাতন্ত্র ১৯১১ সালে কিংদের উৎখাত করে তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। ওদিকে চীনা গৃহযুদ্ধ ফিরে আসার প্রেক্ষাপটে চীনের মূল ভূখণ্ড কমিউনিস্টদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং চীন প্রজাতন্ত্র সরকার ১৯৪৯ সালে তাইওয়ানে চলে আসে। আরওসি সরকার চীনের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করে এলেও ১৯৫০ সাল থেকে এর কার্যকর এখতিয়ার তাইওয়ান ও কয়েকটি ছোট দ্বীপে সীমিত হয়ে পড়ে। ১৯৬০ এর দশকের গোড়ার দিকে তাইওয়ান দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের যুগে প্রবেশ করে। ১৯৮০ এর দশক এবং ১৯৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে দেশটি একদলীয় সামরিক একনায়কত্ব থেকে আধা-প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থাসহ বহুদলীয় গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়।

তাইওয়ান কি স্বাধীন দেশ? । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
রাজধানী তাইপেতে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের বাসভবন

প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে আরওসি জাতিসংঘে চীনের প্রতিনিধিত্ব করতে থাকে, কিন্তু ১৯৭১ সালে পিআরসি জাতিসংঘে আরওসির স্থলাভিষিক্ত হয়। পিআরসি অব্যাহতভাবে তাইওয়ানের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে এবং আরওসিকে স্বীকৃতি দেয় এমন যেকোনো দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে অস্বীকার করে আসছে। চলতি ২০১৯ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ১৭টির সাথে তাইওয়ানের সরকারি সম্পর্ক রয়েছে। যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থায় পিআরসি অংশগ্রহণ করে সেগুলোর বেশির ভাগ হয় তাইওয়ানকে সদস্যপদ দিতে অস্বীকার করছে অথবা অ-রাষ্ট্র পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশগ্রহণ করার পরামর্শ দিচ্ছে। এত কিছু সত্ত্বেও বেশির ভাগ বড় শক্তিধর দেশ প্রতিনিধিত্বশীল কার্যালয়ের মাধ্যমে অথবা কার্যত দূতাবাস বা কনসুলেট হিসেবে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাইওয়ানের সাথে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। তাইওয়ানে প্রধান রাজনৈতিক বিভক্তি হচ্ছে এমন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেগুলোর একাংশ পরিশেষে চীনের সাথে একীভূত হওয়া এবং চীনা পরিচিতি গড়ে তোলার পক্ষপাতী এবং অপর অংশ স্বাধীনতা এবং তাইওয়ানি পরিচিতি বিকাশের পক্ষপাতী। যদিও উভয় পক্ষ তাদের আবেদন প্রচারে উদার অবস্থান বজায় রেখে চলেছে।

তাইওয়ান কি স্বাধীন দেশ? । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
তাইওয়ানের নৌঘঁটিতে একটি ডেস্ট্রয়ার

তাইওয়ানে বর্তমানে একক আধা-প্রেসিডেন্সিয়াল সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এদেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ম্যাডামসাই ইংওয়েন এবং প্রধানমন্ত্রী মি: সু সেং চাং। তাইওয়ানের প্রশাসনিক এলাকা ১৩টি কাউন্টি, ৩টি নগরী ও ৬টি বিশেষ পৌরসভায় বিভক্ত। কাউন্টিগুলো হলো চাং হুয়া, চিয়াইই, সিনচু, হুয়ালিয়েন, কিনমেন, লিয়েনচিয়াং, মিয়াউলি, নানতাউ, পেংহু, পিং তাং, তাইতুং, ঈলান ও ইউনলিন; তিনটি নগরী চিয়াঈ, সিনচু ও কীলাং; ছয়টি বিশেষ পৌরসভা কাওহসিয়াং (নগরী), নিউ তাইপে (নগরী), তাইচুং (নগরী), তাইনান (নগরী), তাইপে (নগরী) ও তাওইউয়ান (নগরী)। এদেশে ১১৩ সদস্যের একটি এক-কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট রয়েছে।

তাইওয়ান কি স্বাধীন দেশ? । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
তাইপের নেইহু প্রযুক্তি পার্ক

তাইওয়ান উচ্চ আয়ের একটি অগ্রসর অর্থনীতি। এর কর্মীবাহিনী অত্যন্ত দক্ষ ও শিক্ষিত। তাইওয়ান বিশ্বে ২২তম বড় অর্থনীতি এবং এর উচ্চ-প্রযুক্তির শিল্প বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাইওয়ানের মুদ্রার নাম নিউ তাইওয়ান ডলার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে দ্বীপপুঞ্জসমূহ প্রজাতন্ত্রী চীনের অধীনে শাসিত হয়। সাধারণত প্রজাতন্ত্রী চীন-শাসিত এলাকা বোঝাতেও ‘তাইওয়ান’ ব্যবহৃত হয়। প্রজাতন্ত্রী চীন প্রশান্ত মহাসাগরের তাইওয়ান দ্বীপ, অর্কিড আইল্যান্ড, গ্রিন আইল্যান্ড শাসন করে থাকে। এছাড়া পিশকাদোরিশ (অর্থাৎ ‘মৎস্যজীবীগণ’), কিনমেন, ফুচিয়েন তীরবর্তী মাৎসু আইল্যান্ড প্রভৃতি দ্বীপও শাসন করে। তাইওয়ান ও ফেংহু দ্বীপপুঞ্জগুলো (তাইপে ও কাওসিউং পৌরসভা বাদে) প্রজাতন্ত্রী চীনের তাইওয়ান প্রদেশ হিসেবে প্রশাসিত হয়।

তাইওয়ান কি স্বাধীন দেশ? । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
নিউ তাইপে

তাইওয়ান দ্বীপের মূল ভূখণ্ড ফরমোজা (পর্তুগিজ ভাষায় ইলিয়া ফরমোজা অর্থাৎ সুন্দরী দ্বীপ) নামেও পরিচিত যা পূর্ব এশিয়ার চীনা মূল-ভূখণ্ড তীরবর্তী অঞ্চল এবং জাপানের মূল-ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। জাপানের রিউকি দ্বীপপুঞ্জের ঠিক পশ্চিমেই তাইওয়ান দ্বীপের অবস্থান। এর পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণে দক্ষিণ চীনসাগর ও লুজনখাড়ি, পশ্চিমে তাইওয়ান খাড়ি এবং পূর্বে পূর্ব চীনসাগর অবস্থিত। দ্বীপটি ৩৯৪ কিলোমিটার (২৪৫ মাইল) দীর্ঘ এবং ১৪৪ কিলোমিটার (৮৯ মাইল) প্রশস্ত। এখানে কাড়া পর্বত ও ট্রপিকাল বন রয়েছে।

তাইওয়ান কি স্বাধীন দেশ? । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
তাইওয়ানের এই উচ্চগতিশীল ট্রেন ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটার গতিতে চলে

বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে তাইওয়ান অন্যতম এবং এদেশের অধিকাংশ মানুষ শহরে বাস করে। জনসংখ্যার বেশির ভাগ পশ্চিম উপকূলে বাস করে। তাইওয়ানের আয়তন ৩৬ হাজার ১৯৭ বর্গকিলোমিটার (১৩,৯৭৬ বর্গমাইল) এবং লোকসংখ্যা ২ কোটি ৩৫ লাখ ৭৭ হাজার ২৭১ জন। জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ৯৫ শতাংশ হান (৭০% হোকলো, ১৩% হাক্কা, ১২% ১৯৪৯ সালের বহিরাগত), ৩% নতুন বহিরাগত এবং ২% আদিবাসী। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে ফক ধর্মের অনুসারী (৪৩.৮%), বৌদ্ধ (২১.২%), অসম্বন্ধ (১৩.৭%), খ্রিষ্টান (৫.৮%) এবং অন্যান্য ১৫.৫%)। সপ্তদশ শতাব্দীর পর থেকে তাইওয়ানে একটি মুসলিম হুই সম্প্রদায়ও রয়েছে।
এদেশের প্রধান ভাষা ম্যান্ডারিন এবং উপভাষা তাইওয়ানি (মিননান উপভাষা), হাক্কা ইত্যাদি। উচ্চপ্রযুক্তি, উষ্ণমণ্ডলীয় কৃষিজাতপণ্য প্রভৃতি রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় করে তাইওয়ান। ন্যানো প্রযুক্তি, অপ্টোইলেকট্রনিক, পর্যটন প্রমুখ শিল্প তাইওয়ানের উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

তাইওয়ান কি স্বাধীন দেশ? । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
ইলান কাউন্টির একটি ধানক্ষেত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গণচীনের জাপানি হামলা প্রতিরোধ যুদ্ধকালে চীনের কুওমিন তাং পার্টি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জাপানের আগ্রাসনবিরোধী জাতীয় যুক্তফ্রন্ট গড়ে তুলে জাপানি সাম্রাজ্যবাদীদের আক্রমণ প্রতিরোধ করে। জাপান-বিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধটি জয়যুক্ত হবার পর চিয়াং কাইশেকের নেতৃত্বাধীন কুওমিন তাং গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট হয়ে সারা দেশজুড়ে গৃহযুদ্ধ বাধায়। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে চীনা জনগণ তিন বছরের বেশি সময় মুক্তিযুদ্ধ চালায়। তখনকার কুওমিন তাং গোষ্ঠীর অনুসৃত গণবিরোধী নীতির দরুন সারা দেশের বিভিন্ন জাতির জনগণ এই গোষ্ঠীকে ঘৃণা করে, ফলে কুওমিন তাং পার্টির ‘চীন প্রজাতন্ত্র’ (রিপাবলিক অব চায়না) সরকার উৎখাত করা হয়। ১৯৪৯ সালের ১লা অক্টোবর চীন গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তা চীনের একমাত্র বৈধ সরকার হয়ে দাঁড়ায়। কুওমিন তাং গোষ্ঠীর কিছু সৈন্যবাহিনী এবং সরকারি কর্মকর্তা সরে গিয়ে তাইওয়ান আঁকড়ে ধরে বসে। তারা তখনকার মার্কিন সরকারের সমর্থনে তাইওয়ান প্রণালির দু’তীরের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেন।
তাইওয়ান কি চীনের অংশ নাকি স্বাধীন?- এ নিয়ে সংশয় আছে অনেকের মধ্যে। এমনকি তাইওয়ানকে কি নামে ডাকা হবে তা নিয়েও। চীন আর তাইওয়ানের নেতারা দীর্ঘ ছয় দশক পর প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসার পর এসব প্রশ্ন আবার সামনে আসে। চীন মনে করে তাইওয়ান তাদের দেশেরই অংশ। এটি চীন থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটি প্রদেশ। যেটি ভবিষ্যতে কোন একদিন চীনের সঙ্গে বিলুপ্ত হবে।
তাইওয়ান নিজেকে কিভাবে দেখে সেটার উত্তর অবশ্য এতটা সরল নয়। সেখানে কোন কোন দল এবং জনগণের একটি অংশ তাইওয়ানকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে দেখতে চান। কেউ কেউ চীনের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পক্ষে। আর জনগণের একটা বিরাট অংশ এখনো মনস্থির করে উঠতে পারেননি। তারা বরং তাইওয়ান এখন যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থাতেই থেকে যাওয়ার পক্ষে। অর্থাৎ চীনেরও অংশ নয়, আবার চীন থেকে আলাদাও নয়।

বিচ্ছিন্নতার ইতিহাস
চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন তাইওয়ান মূলত দক্ষিণ চীন সমুদ্রের একটি দ্বীপ। এক সময় ওলন্দাজ উপনিবেশ ছিল। তবে ১৬৮৩ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত চীনের রাজারাই শাসন করেছে তাইওয়ান। এরপর জাপানিরা দখল করেছে এই দ্বীপ। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়া হয় চিয়াং কাইশেকের নেতৃত্বাধীন চীনা সরকারের হাতে।
কিন্তু চীনে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে হারতে থাকে চিয়াং কাইশেকের সরকার। চীনের বেশির ভাগ অংশের নিয়ন্ত্রণ হারায় তারা। এরপর চিয়াং কাইশেক আর তার কুওমিন টাং সরকারের লোকজন তখন পালিয়ে যায় তাইওয়ানে। সেখানে তারা ‘রিপাবলিক অব চায়না’ নামে সরকার গঠন করে। নিজেদেরকে সমগ্র চীনের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার বলেও দাবি করে তারা। কোন একদিন কমিউনিস্টদের কাছ থেকে আবার পুরো চীনের নিয়ন্ত্রণ তারা নেবে, এমনটাই ছিল তাদের পরিকল্পনা।

তাইওয়ান কি স্বাধীন দেশ? । মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
তাইওয়ানের দাবাজিয়ান পর্বত

বহুদিন পর্যন্ত জাতিসংঘ থেকে বিশ্বের অনেক দেশ চিয়াং কাইশেকের সরকারকেই চীনের সত্যিকারের সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তাইওয়ানের সরকারই চীনের প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ বেইজিংয়ের সরকারকেই চীনের আসল সরকার বলে স্বীকৃতি দেয়। তারপর থেকে একে একে বিশ্বের প্রায় সব দেশই বেইজিংয়ের পক্ষ নেয় এবং তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কমতে থাকে।
১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত চীন আর তাইওয়ানের মধ্যে চলে তীব্র বাকযুদ্ধ। কিন্তু এরপর সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ‘এক দেশ, দুই পদ্ধতি’ নামে চীন এক প্রস্তাব দেয়। যেখানে তাইওয়ান মূল চীনে বিলুপ্ত হবে এবং তাদের স্বায়ত্তশাসন দেয়া হবে। কিন্তু তাইওয়ান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। অবশ্য এর মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকেনি।
২০০০ সালে তাইওয়ানের নুতন প্রেসিডেন্ট হন চেন শুইবিয়ান। ২০০৪ সালে তিনি ঘোষণা দেন যে তাইওয়ান চীন থেকে আলাদা হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়। তার এই অবস্থান চীনকে ভীষণ রুষ্ট করে। ২০০৫ সালে চীন তড়িঘড়ি করে এক আইন পাস করে। যাতে বলা হয়, তাইওয়ান যদি চীন থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা করে, সেটা ঠেকাতে চীন প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করবে। তাইওয়ানের অর্থনীতি এখন চীনের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে জনসংখ্যার একটা বড় অংশ এখন আর স্বাধীনতাকে কোন বাস্তবসম্মত বিকল্প বলে ভাবে না।
তাইওয়ানের বড় দুই দলের মধ্যে ‘ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি’ এখনো অবশ্য স্বাধীনতার পক্ষে। অন্য দিকে কুওমিন টাং পার্টি (কেএমটি) চায় মূল চীনের সঙ্গে একত্রীকরণ।
বাংলাদেশ এবং তাইওয়ানের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রকার সম্পর্ক নেই। ১৯৭৫ সালের ৪ই অক্টোবর, বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে স্বীকৃতি দেয় এবং তাইওয়ানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব ২৭৫৮-এ বাংলাদেশ পিআরসি দ্বারা আরওসির প্রতিস্থাপনকেও সমর্থন দেয়। বাংলাদেশ বিষয়ক সকল কিছু এখন যৌথভাবে নয়াদিল্লিতে অবস্থিত তাইপেই ইকোনোমিক অ্যান্ড কালচারাল সেন্টার ইন ইন্ডিয়া এবং ব্যাংককে অবস্থিত তাইপেই ইকোনোমিক অ্যান্ড কালচারাল সেন্টার ইন থাইল্যান্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
সম্প্রতি (২ জানুয়ারি, ২০১৯) চীনের প্রেসিডেন্ট শিজিন পিং পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, তাইওয়ান খুব শিগগিরই চীনের সাথে পুনরায় একীভূত হয়ে যাবে। মূলত তাইওয়ান চীনেরই একটি অংশ এবং এ সত্য কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ মনে করলেও তাইওয়ান কিন্তু নিজেদেরকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবেই বিবেচনা করে। সেই ১৯৫০ সাল থেকেই তাইওয়ান একটি স্বাধীন দেশের ন্যায় ব্যবহার করে আসছে এবং নতুন বছরের শুরুর দিনই দেশটির প্রেসিডেন্ট ম্যাডামসাই ইং-ওয়েন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বেইজিংকে অবশ্যই তাইওয়ানের অস্তিত্ব মেনে নিয়ে, সকল বিবাদ মিটিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সৃষ্টি করতে হবে

SHARE

Leave a Reply