Home গল্প বাবার স্বপ্ন । জাহাঙ্গীর আলম

বাবার স্বপ্ন । জাহাঙ্গীর আলম

বাবার স্বপ্ন । জাহাঙ্গীর আলমগোলাম মোস্তফা একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। ভুরুঙ্গামারী শহরে জামতলায় তার বাসা ও হার্ডওয়ারের দোকান। তার দুটি ছেলে সিহাব ও সিয়াম। গোলাম মোস্তফার অনেক স্বপ্ন ছিল সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবে। বড় ছেলে সিহাব ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ে লেখাপড়া বাদ দিয়ে বাবার ব্যবসার কাজে লেগে যায়। গোলাম মোস্তফার স্বপ্ন ভেঙে গেল এবং সিহাব অল্প বয়সে বিয়ে করে সুন্দরভাবে সংসার করছে। সিহাবের একটা কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। গোলাম মোস্তফা সুন্দর একটা নাতনী পেয়ে খুবই আনন্দিত ও অনুপ্রাণিত। এ দিকে সিয়াম বড় হতে লাগে। গোলাম মোস্তফার অতি আদরের সন্তান সিয়ামকে পড়ালেখার জন্য কোথাও যেতে দেয় না। বাড়িতেই চারটা শিক্ষক রেখে দিয়েছে। ভালো করে লেখাপড়া করার জন্য।
গোলাম মোস্তফার কথা- আমার যত টাকা লাগে লাগুক আমি আমার ছোট্ট ছেলেকে লেখাপড়া করাবই ইনশাআল্লাহ। বড় ছেলে সিহাবকে একটা দামি প্রাইভেট কার কিনে দিয়েছে। সিয়াম ছোট তাই এখনো তাকে গাড়ি কিনে দেয়নি। সিয়াম এবার ক্লাস নাইনে পড়ে। তার বাবা গোলাম মোস্তফা বলেছে, বাবা তুমি ভালো করে পড়াশুনা করো। তোমার এসএসসি পরীক্ষা দেয়া শেষ হলেই আমি তোমাকেও একটা নতুন মডেলের সিএস গাড়ি কিনে দিবো। তবে তোমাকে ভালো করে লেখাপড়া ও অনেক ভালো রেজাল্ট করতে হবে বাবা। তোমার কোন কাজ নেই, তুমি শুধু খাবে আর পড়াশুনা করবে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ২০১৮ সালের সিএস গাড়ির নতুন মডেল বাংলাদেশে এসেছে তার ছবি বের হয়েছে। গোলাম মোস্তফা সেই পত্রিকা নিয়ে সিয়ামকে দেখিয়ে বলছে বাবা এ দিকে এসো এই দেখো আমি তোমাকে যে গাড়ি কিনে দিতে চেয়েছি সেই গাড়ির ফটো দিয়েছে। সিয়াম গাড়ির ছবি দেখে খুশিতে আত্মহারা। সিয়াম যতড়ব করে সেই পত্রিকার গাড়ির ছবিটা কেটে রেখে দেয়। গোলাম মোস্তফা সিয়ামের চারটি স্যারকে সিয়ামের সামনে অগ্রিম দাওয়াত বার্তা দিয়ে বলে স্যার আপনার ছাত্রকে ২০২১ সালের এপ্রিল মাসের ২০ তারিখে নতুন মডেলের সিএস গাড়ি কিনে দিবো এবং সেই গাড়িতে চড়ে আমরা সবাই কক্সবাজার বেড়াতে যাব। আপনাদেরকেও যেতে হবে। আপনারা যে যেখানে থাকেন না কেন অবশ্যই যেতে হবে শুধু তাই নয়, আপনাদের বাড়িওয়ালিকেও সাথে নিবেন। সিহাবের গাড়ি ও সিয়ামের নতুন সিএস গাড়িতে করে সবাই মজা করে কক্সবাজার ঘুরতে যাবো ইনশাআল্লাহ।
বাবার স্বপ্ন । জাহাঙ্গীর আলমগোলাম মোস্তফার মনে স্বপ্ন আমার বড় ছেলে তেমন পড়াশুনা করলো না। আমার আদরের ছোট ছেলে সিয়ামকে মাদ্রাসায় দিলাম। কিন্তু ছেলেটা যে কেমন হলো শুধু পড়াশুনা করে আর ঘুমায়। কোনদিন নামাজও পড়তে দেখি না মধুর সুরে কুরআন তেলাওয়াত করতেও দেখি না। ছেলেকে মাদ্রাসায় দিলাম অন্ততপক্ষে আমি যেদিন মারা যাবো সেদিন আমার জানাজা তো পড়াতে পারবে। কিন্তু কিভাবে পড়াবে। সেতো নামাজও পড়ে না কুরআনও পড়ে না। গোলাম মোস্তফার মনে শান্তি নাই। সিয়াম নামাজ পড়বে কুরআন পড়বে আমাদের কুরআন থেকে ভালো ভালো কথা শুনাবে। কিন্তু কই একটি দিনও তো শুনালো না।
গোলাম মোস্তফা নিয়মিত ব্যবসার কাজ শেষে অনেক রাতে এসে ঘুমায়। হঠাৎ করে একদিন ফজর নামাজের পরে সকালবেলা পাশের রুমে মিষ্টি মধুর সুরে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত কানে পড়ে। গোলাম মোস্তফার ঘুম ভেঙে গেল। কে এতো সকালে টিভি জুড়াল। তাও আবার কুরআন তেলাওয়াত। কিন্তু কই টিভি তো বন্ধ এই বলে আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে দেখে সিয়াম তার রুমে মধুর সুরে কুরআন তেলাওয়াত করছে। দেখে গোলাম মোস্তফার হৃদয় জুড়িয়ে গেল। ওদিকে সিয়ামের মা ও দাদু সবাই মিলে দরজার কাছে এসে মুগ্ধ মনে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত শুনছে। কেউ কাউকে কিছুই বলছে না। সিয়াম কুরআন তেলাওয়াত শেষে দু’হাত তুলে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করছে, হে আল্লাহ আমি জীবনে অনেক গুনাহ করেছি। আমি জেনে শুনেও নামাজ ছেড়ে দিয়েছি। কুরআন পড়া জেনেও কোনদিন কুরআন তেলাওয়াত করিনি। আমার প্রাণপ্রিয় মা ও বাবা আমার জন্য কতো কষ্ট করেছেন। আমি তাদের জন্য কোন কিছুই করতে পারিনি। হে আল্লাহ্ তুমি আমার মা ও বাবাকে হেদায়েত নসিব করুন। আমাকে মা-বাবার খেদমত করার তাওফিক দান করুন। আমাকে আজ থেকে নিয়মিত নামাজ ও কুরআন তেলাওয়াত করার তাওফিক দান করুন। আমিন। গোলাম মোস্তফার মনে তৃপ্তি ও আনন্দের ছোঁয়ার শেষ নেই। গোলাম মোস্তফা সিয়ামকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলছে বাবা তুমি আমা মনের স্বপ্ন পূরণ করেছ। তুমি আজ হঠাৎ এমন পরিবর্তন কেমনে হলে বাবা? সিমায় বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, বাবা আমি জীবনে অনেক ভুল করেছি আজ রাতে স্বপ্নে দেখি তুমি মরে গেছো, তোমাকে নিয়ে মা কাঁদছে, দাদু কাঁদছে সবাই কাঁদছে। কান্নার শেষ নেই। কিন্তু তোমাকে জানাজা পড়ানোর মতো কোন হুজুর খুঁজে পাচ্ছি না। তখন আমার মনে পড়ে গেল আমার বাবা বলেছে সিয়াম অন্ততপক্ষে আমার জানাজা তো পড়াতে পারবে। আমি সেই কথা মনে করে আরো বেশি করে কাঁদছি। একটু পরে হঠাৎ জেগে দেখি আমি আমার বিছানায়। আমি ঘুম থেকে উঠলাম এবং ফ্রেশ হলাম। ওজু করে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়লাম। একটু পরে ফজরের আজান হলো। মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে বাসায় এসে কুরআন পড়লাম। আর মনে মনে শপথ করি আল্লাহর কাছে আমি আজ থেকে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বো। কুরআন তেলাওয়াত করবো। আল্লাহ্ তায়ালার সকল বিধান মেনে চলবো। গোলাম মোস্তফা সিয়ামের কথা শুনে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে আলহামদুলিল্লাহ্। আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আজ আমি অতি আনন্দিত ও অনুপ্রাণিত। বাবা আমার জন্য দোয়া করবেন আমি যেন আল্লাহ তায়ালার সকল বিধান মেনে চলতে পারি ও সঠিকভাবে লেখাপড়া করতে পারি। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে নতুন সিএস গাড়ি যেন কিনতে পারি। আল্লাহ তায়ালা আমাকে ও তোমাকে স্বপ্ন পূরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তুমি অনেক বড়ো হও বাবা আমি সর্বদাই এই কামনা করি।

SHARE

Leave a Reply