Home চিত্র-বিচিত্র যে পাখির আকাশে নিবাস । রিয়াজুল ইসলাম

যে পাখির আকাশে নিবাস । রিয়াজুল ইসলাম

যে পাখির আকাশে নিবাস । রিয়াজুল ইসলামপাখি আকাশে উড়বে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু কতক্ষণ পর্যন্ত! কোনো ধরনের বিরতি ছাড়াই টানা দীর্ঘ মাসধরে সুইফট পাখির অস্বাভাবিক আকাশে উড়ার বিষয়টি অবাক করেছে বিজ্ঞানীদের। গবেষণা করে জানা গেছে মাঝারি আকৃতির পরিযায়ী পাখি কমন সুইফট কোনো ধরনের বিরতি ছাড়াই যতটা সময় ধরে আকাশে উড়তে পারে, সেটা পৃথিবীর আর কোনো পাখি পারে না। তাই কমন সুইফট পাখির আকাশে উড়ে থাকার বিষয়টিকে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর প্রাকৃতিক দীর্ঘতম ভ্রমণ রেকর্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইউরোপের অত্যন্ত পরিচিত পাখি কমন সুইফট বার্ড।
মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের পাহাড়ের সুউচ্চ আবদ্ধ গুহায় সুইফট পাখির আদিনিবাস। এই পাখি দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের ফিঙে পাখির মতো। ক্ষিপ্রগতির জন্য এই পাখিটির খ্যাতি রয়েছে।
সম্প্রতি জানা যায়, বছরে টানা ১০ মাস এই পাখি আকাশে উড়তে পারে। সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ১৯টি সুইফট কমনবার্ডের ওপর এই গবেষণা চালান। সুসান আকেসন ও তাঁর স্বামী অ্যান্ডার্স হ্যাডেনস্ট্রম ১৯টি কমন সুইফটের গায়ে ২০১৩ সালে খুব হালকা যন্ত্র লাগিয়ে দেন। সেগুলো তথ্য সংগ্রাহক যন্ত্র। দুই বছর পর পাখিগুলোকে ধরে তাঁরা পেয়ে গেলেন এদের ওড়ার সময়কার নানা তথ্য। যেমন স্থানীয় আলোর মাত্রার নিয়মিত রেকর্ড। আর তা থেকে জানতে পারলেন, পাখিগুলো কখন কোথায় ছিল। পাশাপাশি এদের ওড়ার গতি, কার্যক্রম এবং শারীরিক অবস্থানের তথ্য সংগ্রহ করে গবেষকদম্পতি জানতে পারলেন, এরা নির্দিষ্ট সময় উড়ছিল নাকি বিশ্রামে ছিল।
যে পাখির আকাশে নিবাস । রিয়াজুল ইসলামগবেষণায় দেখা গেছে, সুইফট ১০ মাসের লম্বা যাত্রার প্রায় ৯৯.৫ শতাংশ সময়ই এরা আকাশে উড়েছে। খুব অল্প সময়ের জন্য বিশ্রাম নিয়েছে। আবার কিছু কমন সুইফট পাখির ক্ষেত্রে দেখা গেছে ১০ মাসে তারা কখনোই বিশ্রাম নেয়নি, ভূমি স্পর্শ করেনি। দিনের তুলনায় এদের রাতেই বেশি পথ অতিক্রম করতে দেখা গেছে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে কমন সুইফট বার্ড কিভাবে ঘুমায়। গবেষকরা দেখেছেন এটি উষ্ণ বাতাসের প্রবাহে ওড়ে নিজের শক্তি সঞ্চয় করে এবং খুব উঁচু থেকে ধীরে ধীরে নিচে নামার সময় হালকা ঘুমিয়ে নেয়।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অন্যান্য পাখি দীর্ঘ সময় ধরে আকাশে উড়লেও এই কমন সুইফট পাখিগুলো নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। এখন পর্যন্ত দীর্ঘ সময় যাবৎ আকাশে ওড়ার রেকর্ডটি ছিল এ্যালপাইন সুইফট পাখির দখলে। এই পাখিগুলো একটানা ছয় মাস আকাশে উড়তে পারে। তবে এই রেকর্ডটি বর্তমানে কমন সুইফট পাখির দখলে চলে গেল।
যে পাখির আকাশে নিবাস । রিয়াজুল ইসলামবিশেষজ্ঞদের মতে, এটি খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার যে পাখিগুলো ১০ মাস আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় থাকে মাটি স্পর্শ করার কোন প্রকার প্রয়োজন ছাড়াই। বেশির ভাগ সময় ওড়ার পেছনে শক্তি ব্যবহার করার ফলে পাখিদের আয়ু কমে আসে। কিন্তু এই পাখিগুলোর ক্ষেত্রে এ কথা পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ এই পাখিগুলো প্রায় ২০ বছর বেঁচে থাকে। কমন সুইফট পাখি প্রতি জুলাইয়ে দলবেঁধে ইউরোপ ছেড়ে পাড়ি জমায় আফ্রিকার পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে। ফিরে আসে একেবারে পরের জুন মাসে। এই সময়ের মধ্যে ১০ মাস ধরে তারা প্রায় একটানা উড়ে চলে। তারা আফ্রিকায় গেলেও হয়তো সেখানকার মাটিতে একবারও পা রাখে না।
সুইডেনের ল্যান্ড ইউনিভার্সিটির সুসান আকেসন জানিয়েছেন, মাঝারি আকারের এই পাখিরা উড়ন্ত অবস্থায়ই খায় এবং যাবতীয় কাজ সেরে নিতে পারে। তারা কোনো গাছের ডালে, বা বাড়ির ছাদে অথবা অন্য কোথাও নামতে পারে, কিন্তু ভূমিতে নয়। কারণ, কমন সুইফটের ডানা অনেক বেশি লম্বা আর পা-জোড়া খুব ছোট। পায়ের আকৃতি এত ছোট বলেই এরা সমতল থেকে উড়াল দিতে পারে না। ফলে পাখিটি প্রকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী আকাশচারী প্রাণীগুলোর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। দীর্ঘদিন একটানা আকাশে কাটিয়ে দেওয়ার অসাধারণ সামর্থ্যই এদের অনন্যতা দিয়েছে। সুইফট পাখি মানুষের অনেক উপকারে আসে। ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের উত্তরের ছোট্ট বন্দরনগর কুমাই। একটি ছোট পাখির কারণে উন্নতি যেন উপচে পড়ছে ওই শহরে। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী এই পাখি তার গতির মতোই দ্রুত বদলে দিয়েছে ওই শহরের অর্থনৈতিক অবস্থা।
সুইফট পাখির বাসা দিয়ে খুব সুস্বাদু এক স্যুপ তৈরি হয়, যে স্যুপে রসনার স্বাদ মেটাতে দূর-দূরান্ত থেকে ভোজনরসিকদের আগমন ঘটে ওই শহরে।
কুমাই শহরজুড়ে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অনেক ভবন। এসব ভবনে কোনো জানালা নেই। একেকটি ভবনের মাথায় রয়েছে উঁচু স্তম্ভ। এসব স্তম্ভের গা-জুড়ে ছোট ছোট ফোকর। এসব ফোকরে বাসা বাঁধে পাখিগুলো। এভাবে প্রতিটি ভবন যেন হয়ে উঠেছে সুইফট পাখির কারখানা।
কুমাইয়ে বাস করে হাতেগোনা হাজার বিশেক মানুষ। তাদের তুলনায় সেখানে এখন সুইফট পাখির সংখ্যা ১০ গুণেরও বেশি, অর্থাৎ দুই লাখের ওপরে। সুইফট পাখি নিজের লালা দিয়ে বাসা তৈরি করে। ওই বাসা দিয়েই তৈরি হয় স্যুপ। ঐতিহ্যবাহী চীনা খাবারের তালিকায় রয়েছে এই স্যুপ। বলা হয়ে থাকে অনেক চীনা নারী এটি খুব পছন্দ করেন। স্বচ্ছ জেলির মতো দেখতে এই পাখির বাসার স্যুপ তারুণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় কোলাজেন প্রোটিন তৈরিতে সহায়তা করে এটি।
বিশ্বজুড়ে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সুইফট পাখির বাসার দাম অনেক বেড়ে গেছে। ১৯৯০-এর দশকেও প্রতি কেজি বাসা (এক কেজিতে প্রায় ১২০টি) বিক্রি হয়েছে ৪০০ মার্কিন ডলারে। সেখানে এখন প্রতি কেজির দাম প্রায় তিন হাজার ডলার।
এভাবেই সুইফট পাখি বিরামহীনভাবে আকাশে উড়েও মানুষকে সহায়তা করে যাচ্ছে। তবে একটানা দশ মাস আকাশে ওড়ার এমন নজিরবিহীন ঘটনা সত্যিই আমাদের চমকিত করেছে।

SHARE

Leave a Reply