Home গল্প অন্য রকম গল্প । আহসান হাবিব বুলবুল

অন্য রকম গল্প । আহসান হাবিব বুলবুল

অন্য রকম গল্প । আহসান হাবিব বুলবুলগাজীপুর জেলার ধীরাশ্রম গ্রাম।
পাশ দিয়ে চলে গেছে সিটি করপোরেশনের পাকা রাস্তা।
জায়গাটা উন্নয়নশীল। নগরায়ণ হচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে গড়ে উঠছে শিল্প-কারখানা। রাস্তার একপাশে ইটভাঙার শ্রমিকরা কাজ করছেন। এই সাতসকালে খট্ খট্ শব্দ
চারদিকের নীরবতা ভাঙছে। আজ চৈত্রের কত তারিখ নয়ন তা জানে না। তবে সকালটা তেতেছে তা খুব আঁচ করতে পারে।
: মা! ছাতাটা টাঙ্গায়্যা দাও। সকাল বেলাতেই সূর্যির তেজটা কেমুন দ্যাখছ।
: হ বাবা দিতাছি।
সাবিহা খাতুন একটি লম্বা লাঠির সাথে ছাতাটা বেঁধে সূর্যের দিকে মুখ করে টাঙিয়ে দেয়। একটা শীতল ছায়া নয়নের কপালে এসে পড়ে। নয়নের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। বাঁ হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে, ছাতার দিকে এক নজর তাকিয়ে নয়ন আবার ইটের ওপর হাতুড়ির খট্ খট্ শব্দ তোলে। মায়ের সাথে ইট ভাঙার কাজটা নয়ন এখনও রপ্ত করে উঠতে পারেনি। কচি হাতের আঘাতে ইটের দু’একটি টুকরা ওকে কখনও কখনও পাল্টা আঘাত করে বসে। তাতে ‘ও’ বিচলিত হয় না। ‘ও’ জানে এ থেকেও মায়ের মনের আঘাত অনেক বেশি। একটু অন্যমনস্ক হতেই হাতুড়ির একটা আঘাত সজোরে বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির ওপর এসে পড়ে।
‘উহ্ মা গো মরছি!’- আর্তনাদটা দিগন্তে না মিলাতেই একটা লাল রঙের সুবারু গাড়ি ওদের সামনে এসে থামে। ভেতর থেকে একজন ভদ্রলোক বেরিয়ে আসেন।
: একি! ছেলেটির আঙুল কেটে রক্ত ঝরছে, আর তুমি মা হয়ে দেখছ!
: ভদ্রলোকের কথায় সাবিহা খাতুনের সম্বিত ফেরে।
অন্য রকম গল্প । আহসান হাবিব বুলবুলমা কাঁদতে শুরু করে-হায় ! হায়! আমার পোলাডা শেষ হইয়া গ্যাল। নয়ন হাতটা উঁচু করে ধরে আছে। টপ্ টপ্ করে রক্ত ঝরে পড়ছে কালো পাথরের ওপর। মা শাড়ির আঁচলের কিছুটা ছিঁড়ে নয়নের হাতটা বেঁধে দেয়। ভদ্রলোক মা ও ছেলেকে গাড়িতে তুলে নিয়ে রওনা দেন হাসপাতালের দিকে।
ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তিনি তার জীবনের গল্প বলেছেন। অনুরোধ করেছেন আমি যেন তার নাম প্রকাশ না করি। আমি তার অনুরোধ রাখবো। এসো আমরা তার একটা ছদ্মনাম দেই; ‘আকাশ’। আকাশ সাহেব তখন খুব ছোট। এক রাতে তার বাবা ব্রেন স্ট্রোক করে মারা গেলেন। চল্লিশ দিন না যেতেই চাচারা বললেন, এ বাড়িতে তোমাদের কোনো অধিকার নেই। মায়ের মাথায় তখন বাজ ভেঙে পড়লো।
অথচ বাবা তার ছোট ভাইদের নিয়ে একটি ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। সেই আয়ে তাদের পরিবার চলতো স্বাচ্ছন্দ্যে। বাবার অবর্তমানে চাচাদের সংসারে ঠাঁই হলো না তাদের। নিরুপায়-অসহায় মা শিশু আকাশকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন অজানার উদ্দেশ্যে। দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে তাদের আশ্রয় মিললো। এর পরের কাহিনী অনেক বেদনার, অনেক বঞ্চনার। সেসব কথা নাই বা বললাম।
তবে একটি ঘটনা না বললেই নয়, আকাশের মা প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে। কোলে বাচ্চা দেখে কেউ কাজ দিতে চায় না। সবাই কোলের বাচ্চার দিকে তাকিয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায়। এটা তার সম্মানে লাগে। তার মন সায় দেয় না এভাবে জীবন ধারণ করতে। তিনি মনঃস্থির করেন বাচ্চাকে বাড়িতে রেখেই কাজে বেরুবেন। কিন্তু কে বাচ্চা দেখবে, কে সামলাবে তার শিশু বাচ্চাকে। ভাবেন, আশ্রয়দাতার এক মেয়ে রয়েছে কিশোরী বয়সের। ওকে বলে দেখবেন।
সত্যি সত্যি একদিন তাই হলো। কিশোরী মেয়েটি তার বাচ্চা দেখতে রাজি হলো। আকাশের মা আকাশকে খাওয়ায়ে ঘুম পাড়িয়ে সকাল সকাল কাজে বেরিয়ে পড়লেন। ঘণ্টা দুই পরই শিশু আকাশ ঘুম থেকে জেগে উঠলো। মাকে না দেখে জুড়ে দিলো ভীষণ কান্না। কিশোরী মেয়েটি অনেক চেষ্টা করেও সে কান্না থামাতে পারছিল না। বাড়ির অন্যরাও অনেক চেষ্টা করলো। কিছুতেই কিছু হলো না। মা কোথায় গেছে কেউ কিছু জানে না। বলেও যায়নি। অবস্থা বেগতিক আঁচ করতে পেরে বাড়ির কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করা শুরু করে দিলো। এক পর্যায়ে কুকুরটি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো। খুঁজে বের করলো আকাশের মাকে। কুকুরটি তাকে ঘেউ ঘেউ করে লেজ নেড়ে নেড়ে বাড়ির পথ দেখাতে চাইল। তিনি কুকুরটিকে চিনতে পারলেন; কিন্তু কিছু বুঝে উঠতে পারলেন না। পরে কুকুরটা যখন পথ পানে একবার চলে যায় আবার ফিরে আসে তাকে বুঝাতে চায় তুমি আমার পিছু নাও তখন মায়ের মনটা আঁতকে ওঠে! তিনি কাল বিলম্ব না করে কাজ ফেলে রেখে কুকুরের পিছু পিছু বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। এসে দেখেন তার বাচ্চা অঝরে কাঁদছে। তিনি বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। কুকুরটি তার পাশে দাঁড়িয়ে আনন্দে লেজ নাড়তে থাকে। বাড়ির সবাই বিস্ময়ে কুকুরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
এরপর কেটে গেছে অনেক বছর। অনেক ত্যাগ আর অধ্যবসায়ের পর শিশু আকাশ এখন আকাশ সাহেব হয়েছেন। মায়ের দুঃখ ঘুচিয়েছেন। বাবার ব্যবসা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। কোনো মায়ের কোনো শিশুর কষ্ট দেখলে আকাশ সাহেবের মনটা তাই কাঁদে। আকাশ সাহেব সাবিহা ও তার ছেলে নয়নকে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন। কাজ দিয়েছেন। নয়ন এখন স্কুলে পড়ে।…
আজ ১লা মে। মে দিবস। শ্রমিক দিবস। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন। সাভারের রানা প্লাজার সামনে সকাল থেকেই ভিড় জমে উঠেছে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির কথা তোমরা জান। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে দু’হাজার তেরো সালের চব্বিশে এপ্রিল রাজধানীর পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলখ্যাত সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় সহস্রাধিক গার্মেন্টসশ্রমিক নিহত ও শত শত শ্রমিক আহত হন। ধ্বংসস্তূপের বেদিতে ফুল দিয়ে ভালোবাসা নিবেদন করতে এসেছেন নিহতদের স্বজনরা। নয়নের হাত ধরে সাবিহা খাতুনও এসেছেন। হাতে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা।
ধ্বংসস্তূপের মাটি ছুঁয়ে দেখতে চান সাবিহা। শুনতে চান তার স্বামীর হৃৎপিণ্ডের শব্দ, পায়ের আওয়াজ। নয়ন মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখে। অদূরে লাল গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন আকাশ সাহেব। তার দু’চোখে তখন অশ্রুধারা।

SHARE

Leave a Reply