Home স্মরণ প্রিয় কবি নজরুল ইসলাম । শরীফ আবদুল গোফরান

প্রিয় কবি নজরুল ইসলাম । শরীফ আবদুল গোফরান

মস্ত বড় এক দীঘি। নাম তার পীরপুকুর। এই পুকুরপাড়ের মসজিদের ইমাম কাজী ফকির আহমদ। জমি-জমা বলতে তেমন কিছু নেই। দরগাহের খাদেমগিরি আর মসজিদের ইমামতি করেই চলে সংসার। ফলে অভাব অনটন তার নিত্যসাথী। লোকে বলে, পাটনার হাজীপুর গ্রামে নাকি ছিল তাদের আদিবাস। ওখান থেকে তারা চুরুলিয়া গ্রামে এসে বসতি করেছেন।
কাজী সাহেবের ছেলে সন্তান বাঁচতো না। একে একে চার চারটি সন্তান জন্মের পরেই মারা যায়। ফলে দুঃখের শেষ নেই। তবুও মসজিদের মিনার হতে খুব ভোরে তার আজানের সুর ভেসে আসে। থরথর করে কেঁপে ওঠে গাছের পাতা। তারপর কোন এক সময় পুকুরের ছোট ঢেউভাঙা পানিতে মিশে যায় সেই সুর। এক এক করে চলে গেলো অনেকগুলো বছর।
ফিরে এলো ১৮৯৯ সালের ২৪ মে। গভীর রাত নীরব নিথর সারা গাঁ। কাজী সাহেবের সংসারে এলেন তার পঞ্চম সন্তান। দুঃখে তার মুখ মলিন। কারণ এ সন্তানকেও যদি বাঁচাতে না পারেন। মসজিদে গিয়ে সেজদায় পড়ে রইলেন। ছেলের জন্য পানাহ্ চাইলেন মহান আল্লাহর দরবারে।
বাবার দুঃখের দিনে জন্মেছে শিশুটি, তাই নাম রাখা হলো দুখু। মা জায়েদা খাতুনের খুশির শেষ নেই। দুখুকে কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে কত আদর। চুমুতে চুমুতে গাল ভরে দেয়। মা আদর যত্নে শিশু দুখুকে মানুষ করতে লাগলেন। বাবা-মার চোখের মণি দুখু মিয়া ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলেন।
যথাসময়ে বাবা তাকে গ্রামের মক্তবে ভর্তি করে দিলেন। মক্তবে তিনি আরবি ফার্সি শিখতে লাগলেন। লেখাপড়ায় দুখু খুব ভালো। একবার যা পড়তেন সেটা খুব সহজেই মনে রাখতে পারতেন। ছোটবেলা থেকে দুখু ছিলেন ডানপিটে। কোনো বাঁধাধরা নিয়ম তিনি মানতেন না। গ্রামের দুষ্টু ছেলেদের সর্দার ছিলেন তিনি। এ বাড়ির আম ও বাড়ির লিচু চুরিতে তার জুড়ি ছিল না। তার এসব দুরন্তপনায় গ্রামের লোকেরা মোটেও বিরক্ত হতো না। তিনি ডাগর ডাগর চোখ, ঝাঁকড়া কোঁকড়া চুল আর মিষ্টিমাখা হাসি দিয়ে সবার মন জয় করে নিতেন।
এতক্ষণে হয়তো তোমরা বুঝতে পেরেছে কে এই দুখু মিয়া। হ্যাঁ বন্ধু, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গল্পই করছিলাম তোমাদের কাছে।
তোমাদেরকে আগেই বলেছি, নজরুলের বাবা সম্পর্কে। তিনি ছিলেন খুবই ঈমানদার। ইবাদত-বন্দেগিতে সারাক্ষণ মশগুল থাকতেন। ছেলেকে মক্তবে দিয়েই তিনি নিশ্চিত। আর সবার মতো তার ছেলেও মানুষ হবে। ক্রমে ক্রমে নজরুলের বয়স বাড়তে লাগলো। ইতোমধ্যে আট বছরে পা দিয়েছে দুখু। আর এরই মধ্যে তিনি স্নেহময় পিতা কাজী ফকির আহমেদকে হারান। স্বামীর অকাল মৃত্যুতে মা জাহেদা খাতুন বিপদে পড়ে গেলেন। গরিবের সংসার। কিভাবে সংসার চালাবেন এই চিন্তা তার মনে। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়লেন না। ছেলের মুখের দিকে চেয়ে সাহসে বুক বাঁধলেন। এর মধ্যে নজরুল প্রাথমিক পাঠ শেষ করলেন। বয়স মাত্র ১০ বছর। সংসার অচল। অভাবের তাড়নায় লেখাপড়া বন্ধ। সংসারের ভার পড়লো নিজ ঘাড়ে। বাবার মক্তবেই চাকরি নিলেন নজরুল। কারণ সংসারের হাল ধরতে হবে তাকেই। বয়স কম বলে সবাই তাকে বলতো ছোট ওস্তাদজি। কিন্তু ও কাজ তার বেশি দিন ভালো লাগলো না।
প্রিয় কবি নজরুল ইসলাম । শরীফ আবদুল গোফরানগ্রাম ছেড়ে নজরুল চলে এলেন শহরে। আসানসোল শহর। চাকরি নিলেন এক রুটির দোকানে। খুব ভোরে ওঠে তাকে আটা মাখতে হয়। মাইনে মাত্র এক টাকা। তাতেই তিনি খুশি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পুঁথি নিয়ে বসতেন। সঙ্গীরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করতো। ভবিষ্যতে নজরুল কবি হবে এ কথা শুনে অবজ্ঞার হাসি হাসতো। এক সময় চাকরি ছেড়ে দিয়ে রফিকউল্লাহ নামে এক পুলিশ ইন্সপেক্টরের সাথে ময়মনসিংহের দরিরামপুর চলে এলেন। এখানে এসে কবি স্কুলে ভর্তি হলেন।
হঠাৎ একদিন তার মনে পড়ে গেলো নিজ গ্রামের কথা, ফলে চলে এলেন পুনরায় চুরুলিয়ায়। এবার রানীগঞ্জ সিয়ারসোল হাইস্কুলে ভর্তি হলেন। সাথে সাথে কবিতা চর্চাও করেন। কবি দশম শ্রেণীর ছাত্র। সেই সময় সারা দুনিয়াজুড়ে আরম্ভ হলো প্রথম মহাযুদ্ধ। সেই যুদ্ধের ডামাডোলের ঢেউ এসে লাগলো এই উপমহাদেশেও। তরুণ নজরুল তার নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। একদিন চলে এলেন করাচিতে। ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দিলেন। ১৯১৯ সাল। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, দলে দলে সৈন্যরা ঘরে ফিরতে লাগলো। নজরুলও ফিরে এলেন কলকাতায়।
এরপর নিজ বাড়ি চুরুলিয়া যান। কয়েকদিন পর পুনরায় ফিরে আসেন কলকাতায়। তখন ‘নবযুগ’ পত্রিকা প্রকাশ করতেন এ কে ফজলুল হক। নজরুল এ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু বেশিদিন থাকলেন না।
বের হলেন নতুনের খোঁজে। আজ এ শহর, কাল ও শহরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। গেলেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। শুরু করলেন লেখালেখি। তার লেখায় ঝড় উঠলো। ইংরেজবিরোধী লেখায় উথলে উঠলো গোটা দেশ। ইংরেজরা বন্দী করলেন তাকে। এক বছরের সাজা হলো তার। আলীপুর সেন্ট্রাল জেলেই কাটালেন এ সময়গুলো।
বন্ধুরা নজরুলকে নিয়ে এত অল্প পরিসরে লেখা মোটেও সম্ভব নয়। নজরুল হলেন এক মহাসাগর আর এই সাগর পাড়ি দিতে হলে অনেক সময়ের প্রয়োজন। তারপর এক এক করে চলে গেলো অনেক বছর। কঠিন রোগে আক্রান্ত হলেন কবি। তাঁর কলম থেমে গেলো। স্তব্ধ হয়ে গেলো মুখের ভাষা। প্রায় ৩৬ বছর কবি এভাবে বেঁচেছিলেন। কবি নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে কবি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। কবি তাঁর মৃত্যুর কথা ভেবেই হয়তো একদিন বলেছিলেন :
“মসজিদেরই পাশে আমার
কবর দিও ভাই
যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিনের
আজান শুনতে পাই।”

SHARE

Leave a Reply