Home ফিচার পুষ্টিগুণে ভরপুর বাংলাদেশের মৌসুমি ফল । আবদাল মাহবুব কোরেশী

পুষ্টিগুণে ভরপুর বাংলাদেশের মৌসুমি ফল । আবদাল মাহবুব কোরেশী

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে গ্রীষ্মের আবির্ভাব নতুন কোন চমক নয়। সময়ের চাকায় ঘুরতে ঘুরতে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত আর বসন্ত বাংলার আনাচে-কানাচে, শহর-বন্দর ও গ্রামের প্রতিটি দরজায় কড়া নাড়ে। বিশ্বের আর কোথাও এমন বৈচিত্র্যময় পরিবেশের সমাহার আছে কি না সন্দেহ। এখানে একেক সময় একেক ঋতু বেশ ঘটা করে হাজিরা দেয়। বর্ণিল চমৎকার পরিবেশের ডালা মেলে মনপ্রাণ উজাড় করে অভিবাদন জানায় আমাদের। শত রকম ফুল-ফল আর নানা উপসর্গ উপহার দিয়ে গোটা পরিবেশকে মাতিয়ে তোলে। গ্রীষ্মের কড়া রোদ বর্ষার উত্তাল ঢেউ শরতের কাশ হেমন্তের নতুন ধানের মৌ-মৌ গন্ধ গাঢ় কাফন বিছানো ঠকঠকে শীত আর ঋতুরাজ বসন্তের কুহু-কুহু কোকিলের টানা সঙ্গীত হৃদয়ে অন্য রকম দোলা দেয়। এ নিয়ে কত রকম প্রকাশ জগৎসেরা কবি-সাহিত্যিকদের কলম থেকে তা ভাবতেই কেমন যেন অহঙ্কারে মাথাটা উঁচু হয়ে ওঠে। আহ আমার দেশ! তুমি কত বৈচিত্র্যময়, কত সুন্দর। এই দেশে জন্ম নেয়াটাই যেন ভাগ্যের ব্যাপার। এখানে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য নদীর বাঁক বেয়ে নৌকা চলে। জেলেরা পাগলপারা গান গায় মনের সুখে। ছোট-বড় নানা প্রজাতির মাছ ধরে ডিঙি বেয়ে, জাল দিয়ে।
কিশোর ছেলে-মেয়েরা শাপলা তুলে। শালুক তুলে। থই থই পানিতে নাচে পাতিহাঁস, রাজহাঁস আর পানিতে ঘাসের নিচে মুখ লুখিয়ে থাকে পানকৌড়ি, ডাহুক। আর কত শত রঙবেরঙের পাখি উড়াল মারে, ডুব দেয় হাওরের জলে। এ সবই আমাদের দেশের প্রকৃতির আপন চলা। এখানে এ চলায় কারো হাত নেই, কারো সুপারিশ নেই, এটা মহান আল্লাহর নেয়ামতই বলা চলে, তবে মাঝে-মধ্যে যে এর ব্যতিক্রম হয় না, তা কিন্তু নয়।
বন্ধুরা, প্রকৃতির এ রকম শত উপহারের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপহারটা কি বলতে পারো? কী! একে অপরের দিকে তাকাচ্ছ যে! থাক্ থাক্ বলতে হবে না! আমিই বলছি। এখন গ্রীষ্মকাল। বাংলাদেশের প্রকৃতিতে গ্রীষ্মকাল তার অজস্র নেয়ামতের পসরা নিয়ে আমাদের মাঝে হাজির হয়েছে।
গ্রীষ্মকাল হচ্ছে ঋতু গণনার প্রথম মাস, যা বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসকে ধারণ করে। আমরা সহজভাবে বলে থাকি বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ- এই দুই মাস নিয়েই গ্রীষ্মকাল। এই সময়ে সূর্যের প্রচণ্ড তাপে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ভূমি, পানি শুকিয়ে যায়, অনেক নদীই নাব্যতা হারায়, পানিশূন্য মাটিতে ধরে ফাটল। গ্রীষ্মকাল মানেই তো নানারকমের রসালো, ঠাণ্ডা, মিষ্টি ফলের সমাহার- অর্থাৎ গ্রীষ্মকালের জ্যৈষ্ঠ মাসে পাওয়া যায় আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস, তরমুজ, জামরুল, বাঙ্গি, কদবেল, শসা, আমড়া, আরো কত কী! কোনটা ছেড়ে কোনটা চাই আবার কোনটা ছেড়ে কোনটা খাই। এ যেন ফলের প্রতিযেগিতা নানা জাতের রসালো ও বাহারি ফলের। এ জমজমাট আয়োজনকে অন্যভাবে মৌসুমি ফলের সমাহারও বলা চলে। আবার এ মাসকে মধুমাস বা রসালো মাসও বলা হয়। আর এসব মৌসুমি ফল ও ফলের পুষ্টিগুণ নিয়েই আজকে আমার লেখা। আমরা জেনে নেবো মৌসুমি ফল কাকে বলে, খেলে কী হয় বা কেন খেতে হয়, আমাদের মেধা বিকাশে মৌসুমি ফলের ভূমিকাই-বা কী? সবার আগে জেনে নেয়া ভালো মৌসুমি ফল কাকে বলে। সাধারণত যেসব ফল সারা বছর পাওয়া যায় না, নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে পাওয়া যায়, সেসব ফলকেই আমরা মৌসুমি ফল বলে থাকি। যেমন-

পুষ্টিগুণে ভরপুর বাংলাদেশের মৌসুমি ফল । আবদাল মাহবুব কোরেশীআম
স্বাদ ও ঘ্রাণের জন্য মৌসুমি ফলে সবার আগে যে ফলটির নাম আসে তা হলো আম। আম খেতে পছন্দ করে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। আম হলো ফলের রাজা। আমের কদর প্রতিটি মানুষের কাছে লোভনীয়। সেই পারস্য কবি আমির খসরু থেকে শুরু করে বিখ্যাত উদ্যানবিদ পোপেনো আমকে ফলের রাজা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। সম্ভবত আমের এমন আসমানছোঁয়া জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করে আমের গাছকে আমাদের দেশে জাতীয় গাছের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। আমাদের দেশে প্রায় হাজার জাতের আম দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ফজলি, ল্যাংড়া, মোহনভোগ, রাজভোগ, হাড়িভাঙ্গা, ব্রুনাই কিংস, গোপালভোগ, খিরসাপাতি, হিমসাগর, কোহিতুর, গোলাপ খাস, আশ্বিনা ইত্যাদি উল্লেখ করার মতো।
পুষ্টিগুণ বিবেচনা করলে আম একটি আদর্শ ফল যার মধ্যে রয়েছে ক্যালরি, কার্বোহাড্রেট, সুগার, প্রোটিন, ক্যারোটিন, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, থায়ামিন, রিবোফ্লোবিন, ফলিক এসিড, জিঙ্ক, ভিটামিন বি, ভিটামিন সি। একসঙ্গে এত ভিটামিন, মিনারেল ও শরীরের প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপাদানের জোগান খুব কম ফলেই আছে।
মোটকথা আমে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি একত্রে পাওয়া যায়। তাই আমকে বলা যায় সব রোগের জন্য শক্তিশালী প্রতিরোধক। তাই নিজের শরীর গঠনের স্বার্থে আমাদের পরিমাণ মতো আম খেতে হবে।

পুষ্টিগুণে ভরপুর বাংলাদেশের মৌসুমি ফল । আবদাল মাহবুব কোরেশীজাম
বাংলাদেশের পাড়া মহল্লা বা গ্রামে প্রায় প্রতিটি বাড়ির উঠোনে বিশাল যে ফলের গাছ সচরাচর চোখে পড়ে তা হলো মৌসুমি ফলের অন্যতম ফল জাম। এ জামের কথা উঠলেই মনে পড়ে আমাদের পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের সেই বিখ্যাত কবিতার লাইন- পাকা জামের মধুর রসে রঙ্গিন করি মুখ। অর্থাৎ টসটসে পাকা জাম খেলে মুখ রঙ্গিন হয়, কবি তা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। জাম সাধারণত দুই প্রকার যেমন- ১. কালো জাম ২. বুনো জাম। কালো জাম আকারে বড় আর বুনো জাম আকারে ছোট।
বন্ধুরা! এসো এবার জেনে নেই জামের পুষ্টিগুণাগুণের ধরন। জামে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-এ, জিঙ্ক, গ্লুকোজ, ফ্রুকটোজ ও ডেক্সটোজ। ভিটামিন-সি জ্বর, কাশি, টনসিল, ত্বক ও দাঁতের সমস্যায় কার্যকর। ভিটামিন-এ চোখের নানা রোগ প্রতিরোধ করে। মা ও শিশুর জন্য জিঙ্ক বেশ উপকারী। এ ছাড়াও উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য জাম ভীষণ উপকারী। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ও রক্তে চিনির মাত্রা কমাতে সাহায্য করে জাম। জামের বাইরের আবরণে থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ। আঁশজাতীয় খাবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে টিউমার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জাম কোলনের ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। তবে জামে খুব বেশি জৈব এসিড থাকার কারণে বেশি খেলে পেটে গ্যাস হতে পারে।

পুষ্টিগুণে ভরপুর বাংলাদেশের মৌসুমি ফল । আবদাল মাহবুব কোরেশীকাঁঠাল
মৌসুমি ফলের অন্যতম ফল হচ্ছে কাঁঠাল। কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। বাংলাদেশের সব জেলাতেই মোটামুটি কাঁঠালের গাছ দেখতে পাওয়া যায়। কাঁঠাল দারুণ সুস্বাদু ফল। পুষ্টিগুণে অতুলনীয় এ ফল খেতে দারুণ মজা। পরিবারের সবার পুষ্টির ঘাটতি মেটাতে একটি কাঁঠালই যথেষ্ট। শরীরে শক্তি জোগাতে কাঁঠালের জুড়ি নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ডা: মহসীন কবিরের মতে কাঁঠালে রয়েছে ৯৪ কিলোক্যালরি শক্তি।
ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক, বিটা ক্যারোটিন, লুটেইন- কী নেই কাঁঠালে? এ ছাড়াও কাঁঠালের বিচিতে রয়েছে উচ্চতর প্রোটিন। ভিটামিন-এ চোখের পুষ্টি জোগায় ও চোখের নানা সমস্যা দূর করে এবং দেহে ক্ষতিকারক রোগজীবাণু প্রবেশে বাধা দেয়। দেহের ক্ষতস্থান সারিয়ে তুলতে এবং গরমে যে সর্দি, হাঁচি, কাশি হয় কাঁঠালের ভিটামিনসি তা দূর করতে সাহায্য করে। কাঁঠাল আঁশজাতীয় ফল, তাই এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ও দেহের রক্তনালির দেয়ালে চর্বি জমতে দেয় না। কাঁঠালে পাওয়া যায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। কাঁঠালের অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে রয়েছে বিটা ক্যারোটিন, লুটেইন যা প্রোস্টেট, পাকস্থলী ও ফুসফুসের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
পটাশিয়াম দেহের কোষগুলোর বৃদ্ধি পেতে ও দেহের পানির সমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। ক্যালসিয়াম দেহের হাড়, দাঁতের পুষ্টি জোগায়। জিঙ্ক শরীরের ইনসুলিন হরমোনের সরবরাহ নিশ্চিত করে আর ম্যাগনেসিয়াম ও সোডিয়াম দেহের লবণ এবং ক্ষারের সাম্যাবস্থা বজায় রাখে। ভিটামিন-বি কমপ্লেক্সের মধ্যে কাঁঠালে রয়েছে ফোলেট, নিয়াসিন, থায়ামিন, রিবোফ্লভিন। এগুলো দেহে শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে ও নানা রোগ থেকে আমাদের প্রতিরোধ করে। কাঁঠাল কোলেস্টেরলমুক্ত এবং এ ফলে নেই কোনো ক্ষতিকারক চর্বি। তাই ডায়াবেটিস ও হার্টের অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তিসহ সবাই নির্দ্বিধায় কাঁঠাল খেতে পারেন।

পুষ্টিগুণে ভরপুর বাংলাদেশের মৌসুমি ফল । আবদাল মাহবুব কোরেশীলিচু
গ্রীষ্মের অন্যতম সুস্বাদু ফল লিচু। খুব অল্প সময় থাকে বলে এর চাহিদাও ব্যাপক। দানাযুক্ত গোলগাল ফলটি ঝোঁটা বেঁধে গাছে পাকলে দারুণ সুন্দর দেখায়। খেতেও অতুলনীয়। বাংলাদেশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগীয় প্রধান ফারাহ মাসুদা জানান, লিচুর পুষ্টি ও গুণের কথা। মৌসুমি ফল লিচু ভিটামিন ও খাদ্যশক্তির অন্যতম উৎস। এতে রয়েছে মানব শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান। শ্বেতসার এবং ভিটামিন সি’র ভালো উৎস। ছোট বড় সব বয়সের মানুষই এই সুস্বাদু ফল খেতে পারে। তিনি জানান, লিচুতে রয়েছে সামান্য পরিমাণে প্রোটিন ও ফ্যাট যা মানবদেহের জন্য প্রয়োজন। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে রয়েছে ১.১ গ্রাম প্রোটিন এবং ০.২ গ্রাম ফ্যাট। লিচুতে পর্যাপ্ত পরিমাণে শ্বেতসার পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ১৩.৬ গ্রাম শ্বেতসার থাকে। এ ছাড়া লিচুতে ০.০২ গ্রাম ভিটামিন বি১ এবং ০.০৬ গ্রাম বি২ রয়েছে। এ ছাড়াও এতে কিছু পরিমাণে খনিজ লবণ থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ০.৫ গ্রাম খনিজ লবণ পাওয়া যায় বলে জানান মাসুদা। লিচুতে রয়েছে ভিটামিন সি যা ত্বক, দাঁত ও হাড়ের জন্য ভালো। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ৩১ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি পাওয়া যায়। নানারকম চর্মরোগ ও স্কার্ভি দূর করতে সাহায্য করে ভিটামিন সি। তা ছাড়া এটি ত্বক উজ্জ্বল করতে ও বলিরেখা কমাতেও সাহায্য করে। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম রয়েছে। ক্যালসিয়াম দেহের হাড় গঠন করে ও হাড়ের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। লিচুতে অল্প পরিমাণে লৌহ পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রামে ০.৭ মিলিগ্রাম লৌহ। এ ছাড়াও লিচুতে রয়েছে থিয়ামিন, নিয়াসিন ইত্যাদি, যা লিচুর পুষ্টিগুণ আরও বৃদ্ধি করে। এসব ভিটামিন শরীরের বিপাক ক্ষমতা বাড়ায়। শক্তির ভালো উৎস লিচু। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচু থেকে ৬১ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। এটি শরীরের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। পাশাপাশি চর্বি কমাতে সাহায্য করে। লিচুর অলিগোনল নামের উপাদান অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টিইনফ্লুয়েঞ্জা হিসেবে কাজ করে। এ উপাদান রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে, ত্বকে ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মির প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করে এবং ওজন কমায়। লিচু মানবদেহে ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতা হ্রাস করে। ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কোষ ধ্বংস করে। লিচুতে রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম এবং অন্যান্য খনিজ উপাদান যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

পুষ্টিগুণে ভরপুর বাংলাদেশের মৌসুমি ফল । আবদাল মাহবুব কোরেশীআনারস
মৌসুমি ফলের অন্যতম ফল আনারস। ফলটি মিষ্টি, রসালো ও তৃপ্তিকর। অসংখ্য গুণে গুণান্বিত এই ফলের জুড়ি মেলা ভার। ফলটিতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ, সি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালোরি ও আঁশ রয়েছে। এটি কোলেস্টেরল ও চর্বিমুক্ত। তাই স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ ফলের জুড়ি নেই। শুনতে ভালো লাগবে যে আনারস আমাদের ওজন কমাতে সাহায্য করে। কারণ আনারসে প্রচুর ফাইবার এবং অনেক কম ফ্যাট রয়েছে। আনারসে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজ থাকার ফলে তা আমাদের হাড়ের গঠন ও হাড়কে বেশ মজবুত করে। চুলকে করে শক্তিশালী। এতে রয়েছে প্রচুর ক্যালরি, যা আমাদের শক্তি জোগায়। এ ফলটি ত্বকের মৃত কোষ দূর করে, ত্বককে কুঁচকে যাওয়া থেকে বাঁচায়। আনারস জ্বর ও জন্ডিস রোগের জন্য বেশ উপকারী। দেহের তৈলাক্ত ত্বক, ব্রণসহ সব রূপলাবণ্যে আনারসের যথেষ্ট কদর রয়েছে।
আনারসের ক্যালসিয়াম দাঁতের সুরক্ষায় কাজ করে। মাড়ির যে কোনো সমস্যা সমাধান করতে বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন আনারস খেলে দাঁতে জীবাণুর আক্রমণ কম হয় এবং দাঁত ঠিক থাকে। আনারস হজমশক্তি বৃদ্ধি করতে বেশ কার্যকর। বদহজম বা হজমজনিত যে কোনো সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে প্রতিদিন আনারস খাওয়া অত্যন্ত জরুরি। আনারস ভাইরাসজনিত ঠাণ্ডা ও কাশি প্রতিরোধে সাহায্য করে। যদি ঠাণ্ডা-কাশি বেশি হয় তাহলে ডাক্তারের ওষুধের পাশাপাশি আনারস খেলে দ্রুত উপকার পাওয়া যাবে। গরম-ঠাণ্ডার জ্বর, জ্বর-জ্বর ভাব দূর করে এই ফল। এতে রয়েছে ব্যথা দূরকারী উপাদান। তাই শরীরের ব্যথা দূর করার জন্য এর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। আনারসের অপকারিতাও কম নয়। যেমন- আনারস খাওয়ার ফলে অনেক নারী ও পুরুষের দেহে অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। আনারসে আছে অনেক বেশি পরিমাণে প্রাকৃতিক চিনি। আনারসের ২টি চিনি উপাদান সুক্রোজ এবং ফ্রুক্টোজ যা ডায়বেটিস রোগীদের জন্য ক্ষতিকর। কাঁচা আনারসে আছে অনেক বেশি পরিমাণে এসিডিটি যা আমাদের মুখের ভেতর ও গলায় শ্লেষ্মা তৈরি করে এবং ফলটি খাওয়ার পর মাঝে মাঝে অনেকের পেটে ব্যথাও হতে পারে।

পুষ্টিগুণে ভরপুর বাংলাদেশের মৌসুমি ফল । আবদাল মাহবুব কোরেশীবাঙ্গি
মৌসুমি ফলের অন্যতম এক দেশী ফল বাঙ্গি। অনেকটা প্রচারবিমুখ এই ফলটি দেখতে যেমন সুন্দর খেতেও তেমন চমৎকার। গ্রীষ্মের এই চরম গরমে আরামদায়ক ফল হিসেবে বাঙ্গির তুলনা হয় না। পুষ্টিতে ভরপুর এই ফলটি সব বয়সের মানবদেহের জন্যই উপকারী।
বাঙ্গিতে প্রচুর ভিটামিন এ ও সি রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম বাঙ্গিতে ৩৪ কিলোক্যালোরি খাদ্যশক্তি পাওয়া যায়। ফলিক এসিডে পূর্ণ এই ফলটি মানবদেহের জন্য খুবই উপকারী। ফলিক এসিড রক্ত তৈরিতে সহায়তা করে। বাঙ্গি একেবারে চর্বি বা কোলেস্টেরলমুক্ত। তাই কোনোভাবেই মুটিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। বাঙ্গির ভিটামিন-এ দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। বাঙ্গিতে আছে ০.৯ গ্রাম খাদ্য আঁশ। তাই যাদের কোষ্ঠকাষ্ঠিন্যের সমস্যা আছে তারা নির্দ্বিধায় বাঙ্গি খেতে পারেন। ছোট বাচ্চাদের মেধা বিকাশের দায়িত্বটা বাঙ্গিকে দিয়ে রাখতে পারেন। শরীরে কাটাছেঁড়া থাকলে বাঙ্গিতে থাকা ভিটামিন-সি তা দ্রুত শুকাতে সহায়তা করবে। বাঙ্গির রস শরীরের সঠিক তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায়। রাখে ত্বক সুস্থ ও সুন্দর রাখে। সুতরাং নির্দ্বিধায় বাঙ্গি আমাদের জন্য এক উপকারী ফল। এ ছাড়া তরমুজ, পেয়ারা, কদবেল, শসা, আমড়া, চালতা ইত্যাদিও মৌসুমি ফলের অন্তর্গত। এসব ফল খেতে যেমন সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিগুণেও ভরপুর। সুতরাং এসব ফল খেতে মোটেও অবহেলা নয়। নিজের দেহ মন আর মেধা বিকাশের লক্ষ্যে আমাদের এসব ফল খাওয়া উচিত। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে কোন অবস্থাতেই যেন পরিমাণের অধিক খাওয়া না পড়ে। তাই আমাদের নিচের ছড়াটার প্রতি অবশ্যই আমল করতে হবে।
আম খাবো জাম খাবো, আরো খাবো বেল
পুষ্টিতে ভরপুর, কলা কদবেল।
কাঁঠাল কলা আর, খাবো জলপাই
নারকেল আনারস, কুলও খাবো ভাই।
তরমুজ পেয়ারা, লিচু আতা পেঁপে
সব ফল খাবো আমি, ঠিক মেপে মেপে।

SHARE

Leave a Reply