Home ভ্রমণ চন্দ্রনাথ পাহাড় চূড়ায় একদিন । নাঈম আরিয়ান

চন্দ্রনাথ পাহাড় চূড়ায় একদিন । নাঈম আরিয়ান

চন্দ্রনাথ পাহাড় চূড়ায় একদিন । নাঈম আরিয়ানসেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল শেষ। এখন ঘোরাঘুরির পালা। যখন থেকে পরীক্ষা শেষ হওয়ার দিন ঘনিয়ে আসছে তখন থেকেই ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছিলো। ঠিক করা হলো এবারের ট্রিপটা কাছে কোথাও এবং অ্যাডভেঞ্চার টাইপের হবে। তাই প্রথমেই ঠিক হয়ে গেলো সীতাকুন্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় যেটা চট্টগ্রাম জেলার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। কিন্তু সময় নিয়ে লাগলো এক ঝামেলা। একেকজনের একেক সমস্যা। একজনের এইটা তো আরেকজনের ওইটা। এভাবে প্ল্যানটা ঝুলতে লাগলো মাসখানেক। অবশেষে দিন ঠিক হলো ১৬ ডিসেম্বর। প্ল্যানটা কী রকম হবে এসব কল্পনা করতে করতে আনন্দে দিন কাটতে লাগলো আর কাক্সিক্ষত দিনটির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু ঠিক আগের দিন আবার টাইম চেঞ্জ। ১৬ ডিসেম্বর ছুটির দিন, এই জন্য গাড়ি পাওয়া যাবে না। তা ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় বিজয় দিবস উদযাপনের প্রোগ্রাম হবে। এবার ঠিক হলো পরদিন ১৭ ডিসেম্বর। যাই হোক, অবশেষে বহুল আকাক্সিক্ষত দিনটির আগমন। সকাল ৯টার মধ্যে সবাই পৌঁছে গেলাম শহরের একে খান মোড়ে। একে খান থেকে লোকাল বাস আছে যেগুলো ফেনী পর্যন্ত যায়। আমরা সেখানে নাস্তা শেষে বাসে উঠলাম।
আর কয়েকদিন পরেই নির্বাচন, তাই সবখানেই কঠোর নিরাপত্তা। বাসে বাসে পুলিশের তল্লাশি। এতটুকু পথে দুইবার গাড়ি থামিয়ে পুলিশ চেক করলো। তারপর গাড়ি এসে থামলো সীতাকুন্ড শহরে। আমরা বাস থেকে নেমে সীতাকুন্ড বাজারে গেলাম। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন, শুকনা খাবার, কলা, পানি কিনে নিলাম। তারপর সিএনজি নিয়ে একদম পাহাড়ের কিনার পর্যন্ত এলাম।
নিচের ঢালু জায়গা থেকে ১০০০ ফুট ওপরের পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত মন্দিরটি দেখা যাচ্ছে। সবাই রোমাঞ্চকর অনুভূতিতে নিঃশ্বাস ফেলে বললো ‘এ আর এতো উঁচু কী, ওইতো দেখা যাচ্ছে।’
পূর্বে ভ্রমণকারী অনেকের সতর্কবার্তা ছিলো এমন- এটা অনেক উঁচুতে তাই উঠতে কষ্ট হবে, জায়গাটা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ, তাই খোলা চোখে খুব সাবধানে উঠতে হবে, অনেক জায়গায় একপাশ পাহাড় আর অন্যপাশ পুরোটাই খালি যার মানে অন্যপাশ গভীর গর্ত, সুতরাং অসাবধানবশত পা ফস্কে গেলেই ভয়ানক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
এইসব সতর্কবার্তাকে একপাশে রেখে শুরু হলো আমাদের সাতজনের চন্দ্রনাথ পাহাড় অভিযান। আমাদের মধ্যে জমির আগেও একবার এসেছিলো, তাই ও আমাদের গাইড নিযুক্ত হলো।
শুরুর দিকের পথটা মোটামুটি সমতল। তাই নাচতে নাচতে উঠতে ছিলাম সবাই। কিছুদূর যাওয়ার পর ডানে বাঁয়ে দুটো পথ। ডান পাশেরটার প্রায় পুরোটাই সিঁড়ি কিন্তু এটা পাহাড় থেকে নামার জন্য সুবিধাজনক। বাম পাশেরটায় তেমন সিঁড়ি নেই বরং অনেক জায়গায় খাড়া কিন্তু এটাই পাহাড়ে ওঠার জন্য তুলনামূলক ভালো। সে জন্য আমরা বামপাশ দিয়ে উঠতে লাগলাম। সামান্য একটু উঠেই সবাই হাঁপিয়ে পড়লাম। পাঁচ মিনিট উঠলে আরো পাঁচ মিনিট জিরোতে হতো।
আমাদের এক বন্ধু ছিলো মোর্শেদ যাকে জমির ফোনে জানিয়েছিলো সীতাকুন্ডে যাচ্ছি বলে। কিন্তু সে জানতো না আমরা যে পাহাড়ে উঠবো। বেচারা ছিলো অসুস্থ। তার অবস্থা এমন হয়েছিলো যে তা বলার বাইরে। বেচারার বেগতিক অবস্থা দেখে আমরা জমিরকে ইচ্ছামত গালি দিয়ে আমাদের গুরু দায়িত্ব শেষ করলাম।


আমরা বিরতি নিয়ে নিয়ে উঠছিলাম ওপরে। পথ অতি সংকুল। কোথাও ভাঙা ভাঙা সিঁড়ি। কোথাও একদম খাড়া রাস্তা। একপাশে গভীর গর্ত। খুব মনোযোগের সাথে সতর্কতা নিয়ে পা ফেলতে হয়


অন্য এক বন্ধু ছিলো জিহাদ। সে একটু স্বাস্থ্যবান, হৃষ্টপুষ্ট মানুষ ছিলো। স্বাভাবিকভাবেই এ শরীর নিয়ে পাহাড়ে ওঠা অনেক দুরূহ এবং ভীষণ কষ্টকর কাজ। সে বারবার বলেছিলো ‘প্রথমে কে বলেছিলো এই পাহাড়ে ওঠার কথা, আমি এখন তারে খুঁজতাছি।’ ‘আর জীবনে পাহাড়ে ওঠার নাম মুখে নিবো না।’
বাকি বন্ধুদের মধ্যে সাঈদ, কাউসার, রিয়াদ সবাই হাঁপিয়ে উঠেছিলো। আমার অবস্থাও বর্ণনা করার মতো নয়। কিন্তু কেন জানি মনে যথেষ্ট বল ছিলো, উদ্যম ছিলো, ¯পৃহা ছিলো, এসেছি যখন একদম চূড়াতে উঠবোই।
যাই হোক, আমরা বিরতি নিয়ে নিয়ে উঠছিলাম ওপরে। পথ অতি সংকুল। কোথাও ভাঙা ভাঙা সিঁড়ি। কোথাও একদম খাড়া রাস্তা। একপাশে গভীর গর্ত। খুব মনোযোগের সাথে সতর্কতা নিয়ে পা ফেলতে হয়। একদম একনিষ্ঠতার সাথে পথ চলতে হবে। এরই মধ্যে আমাদের দু-তিনবার নাস্তা খাওয়া হয়ে গেছে যেগুলা আমরা নিয়ে গিয়েছিলাম। কিছুদূর পর পর পাহাড়েই ছোট একটা দুটো ঝুপড়ি পড়ে, যেগুলাতে খাবারের দাম অতি চড়া। তাই যারাই যাবেন, খাবার আগে থেকেই কিনে নিয়ে যাবেন। উঠার পথে ডানদিকে আরেকটা পাহাড় চূড়ায় আরো একটা মন্দির আছে। এটার নাম বিরুপাক্ষ মন্দির। আমরা প্রথমে সেটাতে গেলাম। চূড়া থেকে প্রকৃতি কত যে সুন্দর, মনোরম দেখাচ্ছিলো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দূরের দিগন্তে আকাশের সাথে সমতল যেন মিশে গেছে। চারপাশে উঁচু-নিচু পাহাড় আর পাহাড়। আমরা সেখানে অনেকগুলো ছবি তুললাম। তারপর সেখান থেকে নেমে বামদিকে চন্দ্রনাথ চূড়ার উদ্দেশে রওনা দিলাম।
বিরূপাক্ষ মন্দির থেকে চন্দ্রনাথ মন্দির এর দুরত্ব ১০০ থেকে ১৫০ মিটার। কিন্তু এই জায়গাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। এই পুরো পথটাই প্রায় খাড়া, উপরের দিকে। কোথাও কয়েকটা আধা আধা সিঁড়ি আর বাকি পথে শুধু পা রাখার মত ছোট ছোট খোঁপ। পথের ডানপাশেই খাদ। ধীরে সুস্থে অতটুকু পথ পাড়ি দিয়েই আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের কাক্সিক্ষত জায়গায়, চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায়। দেখলাম আমাদের আগেই সেখানে অনেক দর্শনার্থী পৌঁছে গেছেন। শুরুতেই কিছুটা ফাঁকা জায়গা যেখানে একটা গাছ রয়েছে। সেখানে অনেকে ছবি তুলছে, অনেকে দিগন্তে তাকিয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আমরাও কিছু ছবি তুলে মন্দিরের কাছে চলে এলাম। মন্দিরে অনেক মানুষ। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এখানে প্রায়ই পূজা দিতে আসেন।
এইদিক থেকে অনেক বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকার মতো দৃশ্য। দূরের পাহাড়গুলো আকাশের সাথে গিয়ে মিশেছে। প্রকৃতির এমন দৃশ্য মানুষের মনকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়, প্রশান্তি এনে দেয়, সমস্ত ক্লান্তি, অবসাদ দূর করে দেয়, চোখ জুড়িয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় এই চিরসত্য কথা ‘প্রকৃতি কখনো কাউকে হতাশ করে না’। প্রকৃতি উদার, অকৃপণ। আকাশ-পাহাড় বিস্তৃত এমনি সুদৃশ্য যে সেটা কাগজে বর্ণনা করার মতো নয়। নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে আমরা সবাই ক্লান্তি ভুলে একদম প্রফুল্লিত হয়ে উঠলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। হঠাৎ করে হালকা ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। বৃষ্টি হলে পথ পিচ্ছিল হয়ে যাবে, তখন নামার পথটা ভয়ঙ্করভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হবে। কিন্তু বৃষ্টি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। নিশ্চিন্ত হলাম। ঘন্টাখানেক চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় কাটিয়ে অবশেষে আমরা নামার পথ ধরলাম। তারপর সীতাকুন্ড বাজারে এসে নামাজ পড়ে, দুপুরের খাবার খেয়ে আরেকটা চমৎকার জায়গা গুলিয়াখালী সি-বিচের উদ্দেশে রওনা দিলাম।

SHARE

Leave a Reply